07/05/2026
রাজনীতির সত্য কী? মিথ্যাকে প্রশ্ন করুন।
মিথ্যা ও প্রতিশ্রুতি: রাজনীতির দুই মুদ্রা।
ম্যাকিয়াভেলি ৫০০ বছর আগেই বলে গেছেন— শাসকের জন্য সত্যের চেয়ে সত্যবান হওয়ার ভান বেশি জরুরি। বাংলাদেশের রাজনীতিতেও তাই। নির্বাচনের আগে ঘরে ঘরে চাকরি, দশ টাকায় চাল, দুর্নীতির জিরো টলারেন্স-এগুলো নীতির ঘোষণা নয়, এগুলো হলো রাজনৈতিক মুদ্রা। মিথ্যা এখানে নৈতিক বিচ্যুতি না, বরং ক্ষমতায় যাওয়ার বা টিকে থাকার হাতিয়ার।
তাহলে সত্য কোথায়? রাজনীতির সত্য তিন জায়গায় ধরা পড়ে:
অর্থাৎ, নেতার মুখের কথা নয়— বাজেট বরাদ্দ, পুলিশের আচরণ, আর সাধারণ মানুষের পাতের ভাতই রাজনীতির আসল সত্য।
জুলাই সনদ ২০২৪: প্রতিশ্রুতি থেকে বাস্তবায়নের ফারাক।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর "জুলাই সনদ" এসেছিল নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের প্রতিশ্রুতি নিয়ে। মূল তিন স্তম্ভ ছিল:
রাষ্ট্র মেরামত: সংবিধান সংস্কার, ক্ষমতার ভারসাম্য, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা
জবাবদিহি: গুম-খুন-দুর্নীতির বিচার, দলীয়করণ মুক্ত প্রশাসন
নতুন অর্থনীতি: বৈষম্য কমানো, কর্মসংস্থান, সিন্ডিকেট ভাঙা।
সংবিধান সংস্কার কমিশন হয়েছে, শুনানি চলছে। কিন্তু পুলিশের আইন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বদলে আসা নতুন সাইবার আইন— এগুলোতে কাঠামোগত বদল কতটা হয়েছে? ক্ষমতা এখনও প্রধানমন্ত্রী-কেন্দ্রিক। সত্য হলো: কাগজে কমিশন, মাঠে পুরনো অভ্যাস।
জবাবদিহির নামে বাছাই
গত সরকারের দুর্নীতির মামলা হচ্ছে দ্রুত। ভালো। কিন্তু নতুন সরকারের আশেপাশে গজিয়ে ওঠা ঠিকাদার, নতুন সিন্ডিকেট, দলীয় পদ বাণিজ্য— এগুলোর বিচার কোথায়? সত্য হলো: জবাবদিহি এখনও ক্ষমতার অস্ত্র, নীতি না।
অর্থনীতির সিন্ডিকেট বনাম সাধারণের পকেট।
চাল, তেল, আলুর দাম কমাতে টাস্কফোর্স হয়েছে। কিন্তু বাজার সিন্ডিকেটের মাথারা বদলেছে, সিস্টেম বদলায়নি। চাকরির পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস বন্ধ হয়নি, শুধু হাতবদল হয়েছে। সত্য হলো: লোক দেখানো অভিযান আছে, কাঠামোগত সংস্কার নেই।
টকশোতে সংস্কার, সেমিনারে গণতন্ত্র। কিন্তু মাঠে যখন শ্রমিকের বেতন আটকায়, আদিবাসীর জমি কাড়ে, তখন রাস্তায় ক’জনকে পাওয়া যায়? সত্য হলো: নৈতিক অবস্থান আছে, রাজনৈতিক ঝুঁকি নেওয়ার সাহস কম।
মানুষ এখন আর নেতার ওয়াদা বিশ্বাস করে না। ভোটের দিন ২০০ টাকা আর একটা লুঙ্গিই তার কাছে "রাজনৈতিক সত্য"। কারণ রাষ্ট্র তার কাছে সেবা দেয় না, লেনদেন করে।
রাজনীতির সত্য কীভাবে বদলাবে?
মিথ্যা রাজনীতির ভাষা থাকবেই, যতদিন জবাবদিহি না থাকে।
জুলাই সনদের আসল পরীক্ষা তিনটা জায়গায়:
এক. নির্বাচন কমিশন, দুদক, পুলিশ— এরা কি সরকার বদলালেও নিরপেক্ষ থাকতে পারবে? না পারলে সনদ কাগজই থাকবে।
দুই. চাঁদাবাজি-টেন্ডারবাজির খরচ রাজনীতি থেকে না সরালে, নেতা মিথ্যা বলতে বাধ্য। কারণ সত্য বললে ক্যাম্পেইনের টাকা আসবে না।
তিন. আমরা নিজেরা কি ভাইয়ের চাকরির জন্য তদবির বন্ধ করেছি? দুর্নীতিবাজ আত্মীয়কে সামাজিকভাবে বয়কট করেছি? না করলে, নেতা কেন সৎ হবে?
রাজনীতির চূড়ান্ত সত্য তাই ক্ষমতা না, নীতি না— এটা একটা আয়না। সমাজ যেমন, নেতা তেমন। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন হবে তখনই, যখন রাস্তার মানুষ প্রতিশ্রুতি শুনে হাততালি না দিয়ে প্রশ্ন করবে— "টাকা কোথা থেকে আসবে? কবে করবেন? না পারলে পদ ছাড়বেন?"
মিথ্যা বলা বন্ধ হবে না। কিন্তু মিথ্যাকে প্রশ্ন করার সাহসটাই রাজনীতির নতুন সত্য হয়ে উঠতে পারে। আর সেটা শুরু করতে হবে আপনাকে, আমাকে দিয়েই।