04/02/2025
সম্প্রতি এলেক্স সরোসের সঙ্গে ডঃ ইউনুসের সাক্ষাৎ বেশ ভাইরাল হয়েছে। প্রচুর আলোচনার খোরাকও হয়েছে।
[[খুব সহজ ভাষায় ও ছোট করে যারা এই সম্পর্কে একদমই জানেন না, তাদের জানানোর সামান্য চেষ্টা করছি। যারা এ বিষয়ে জানেন, তারা এটা গভীরভাবে না দেখলেই ভালো, কারণ ডিপ স্টেট সম্পর্কে এত ছোট করে লেখা আসলেই অসম্ভব। প্রচুর তথ্য মিসিং থাকবে। সম্পূর্ন জানতে হলে প্রচুর পড়তে হবে]]
কে এই এলেক্স সরোস? কেন এত আলোচনা তাকে নিয়ে?
এলেক্স সরোস মার্কিন বিলিওনিয়ার জর্জ সরোসের পুত্র। জর্জ সরোস অত্যন্ত বিখ্যাত সরোস ফান্ড ম্যানেজমেন্ট কোম্পানী ও ডিপ স্টেটের অন্যতম স্টেক হোল্ডার ও হিলারী ফাউন্ডেশনের সবথেকে বড় ডোনার হবার কারণে। সেই সরোসেরই ওপেন সোসাইটি ম্যানেজমেন্ট নামক সাইড কোম্পানীর চেয়ারম্যান এই এলেক্স সরোস।
ডিপ স্টেট, মিথ নাকি ফ্যাক্ট?
ডিপ স্টেট বলতে সাধারণভাবে এমন একটা অর্গানাইজেশন বুঝায় যারা আমেরিকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ন্ত্রণ করে। এর মধ্যে আমেরিকার গোয়েন্দা সংস্থা থেকে শুরু করে বিদেশে আমেরিকার "স্বার্থে" করা রাজনৈতিক প্রজেক্ট থেকে গণহত্যা পর্যন্ত আছে। কোল্ড ওয়ার থেকে কেনেডি হত্যা, সব বিষয়ে এরা বহু বছর ধরে কাজ করলেও প্রথম এদের অস্তিত্ব জানান দেয় সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙার পর, বিল ক্লিনটনের সময়। তারপর থেকে তাদের নিয়ে আলোচনা ক্রমেই বেড়েছে।
আমেরিকা যদিও বরাবরই ডিপ স্টেটের অস্তিত্ব অস্বীকার করে এসেছে ট্রাম্পের আগ পর্যন্ত। এবারের নির্বাচনের আগে ট্রাম্প সরাসরি ডিপ স্টেটের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেই নির্বাচনে জিতে এসেছে। এর বাইরে চীন, রাশিয়া, ইন্ডিয়া, ইজরায়েল, হাঙ্গেরি মাঝেমধ্যেই ডিপ স্টেট বিষয়ে অভিযোগ করেছে।
কাজেই এটা বলাই যায়, ডিপ স্টেট কোন মিথ নয় বরং বাস্তব।
কিভাবে কাজ করে ডিপ স্টেট? এর সাথে সরোস, ক্লিনটন বা ইউনুসের সম্পর্কই বা কি?
ডিপ স্টেটের কাজের বিষয়ে খুব বেশি প্রমাণ পাওয়া যায় না, অথবা বলা যায় তারা প্রমাণ রাখে না। তবে তারা পেন্টাগন, সিআইএ, এফবিআই এর গুরুত্বপূর্ণ পদ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখে বলে সবার বিশ্বাস। এছাড়াও বেশিরভাগ মিডিয়া তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকায় নিজেদের সম্পর্কে ধোঁয়াশা রাখাটা খুবই সহজ তাদের জন্য। এই ক্ষেত্রে সরোসের OCCRP নামক ইনভেস্টিগেটিভ মিডিয়া আউটলেট সবথেকে বড় ভূমিকা পালন করে। প্রতিটি দেশে তাদের ডোনেশনে চলা বিভিন্ন মিডিয়া তাদের স্বার্থ সংরক্ষণে বড় ভূমিকা রাখে। গুগল, ফেসবুক থেকে শুরু করে বড় বড় প্রতিষ্ঠান এসব কাজে তাদের সাহায্য করে বা করতে বাধ্য হয়। এই OCCRP'র অর্ধেক ডোনেশন আসে আমেরিকান সরকারের থেকে, আমাদের সবার পরিচিত দাতব্য সংগঠন USAID এর মাধ্যমে। এছাড়াও তাদের ডোনার হিসেবে বড় বড় বিলিওনিয়ারের পাশাপাশি রয়েছে ডঃ ইউনুসের সাথে হাস্যরসে ব্যস্ত এলেক্স সরোসের OSF এবং ফোর্ড ফাউন্ডেশন।
বিভিন্ন স্বল্পোন্নত বা উন্নয়নশীল দেশে প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রে তাদের সবথেকে প্রচলিত উপায় এনজিও'র বিস্তার। বাংলাদেশের ব্র্যাকসহ আরও বহু এনজিও এবং বিশ্ববিদ্যালয় সরাসরিই এই OSF এর ফান্ড পেয়ে চলে বলে তাদেরই ওয়েবসাইটে প্রমাণ রয়েছে। নিজের দেশের পাশাপাশি অন্য দেশেও ডিপ স্টেট সহজেই প্রভাব বিস্তার করতে পারে এইসব মিডিয়া, বিশ্ববিদ্যালয় ও এনজিও নিজেদের কন্ট্রোলে থাকায়।
বিভিন্ন এনজিওর মাধ্যমে তারা সামাজিক, অর্থনৈতিক, মানবিক, নারীর অধিকার ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণের মতো বিভিন্ন বড় প্রকল্প গ্রহণ করে। এর ফলে মানুষের কাছে পৌঁছানো সহজ হয়, রাজনৈতিক বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গেও আলোচনা সহজ হয়। এবং সবথেকে বড় যে সুবিধা হয়, তা হলো খুব সহজেই অনুদান হিসেবে বিশাল পরিমাণ ফান্ড ঢুকানো যায়, যা পরে সেই দেশের ভেতরে অস্থিরতা তৈরিতে কাজে লাগে।
ধারণা করা হয় বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে জঙ্গীদের ফান্ডিংয়ে জড়িত রয়েছে এই ডিপ স্টেটের প্রধান হাতিয়ার USAID। সরকারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় নিজেদের পে রোলে থাকা মিডিয়া ব্যবহার করে মানুষের মনে নেতিবাচক ধারণা সৃষ্টিও তাদের প্ল্যানের অংশ।
এছাড়াও অভিযোগ রয়েছে রোহিঙ্গা সমস্যার মূলেও রয়েছে এই ডিপ স্টেট। মায়ানমারে অস্থিরতা সৃষ্টির মাধ্যমে রোহিঙ্গা ক্রাইসিস সৃষ্টি, তাদের বাংলাদেশে আসতে বাধ্য করা, বাংলাদেশের ভেতরে অস্থিরতা সৃষ্টি করে রোহিঙ্গা প্রবেশের ব্যবস্থা করা এবং তারপর রোহিঙ্গাদের সাহায্য করার নামে শত শত নতুন এনজিও সৃষ্টির মাধ্যমে দেশে অস্থিরতা তৈরির জন্য আরও ফান্ড ও লোকবল বিভিন্ন জায়গায় প্রবেশ আরও সহজ করা, এসবই এক সুতোয় গাঁথা।
এছাড়াও তাদের সবথেকে বড় প্রজেক্টের একটা হলো তরুণদের স্কলারশিপ থেকে শুরু করে বিভিন্ন সুবিধা দেয়ার মাধ্যমে নিজেদের দলে টানা এবং তাদের ব্রেনওয়াশ করা। গত বেশকিছু বছরে দেশের শিক্ষাক্ষেত্রে তাদের প্রভাবের দিকে নজর রাখলেই স্পষ্ট বোঝা যায়। এই কাজ তারা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশেই সফলতার সঙ্গে করে চলেছে। তার সবথেকে বড় প্রমাণ আরব বসন্ত, ভেনেজুয়েলা ক্রাইসিস বা হালের ইউক্রেন যুদ্ধ অথবা বাংলাদেশ। প্রতিটি ক্ষেত্রেই তরুণদের আবেগকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধার করে দেশকে ধ্বংসের পথে ঠেলে দেয়া হয়েছে।
এই সরোস এবং ক্লিনটন পরিবারের সম্পর্কও বহুদিনের। সরোস পরিবার, ক্লিন্টন পরিবার এবং আরও কিছু ক্ষমতাবান মানুষ নিয়ে 'শ্যাডো পার্টি' নামক একটি গ্রূপ সম্পর্কে জানা যায় যারা ডেমোক্রেটদের নিয়ন্ত্রণ করে এবং ডিপ স্টেটে সবথেকে বেশি প্রভাব বিস্তার করে। পেন্টাগনে ক্ষমতার অপপ্রয়োগ করে বিভিন্ন দেশে ক্যু থেকে জঙ্গী উত্থান, তেল গ্যাস খনির দখল থেকে শান্তি প্রতিষ্ঠার নামে যুদ্ধ, অথবা বিএলএম মুভমেন্টের নামে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে জনমত সৃষ্টি, সবকিছুর পেছনে ব্রেন হিসেবে কাজ করেছে এই শ্যাডো পার্টি।
এবং ক্লিনটন পরিবারের সঙ্গে ডঃ ইউনুসের সম্পর্কও কারো অজানা নয়। গ্রামীণ ব্যাংক ইস্যুতে হিলারী ক্লিনটনের কাছে নালিশ জানিয়ে করা ইমেইল শুরু করে ক্লিনটনের নির্বাচন অথবা ডিপ স্টেটের ফান্ডে বিশাল ডোনেশন, সবক্ষেত্রেই ডঃ ইউনুসের ভূমিকা দৃশ্যমান। দেশের ট্যাক্স ফাঁকি দিয়ে পাচার করা হাজার হাজার কোটি টাকার বেশিরভাগ ক্লিনটন ফাউন্ডেশন তথা ডিপ স্টেট ফান্ডে ইউনুস দান করেছেন বলেই সবার ধারণা। ডঃ ইউনুস তাদের কত কাছের তার সাম্প্রতিক প্রমাণ প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব পাওয়ার পরই তার ক্লিনটন, সরোসদের কাছে ছুটে যাওয়া। যা আদতে তাদের দীর্ঘদিনের প্ল্যানের সফলতার পার্টিই বলা যায়।
ডিপ স্টেটের বহু বছরের প্ল্যানের সাকসেসফুল ইমপ্লিমেন্টেশন এই তথাকথিত জুলাই বিপ্লব বা গণঅভ্যুত্থান। ডঃ ইউনুস কিছু জানেন না বলে প্রচার করলেও এখন এটা স্পষ্টই যে শুরু থেকেই ডঃ ইউনুস এই প্ল্যানের সঙ্গে জড়িত। এলেক্স সরোসের সঙ্গে ডঃ ইউনুসের এই দহরম মহরম দেশের ভাগ্যাকাশে আরও কত দুর্যোগ আনবে তা সময়ই বলে দেবে। এ থেকে মুক্তির উপায়? তাদের ফাঁদে পড়া এই দেশের জনগণের হাতেই মুক্তির চাবি।
[[এই লেখার মাঝেই নিউজ পেলাম ট্রাম্প প্রশাসন কর্তৃক USAID বন্ধ করার ঘোষণা দেয়ার। যা আদতে প্রমাণ করে তাদের বিরুদ্ধে ডিপ স্টেটের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ আসলেই সত্যি]]
— শাকিব হাসান