08/05/2026
বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে যে অভিযোগগুলো ঘুরে ফিরে আসে, সেগুলোর কেন্দ্রবিন্দু একটাই: একটি বেসরকারি আবাসন কর্তৃপক্ষ কতদূর পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ চালাতে পারে, এবং সেই নিয়ন্ত্রণ কখন নাগরিক অধিকারের সঙ্গে সংঘর্ষে যায়।
সমস্যাটা শুধু অতিরিক্ত ফি বা অনুমতির না। এখানে মূল প্রশ্ন হচ্ছে ক্ষমতার প্রকৃতি। একটি আবাসিক প্রকল্প কি ধীরে ধীরে এমন এক কাঠামোয় রূপ নিচ্ছে, যেখানে নাগরিকরা জমির মালিক হলেও কার্যত স্বাধীন না?
প্রথমত জমি ডেভেলপমেন্ট, মাটি কাটা, রাবিশ অপসারণ, রেডিমিক্স, পাইলিং, ইন্টারনেট, ডিশ, গ্যাস সিলিন্ডার, অনুষ্ঠান আয়োজন পর্যন্ত নির্দিষ্ট অনুমোদিত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে করাতে বাধ্য করা হয়। এর ফলে একটি উন্মুক্ত বাজারের বদলে তৈরি হয় নিয়ন্ত্রিত অর্থনৈতিক বলয়। বাসিন্দার পছন্দের স্বাধীনতা কমে যায়, প্রতিযোগিতা নষ্ট হয়, এবং মূল্য নির্ধারণে একচেটিয়া প্রভাব তৈরি হয়।
দ্বিতীয়ত, চলাচল ও প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ।
গেট বন্ধ রাখা, নির্দিষ্ট রাস্তা সীমিত করা, রাতে যাতায়াতে বাধা, মালামাল প্রবেশ বা বহির্গমনে অনুমতির প্রয়োজনীয়তা, এগুলো যদি অতিরিক্ত মাত্রায় প্রয়োগ হয় তাহলে তা নিরাপত্তা ব্যবস্থার চেয়ে বেশি কিছু হয়ে দাঁড়ায়। তখন প্রশ্ন ওঠে এটি কি নিরাপত্তা, নাকি প্রশাসনিক কর্তৃত্বের প্রদর্শন?
তৃতীয়ত রাজউক অনুমোদনের পরও আবার আলাদা অনুমোদন প্রয়োজন হওয়া নিয়ে ক্ষোভ আছে। এখানেই রাষ্ট্রের ভিতরে আরেক রাষ্ট্র কথাটা আসে। কারণ সাধারণ নাগরিকের দৃষ্টিতে রাষ্ট্রীয় অনুমোদনের পর আরেকটি বেসরকারি অনুমোদন বাধ্যতামূলক হয়ে গেলে সেটি এক ধরনের সমান্তরাল কর্তৃত্ব হিসেবে দেখা দেয়।
চতুর্থত, এর মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব আছে।
যখন মানুষ অনুভব করে যে প্রতিটি কাজের জন্য তাকে কারও অনুমতি নিতে হচ্ছে, তখন সেখানে শুধু আর্থিক চাপ না, এক ধরনের স্থায়ী মানসিক নির্ভরতা তৈরি হয়। নাগরিক ধীরে ধীরে মালিক থেকে অনুমতিপ্রার্থী হয়ে যায়। এই অনুভূতিটাই সবচেয়ে বেশি ক্ষোভ তৈরি করে।
একটি আবাসিক কর্তৃপক্ষ কতদূর পর্যন্ত নিয়ম করতে পারবে?
কখন সেই নিয়ম সেবা থেকে নিয়ন্ত্রণে পরিণত হয়?
কখন নিরাপত্তা ব্যবস্থা নাগরিক স্বাধীনতার উপর আধিপত্য হয়ে দাঁড়ায়?
এটি এমন এক অলিগার্কিক কাঠামো যা আগের জমিদারি ব্যাবস্থার একটা কর্পোরেট সংস্করণ। এটি এমন একটি কাঠামো যেখানে অল্প কয়েকজন ক্ষমতাবান ব্যক্তি বা গোষ্ঠী কার্যত নিজেদের নিয়মে একটি অঞ্চল পরিচালনা করে, কিন্তু সেই ক্ষমতার উপর পূর্ণ গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতা থাকে না। বসুন্ধরা নিয়ে সমালোচকদের বক্তব্য মূলত সেদিকেই ইঙ্গিত করে।
সবশেষে, এই বিতর্ক আসলে শুধু বসুন্ধরা নিয়ে না।
এটা ভবিষ্যতের শহর নিয়েও প্রশ্ন তোলে।
বাংলাদেশে কি ধীরে ধীরে এমন গেটেড নগরব্যবস্থা তৈরি হচ্ছে যেখানে নাগরিকের পরিচয় হবে বাসিন্দা, কিন্তু পূর্ণ নাগরিক স্বাধীনতা থাকবে সীমিত?
নাকি বিশৃঙ্খল নগরজীবনের বাস্তবতায় মানুষ নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলার বিনিময়ে কিছু স্বাধীনতা স্বেচ্ছায় ছেড়ে দিচ্ছে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই নির্ধারণ করবে ভবিষ্যতের শহর কেমন হবে।
কিন্তু সরকারের ক্ষেত্রে এটা নগর ব্যাবস্থার চেয়ে বড় ইস্যু। একটি কোম্পানি কি বারবার রাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ করছে! এটি কি এভাবেই থেকে যাবে নাকি তাকে টিকতে দিয়ে রাষ্ট্র তার সার্বভোমত্বের ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে আরও কিছুটা ছাড় দিবে! কারন বসুন্ধরা কে বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে তার অতিতে সে ভারতের মতো বৈদেশিক শক্তি গুলার সাথেও যুক্ত থেকে দেশ এবং তার সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলো।