08/09/2025
ছাত্রলীগের ত্যাগ, সংগ্রাম ও বিজয়ের অম্লান ইতিহাসঃ
ছাত্র রাজনীতি উনিশ শতকের গোড়ার দিকে ছাত্র রাজনীতি বাংলার রাজনীতিতে একটি নতুন মাত্রা যোগ করে। বিশ শতকের প্রথম পাদে বিপ্লবী সন্ত্রাসবাদী আন্দোলন, স্বদেশী আন্দোলন ও অসহযোগ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ছাত্র রাজনীতি একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পরিগ্রহ করে। তবে এর আগে যে ছাত্র রাজনীতি একেবারেই ছিল না তা বলা যাবে না। পাশ্চাত্য শিক্ষার একটি বৌদ্ধিক প্রতিক্রিয়া হলেও তৎকালীন ইয়ং বেঙ্গল ছিল ছাত্রদেরই একটি আন্দোলন। এটি ছিল মূলত প্রচলিত নিয়মাচারের প্রতি এক ধরনের বিদ্রোহ। কিন্তু ইয়ং বেঙ্গল গোষ্ঠী সামাজিক ও অন্যান্য ব্যাপারেও আগ্রহী ছিল, যেগুলি পরবর্তীকালে রাজনীতির অংশ হয়ে ওঠে। উনিশ শতকের সত্তরের দশকের গোড়ার দিকে সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ভারতীয়দের মধ্যে রাজনৈতিক চেতনা সঞ্চারের লক্ষ্যে একটি ছাত্রসংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। একই সময়ে আনন্দমোহন বসু ছাত্রদের রাজনীতিতে যোগদানের আহবান জানান এবং ছাত্রদের রাজনীতি বিষয়ে আনুষ্ঠানিক শিক্ষাদান শুরু করেন। কিন্তু বিদ্যমান রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি, বিশেষত স্কুল ও কলেজ কর্তৃপক্ষের কড়া শাসন ছিল ছাত্রদের রাজনীতিতে আগ্রহী হয়ে ওঠার পথে প্রধান বাধা। এ ছাড়া উনিশ শতকের শেষভাগের পূর্ব পর্যন্ত উপনিবেশিক সরকারের একটি চাকুরির জন্য কিছুটা বিদ্যার্জন ছিল সকল শ্রেণীর ছাত্রের সর্বোচ্চ উচ্চাভিলাষ।
বিশ শতকের গোড়ার দিকে পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর জাতীয়তাবাদী আন্দোলন ছাত্রদের সক্রিয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণে প্রণোদনা জোগায়। জাতীয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণ সত্ত্বেও ১৯২৮ সালে কংগ্রেসের উদ্যোগে নিখিল বঙ্গ ছাত্র সমিতি গঠিত হওয়ার আগে বাঙালি ছাত্রদের কোনো নিজস্ব সংগঠন ছিল না। এ সংস্থার সভাপতি ও সম্পাদক ছিলেন যথাক্রমে প্রমোদ কুমার ঘোষাল এবং যাদবপুর (জাতীয়) ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ছাত্র ও ছাত্র পত্রিকার সম্পাদক বীরেন্দ্রনাথ দাসগুপ্ত। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন পন্ডিত জওহরলাল নেহরু, আর অতিথি বক্তা ছিলেন সুভাষচন্দ্র বসু। সংস্থার গঠনতন্ত্রের কাঠামো ছিল কংগ্রেসের আদলে তৈরি। একটি কেন্দ্রীয় কাউন্সিল ও ১৯ সদস্যের কার্যনির্বাহী কমিটি নিয়ে সমিতির কাঠামো গঠিত হয়। গঠনতন্ত্রে উল্লিখিত না থাকলেও কার্যত নিখিল বঙ্গ ছাত্র সমিতি ছিল কংগ্রেসের ছাত্রফ্রন্ট।
বিশ শতকের বিশের দশকের রাজনীতিতে মুসলিম ছাত্রদের অংশগ্রহণ প্রায় ছিলই না। মুসলিম অভিভাবক ও নেতারা তাদের রাজনীতি থেকে দূরে রাখার পক্ষপাতী ছিলেন। তা সত্ত্বেও কংগ্রেসের উদ্যোগে গঠিত নিখিল বঙ্গ ছাত্র সমিতির দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে ঢাকা শহরের কয়েকজন মুসলিম বুদ্ধিজীবী নিজেদের একটি ছাত্রসংগঠনের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন। ফলত ১৯৩০ সালের ১২ জুলাই ঢাকায় অনুষ্ঠিত মুসলিম ছাত্রদের একটি সম্মেলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. শহীদুল্লাহ্কে একটি মুসলিম ছাত্র সমিতি গঠনের দায়িত্ব দেয়া হয় এবং ১৯৩২ সালে নিখিলবঙ্গ মুসলিম ছাত্র সমিতি প্রতিষ্ঠিত হয়। রাজনীতিতে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকা ছিল এ ছাত্রসংগঠনের ঘোষিত নীতি। ইতঃপূর্বে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য লে. কর্নেল এইচ সোহরাওয়ার্দী মুসলিম ছাত্রদের রাজনীতি থেকে দূরে থাকার আহবান জানিয়েছিলেন।
কিন্তু মুসলিম ছাত্রদের এ সংগঠনটি আসলে মুসলিম রাজনৈতিক নেতারাই পরিচালনা করতেন এবং তাদের নানা দল-উপদল এটি নিয়ন্ত্রণ করতে চাইত। এভাবেই অভিন্ন সংগঠনভুক্ত হওয়া সত্ত্বেও টেইলর হোস্টেল ও কারমাইকেল হোস্টেলের ছাত্ররা যথাক্রমে মুসলিম লীগ ও কৃষক-প্রজা পার্টি এ দুটি রাজনৈতিক দলের অনুগামী হিসেবে বিভক্ত হয়ে পড়ে। ১৯৩৭ সালে সাধারণ নির্বাচনকালে এ ধারা আরও ঘনীভূত হয়। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ১৯৩৭ সালে গঠন করেন অল ইন্ডিয়া মুসলিম স্টুডেন্টস ফেডারেশন এবং ওই বছরই কলকাতায় এর বঙ্গীয় শাখা প্রতিষ্ঠিত হয়। অবশ্য ১৯৩৭ সালের নির্বাচনের আগে খুব কমসংখ্যক মুসলিম ছাত্রই এসব রাজনৈতিক সংগঠনে আগ্রহী ছিল।
কিন্তু ১৯৩৭ সালের নির্বাচনের পর এবং জিন্নাহর নেতৃত্বে বাংলায় মুসলিম লীগের বিস্তার ঘটলে ছাত্ররা মুসলিম লীগ নেতাদের অনুগামী হয়ে ওঠে। কলকাতায় ইস্পাহানি ও ঢাকায় খাজাদের ভবনগুলি ছাত্রদের ওপর মুসলিম লীগের নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার কেন্দ্রে পরিণত হয়। ১৯৩৮ সালে বাংলায় অল ইন্ডিয়া মুসলিম স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের নতুন নামকরণ হয় অল বেঙ্গল মুসলিম স্টুডেন্টস লীগ। পুনর্গঠিত এ সংগঠনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ছিলেন যথাক্রমে ঢাকার আবদুল ওয়াসেক ও যশোরের শামসুর রহমান। এ মুসলিম স্টুডেন্টস লীগই পূর্ববাংলার মুসলিম ছাত্রদের ব্যাপকভাবে রাজনীতিতে আকৃষ্ট করে। ঢাকার নবাব ছিলেন সংগঠনের পৃষ্ঠপোষক। মুসলিম স্টুডেন্টস লীগই পাকিস্তান আন্দোলনে ছাত্রদের ব্যাপক যোগদান নিশ্চিত করেছিল।
সুদীর্ঘ দু'শ বৎসর সমগ্র জাতি বৃটিশ বেনিয়াদের শাসনে ছিল। তারপর ১৯৪৭ সালে বৃটিশদের শৃঙ্খল থেকে জাতি মুক্তি পাবার পর পাকিস্তান শাসক গোষ্ঠী বাঙ্গালী এবং বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে এক হীন চক্রান্ত শুরু করে। তৎকালীন 'পাকিস্তান ' দুইটি প্রদেশ ( পূর্ব ও পশ্চিম ) নিয়ে গঠিত হয়। সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের সাথে তাদের সুসম্পর্ক ছিল না। তারা বাঙ্গালী জাতিকে পিছনে ফেলার জন্য প্রথমে আঘাত হানে তাদের শিক্ষা সংস্কৃতির উপর, তারা বাঙ্গালীর মুখের ভাষা, মায়ের ভাষা কেড়ে নিতে চাইল। পাকিস্তান সৃষ্টির পরপরই ঢাকার কার্জন হল প্রাঙ্গণে এক সভায় বড় লাট মুহম্মদ আলী জিন্নাহ এই উক্তটি করেছিলেন -" 'উর্দু এন্ড উর্দু ' এলোন শ্যাল বি দ্যা স্টেট ল্যাংগুয়েজ অব পাকিস্তান "। জিন্নাহ সাহেবের সেই স্বৈরাচারী মনোভাব ব্যক্তকারী ও উদ্বত্যপূর্ণ উক্তি কিন্তু সেদিন বিনা চ্যালেঞ্জে ছেড়ে দেওয়া হয় নি। 'নো' 'নো' বলে ছাত্র সমাজ সেদিন শক্তিশালী বড় লাট সাহেবের মুখের সামনেই ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন। এর পরবর্তী তিন বৎসর 'রাষ্ট্র ভাষা' দিবস হিসেবে সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে পালিত হয়। ভাষাকে কেন্দ্র করে সরকারের হীন চক্রান্তের মুখোশ যতই স্পষ্ট হচ্ছে, আন্দোলন ততই প্রকটিত হতে লাগল।পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর বিশেষত ১৯৪৮ সালে রাষ্ট্রভাষা সম্পর্কে জিন্নাহর ঘোষণার পর মুসলিম ছাত্রলীগের ওপর খাজা পরিবারের প্রভাব লোপ পায়। মুসলিম লীগের খাজাবিরোধী উপদলটি অল বেঙ্গল মুসলিম স্টুডেন্টস লীগ থেকে বেরিয়ে ১৯৪৮ সালে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম স্টুডেন্টস লীগ গঠন করে। এ বছরই শুরু হয় ভাষা আন্দোলন এবং তাতে নেতৃত্ব দেয় এ ছাত্রলীগ। এ জাতীয় আন্দোলনে ছাত্রদের অবদান সুজ্ঞাত ও সর্বজনস্বীকৃত। কিন্তু ভাষাসমস্যার সমাধান হলেও ছাত্র আন্দোলন থামে নি । যার মাধ্যমে সর্বপ্রথম উদ্ভব হয়েছিল বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের বীজ।
৫৪ এর যুক্তফ্রন্ট আন্দোলন, ৫৮ এর সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলন ৬২'র শিক্ষা আন্দোলনেও ছাত্রলীগেই নির্ভীক ও স্বার্থক নেতৃত্ব প্রদান করে। ৪৮-৬২ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ১৪ বছরের সংগ্রামের অভিজ্ঞতা থেকে যে উপলব্ধি সঞ্চিত হয় তাহলে পাকিস্তানি রাষ্ট্র কাঠামোর অভ্যন্তরে বাঙ্গালী জাতির অধিকার প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।
ছাত্রলীগ ও নিউক্লিয়াসঃ
পূর্বপাকিস্তান ছাত্রলীগের মধ্যে সুস্পষ্ট দু’টি ধারা বিদ্যমান ছিল। একটি ছিল মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে নিজস্ব রাজনীতির ধারা এবং অপর অংশের ঝোঁক ছিল মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের প্রতি। সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী নিজস্ব রাজনীতির ধারার তিনজন ছাত্রনেতা ১৯৬২ সালে ছাত্রলীগের অভ্যন্তরে গোপন সংগঠন ‘স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ’ গঠন করেন। তিন সদস্যের এই ক্ষুদ্র সত্তা পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলাদেশের ‘নিউক্লিয়াস’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। নিউক্লিয়াসের তিনজন সদস্য ছিলেন সিরাজুল আলম খান, আব্দুর রাজ্জাক ও কাজী আরেফ আহমেদ। এরা ছাত্রলীগের অভ্যন্তরের প্রগতিশীল অংশের মধ্যে থেকে প্রতিশ্রুতিশীল কর্মী সংগ্রহ করে সারাদেশে একটি সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে তোলেন। নিউক্লিয়াসের কাজ ছিল, 'বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের লক্ষ্যে যাবতীয় নীতি-কৌশল প্রনয়ণ করা এবং স্বাধীকার আন্দোলনকে সশস্ত্র স্বাধীনতা যুদ্ধের দিকে নিয়ে যাওয়া। স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদের সর্বময় কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা ছিল এই তিন ছাত্রনেতার কাছে। দেশের ছাত্র আন্দোলনের প্রতিটি কর্মসূচি বিশেষত শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক ঘোষিত ৬ দফা, ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের ১১ দফার আন্দোলনসহ প্রতিটি আন্দোলনকে গণরূপদানের মাধ্যমে স্বাধীনতার পক্ষে জনমত গড়ে তোলা। একইসাথে জাতিকে স্বাধীনতার জন্য প্রস্তুত করা ছিল নিউক্লিয়াসের অন্যতম কাজ। মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা তৈরি, ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ নেতা ও ডাকসুর ভিপি আ স ম আবদুর রব কর্তৃক পতাকা উত্তোলন, ৩ মার্চ ছাত্রলীগ নেতা সাহাজান সিরাজ কর্তৃক স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ, জাতীয় সঙ্গীত নির্বাচন, জয়বাংলা বাহিনী গঠন এবং তার কুচকাওয়াজ ও বঙ্গবন্ধুকে সামরিক অভিবাদন জানানো, সবই ছিল স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার অংশ। বিপ্লবী পরিষদের সকল কর্মকাণ্ডের প্রতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সমর্থন ছিল।
নিউক্লিয়াসের সিদ্ধান্তে ১৯৬৪ সালে কাজী আরেফ আহমেদের পৈত্রিক নিবাস পুরনো ঢাকার ১৪/৩ অভয় দাস লেনের বাড়িতে একটি সাইক্লোস্টাইল মেশিন স্থাপন করা হয়। এ মেশিনে মূদ্রিত ‘জয়বাংলা’ ও ‘বিপ্লবী বাংলা’ নামে স্বাধীনতার ইশতেহার প্রচার করা হতো। নির্দেশ ছিল যে এ ইশতেহার পড়ার পর পুড়িয়ে বা ছিঁড়ে ফেলতে হবে। নিউক্লিয়াস সদস্যদের মধ্যে আব্দুর রাজ্জাকের অন্যতম দায়িত্ব ছিলো শেখ মুজিবুর রহমান ও আওয়ামী লীগের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করে নিউক্লিয়াসের কার্যক্রম সম্পর্কে অবহিত রাখা। কাজী আরেফের দায়িত্ব ছিলো স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদের সংগঠন গড়ে তোলা। হামিদুর রহমান শিক্ষা কমিশনের বিরুদ্ধে বাষট্টি সালে গড়ে ওঠা ছাত্র আন্দোলন, বঙ্গবন্ধু কর্তৃক ঘোষিত বাঙালির মুক্তির সনদ ছেষট্টির ছয় দফার আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, সত্তরের সাধারণ নির্বাচন , ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষন, শেখ মুজিবুর রহমানকে আনুষ্ঠানিকভাবে বঙ্গবন্ধু উপাধি প্রদান, নিউক্লিয়াস'র সিদ্ধান্ত অনুযায়ী স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা তৈরি, আনুষ্ঠানিকভাবে পতাকা উত্তোলন, স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ সর্বোপরি বাঙালির স্বাধীনতা যুদ্ধসহ এ সকল কর্মকাণ্ডই ছিলো 'নিউক্লিয়াস' বা 'স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার অংশ। আর এ সকল কর্মসূচির পরিকল্পনা প্রণীত হতো নিউক্লিয়াসের মাধ্যমে। ১৯৬২ সাল থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত নিউক্লিয়াসের সাংগঠনিক তত্ত্বাবধানে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে প্রায় সাত হাজার (৭০০০)সদস্য সংগৃহীত হয়। এবং আন্দোলনে এদেশের ছাত্র, শ্রমিক, কৃষক, জনতা তথা বাঙ্গালী জাতির জাতীয় জাগরণের ভিত্তি হিসেবে ভূমিকা পালন করেছে এখানেও নেতৃত্ব দিয়েছে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী ছাত্রলীগের অংশটি।
১৯৭০ এ ইয়াহিয়া খান প্রদত্ত নির্বাচন এদেশের অনেকে বর্জন করলেও ছাত্রলীগ নির্বাচনের মাধ্যমে বাঙ্গালী ছাত্র-জনতাকে সংগঠিত করার প্রশ্নে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করে। এ নির্বাচনে বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের চুড়ান্ত প্রকাশ ঘটার পরও সেদিন নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রাপ্ত আওয়ামী নেতৃত্ব ছিল পাকিস্তানের সাথে আপোষ মুখী ভূমিকায় রত। তখন ছাত্রলীগকেই আবারো পালন করতে হয় ইতিহাসের নির্ধারকের ভূমিকা।
পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীর রক্তচক্ষু, আওয়ামী নেতৃত্বের আপোষকামিতাকে পদদলিত করে তদানিন্তন ছাত্রলীগ নেতা ও ডাকসুর সহ-সভাপতি আ স ম আবদুর রব সর্বপ্রথম উত্তোলন করেন স্বাধীনতার পতাকা।
৭১এর ২৬শে মার্চ থেকে স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হলে ছাত্রলীগই এ যুদ্ধে এদেশের ছাত্র যুব সমাজের নেতৃত্ব দিয়েছে সচেষ্ট হয়েছে স্বাধীনতা ও শোষণ মুক্তির উভয় প্রশ্নের মিমাংসা করতে।
স্বাধীনতার পর ছাত্রলীগের সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী গ্রুপ নিন্মলিখিত বক্তব্য জাতির সামনে তুলে ধরেনঃ
আমরা একটা ঘুণে ধরা সমাজে বাস করছি। আর্থিক অভাব-অনটন, অশিক্ষা-কুশিক্ষা, দুর্নীতি সর্বত্র অসদুপায় অবলম্বন ও প্রতারণা, অবিচার ও নির্যাতন এ সমাজকে গ্রাস করেছে। পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক শোষণ ও শ্রেণী শোষণের জন্মদাতা দীর্ঘদিনের উপনিবেশবাদী শাসন এই সকল দুষ্টক্ষতকে লালন করছে পরম-যত্নে।
গত তেইশ বছরের পাকিস্তানী আমলের ঘৃণ্য স্বার্থপরতা আমাদের অর্থনৈতিক কাঠামোকে সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত করেছে। পাকিস্তানী উপনিবেশবাদদের শোষণ ও নির্যাতন এবং বাংলাদেশে সাড়ে সাত কোটি নিম্নবিত্ত কৃষক-শ্রমিকের চরম নিঃস্বতার পটভূমিকায় গত বছরের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে তিরিশ লক্ষ মানুষের আত্মাহুতির বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্বাধীনতা সুদীর্ঘ দুই শত তেরো বছরের ঔপনিবেশিক শাসনের সুনিশ্চিত মৃত্যু ঘটালেও সমাজের অভ্যন্তরে শ্রেণী শোষণ, সামন্তবাদ ও পুঁজিবাদের মাধ্যমে আজও চলছে। শোষক আর শোষিতের শ্রেণীগত পার্থক্য এদেশে এখনও অত্যন্ত সুস্পষ্ট। কিন্তু প্রাক-স্বাধীনতা যুগে নির্লজ্জ ও প্রত্যক্ষ ঔপনিবেশিক শোষণ আর পরবর্তীকালে স্বাধীনতার মোড়কে শ্রেণী বিভেদ সৃষ্টিকারীদের চোরাগোপ্তা অদৃশ্য শোষণের কোন মৌলিক পার্থক্য নেই। শোষণ সকল রূপান্তরে, সকল পর্যায়ে শোষিতের জীবনে একই প্রকার অর্থনৈতিক বিপর্যয় ডেকে আনে। তাই যে পর্যন্ত না এই সামন্তবাদী ও পুঁজিবাদী শোষণের সকল সম্ভাব্য পথ সম্পূর্ণরূপে রুদ্ধ করে এদেশে এক শোষণ-হীন সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে, ততদিন লক্ষ লক্ষ মানুষের রক্তের মূল্যে অর্জিত কোটি কোটি মানুষের চোখের জলে এক চরম অর্থ-হীনতায় পর্যবসিত হয়ে থাকবে।
গণতন্ত্র প্রতিটি সুস্থ মানুষের জীবনের স্বাভাবিক জন্মগত রাজনৈতিক অধিকার। কিন্তু আমাদের দেশে প্রচলিত গণতন্ত্রের বিভ্রান্তিকর রূপ সত্যিকার অর্থে সমাজের অভ্যন্তরে মানুষে মানুষে বিভেদকে পোষণ করে চলেছে। পুঁজিবাদী লিপ্সা তদর্থে শ্রেণী শোষণ সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে যে অর্থনৈতিক বৈষম্যের জন্ম দিয়েছে, তার প্রত্যক্ষ ফলশ্রুতিতে সমাজের প্রতিটি শ্রেণী বা মানুষের পক্ষে প্রকৃত গণতান্ত্রিক অধিকার ভোগ করা সমভাবে সম্ভব হয়ে উঠে না। শ্রেণী বিভেদ বিরাজমান সমাজে তাই সমাজতন্ত্র গণতন্ত্রেরই পূর্ব শর্ত। কারণ কেবলমাত্র অর্থনৈতিক বৈষম্য সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিহ্ন করে পূর্ণ সমাজতান্ত্রিক বিধি ব্যবস্থার মাধ্যমে শোষণ-হীন শ্রেণীহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার দ্বারাই সমাজে সত্যিকারের সমানাধিকার তথা গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা সম্ভব। সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব অনিবার্য। সমাজতন্ত্রের পথ অত্যন্ত দুরূহ ও বাধা বিঘ্নময়। এ পথে প্রতি পায়ে পায়ে ছড়িয়ে আছে অজস্র কাঁটা। স্তরে স্তরে বিপ্লব ঘটিয়ে তুলতে হবে এ পথের সকল কাঁটা। ভাঙ্গতে হবে সকল বাধা বিঘ্নের বেড়া। বড়-মাঝারি-ছোট সকল প্রকার সামন্ত-প্রভু, পুঁজিপতি, প্রতিক্রিয়াশীল রাজনৈতিক চক্র, সুবিধাবাদী রাজনীতি, আমলাতন্ত্র, উঠতি-বুর্জোয়া ও শিল্প প্রশাসক গোষ্ঠী, অতি-উৎসাহী সামরিক চক্র, সাম্রাজ্যবাদী গোষ্ঠী ও সকল প্রকার শ্রেণী-বিভেদ পোষণকারীরাই সমাজতান্ত্রিক পথকে কণ্টকাকীর্ণ করে রেখেছে। উপর্যুপরি বৈপ্লবিক আন্দোলনের মাধ্যমে অপসারিত করতে হবে, সমাজতন্ত্রের এ সমস্ত বিরুদ্ধ শক্তিকে। সমাজতান্ত্রিক আদর্শে একনিষ্ঠ ছাত্র, শ্রমিক, কৃষক ও রাজনৈতিক সংগঠন সমূহের মাধ্যমে এই বিপ্লব পরিচালিত হবে স্বয়ং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে। তাই-
সমাজতন্ত্রের মাধ্যমে একটি শ্রেণীহীন-শোষণ-হীন সমাজ প্রতিষ্ঠা এবং ছাত্র-শ্রমিক-কৃষক ও রাজনৈতিক সংগঠনের মধ্য দিয়েই গড়ে উঠা নতুন নেতৃত্বের অধিকারী কৃষক, শ্রমিকের সত্যিকারের প্রতিনিধিদের উপর শাসন ব্যবস্থা অর্পণের মাধ্যমে কৃষক-শ্রমিক রাজ প্রতিষ্ঠা করাই আমাদের মূল লক্ষ্য হবে।
সাড়ে সাত কোটি বাঙালী জাতির জন্য সৃষ্ট এই বাংলাদেশ, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের আত্মবিকাশ, বাঙালী (মেহনতি মানুষের) শিল্প ও সংস্কৃতি, কৃষ্টি ও সভ্যতার ঐতিহ্যকে আরও ঐতিহ্য মণ্ডিত করে তোলার জন্য আমাদের জাতীয়তাবাদী দৃষ্টিভঙ্গিকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরে আমাদের বিপ্লবী চেতনাকে পরিচালিত করতে।
এদেশে অতীতের সকল ফলপ্রসূ আন্দোলনের অগ্রদূত ও একক নেতৃত্বদানের গৌরবে গৌরবান্বিত ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ একটি শোষণ-হীন-শ্রেণীহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার এবং বাংলাদেশে কৃষক-শ্রমিক রাজ প্রতিষ্ঠা কল্পে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে শ্রেণী সংগ্রামকে ত্বরান্বিত করে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব পরিচালনায় বদ্ধপরিকর।