28/03/2025
ভূমিকম্প: বাংলাদেশের ঝুঁকি ও প্রস্তুতি
সাম্প্রতিক অবস্থা
২০২৪ সালে দেশ ও প্রতিবেশী অঞ্চলে ৫৩টি ভূমিকম্প রেকর্ড করা হয়েছে, যা গত ৮ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। ফেব্রুয়ারি মাসের শেষে টানা তিন দিন ধরে ছোট ছোট কম্পন অনুভূত হয়।
ঝুঁকির কারণ
ইন্ডো-বার্মা প্লেটের সংঘর্ষের ফলে সৃষ্ট "লক" অবস্থা থেকে জমে থাকা শক্তি যেকোনো সময় বড় ধরনের ভূমিকম্পের কারণ হতে পারে।
ঐতিহাসিক তথ্য ও পূর্বাভাস
• সর্বশেষ বড় ভূমিকম্প (৭.১ মাত্রা): ১৯১৮ সালের ১৫ জানুয়ারি শ্রীমঙ্গল ভূমিকম্প বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলের (বর্তমান হবিগঞ্জ) কাছাকাছি ঘটে। এটি উত্তর-পূর্ব ভারত ও মিয়ানমারেও প্রভাব ফেলেছিল।
• রিটার্ন পিরিয়ড: বিশেষজ্ঞদের মতে, ৭ মাত্রার ভূমিকম্পের পুনরাবৃত্তি গড়ে ১৫০–১৭৫ বছর পর হতে পারে। যেহেতু শেষ ঘটনা ১০৬ বছর আগে, ভূতাত্ত্বিকভাবে বাংলাদেশ এই সময়সীমার "জোনে" রয়েছে।
• ১৭৬২ সালের আরাকান ভূমিকম্প (~৮.৫ মাত্রা): চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলে ক্ষয়ক্ষতি করলেও এটি বাংলাদেশের অভ্যন্তরে নয়।
দুর্বল অবকাঠামো ও ঝুঁকি
অপরিকল্পিত নগরায়ণ, পুরনো ভবন এবং ভূমিকম্প-সহনশীল নকশার অভাব বাংলাদেশকে উচ্চ ঝুঁকির মধ্যে রাখছে। গবেষণা অনুযায়ী, ৭ মাত্রার ভূমিকম্পে শহরাঞ্চলের ৪০% ভবন ধসে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে।
সরকারি ও জনপ্রস্তুতি
ইমারজেন্সি অপারেশন সেন্টার থাকলেও ম্যানপাওয়ার, কার্যকরী প্রোটোকল এবং প্রশিক্ষণের ঘাটতি রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা জনসচেতনতা, নিয়মিত ড্রিল এবং প্রযুক্তির মাধ্যমে শিক্ষার ওপর জোর দিচ্ছেন।
ভূমিকম্পের পূর্বে:
1. জরুরি কিট প্রস্তুত করুন:
• পানি, শুকনো খাবার, ফার্স্ট এইড, টর্চ, ব্যাটারি এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ মজুদ করুন।
• গুরুত্বপূর্ণ ডকুমেন্টের কপি পানিরোধী পাত্রে রাখুন।
2. ভারি বস্তুগুলি সুরক্ষিত করুন:
• বইয়ের শেলফ, কেবিনেট এবং ভারী আসবাবপত্র দেয়ালের সঙ্গে লাগিয়ে রাখুন যেন সেগুলি পড়ে না যায়।
• রান্নাঘরের যন্ত্রপাতি, আয়না এবং অন্যান্য বস্তু সুরক্ষিত রাখুন যাতে সেগুলি পড়ে না যায়।
3. ঘরে নিরাপদ স্থান চিহ্নিত করুন:
• প্রতিটি কক্ষে নিরাপদ স্থান নির্বাচন করুন, যেমন শক্ত কাঠামোর নিচে অথবা জানালা থেকে দূরে একটি শক্ত দেয়ালের পাশে।
• পরিবারের সবাইকে এই নিরাপদ স্থান সম্পর্কে জানিয়ে দিন।
4. গ্যাসের লিক চেক করুন:
• গ্যাসের লাইন সুরক্ষিত রাখা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে বন্ধ করার ব্যবস্থা নিশ্চিত করুন।
• গ্যাস লিক ডিটেক্টর স্থাপন করুন, যদি সম্ভব হয়।
5. পারিবারিক পরিকল্পনা তৈরি করুন:
• পরিবারের সদস্যদের জন্য একটি জরুরি যোগাযোগ পরিকল্পনা তৈরি করুন, এবং জানিয়ে দিন কোথায় মিলিত হবে।
• একটি বাহ্যিক যোগাযোগ ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগের জন্য প্রস্তুত থাকুন, যিনি ফোন নেটওয়ার্ক না থাকলে সাহায্য করতে পারবেন।
6. ভূমিকম্প-সহনশীল নির্মাণ নিশ্চিত করুন:
• ভবন নির্মাণের সময় ভূতাত্ত্বিক জরিপ এবং ঝুঁকি বিশ্লেষণ করা বাধ্যতামূলক করুন।
• শক্তিশালী ফাউন্ডেশন, স্টিল ফ্রেম এবং শক অ্যাবজর্বার ব্যবহার নিশ্চিত করুন এবং আন্তর্জাতিক বিল্ডিং কোড মেনে চলুন।
ভূমিকম্পের সময়:
1. ড্রপ, কাভার এবং হোল্ড অন পদ্ধতি অনুসরণ করুন:
• হাত ও হাঁটুতে মাথা গুঁজে শুয়ে পড়ুন, মাথা ও গলা ঢেকে দিন, এবং শক্ত কাঠামোর নিচে আশ্রয় নিন। সেখানে থাকাকালীন জায়গা না ছেড়ে তাতে অবস্থান করুন ।
2. ভিতরের দিকে থাকুন:
• বাইরে না বেরিয়ে ভিতরে নিরাপদে থাকুন, জানালা ও বাইরের দেওয়াল থেকে দূরে থাকুন।
• উচ্চ বিল্ডিংয়ে থাকলে এলিভেটর এড়িয়ে চলুন এবং যতটা সম্ভব নিচু তলায় থাকুন।
3. বাইরে থাকলে, খোলামেলা জায়গায় চলে যান:
• ভবন, গাছ, বৈদ্যুতিক লাইন বা যেকোনো কিছু থেকে দূরে সরে যান যা পড়তে পারে বা ক্ষতি করতে পারে।
4. যদি গাড়িতে থাকেন, গাড়িটি সাইডে থামান:
• গাড়িটি সাইডে পার্ক করুন, সিট বেল্ট পরিধান করুন এবং ভূমিকম্প থামা পর্যন্ত গাড়ির মধ্যে থাকুন।
• ভবন বা বৈদ্যুতিক লাইন থেকে দূরে থাকুন।
ভূমিকম্পের পর:
1. আঘাতপ্রাপ্তদের চিকিৎসা করুন:
• আহত পরিবারের সদস্যদের চিকিৎসা করুন এবং প্রয়োজন হলে ফার্স্ট এইড প্রদান করুন।
• গুরুতর আহত কাউকে সরানোর আগে তাদের অবস্থান নির্দিষ্ট করে নিন, তার শারীরিক ক্ষতি সম্পর্কে ধারণা নিয়ে নিন ।
2. আপনার বাড়ির ক্ষয়ক্ষতি পরীক্ষা করুন:
• বাড়ির কাঠামোগত ক্ষতি, গ্যাস লিক, এবং বৈদ্যুতিক বিপদ পরীক্ষা করুন।
• গ্যাসের গন্ধ পেলে তা বন্ধ করুন এবং মোমবাতি বা গ্যাসলাইট জ্বালাবেন না।
3. অ্যাফটারশকসের জন্য প্রস্তুত থাকুন:
• বড় ভূমিকম্পের পর প্রায়ই ছোট ভূমিকম্প (অ্যাফটারশকস) হয়, তাই সতর্ক থাকুন এবং পুনরায় ড্রপ, কাভার ও হোল্ড অন পদ্ধতি অনুসরণ করুন।
4. তথ্য জানুন:
• বেসরকারি বা সরকারি সূত্র থেকে সর্বশেষ পরিস্থিতি জানুন।
• স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নির্দেশাবলী অনুসরণ করুন।
5. ভবন থেকে দূরে থাকুন:
• ক্ষতিগ্রস্ত ভবন থেকে দূরে থাকুন, কারণ এগুলি আরও ধ্বংসাত্মক হতে পারে এবং পড়তে পারে।
ভূমিকম্প-সহনশীল নির্মাণের নীতি
• নির্মাণের আগে ভূতাত্ত্বিক জরিপ ও ঝুঁকি বিশ্লেষণ বাধ্যতামূলক করুন।
• শক্তিশালী ফাউন্ডেশন, স্টিল ফ্রেম, শক অ্যাবজর্বার ব্যবহার এবং আন্তর্জাতিক বিল্ডিং কোড মেনে চলুন।
• পুরনো ভবন নিয়মিত মেরামত ও আধুনিকীকরণ করুন।
পেশাদার নির্মাণ পরামর্শ
পরিকল্পনা ও সঠিক ডিজাইনের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। মুখে মুখে হিসাব করে ২ রড বা ৬ রডের ভিত্তিতে বাড়ি নির্মাণ করা থেকে বিরত থাকুন। মিস্ত্রি বা বড় চাচার পরামর্শের ভিত্তিতে নির্মাণের মাধ্যমে পরিবারের নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে ফেলবেন না। আধুনিক ইঞ্জিনিয়ারিং কনসালটেন্সি গ্রহণ করে নির্মাণের মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন, যাতে ভবিষ্যতের দুর্যোগে ক্ষতির সম্ভাবনা কমে যায়।
Accord C&C বাংলাদেশের লিডিং ইঞ্জিনিয়ারিং ও নির্মাণ সমাধান প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে ভূমিকম্প-সহনশীল ডিজাইন, স্ট্রাকচারাল অ্যানালাইসিস, এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় বিশেষজ্ঞ পরামর্শ দিয়ে থাকে। যেকোনো প্রকল্পের জন্য প্রযুক্তিগত সহায়তা ও কাস্টমাইজড সমাধান পেতে আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন।
সতর্কতা ও প্রস্তুতি
পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে জরুরি পরিকল্পনা তৈরি করুন, নিয়মিত ড্রিল করুন এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নির্দেশিকা অনুসরণ করুন।
©️