01/08/2017
👌👌👌👌👌👌👌👌👌👌
সুদীপ্ত
----------
অনেক দিন পর সুদীপ্ত বাড়ি যাচ্ছে। পড়া আর পার্ট টাইম চাকরি করে বাড়ি যাওয়ার মত সময় হয়ে উঠে না ওর। তাই, প্রায় ছয় মাস পর এবার বাড়ি যাচ্ছে আর ভাবছে কী কী করবে বাড়ি গিয়ে।
ছোট ভাই বোন দুটোর জন্য নেয়া জামা কাপড়গুলো ওদের পছন্দ হবে কিনা তা নিয়েও চিন্তা হচ্ছে । ভাবছে কেমন খুশিই না হবে ওরা ওদের জন্য নেয়া কাপড় আর খেলনাগুলো পেয়ে, আর মার জন্য নেয়া শাড়িটা যে মা পছন্দ করবে তা নিয়ে কোন সন্দেহ অবশ্য নেই সুদীপ্তের। কারণ, মা সবসময় ওর পছন্দের উপর কোন আপত্তি করে না বললেই চলে।
এসব ভাবতে ভাবতে হঠাৎ ওর চোখে পানি চলে এল।
মনে পড়ে গেল ওর অসহায় বাবার চেহারাখানি।
যে বাবা শত চেষ্টা করেও ওদের জন্য একটা স্বচ্ছল জীবন তৈরী করতে পারেন নি। অভাবের তাড়নায় যখন বাবার মেজাজ গরম হয়ে উঠতো আর সেই মেজাজের ঝাল ওর উপর মেটানো হত, তখন মনে হত এই বাবা না থাকলেই বুঝি ভাল হত। কিন্তু, এখন এসব কথা মনে হলে ওর নিজেরই মরে যেতে ইচ্ছা করে। কারণ, বড় হবার সাথে সাথে ক্ষুধার জ্বালাটাও বুঝি বোঝে এসে গেছে সুদীপ্তের। এখন সে বোঝে এক বেলা না খেয়ে থাকলে কেমন লাগে, কেমন করে পুরো পৃথিবীটাকে ধোঁকাবাজ মনে হয়। যেন সমস্ত সৃষ্টি মিলে শোধ তুলছে কোন অপরাধের।
এখন আর বাবার উপর কোন রাগ নেই সুদীপ্তের, বরং উলটো মায়া হয় তাঁর জন্য। তাই তো সব সময় চেষ্টা করে যে কোন ভাবেই হোক বাবার সংসারের ভার কিছুটা লাঘব করতে। এ জন্য পড়া লেখার পাশাপাশি সব সময় টিউশনি পড়ানো আর পার্টটাইম চাকরি করে আসছে আজ চার বছর ধরে যাতে ও নিজে যেমন কষ্ট করেছে, ছোট ভাই বোনগুলো যেন সেই অভাবের কষ্ট থেকে কিছুটা মুক্তি পেতে পারে।
এসব ভাবতে ভাবতেই বাস থেকে নামার সময় হয়ে গেলো। এখান থেকে নেমে হেঁটে প্রায় আরো এক ঘন্টার রাস্তা গেলে তবেই বাড়ি । তাই দেরী না করে সুদীপ্ত হাঁটতে শুরু করলো। একা একা চলতে চলতে সুদীপ্তের হঠাত দীপার কথা মনে পড়ে গেলো। মনে পড়ে গেলো শেষবার দেখা ওর অশ্রু সজল মায়াবী চোখগুলোর কথা।
যে চোখগুলো নীরবে নিজেদের অভিযোগগুলো জানিয়ে যাচ্ছিলো বারবার আর ঝরিয়ে ফেলছিলো হৃদয় নিংড়ানো অশ্রু। প্রায় দু বছরের বন্ধুত্ব ছিল সুদীপ্ত আর দীপার। অনার্স পড়ার ফাঁকে এক টিউশনিতে গিয়ে দীপার সাথে পরিচয় হয় সুদীপ্তের। ছাত্রের বড় বোন ছিল দীপা। ও তখন মাত্র অনার্সে ক্লাস শুরু করেছে , একই কলেজে পড়ে মেয়েটা তা জানতে পারে সুদীপ্ত।
একদিন সুদীপ্ত পড়াচ্ছে এমন সময় দীপা এসে বলল,
"আপনি কি গল্পের বই পড়েন ?"
সুদীপ্ত কিছুটা বিব্রত হয়ে উত্তর দিল, "কারো কাছে পেলে মাঝে মাঝে পড়ি। কেন বলুন তো?''
দীপা বলে উঠল, "আমার একটা বই লাগবে। আপনি কি জোগাড় করে দিতে পারবেন? পারলে আমি এখনি টাকা দিয়ে দিচ্ছি।"
সুদীপ্ত একটু চিন্তায় পড়ে গিয়ে জানতে চাইলো, "বই? আর কবে লাগবে? আমার একটু সময় লাগবে, তাতে যদি অসুবিধা না হয় তাহলে আমি চেষ্টা করে দেখতে পারি।"
দীপা বলল, "ঠিক আছে, আমি টাকা আর বই এর নাম নিয়ে আসছি।"
এরপর ও টাকা দিয়ে যায় আর কিছু না বলে।
এর তিনদিন পর শুক্রবার থাকায় সুদীপ্ত অনেক খুঁজে বইটি জোগাড় করে রাখে আর মনে মনে ভাবতে থাকে, "যাক বাবা, টিউশনিটা বুঝি এবারকার মত রক্ষা পেল।"
শনিবার দিন দীপাকে ডেকে বইটা হাতে দিলে ও কিছু না বলেই বই নিয়ে চলে যায়। এতে সুদীপ্ত অনেক অবাক হলেও কিছু বলে না। ও আগের মতই পড়াতে থাকে। এর দু'দিন পর হঠাত কলেজে দীপার সাথে দেখা হয়ে যায় ওর। সুদীপ্ত এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করলেও দীপা সামনে এসে দাঁড়ায় আর হাত জোড় করে ক্ষমা চায়।
আবার অবাক হয় সুদিপ্ত আর বলে , "ছি ছি এসব কী করছেন? মানুষ কী ভাববে! হাত নামান, প্লিজ!
দীপা বলে, "তাহলে বলুন মাফ করেছেন।"
সুদীপ্ত বলে, "আরে কী আশ্চর্য, আপনি আমার কাছে তো কোন অপরাধ করেন নি যে আমি আপনাকে ক্ষমা করবো।"
দীপা বলল, "সে দিন আপনাকে একটা ধন্যবাদ পর্যন্ত দেই নি, এটা কি আমার অপরাধ নয়?"
সুদীপ্ত হেসে উঠে বলল , "ওহ, ঐ দিনের কথা এখনো মনে রেখেছেন? আমি তো কবেই ভুলে গেছি। বাদ দিন তো, আপনিও ভুলে যান। এটা কোন ব্যাপারই না।"
দীপা স্বস্তির সাথে বলল, "যাক বাবা, বাঁচলাম। আমি তো ভাবলাম আপনি আমার উপর খুব রেগে আছেন। চলেন এই খুশিতে আপনাকে চা খাওয়াই।"
সুদীপ্ত এবার বলল, "ধন্যবাদ। কিন্তু আমার এখন যেতে হবে, কাজ আছে। এখন তাহলে আসি" একথা বলে ও তাড়াতাড়ি ওখান থেকে চলে গেলো।
দীপা খুব অবাক হয়ে ওর চলে যাওয়া অবয়বটার দিকে তাকিয়ে থাকলো । আর ভাবতে লাগলো, "যেখানে ছেলেরা মেয়েদের সঙ্গ পেতে লালায়িত, সেখানে নিজে থেকে বলা সত্ত্বেও যেতে চাইলো না! এ কেমন ছেলেরে বাবা!"
এরপর থেকে প্রায়ই দীপা নানা ভাবে সুদীপ্তের সাথে দেখা করে ওকে জানতে লাগলো, বুঝতে লাগলো। যদিও সুদীপ্ত অনেক এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করেছে, কিন্তু সফল হয় নি। দীপার আন্তরিক চেষ্টার কাছে পরাজিত হয়েছে বার বার। এভাবেই ওদের মাঝে একটা সুন্দর বন্ধুত্বের সৃষ্টি হয়।
কিন্তু, নিয়তির পরিহাস। দুটো ছেলে মেয়ে বুঝি বন্ধু থাকতেই পারে না। একজন না একজন প্রেমে পড়েই যাবে, এটা যেন অবশ্যম্ভাবী একটা ব্যাপার। এখানে দীপা এই পথে পা বাড়িয়ে দেয়। যেদিন দীপা নিজের মনের কথা সুদীপ্তের কাছে প্রকাশ করে, সেদিন ওর উপর যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়ে। ও ভেবেই পায় না ওর কোন আচরণ থেকে দীপা এমন কথা ভাবতে পারে। ও সব সময় নিজেকে গুটিয়ে রেখেই দীপার সাথে মিশেছে।
অনেক চিন্তা করে সুদীপ্ত ঠিক করে দীপার সাথে আর কোন সম্পর্ক রাখবে না। ওর ভাইটাকেও পড়ানো ছেড়ে দিবে। যে সম্পর্কের কোন ভবিষ্যত নেই, সেই দিকে পা বাড়ানোটা যে বোকামী ছাড়া আর কিছু নয় তা সুদীপ্ত ভালোই বোঝে। সব চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নেয়ার পর সুদীপ্তের মনটা খারাপ হয়ে যায়। কিন্তু ওর বাস্তববাদী মন ওকে ঠিক থাকতে সাহায্য করে।
এরপর দীপা দেখা করতে এলে সুদীপ্ত খুব ভাল ভাবে বুঝিয়ে বলে যে, ও আর দীপার সাথে কোন যোগাযোগ করবে না। কারণ, এই মুহূর্তে ওর পক্ষে এধরনের কোন সম্পর্কে জড়ানো সম্ভব না।
বলে, "তুমি তো সবই জানো , আমার পরিবার, আমার ভাই-বোন সম্পর্কে। ওদের কথা বাদ দিয়ে আমি নিজেকে নিজের কথা ভাববার অনুমতি দিতে পারি না। পারলে আমাকে ক্ষমা করে দিও, আর আমাকে ভুলে যেও।"
একথা শুনে দীপা নীরবে কাঁদতে থাকে, আর কিছুই বলে না। যেন ও জানতোই এমন কথা শুনতে হবে।
এসব কথা চিন্তা করতে করতেই বাড়ির সামনে চলে আসলো সুদীপ্ত, আর সাথে সাথে নিজের চেহারার দুঃখকে হাসিতে পরিণত করে নিল ও।
"মা, মা" করে ডাক দিতেই পুরো বাড়িতে যেন খুশির জোয়ার বয়ে গেল। সবার জন্য আনা জিনিসপত্র সবার হাতে তুলে দেয়ার পর, যেন আজই বাড়িতে ঈদের চাঁদ দেখা গিয়েছে এমন অবস্থা শুরু হল।
সুদীপ্তের মা ওর আনা শাড়িটা হাতে নিয়ে খুশিতে কেঁদে উঠলেন। সুদীপ্ত খুশীতে কান্নারত মাকে বুকে নিয়ে মনে মনে বলতে লাগলো,
"সবার এমন একটা আনন্দের দিনের তুলনায় আমার একলার ভালবাসার কী বা মূল্য? এর বেশি আর কী বা চাওয়ার আছে, পাওয়ার আছে এই ক্ষুদ্র জীবনে?
courtesy: Tahmina jahan