08/09/2014
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, ভেতরে বাইরে একটি সতর্ক বার্তা
রাজীব পারভেজ
সময়ের কণ্ঠস্বর: ঐতিহাসিক ৭ মার্চ ভাষণের শেষ বাক্য ছিল জয় বাংলা, জয় পাকিস্তান- সম্প্রতি প্রকাশিত এ কে খন্দকার রচিত ‘১৯৭১: ভেতরে বাইরে’ বইটিতে এ কথাটি বলা হয়েছে। বইটির মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথিদের মাঝে অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান তাঁর বক্তৃতায় উক্ত অংশটির দৃষ্টি আকর্ষণ করে তাৎক্ষণিকভাবেই বলে ফেলেন যে, এটি নিয়ে পরবর্তীতে একটি বির্তক জন্ম দিতে পারে। ড. আনিসুজ্জামানের বক্তৃতার অংশটি রাতের বেলা একটি অনলাইন সংস্করনে দেখতে পেয়ে তৎক্ষণাৎ ব্যক্তিগতভাবে ভাবছিলাম প্রকৃতই বিতর্ক হবার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। দুই-তিনজনের সাথে বিষয়টি নিয়ে শেয়ার করি।আর যে ভাবনা তারই বহিঃপ্রকাশ দেখতে পেলাম পরের দিন জাতীয় সংসদে সিনিয়র পার্লামেন্টারিয়ান তোফায়েল আহমেদ, আমির হোসেন আমু, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, কাজী ফিরোজ রশিদ প্রমুখ বইযের বিভিন্ন বিতর্কিত বিষয় নিয়ে তীব্র ভাষায় সমালোচনা করেন। পরবর্তীতে টানা তিন দিন ধরে টিভি টকশো, জাতীয় সংবাদপত্র, অনলাইন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো এবং রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় এ বিষয়কে কেন্দ্র করে নানারকম আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। বিএনপি বিষয়টিকে নিয়ে রাজনৈতিকভাবে সুবিধা নেয়ার একটি অপপ্র্রয়াস চালাচ্ছে।
রাজনৈতিকভাবে এখন দেশ মূলত দুটি শিবিরে বিভক্ত। মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের ধারক ও বাহক বলে স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী সংগঠন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও তার মিত্র জোটভুক্ত দলগুলোর নেতাকর্মী এবং বুদ্ধিজীবিরা তাদের রাজনৈতিক ভাষায় এর জবাব দিচ্ছেন এবং অপরপক্ষে আওয়ামী লীগ বিরোধী শিবির হিসেবে পরিচিত রাজনৈতিক দলগুলো ও সেই সকল দলের নিয়মিত বুদ্ধিজীবিরা বরাবরের মতই সংকীর্ণ দলীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে বিষয়টি নিয়ে বিশ্লেষন করে চলছেন এমনটিই আমরা দেখতে পাচ্ছি। দেশের সাধারণ মানুষ এবং এ প্রজন্মের নাগরিকরা খানিকটা বিভ্রান্ত এ ধরনের বিভ্রান্তিমূলক বিশ্লেষণ ও ব্যাখায়। তারা কোন মতবাদ বা বিশ্লেষণকে বেছে নিবে! এটি একটি প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। ক্ষুদ্র রাজনৈতিক পক্ষপাতদুষ্টে জর্জরিত জনগোষ্ঠী নিজস্ব বলয়ের বাইরে যেন বের হয়ে উদার দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ইতিহাসকে ধারণ করতে পারছে না এমনটি মনে হচ্ছে বারংবার।
মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস নিয়ে অনেক ধরনের গবেষণা হয়েছে এবং গবেষণা অব্যহত রয়েছে। একই ঘটনার বিশ্লেষণ বিভিন্ন জন নানাভাবে করছেন তাদের নিজস্ব চিন্তা চেতনা অনুযায়ী, কেউ কেউ তাদের দলীয় দৃষ্টিকোণ অনুযায়ী। দেশের সচেতন নাগরিকসমাজ এবং ইতিহাস, রাজনীতি সম্পর্কে আগ্রহীরা তাদের বিবেক বুদ্ধি অনুযায়ী বিষয়গুলোকে ধারণ করেছেন। গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে যে কোনো ব্যক্তি তাঁর নিজস্ব মতামত প্রকাশ বা যেকোন মতামতকে গ্রহণ করতে পারে। এমন উপযুক্ত পরিবেশ আমাদের দেশে বিদ্যমান আছে বলেই আমরা নির্দ্ধিদ্বায় বলতে পারি। তবে গণতন্ত্রের সুযোগ নিয়ে কেউ যদি স্পর্শকাতর বিষয়ে কল্পকাহিনী রচনার মাধ্যমে এর অপব্যবহার করে তবে তাঁর মতামতকে উপেক্ষা বা অশ্রদ্ধা পোষন করে কথা বলবার যথেষ্ঠ সুযোগও এখানে রয়েছে।
৭ মার্চের ১৯ মিনিটের সেই যুগান্তকারী, হৃদয়স্পর্শকারী ভাষণটিকে যতবারই শোনা হয় ততবারই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অপরিসীম রাজনৈতিক দক্ষতার প্রাচুর্যতা বারংবার মনে করিয়ে দেয়। সমস্ত ভাষণটিতে দেশের মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা সংগ্রাম নিয়ে যে প্রসারতা ছিল তাতে অন্য কোনরূপ বিশ্লেষণের কোন অবকাশ বিন্দুমাত্র নেই। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান বিভক্তির সময়ে যে যুবকটি অনুধাবন করেছিলেন যে, আমাদের আরেকবার সংগ্রাম করতে হবে ; বাঙালির অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য এবং সেটি পৃথক রাষ্ট্র গঠনের মাধ্যমে। ৪৭ থেকে ৭১ দীর্ঘ সময় পাড়ি দিয়ে চূড়ান্ত পরিণতি আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধ। এখানে বিক্ষিপ্তভাবে একটি ঘোষণা, ভাষণ বা সাক্ষাৎকারকে সামনে এনে বঙ্গবন্ধুর দীর্ঘ সময়ের রাজনৈতিক সংগ্রামকে খাটো করার কোনো সুযোগ নেই।
বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দূরদর্শিতা, কঠোর পরিশ্রম, জনমানুষের নেতৃত্ব দেবার অপরিসীম সম্মোহনী মেধাশক্তি নিয়ে আলোচনা করার জন্য উপযুক্ততা অর্জন করার মত বৈশিষ্ট্য তথাকথিত সমালোচকদের মাঝে কতটুকু আছে সেটি ভাবা উচিৎ।
আর তাকে নিয়ে উল্টো বিতর্ক করার দুঃসাহস যারা দেখায় তাদের রাজনৈতিক দর্শন, মানবিক মূল্য বোধ, কৃতজ্ঞতা নিয়ে প্রশ্ন আসতে পারে। এতে এহেন ব্যক্তিদের মনে দুঃখ পাওয়ার কিছু নেই। কারণ ১০ লাখ মানুষ রেসকোর্স ময়দানে উপস্থিত হয়ে যে কথা শুনতে পায়নি, সভায় উপস্থিত না থেকে যে সমস্ত স্মৃতিচারণকারী বা ইতিহাস প্রণেতা শুনতে পেয়েছেন তাদের সমালোচনা শুনতে হবে তাদের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে ইতিহাস রচনার পর থেকেই। শুধু সমালোচনা নয়, কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য এবং নানারকম আক্রমণের শিকার হলেও অবাক হওয়ার কিছু নেই। কারণ একটি রাজনৈতিক আবেগের উপর তাঁরা আঘাত হেনে আত্মমর্যাদা নিয়ে সমাজে অবস্থান করবেন এমনটি ভাবলে ভুল হবে। এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এ দেশের রাজনৈতিক সচেতন জনগোষ্ঠী এমন প্রতিষ্ঠিত সত্য নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টিকারীদের গ্রহণ করবেন না বলেই ধরে নিতে হবে। মনে রাখতে হবে মুক্তিযুদ্ধের সময় যারা এদেশের বিপক্ষে ছিলেন তারা হয়ত মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী বা রাজাকার, কিন্তু একজন মুক্তিযোদ্ধা সবসময় মুক্তিযোদ্ধার মর্যাদা নিয়ে থাকবেন; যতক্ষণ পর্যন্ত তিনি মুক্তিযুদ্ধের সত্যিকারের অবস্থানকে ধারণ করে থাকবেন। এর ভিন্নতা দেখা দিলে নতুন পরীক্ষায় অবতীর্ণ হতে হবে। আর এ পরীক্ষায় তিনি অকৃতকার্য হলে এর সম্পূর্ণ দায়ভার তাঁর নিজস্ব।
সবশেষে বঙ্গবন্ধু কন্যা, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে উদ্দেশ্য করে বলতে চাই, এই ‘১৯৭১ : ভেতরে বাইরে’ বইটি আপনি, আপনার দল ও সরকারের জন্য একটি সতর্ক বার্তা। ‘৭৫-এর মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের পর মোশতাক সরকারের নিকট রেডিও বাংলাদেশে গিয়ে যে ব্যক্তি অনুগত্য প্রকাশ করে তাঁকে কেন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দু’বার নমিনেশন দেয়া হয়েছিল! কেন তাঁকে সরকারের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল! যে ব্যক্তির রাজনৈতিক মূল্যবোধ এমন তাকে কেন চিনতে ভুল করা হল! এমন ধরনের ভুল অতীতেও হয়েছে এবং বর্তমানেও বিদ্যমান রয়েছে বলেই অনেকে বলে থাকেন। রাষ্ট্র ক্ষমতার স্বাদ পেয়ে মসনদের বাইরে গেলে অল্প সময়ের মধ্যে যাদের এমন স্বরূপ প্রকাশ পায় তাদের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন না করলে এর খেসারত আপনি,আপনার দলসহ পুরো জাতিকে দিতে হবে এতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, এদের চিহ্নিত করা খুব কঠিন কাজ নয়। কিন্তু এমন রাজনৈতিক আবেগ বিবর্জিত যারা রয়েছেন তারা বরাবরই আপনার পাশে থাকবার নিরন্তর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবেন তাদের দক্ষ কূট-রাজনৈতিক অপকৌশলের মাধ্যমে। এ ধরনের ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে আপনি অনুগ্রহপূর্বক কঠোর আপোষহীন ভূমিকায় ভবিষ্যতে পরিচালিত হবেন এমন প্রত্যাশায় রইলাম।
লেখক: সম্পাদক-সময়ের কণ্ঠস্বর ডটকম; সাধারণ সম্পাদক-বঙ্গবন্ধু সমাজকল্যাণ পরিষদ, ঢাকা মহানগর কমিটি।
ই-মেইল: [email protected]
http://www.somoyerkonthosor.com/news/118443
রাজীব পারভেজ: সময়ের কণ্ঠস্বর: ঐতিহাসিক ৭ মার্চ ভাষণের শেষ বাক্য ছিল জয় বাংলা, জয় পাকিস্তান- সম্প্রতি প্রকাশিত এ কে খন্দকার রচিত ‘১৯৭১: ভেতরে বাইরে’ বইটিতে এ কথাটি বলা হয়েছে। বইটির মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথিদের মাঝে অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান তাঁর বক্তৃতায় উক্ত অংশটির দৃষ্টি আকর্ষণ করে তাৎক্…