19/05/2024
হে তরুণ তুমি ফিরে এসো আপন ঠিকানায়!!!
আমরা ইন্টারনেটের কল্যাণে সোশ্যাল মিডিয়া, ইলেকট্রনিক মিডিয়া বা প্রিন্ট মিডিয়ার মাধ্যমে জানতে পারি যে, আমাদের বর্তমান তরুণ প্রজন্ম অধঃপতনের দিকে দ্রুত গতিতে ধাবিত হচ্ছে। নেশাগ্রস্থ, গেমাসক্ত, প্রেমাক্রান্ত, ক্ষমতালিপ্সু হয়ে দিনযাপন করছে ফলশ্রুতিতে সমাজে বাড়ছে সহিংসতা, অরাজকতা, অমানবিক কার্যকলাপ। মানুষ দিনদিন হারিয়ে ফেলছে তার নৈতিকতা, মানবিকতা। আগে আমরা রাস্তা দিয়ে চলাফেরার সময় যদি সামনে কোন বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তির দেখা পেতাম, তাহলে সালাম দিয়ে মাথা নিচু করে রাস্তার এক পাশ দিয়ে হেঁটে তাদের অতিক্রম করতাম। আর যদি কোন শিক্ষকের সামনে পড়ে যেতাম, তাহলে তো আর কোন কথাই নেই। অন্তস্থলের সমস্ত ভয়সহীত সম্মান প্রদর্শনপূর্বক যথাসম্ভব দ্রুত ঐ স্থান ত্যাগ করতাম এবং মনে মনে ভাবতাম যে, যেখানে বাঘের ভয় সেখানে সন্ধ্যা হয়। বর্তমানে চিত্র পুরোটাই ভিন্ন। বড়দের সম্মান তো দূরে থাক, শিক্ষক অবধি তাদের সম্মান হতে বঞ্চিত হয়। কেন এমন হলো? কি এমন কারণ যে, মাত্র ১০ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে এমন আমল পরিবর্তন?
ব্যক্তিগতভাবে আমার কাছে এর তিনটি প্রধান কারণ প্রতীয়মান হয়:
১. অর্থনৈতিক সচ্ছলতার অসুস্থ প্রতিযোগিতা
২. ধর্মীয় শিক্ষার অভাব এবং
৩. পাশ্চাত্যের সমাজ ব্যবস্থার বিরূপ প্রভাব
আসুন একটু ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করি।
#অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা সকলেরই কাম্য এবং সকলের সচ্ছল হওয়াটাই একটি সমাজ ও দেশের জন্য কল্যাণকর ও বাঞ্ছনীয়। কিন্তু সেটা অর্জন করার পন্থা হতে হবে সঠিক ও সুস্থ উপায়ে। বর্তমান সময়ে পরিলক্ষিত হয় যে, পূর্বের তুলনায় আমাদের অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা বৃদ্ধি পেয়েছে বটে কিন্তু অর্থ উপার্জনের ধরনটা পরিবর্তিত হয়েছে। এখন মানুষ বৈধ পথের তুলনায় অবৈধ পথে অর্থ উপার্জন করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ বোধ করে। এখন উপরি উপার্জন বৈধ বলে পরিগণিত হয়। এই উপরি উপার্জন পরিবার-পরিজনের জন্যই তো করা হয়? ইংরেজিতে একটি প্রবাদ আছে Ill got ill spent (পাপের ধন প্রায়শ্চিত্তে যায়)। একবারও কি আমরা ভেবে দেখেছি যে, আমাদের এই উপার্জিত অর্থ আমার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এটা ক্ষতি করছে নাকি উপকার করছে? মানুষের অবস্থা ভেদে প্রয়োজনের তুলনায় অধিক অর্থ অনৈতিকতার পাথেয় হয়ে দাঁড়ায়। আর প্রকৃতি কখনো কাউকে ছেড়ে দেয় না, সময়মত সব হিসাব কড়ায়-গন্ডায় উসুল করে নেয়। আমার আপনার উপার্জন যদি বৈধ পথে না হয় তাহলে এর বিরুদ্ধে প্রভাব আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উপর পড়বেই।
# প্রত্যেকটি ধর্মীয় অনুশাসন মানুষকে বিবেকবান ও প্রজ্ঞাসম্পন্ন করে তোলে। ধর্মীয় বোধ মানুষকে তার সৃষ্টিকর্তার সাথে পরিচয় করিয়ে দেয় আর তাই তারা সৃষ্টিকর্তার আদেশ-নিষেধ মেনে চলার চেষ্টা করে। আর সৃষ্টিকর্তার বিধানের অন্যতম অংশ হলো কর্মফলের প্রাপ্যতা। আমরা পৃথিবীতে যে কর্ম করব, পরকালে সেই রূপ ফল পাব। যে এই চিন্তা করে যে, একদিন আমাকে আমার কর্মফলের জন্য সৃষ্টিকর্তা সম্মুখীন হতে, হবে তার দ্বারা ভালো কাজ ছাড়া কখনো খারাপ কাজ সংগঠিত হওয়া খুবই ক্ষীণ। তাই যদি ধর্মীয় জ্ঞান কারো মধ্যে না থাকে, তাহলে সে যে কোন খারাপ কাজ করতে দ্বিধাবোধ করে না। আমরা ছোট সময়ে কাক ডাকা ভরে চোখ মুছে মুছতে চলে যেতাম মসজিদ বা মাদ্রাসার মক্তবে। সেখান থেকে ফ্রেশ মস্তিষ্কে কুরআন পড়ার পাশাপাশি ওস্তাদের কাছ থেকে নানান বিষয়ে সবক নিতাম। মানুষের হক নষ্ট করলে কি হবে, প্রতিবেশীর সাথে খারাপ আচরণের ফল কি, মিথ্যা বললে তার পরিণাম কি ইত্যাদি ইত্যাদি। বর্তমান সময়ে বাংলার বুক থেকে মক্তব প্রায় উঠে গেছে বললেই চলে।
আর্থিক সচ্ছল-সচেতন বাবা মায়েরা বাড়িতে হুজুর রেখে ছেলে মেয়েদের তালিম দেয়ান আর অসচেতনদের কথা বলাই বাহুল্য। বাড়ি যদি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার উপযুক্ত পরিবেশগ হতো, তাহলে সরকার কোটিকোটি টাকা খরচ করে ছোট বড় প্রতিষ্ঠান করত না। আর তাই আপনি বা আমি শুধু প্রাইভেট শিক্ষক দিয়ে বাসায় না পড়িয়ে আমাদের সন্তানদের প্রতিষ্ঠানে পাঠানোই উত্তম কারণ পড়ালেখার পাশাপাশি ধর্মীয় আচরণ, সামাজিক আচার-আচরণ শিক্ষাপ্রাপ্ত ছেলেমেয়ে বখে যাওয়া সম্ভাবনা কম থাকে।
# প্রাকৃতিক পরিবেশের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই, শীত প্রধান দেশে যে বৃক্ষ জন্মায়, তা কিন্তু উষ্ণ অঞ্চলে জন্মায় না। ঠিক অনুরূপভাবে উষ্ণ অঞ্চলের পরিবেশ শীত অঞ্চলের পরিবেশের সাথে মেলে না। প্রকৃতিগতভাবে মানুষ যে অঞ্চলে জন্মায়, সে সেই অঞ্চলের সামাজিক ও ধর্মীয় প্রভাব দ্বারা প্রভাবিত হয়ে বেড়ে ওঠে। প্রকৃতগত ও ধর্মীয় কারণেই শীত প্রধান দেশের সামাজিক পরিবেশ, পোশাক-পরিচ্ছদের আচার-আচরণ, উষ্ণ অঞ্চলের পরিবেশের সাথে রাতদিন পার্থক্য। প্রাকৃতিক ও ধর্মীয়ভাবে পাশ্চাত্য সমাজের সমাজ রীতি আচার-আচরণ আমাদের দেশের সাথে মিলে না। কেউ যদি তার নিজের প্রকৃতি, পরিবেশ, আচার-আচরণ ভুলে গিয়ে অন্যের ধার করা কৃষ্টি-কালচার ধারণ করে, তখন তার শেকড় ছিন্ন হয়ে যায়। আর শেকড়বিহীন বৃক্ষ যেমন শুকিয়ে যায়, তেমনি শেকড়বিহীন মানুষের অবস্থাও সেই বৃক্ষের ন্যায় হয়।
উপরোক্ত আলোচনা থেকে পরিশেষে এই উপলব্ধি অর্জিত হয় যে, আমাদের বর্তমান প্রজন্ম ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে, আমাদের শিক্ষা নিতে হবে এবং তাদেরকে শিক্ষা দিতে হবে যে, ধর্মীয় মূল্যবোধের মধ্যে থেকে, অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতার জন্য সুস্থ প্রতিযোগিতা করতে হবে নিজস্ব সমাজাচরণের মধ্যে থেকে।