28/05/2020
সমকামী শিউলির সাক্ষ্যাতকার ★★★
শিউলি দত্ত, একজন কিন্নর, যিনি ১২ বছর বয়সে বাড়ি ত্যাগ করেছিলেন। বর্তমানে উনি একজন সফল নৃত্য শিক্ষক। পরিবার, সমাজ থেকে বঞ্চিত একজন কিন্নর, যিনি আজ সুখী বিবাহিত জীবনযাপন করছেন।
কয়েক মাস যাবৎ প্রতিদিন ট্রেনে অফিস যাওয়ার সময় আমি দেখছি শিউলিকে। কিছুদিন হল, আমাদের মধ্যে একটা ভাল বন্ধুত্ব তৈরী হয়েছে। আজ সুযোগ বুঝে একটা ছোট্ট সাক্ষ্যাতকার নিয়ে নিলাম ওঁর।
আমিঃ ১২ বছর বয়সে বাড়ি ছাড়ার কারণ কী?
শিউলিঃ বাড়ির কেউ আমার সত্যটা জানার পর আমাকে মেনে নেয়নি। এমনকি বাবা, মা পর্যন্ত আমাকে আর সহ্য করতে পারত না। তাই বেরিয়ে এসেছিলাম বাড়ি থেকে।
আমিঃ কেউ বাড়ি ছাড়তে আটকায়নি তোমাকে?
শিউলিঃ না, কেউ আটকায়নি। সবাই শান্তি পেয়েছিল।
আমিঃ বাড়ি থেকে বেরিয়ে সেদিন কোথায় গেলে?
শিউলিঃ সাড়ে ছয়দিন শিয়ালদহ স্টেশনে বসে ছিলাম। পকেটে দশ টাকা ছিল। সেই দিয়ে একদিন খাবার কিনে খেয়েছিলাম। তারপর আর খাবার কিছু পেতাম না। খিদে পেত। পেট চেপে ধরে প্ল্যাটফর্মে শুয়ে থাকতাম।
আমিঃ সাড়ে ছয়দিন পর কী হল?
শিউলিঃ দুজন আমাকে নিয়ে গিয়েছিল একটা ভাতের হোটেলে। পাগলের মত এক গাদা ভাত খেয়েছিলাম আমি সেদিন। মনে হচ্ছিল, কত জন্ম খাইনি।
আমিঃ সেটাই স্বাভাবিক। ওঁরা দুজন কে ছিলেন?
শিউলিঃ ওঁরা দুজন কিন্নর ছিল।
আমিঃ তারপর কী হল?
শিউলিঃ ওই দুজন আমাকে তাদের সাথে নিয়ে গিয়েছিল। সেদিন থেকে আমি একটা আলাদা পরিবার, একটা আলাদা সমাজ পেয়েছিলাম। আমাদের কিন্নর পরিবার, কিন্নর সমাজ। আমি সায়ন থেকে সেদিন শিউলি হয়েছিলাম।
আমিঃ সেখান থেকে নৃত্যশিল্পী হয়ে ওঠার পথটা তো নিশ্চয়ই সহজ ছিল না?
শিউলিঃ একেবারেই সহজ ছিল না। পুরোপুরিভাবে কিন্নর হয়ে উঠতেই আমার কয়েক মাস লেগে গিয়েছিল।
আমিঃ বাড়ির জন্য কষ্ট হত না?
শিউলিঃ খুব কষ্ট হত। বাবা, মায়ের কথা খুব মনে পড়ত। কিন্তু কিন্নর পরিবারের কাছে আমি অনেক ভালবাসা পেয়েছি। তালি মারা থেকে শুরু করে ভিক্ষা চাওয়া, সবটাই আমার জন্য খুব কঠিন ছিল। কিন্তু সবাই আমাকে বারবার বুঝিয়েছিল যে, এটাই আমি।
আমিঃ তোমাদের কিন্নর সমাজ আর সাধারণ সমাজ অনেক আলাদা। কখনো ওই সমাজ থেকে বেরিয়ে এসে এই সমাজে কাজ করতে অস্বস্তি হয়নি?
শিউলিঃ প্রতি মুহূর্তে অস্বস্তি বোধ করেছি। যে সমাজ আমাদের মানে না, সেই সমাজের কাছে পেট চালানোর টাকা চাইতে খুব অস্বস্তি হত আমার। কিন্তু কিন্নর দিদিরা বুঝিয়েছিল যে, এটা আমাদের অধিকার।
আমিঃ ঠিকই তো। তারপর নৃত্যের সাথে কবে যোগসূত্র হল?
শিউলিঃ ট্রেনে ভিক্ষা করতে করতেই একদিন আমার পরিচয় হয় নিখিলের সাথে। সে আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিল যে, আমি নাচতে পারি কিনা। আমি নাচ করতে ছোটবেলা থেকেই ভালবাসতাম। টিভি চালিয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে নাচতাম। আমার উত্তর হ্যাঁ শুনে, সে তার ফোন নম্বর দিয়ে বলেছিল পরের দিন বেহালায় গিয়ে তাকে ফোন করতে।
আমিঃ তারপর?
শিউলিঃ আমি কাউকে ওই ব্যাপারে আগে কিছু বলিনি। পরেরদিন আমি বেহালায় গিয়ে নিখিলকে ফোন করে। ও আমাকে একটা বারে নিয়ে গিয়েছিল। সেই বারের ম্যানেজার ছিল সে। সেখানেই একজন ডান্সার হিসাবে কাজ করার প্রস্তাব দেয় সে আমাকে।
আমিঃ তারপর তুমি রাজী হয়ে গেলে?
শিউলিঃ ট্রেনে, বাসে ভিক্ষা করে জীবন কাটাতে কে চায়? আমি একবারেই রাজী হয়ে গিয়েছিলাম। সেই থেকেই আমার জীবনের মোড় ঘুরে যায়।
আমিঃ বিয়ে কীভাবে হলো?
শিউলিঃ নিখিল অনাথ ছেলে। ওর সাথে বন্ধুত্ব যে কবে ভালবাসায় পরিণত হয়ে গিয়েছিল, আমি বুঝতে পারিনি।
আমিঃ কে আগে প্রপোজ করেছিল?
শিউলিঃ প্রেমে পড়েছিলাম আমি আগে। কিন্তু নিখিলকে বলার সাহস পাইনি। কারণ আমি তো আর কোনো সাধারণ মেয়ে না। তারপর নিখিলই আমাকে প্রপোজ করে। প্রথমে আমি আপত্তি করেছিলাম। কিন্তু সে ছিল নাছোড়বান্দা।
আমিঃ তারপর তো নিশ্চয়ই জীবনটা একদম বদলে গেল?
শিউলিঃ হ্যাঁ, পুরোপুরিভাবে। বিয়ের পর আমাকে আর কাজ করতে দেয়নি নিখিল। বরং আমাকে ভর্তি করে দিয়েছিল এক সমকামীদের নাচের স্কুলে। সেখানে নাচ শিখে, বিভিন্ন প্রোগ্রামে নাচ করেই আজ আমি প্রতিষ্ঠা পেয়েছি।
আমিঃ দারুন ব্যাপার। তোমাদের দুজনের দাম্পত্য জীবন খুব সুখের হোক, এই কামনা করি।
শিউলিঃ ধন্যবাদ। আরেকটা কথা, আমাদের একটা মেয়েও আছে। দত্তক নিয়েছিলাম আমরা। ওকে ছাড়া আমার জীবনকাহিনী পূর্ণ হত না। তাই বললাম।
আমিঃ বাহ! এটা তো আমার জানা ছিল না। সবশেষে আর একটাই প্রশ্ন, যেসব কিন্নররা আজও নিজের জীবনকে অভিশপ্ত মনে করে বাঁচছে, তাদের কী বলতে চাও?
শিউলিঃ আমাদের জীবনকে অভিশপ্ত বানায় এই সমাজ। সমাজকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এগিয়ে যাও। একদিন তোমরাও প্রতিষ্ঠিত হতে পারবে আমার মত।
আমিঃ ধন্যবাদ। ভাল থাকবে।
শিউলিঃ তুমিও ভাল থেকো।
সমাপ্ত।