16/05/2026
রাজনীতি, অর্থনীতি এবং আইন - কানুনে এখনো জমিদারী ব্যবস্থার ভূত রয়ে গেছে। - জমিদারী প্রথা উচ্ছেদের ৭৫তম বার্ষিকী উপলক্ষে রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের আলোচনা সভায় বক্তারা
প্রেস রিলিজ
ঢাকা, ১৬ মে ২০২৬:
১৬ মে শনিবার সকালে ‘বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন’-এর প্রধান কার্যালয়ে “জমিদারী প্রথা উচ্ছেদের ৭৫ বছর: পরিপ্রেক্ষিত এবং বর্তমান প্রাসঙ্গিকতা” শীর্ষক এক বিশেষ আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় বক্তারা বলেন, ১৯৫০ সালের স্টেট অ্যাকুইজিশন অ্যান্ড টেন্যান্সি অ্যাক্ট (State Acquisition and Tenancy Act) বা জমিদারী উচ্ছেদ আইনের মাধ্যমে দৃশ্যত জমি থেকে জমিদারী প্রথা বিলুপ্ত হয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্র, রাজনীতি ও অর্থনীতির সংস্কার না হওয়ায় কৃষক, শ্রমিক, নাগরিক; কারো মুক্তি মেলেনি। ব্রিটিশ আমলের জমিদারি মানসিকতা আজ রাজনীতি, রাজনৈতিক দল, আমলাতন্ত্র এবং পাচারমুখি অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে পুরোদমে রয়ে গেছে। প্রজা থেকে মানবিক মর্যাদা সম্পন্ন নাগরিক হয়ে উঠতে তাই আইনের সংস্কার, রাজনীতির সংস্কার এবং অর্থনীতির সংস্কারের উপর গুরুত্বারোপ করেন বক্তারা।
আলোচনা সভায় সভাপতির বক্তব্যে বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সভাপতি অ্যাডভোকেট হাসনাত কাইয়ূম বলেন, "শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক ১৯৩৬ সালে ‘কৃষক প্রজা পার্টি’ (KPP) গঠন করেন, যার মূল রাজনৈতিক এজেন্ডাই ছিল—"লাঙল যার, জমি তার" এবং কোনো ক্ষতিপূরণ ছাড়াই জমিদারী প্রথার সম্পূর্ণ বিলোপ ঘটানো। এই শ্লোগান বাংলার কোটি কোটি শোষিত ও ভূমিহীন কৃষকের মধ্যে এক অভূতপূর্ব জাগরণ তৈরি করেছিল। এই প্রথম বাংলার কৃষকের রাজনৈতিক স্বীকৃতি ঘটে।
১৯৩৭ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠনের পর ফজলুল হক জমিদারী প্রথার আইনি ও অর্থনৈতিক ভিত্তি খতিয়ে দেখার জন্য এবং তা উচ্ছেদের রূপরেখা তৈরির লক্ষে ১৯৩৮ সালে ‘ফ্লাউড কমিশন’ গঠন করেন এবং 'বেঙ্গল টেন্যান্সি অ্যাক্ট' সংশোধন করেন।
এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৫১ সালের ১৬ই মে ‘পূর্ববঙ্গ জমিদারী দখল ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০’ (East Bengal State Acquisition and Tenancy Act, 1950) আইনের মাধ্যমে জমিদারী প্রথা বিলুপ্ত হয়।
এই আইনের পেছনে যে দীর্ঘ তিন দশকের রাজনৈতিক লড়াই, আইনি খসড়া ও ফ্লাউড কমিশনের মতো যুগান্তকারী উদ্যোগ—তার সবটুকুর নেতৃত্বই দিয়েছিলেন শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক। বাংলায় জমিদারী প্রথার কফিনে শেষ পেরেকটি মূলত তাঁর হাত দিয়েই ঠোকা হয়েছিল।
৭৫ বছর আগে জমিদারী প্রথা উচ্ছেদের পর আজও জলমহাল, চা বাগান এবং হাট বাজারের উপর দৃশ্যমান জমিদারী প্রথা রয়েছে। ইজারাদাররা নব্য জমিদারের মতো সেখানে জুলুম, লুন্ঠন করার লাইসেন্স পান। এসব ইজারাদারী প্রথারও উচ্ছেদ করতে হবে।
বারবার প্রতারিত হয়ে আমাদের মধ্যে কেউ কেউ হতাশ হয়ে বলেন, এই জাতির কোনদিন মুক্তি হবে না। জমি থেকে জমিদারী প্রথা উচ্ছেদে ১৫০ বছর লেগেছিল। ইলামিত্রদের অসামান্য লড়াই ও আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমরা প্রজা থেকে নাগরিক হয়েছি। এখন নাগরিকের অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিতের লড়াই চলছে প্রায় ৭৫ বছর ধরে। ২৪ এর অভ্যুত্থান সে লড়াইয়ের সর্বশেষ বড় আত্মত্যাগ। সংবিধান সংস্কার শুরু হলে সে লড়াইয়ের বড় অগ্রগতি অর্জিত হবে। এই লড়াইয়েও আমাদের বিজয় সুনিশ্চিত।”
নৃবিজ্ঞানী ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বখতিয়ার আহমেদ বলেন, “তেভাগা আন্দোলনের একটি বড় ভিত্তি ছিল কৃষক ও প্রান্তিক মানুষের অধিকার। ৫২ ও ২৪ এর আন্দোলন মূলত একই ধারাবাহিকতা। জমিদারী প্রথা আজ ‘শ্রমদারী’ প্রথায় পরিণত হয়েছে। অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সংস্কার তাই লাগবে।”
সুপ্রীম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার মোকছেদুল ইসলাম বলেন, “আইন দিয়ে শাসন করার নামে মূলত শোষণের এক প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়েছে। এর থেকে মুক্তির জন্য শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন, আদালতের স্বায়ত্তশাসন এবং সামগ্রিক আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থার সংস্কার করা জরুরি। ২০০ বছরের পুরোনো আইন ও কাঠামোর খোলনলচে না বদলে প্রকৃত অর্থে কোনো সংস্কার সম্ভব নয়।”
লেখক ও গবেষক সহুল আহমদ বলেন, “তেভাগা আন্দোলনসহ কৃষকদের দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের ফলেই ১৯৫০ সালে জমিদারী প্রথা উচ্ছেদের আইন হয়েছিল। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, জমিদারী মানসিকতা সমাজ ও রাষ্ট্র থেকে মুছে যায়নি। আজও আমলাতন্ত্র ও নগরকেন্দ্রিক পুঁজিপতিরা গ্রামীণ জনপদের ওপর নতুন কায়দায় আধিপত্য বিস্তার করে রেখেছে। আমলাতন্ত্রের এই অসীম ক্ষমতার কারণে নাগরিকরা আজ নিজ ভূমিতেই কোণঠাসা।”
এছাড়াও আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য রাখেন রাষ্ট্রচিন্তক ও রাজনীতিবিদ মঞ্জুর কাদির,
অহিংস গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল আলম চৌধুরী, রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের নির্বাহী কমিটির সদস্য হরিপদ দাস, সাংগঠনিক সম্পাদক মোহাম্মদ সোহেল প্রমূখ। সভার সঞ্চালনা করেন দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক দিদার ভূঁইয়া।
বার্তা প্রেরক:
এহসান আহমেদ
মিডিয়া সম্পাদক, বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন
১০-বি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা।
ইমেইল: [email protected]
ফোন: +880 1515-687633
লাইভ লিংক: https://www.facebook.com/share/v/17mymLvRvT/