04/09/2024
মনু পাগলার গারদখানা
"তোরা তো দেশটারে মনু পাগলার গারদখানা বানাইলি নাতি!" - বাহার নানুর ফোন। ৮০'র কাছাকাছি বয়স। আমার নানুর জুনিয়র ফ্রেন্ড এই সাবেক কলেজ শিক্ষক নানুটি বলা যায় আমার রাজনৈতিক দিক নির্দেশনার বাতিঘর। রাজনীতির কঠিন প্যাঁচগুলো এতো চমৎকারভাবে বুঝিয়ে দেয়ার মতো দ্বিতীয় মানুষ আমার জীবনে আসেনি। আমি ফোনে কথা বলা প্রায় বন্ধই করে দিয়েছি। বিসিএস ক্যাডার, যদিও পুলিশ প্রশাসনের মতো ক্ষমতাধর পোস্টে নেই, তবুও বাতাসেরও কান থাকে, ফোন ট্যাপ যে কোনো কারোই হতে পারে।
মনু পাগলার কাহিনী হলো, নানুদের গ্রামের এই লোক নেশা করতো, জুয়া খেলতো, বউ পিটাতো। একবার প্রেগনেন্ট অবস্থায় বউকে এমন মারা মারে যে গর্ভপাত হয়ে যায়। বউ এরপর তাকে ডিভোর্স দিয়ে দ্বিতীয় বিয়ে করে। মনু পাগলাও গ্রাম ছেড়ে চলে যায়। এই ঘটনার প্রায় ৩০ বছর পরে মনু পাগলা আবার গ্রামে ফিরে আসে। বউয়ের দ্বিতীয় ঘরে একটি ছেলে হয়। ছেলে তখন থানার দারোগা। মনু মিয়ার সাবেক বউ ২ বছর হলো মারা গিয়েছে। তার ২য় স্বামীও বেঁচে নেই। কিন্তু মনু পাগলা কান্নাকাটি করে সৎ ছেলেকেই বুকে তুলে নেয়, এমন ভাব করে সে তার হারিয়ে যাওয়া ছেলেকে এতোদিন পর খুঁজে পেয়েছে। ঘটনা সে পর্যন্ত থাকলে সমস্যা ছিলো না। দারোগা ছেলের রেফারেন্সে মনু পাগলা গ্রামের লোকদের ওপর অত্যাচার শুরু করে। এর জমি দখল, ওর থেকে বাকি খাওয়া, এই বুড়া বয়সেও আরেকজনের বউয়ের গায়ে হাত দেয়া, তার সামর্থ্যের কোনো অন্যায়ই বাদ যায় না। বুড়া মনু পাগলা এখনো সেই যৌবনের মনু পাগলার মতোই বদ, স্বভাব চরিত্র কিছুই পাল্টায় নাই।
২০২৪-এর বাংলাদেশে জামায়াত হলো সেই মনু পাগলা আর পুরো দেশটাই হলো তার হাতে বন্দী, তার গারদখানা। জামায়াত এমন একটি রাজনৈতিক দল, যারা বাংলাদেশের জন্মেরই বিরোধী। বাংলাদেশ বলে কোনো স্বাধীন রাষ্ট্র হোক, তারা চায় নি। শুধু না চাওয়াই নয়, বাংলাদেশের জন্ম ঠেকাতে তারা সর্বশক্তি দিয়ে পাকিস্তানি হানাদারদের সঙ্গে এক হয়ে দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে।
একটি গুজব ছড়ানো হয় যে, 'বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা চান নি, তিনি সমগ্র পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে চেয়েছিলেন'। এটি যে মিথ্যা কথা, তা মানবতাবিরোধী অপরাধী গোলাম আযমের "জীবনে যা দেখলাম" বই থেকেই বুঝা যায়। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের ১৬২টি আসনের মধ্যে জামায়াত মাত্র ৬৩টি আসনে প্রার্থী দিতে সমর্থ হয়। গোলাম আযমের বই অনুসারে, তাদের নির্বাচনী প্রচারের ২টি প্রধান যুক্তির একটি ছিলো, "আপনারা কি জানেন যে, আওয়ামী লীগ শুধু পূর্ব পাকিস্তানেই আছে? পশ্চিম-পাকিস্তানে এদের কিছুই নেই। তারা ক্ষমতা পেলে পাকিস্তান থেকে পূর্ব-পাকিস্তানকে আলাদা করে ফেলতে পারে।" অর্থাৎ রাজাকার শিরোমনির নিজের বয়ানেই আছে আওয়ামী লীগের দেশ স্বাধীন করার মেনিফেস্টো, একই সাথে স্বাধীন বাংলাদেশের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান।
সেই নির্বাচনে পুর্ব-পাকিস্তানে জামায়াত কোনো আসন পায় নি, পশ্চিম পাকিস্তানে পেয়েছিলো মাত্র ৪টি। অন্যদিকে ১৬০টি আসন পেয়ে আওয়ামী লীগ এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। এর পরের ঘটনাপ্রবাহ আমরা কমবেশি জানি। ইয়াহিয়া খানের গড়িমসি, ভুট্টোর সাথে ষড়যন্ত্র করে সময়ক্ষেপণ, ইতিহাসের সেই অধ্যায়গুলো এই লেখায় আর রিপিট না করি। তবে গোলাম আযমের বই থেকেই পাই, "২৩শে মার্চ পাকিস্তান দিবস। সেদিন সারা পাকিস্তানে পাকিস্তানের জাতীয় পতাকা উড্ডীন হওয়ার তারিখ। ... ২৩শে মার্চ ছাত্ররা সর্বত্র স্বাধীন বাংলার পতাকা ওড়ায়।" তারিখটি খেয়াল করুন। আমাদের 'মেজর' জিয়া কিন্তু তখনো দৃশ্যপটে নেই এবং স্বাধীন বাংলাদেশের শুধু কনসেপ্ট না, অ্যাকটিভিটিও দৃশ্যমান। জামায়াত তখনো অখণ্ড পাকিস্তান রক্ষার চেষ্টা করেই যাচ্ছে।
২৬ তারিখ, ১৯৭১ সকালে গোলাম আযম ঢাকার অবস্থা দেখার জন্য বের হন। তার নিজস্ব বয়ানে, "সেখানে যে বিভৎস দৃশ্য চোখে পড়েছে তা বড়ই অমানবিক ও করুন। ... যে নৃশংস দৃশ্য দেখলাম তাতে মনে হলো যে, সেনাবাহিনী যেন কোনো শত্রুদেশ জয় করার জন্য আক্রমণ চালিয়েছে।"
এতো নৃশংসতা দেখার পরেও জামায়াতে ইসলামী স্বাধীন বাংলাদেশের পক্ষে আসেনি। গোলাম আযমের বয়ান, "শেখ মুজিব, তাজউদ্দিন, সৈয়দ নজরুল পাকিস্তান আন্দোলনে আমার চেয়ে বেশি সক্রিয় ছিলেন। আজ তারা মুসলিম জাতীয়তা ত্যাগ করার কারণে ভারতের তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ কায়েমের জন্য বাংলাদেশকে স্বাধীন করতে চাচ্ছেন। সমাজতন্ত্রও তাদের একটি বড়ো শ্লোগান। ... আমার ঈমান কি এর অনুমতি দেয়? ... আমরা সবদিক বিবেচনা করে যে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে বাধ্য হলাম তা হলো: ... ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ ও সমাজতন্ত্র কায়েমের আন্দোলনে শরীক হতে আমাদের ঈমান অনুমতি দেয় না। ... আমাদের বর্তমান রাজনৈতিক সঙ্কটের সুযোগে আমাদের বন্ধু সেজে ভারত এ দেশ দখল করতে চায়।" গোলাম আযমের "ঈমান" স্বাধীন বাংলাদেশের অনুমতি দেয়নি। এতো নৃশংসতা দেখার পরেও জামায়াত দলগতভাবে পাকিস্তানের পক্ষে ছিলো।
শুধু পক্ষে থাকাই নয়, তারা রাজাকার, আল-বদর, শান্তিকমিটি প্রভৃতি বাহিনী গঠন করে পাকিস্তানের পক্ষে এবং বাংলাদেশের বিপক্ষে সসস্ত্র যুদ্ধ করেছে। স্বাধীন বাংলাদেশে স্বভাবতই তাদের রাজনীতি নিষিদ্ধ ছিলো।
২০২৪ এর তথাকথিত ছাত্র জনতার আন্দোলনের পর কার্যত এখন সেই জামায়াতই বাংলাদেশের রাষ্ট্র ক্ষমতায়। অনেকেই বিস্তারিত না বুঝে কোটাবিরোধী আন্দোলনে সমর্থন দিয়েছিলেন। তাদের কেউ কি চেয়েছিলেন জামায়াতকে ক্ষমতায় চান? না। এরপরের ধাপে অনেকেই সরকারের আওয়ামী লীগ সরকারের পতনকেও সমর্থন করেছিলেন। তাদের কেউ কি চেয়েছিলেন জাময়াতকে ক্ষমতায়? না। জামায়াত কি কোনো ঘোষণা দিয়েছিলো যে, তারা কোটাবিরোধী আন্দোলন বা সরকার পতনের আন্দোলনে নেতৃত্বে আছে? না। কিন্তু, সরকার পতনের পর তারা আন্দোলনের ফসলকে হাইজ্যাক করে সর্বেসর্বা হয়ে বসেছে। সেনাপ্রধান কাদের সাথে বৈঠক করেছেন, সে তালিকায় প্রথমেই বলেছিলেন, জামায়াতের নাম। একবার নয়, তিনবার বলেছিলেন। ড. ইউনূস একটি ফেসভ্যালু মাত্র, প্রকৃত ক্ষমতা এখন জামায়াতের হাতে।
আজ জামায়াত বাংলাদেশের সংবিধান পালটাতে চায়, বাংলাদেশের নাম পালটাতে চায়, বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত পালটাতে চায়। যে দেশটার জন্ম হোক, তারা চায় নি, যে দেশটার মুক্তির বিরুদ্ধে তারা যুদ্ধ করেছে, আজ তার সবকিছুকেই পালটে দিতে চাইবে, সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আপনারা যারা এতোকিছু না বুঝে আন্দোলনে শরিক ছিলেন, সরকার পতন চেয়েছিলেন, তারা কি এখন প্রতারিত হওয়ার বিষয়টি বুঝতে পারছেন? নাকি আরো সময় যেতে হবে, আরো স্পষ্ট হতে হবে?
বাহার নানুকে বললাম, তোমরা মুক্তিযোদ্ধা যারা বেঁচে আছো, তোমরা প্রতিবাদ জানাও, নানু। তোমাদের যুদ্ধ করা দেশটা জামায়াত হাইজ্যাক করে নিয়ে যাবে, তোমরা কিছু বলবা না? নানু দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, কারো যুদ্ধ অন্য কেউ করে দেয় না রে নাতি। আমাদের যুদ্ধটা আমরা করেছি। এখন আর আমরা নেই। এখন যুদ্ধটা তোদের। জিতলে জিতবি, হারলে হারবি। নিজেদের কর্মফল নিজেরাই ভোগ করবি। খেলাফত চাইলে খেলাফত হবে। বাংলাদেশ চাইলে বাংলাদেশ।
20240913
, fans