24/05/2025
রাজনৈতিক সংস্কার: নতুন করে শুরু করার এক অনিবার্য দাবি
আমাদের সময়ের সবচেয়ে জরুরি প্রয়োজন, রাজনৈতিক সংস্কার। রাষ্ট্রের কাঠামো যতই আধুনিক করা হোক, যদি রাজনীতি সংস্কার না হয়, তবে সেই সংস্কার কখনোই ফলপ্রসূ হবে না। কারণ রাষ্ট্র একটি দেহ হলে, রাজনীতি তার প্রাণ। একটি জটিল শরীরের মতোই রাষ্ট্র চলে নেতৃত্ব, সিদ্ধান্ত, দায়িত্ব ও নৈতিকতার সংবেদনশীল সমন্বয়ে, যার কেন্দ্রবিন্দু রাজনীতি।
আমরা এমন এক শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে আছি যেখানে অন্যদের অনুকরণ নয়, নিজেদের অভিজ্ঞতা, চাহিদা ও বাস্তবতা থেকেই নতুন পথ রচনার সাহস দেখাতে হবে। আমাদের ভৌগোলিক বাস্তবতা, সাংস্কৃতিক বোধ এবং সামাজিক কাঠামোকে সামনে রেখেই আমাদের রাজনৈতিক রূপান্তর ঘটাতে হবে। এমন এক মডেল গঠন করতে হবে যা শুধু আমাদের সমস্যার সমাধান দেবে না, বরং অন্যদের জন্যও অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে উঠবে। এই শতাব্দীতে এসে নিজেদের ছোট ভাবার কোনো অবকাশ নেই।
-নেতৃত্বের মানহানি—
বর্তমানে বাংলাদেশের রাজনীতিতে সদস্যপদ পাওয়ার ক্ষেত্রে কোনো সুস্পষ্ট, দায়িত্বশীল কাঠামো নেই। যে কেউ, যেকোনো সময়ে, রাজনৈতিক দলের সদস্য হতে পারে। এতে ভালো-মন্দ, আদর্শ-অবৈধ, সচেতন-অজ্ঞ, সবাই এক কাতারে দাঁড়িয়ে পড়ে। এই অনিয়ন্ত্রিত প্রবেশদ্বার কেবল দলের আভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা নয়, বরং রাষ্ট্র পরিচালনার গুণগত মানেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
প্রশ্ন উঠছে; একটি রাজনৈতিক দলে প্রচুর সদস্য থাকা কি সত্যিই রাষ্ট্র পরিচালনায় সহায়ক? যদি সদস্যরা আদর্শহীন, দায়িত্ববোধহীন হন, তবে সংখ্যাই হবে বিশৃঙ্খলার উৎস। এই অনিয়ন্ত্রিত প্রবেশে রাষ্ট্র চালনায় দক্ষতার বদলে পক্ষপাত, দুর্নীতি এবং দলীয় স্বার্থ মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়। বর্তমানে আমরা যেমনটা দেখছি।
-অরাজনৈতিক নিরপেক্ষ নাগরিকের অধিকারহীনতা আশঙ্কা—
সব নাগরিককে রাজনৈতিক দলের সরাসরি সদস্য হন না এবং অপ্রয়োজনীয় বটে। কিন্তু তাদের যেন দলীয় পরিচয়ের অভাবে বঞ্চিত না হতে হয়, এটিই হওয়া উচিত রাষ্ট্রনীতির মূল লক্ষ্য।
দলীয় রাজনীতির উত্তাপে অরাজনৈতিক সাধারণ নাগরিক প্রায়ই হয়রানির শিকার হন। রাজনৈতিক সংঘর্ষ, হিংসা, বা দ্বন্দ্বে সাধারণ মানুষকেই দিতে হয় ব্যক্তিগত শত্রুতার খেসারত। এমন অবস্থা গণতন্ত্রের পক্ষে নয়; এটি একধরনের অপ্রকাশ্য দলগত স্বৈরতন্ত্র।
-অঙ্গসংগঠন বনাম পেশাজীবী অধিকার: বিভ্রান্তি ও বিকৃতি—
বাংলাদেশে প্রায় প্রতিটি রাজনৈতিক দলের রয়েছে অসংখ্য অঙ্গসংগঠন, যা কখনো ছাত্র, কখনো যুব, কখনো পেশাজীবীদের নামে পরিচিত। প্রশ্ন হলো; এদের বাস্তব ভূমিকা কী? এরা কতটা রাষ্ট্র পরিচালনায় অবদান রাখে, আর কতটা শুধু দলীয় সুবিধা আদায়ের পথে ব্যবহৃত হয়?
একটি বিষয় খেয়াল করলে দেখবেন, জুলাই অভ্যুত্থানে ছাত্ররা কোনো রাজনৈতিক দলের পরিচয়ে আসেনি। এবং এরকম পরিচয় থাকলে এই আন্দোলন সফল হতো না। ঘটনা শেষ হওয়ার পরে অনেকের অনেক পরিচয় পাওয়া গেছে বা তৈরি হয়েছে। আন্দোলনের শুরুটা কিন্তু অরাজনৈতিক ছিল।
পেশাজীবী সংগঠন থাকা উচিত, তবে সেগুলো হওয়া উচিত রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ, স্বতন্ত্র সামাজিক সংগঠন, যারা নিজ নিজ পেশার মর্যাদা, নিরাপত্তা এবং ন্যায্য অধিকার রক্ষায় কাজ করবে। দলীয় আনুগত্যের বিনিময়ে সুযোগ-সুবিধা আদায়ের প্রক্রিয়া দেশে, সাম্য ও ন্যায়বিচারের ধারাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
সুতরাং, এখন সময় এসেছে একটি গঠনতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কার।
এই সংস্কার হবে—
- দায়িত্বনির্ভর
- সদস্য নিয়ন্ত্রিত
- জনমুখী
- প্রযুক্তিনির্ভর
- এবং সর্বোপরি,নৈতিকতায় দৃঢ়
একটি রাজনৈতিক দল হবে রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য নিবেদিত একটি সেনসিটিভ, সচেতন এবং প্রশিক্ষিত প্রতিষ্ঠান। যে দলে সদস্য হওয়া মানে হবে দায়িত্ব নেওয়া, জবাবদিহিতায় প্রস্তুত থাকা।
আমরা যদি সত্যিই একটি উন্নত, ন্যায্য, শান্তিময় বাংলাদেশ গড়তে চাই, তবে আমাদের শুরু করতে হবে রাজনীতি থেকে।
রাজনীতির সংস্কার মানেই রাষ্ট্রের শুদ্ধি। আর সেই শুদ্ধির প্রথম ধাপ, একটি সুশৃঙ্খল, দায়িত্বশীল সদস্য কাঠামো গঠন।