10/10/2025
“তোমারেই আমি চাহিয়াছি প্রিয় শতরূপে শতবার” – প্রেমের মহাজাগতিক সাধনা ও আত্মার অনন্ত অনুসন্ধান
বাংলা সাহিত্যে প্রেমের চিরায়ত ধারা বহমান এক নন্দনতত্ত্ব। সে প্রেম কখনো নিছক মানবিক, কখনো বা অধিবাস্তব, আবার কখনো তা রূপ নেয় ব্রহ্মের সন্ধানে আত্মার এক জাগতিক সাধনায়। কাজী নজরুল ইসলামের “তোমারেই আমি চাহিয়াছি প্রিয় শতরূপে শতবার” গানটি তেমনই এক উচ্চাঙ্গ কাব্যিক সৃষ্টি, যেখানে প্রেমিক কেবল একজন নারীকে খোঁজেন না, তিনি খোঁজেন সৃষ্টির অন্তরালে ছড়িয়ে থাকা চিরন্তন সৌন্দর্য ও অনস্তিত্বের অভিজ্ঞানকে।
🔲চিরন্তন প্রেমের অলৌকিকতা
প্রথম পঙক্তিতেই নজরুল প্রেমের সময়সীমাকে ভেঙে দেন –
“তোমারেই আমি চাহিয়াছি প্রিয় শতরূপে শতবার।
জনমে জনমে চলে তাই মোর অনন্ত অভিসার।”
এখানে ‘শতরূপে শতবার’ শব্দবন্ধ প্রেমিকাকে একক সত্তা থেকে বহু রূপে রূপান্তরিত করে। এই প্রেম দেহ-মন অতিক্রম করে এক ধ্রুপদী, পারমার্থিক অভিসারে রূপান্তরিত হয়। ‘অভিসার’ এখানে শুধু প্রেমিকের পথে প্রেমিকার কাছে যাওয়া নয়, এটি এক দর্শনীয় যাত্রা – জন্মান্তরের মহাসংলগ্ন পথে আত্মার সঙ্গে আত্মার মিলনের চেষ্টা।
🔲প্রকৃতির প্রতীকে প্রেমের রূপান্তর
নজরুল তাঁর কবিতায় প্রকৃতিকে নিপুণভাবে ব্যবহার করেছেন প্রেম ও আত্মার সম্পর্ক ব্যাখ্যা করতে।
“বনে তুমি যবে ছিলে বনফুল
গেয়েছিনু গান আমি বুল্বুল্।”
এখানে প্রেমিকা এক শান্ত বনফুল, আর প্রেমিক হলো উচ্ছ্বাসময় গায়ক পাখি। প্রেমিকা যদি হন নিরব, নিসর্গের অন্তর্গত, তবে প্রেমিক সেই সৌন্দর্যে সুরারোপকারী। এই রূপকে প্রেমের দ্বৈততা ও পরিপূরকতা ফুটে ওঠে, যেখানে একজন নিস্তব্ধতা, অন্যজন আন্দোলন।
আরো এক সুন্দর চিত্র নির্মাণ হয় —
“ছিলাম তোমার পূজার থালায় চন্দন ফুলহার।”
এখানে প্রেমিক নিজেকে নিবেদন করেন প্রেমিকার পূজার সামগ্রী হিসেবে। প্রেম আরাধনার রূপ নেয়। প্রেম এখানে মাংসল নয়, পূজিত – প্রেমিকা যেন দেবীস্বরূপা, আর প্রেমিক তার সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করেন।
🔲স্মৃতি ও পুনর্জন্মের কাব্য
নজরুলের গানে বারবার ফিরে আসে ‘স্মৃতি’, ‘পুনর্জন্ম’ ও ‘অমরতা’র ধারণা –
“আমি ছিনু তব অমরাবতীতে পারিজাত ফুল–গন্ধ।”
এখানে ‘অমরাবতী’ ও ‘পারিজাত’ শব্দ দুটি ব্যবহারে কাব্যিকতা পৌঁছে যায় পুরাণের গহীনে। পারিজাত ফুল হল দেবতালোকের প্রতীক; প্রেমিক নিজেকে সেই গন্ধ, সেই সৌরভ বলে উল্লেখ করে – যা দৃশ্য নয়, অনুভব। প্রেমিক যেন প্রেমিকার অস্তিত্বে এক অনঙ্গ অভ্যন্তরীণ সত্তা।
এবং গানটির শেষের দিকে আসে এক গভীর দীর্ঘশ্বাস –
“আজিও এসেছি তেমনি আশায় ল’য়ে স্মৃতি–সম্ভার।”
এই আশায় প্রতিফলিত হয় মানুষের চিরন্তন আকুলতা – ফিরে পাওয়ার, আবার খোঁজার, আবার ভালোবাসার। স্মৃতির সম্ভার এখানে শুধু ব্যক্তিগত নয়, এক সামষ্টিক বোধ – জীবনের সমস্ত অভিজ্ঞতা, চাওয়া-পাওয়ার অন্তঃসলিলা ধারা।
🔲প্রেমের আধ্যাত্মিক ব্যঞ্জনা
এই গানটিকে নিছক রোমান্টিক কবিতা বলে ভাবলে ভুল হবে। এটি এক ধরণের ভক্তিমূলক প্রেম – যে প্রেম শিব-পার্বতীর, রাধা-কৃষ্ণের, কিংবা মরমী সাধকদের ইশ্বর-প্রীতির। এখানে প্রেমের আকুতি এক আত্মা অন্য আত্মার সাথে মিশে যাবার, মিলনের যে ব্যাকুলতা তা শরীর ছাড়িয়ে আত্মার অলিন্দে পৌঁছে যায়।
“তোমারেই আমি চাহিয়াছি প্রিয় শতরূপে শতবার” – নজরুলের এই গান প্রেমের কবিতার একটি মহাকাব্যিক রূপ। এর প্রতিটি পঙক্তি আমাদের নিয়ে যায় অনুভবের অতল গহ্বরে, স্মৃতির অলিন্দে, এবং আত্মার গভীর অভিসারে। এই গান কেবল প্রেমিক-প্রেমিকার মধ্যকার আকর্ষণ নয়, এটি এক আত্মিক সন্ধান, চিরন্তন সৌন্দর্যের মহিমা অন্বেষণ, এবং জীবনের শ্রেষ্ঠ শিল্প – প্রেমের অনবদ্য উজ্জ্বল রূপায়ণ।
শিল্পী - লুভা নাহিদ চৌধুরী