28/04/2026
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আমেরিকায় একটি শিশু জন্ম নিয়েছিল।
যার শরীরে এমন একটি জিনগত ত্রুটি ছিল যা তাকে মেরে ফেলত।
তার নাম KJ Muldoon।
বিজ্ঞানীরা সেই একটি শিশুর জন্য, শুধুমাত্র তার নিজস্ব মিউটেশন সংশোধনের জন্য, একটি সম্পূর্ণ কাস্টমাইজড CRISPR চিকিৎসা তৈরি করলেন।
এবং সেটি কাজ করল।
সেই মুহূর্তটি ছিল মানব ইতিহাসের একটি বাঁকবদলের মুহূর্ত।
কিন্তু প্রশ্নটা তখনই উঠেছিল — এটা কি শুধু একটি শিশুর গল্পই থাকবে, নাকি হাজার হাজার শিশুর কাছে পৌঁছাবে?
২১ এপ্রিল ২০২৬-এ Nature-এ প্রকাশিত একটি গুরুত্বপূর্ণ Comment আর্টিকেলে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজলেন দুজন বিজ্ঞানী — Fyodor D. Urnov এবং Sadik H. Kassim, যারা নিজেরাই CRISPR-on-demand চিকিৎসার উপর বছরের পর বছর কাজ করছেন।
মূল গবেষণা: Urnov FD & Kassim SH. "Personalized CRISPR therapies could soon reach thousands — here's how." Nature 652, 857–859 (2026). DOI: 10.1038/d41586-026-01243-y
---
বিশ্বে প্রায় ৩৫ কোটি মানুষ ৫,০০০-এরও বেশি ধরনের জিনগত রোগে ভুগছেন। এর অনেকগুলো রোগই এক একটি শিশুর DNA-তে এক একটি অনন্য মিউটেশনের কারণে হয়। তাত্ত্বিকভাবে CRISPR দিয়ে এই মিউটেশনগুলো সংশোধন করা সম্ভব — কিন্তু বাস্তবে সেটা করা এখন পর্যন্ত প্রায় অসম্ভব ছিল।
কারণটা হলো নিয়ন্ত্রক জটিলতা আর অর্থনৈতিক বাস্তবতা।
CRISPR-কে সঠিক মিউটেশন খুঁজে সারাতে হয় একটি ছোট্ট guide RNA দিয়ে — যা প্রতিটি রোগীর জন্য আলাদা হতে পারে। বর্তমান নিয়মে প্রতিটি guide RNA একটি নতুন ওষুধ হিসেবে গণ্য হয়, অর্থাৎ প্রতিটির জন্য আলাদা ক্লিনিকাল ট্রায়াল দরকার।
লেখকরা নিজেরাই কাজ করতে গিয়ে দেখেছেন যে একটি কাস্টমাইজড থেরাপির FDA অনুমোদন পেতে সাধারণত চার বছর সময় লাগে। আর প্রথম ক্লিনিকাল ট্রায়াল শুরু করতে সাধারণত ২৫ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি খরচ হয়।
একটি শিশুর জন্য ২৫ মিলিয়ন ডলার। যে শিশু হয়তো জন্মের প্রথম বছরেই মারা যাবে।
কোনো ওষুধ কোম্পানিই এই অঙ্ক করে না। কারণ এটা ব্যবসায়িকভাবে টেকসই নয়।
---
কিন্তু ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন FDA একটি ঐতিহাসিক পরিবর্তনের প্রস্তাব করল। এর নাম "Plausible Mechanism Pathway।"
এই নতুন পথে ওষুধ কোম্পানিগুলো একই ক্লিনিকাল ট্রায়ালে বিভিন্ন মিউটেশনের অনেক রোগীকে একসাথে অন্তর্ভুক্ত করতে পারবে — যদি তাদের রোগের ক্লিনিকাল উপসর্গ একরকম হয়, যেমন একই ধরনের বিপাকীয় পথ বা ইমিউন সিস্টেমের সমস্যা।
সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটা হলো — শুধু ট্রায়ালের প্রথম CRISPR থেরাপিটির জন্য পুরো পরীক্ষার প্যানেল দরকার হবে। পরবর্তী থেরাপিগুলো যদি প্রথমটি থেকে সামান্য আলাদা হয়, তাহলে শুধু কয়েকটি সহজ পরীক্ষাই যথেষ্ট। এবং যদি প্রথম কয়েকটি কাজ করে, FDA সেই ধরনের CRISPR থেরাপিকে "on-demand" হিসেবে অনুমোদন দিতে পারবে — মানে ডাক্তাররা সরাসরি তাদের রোগীদের প্রেসক্রিপশন দিতে পারবেন।
ফলাফল কী হবে? লেখকরা হিসাব করে দেখিয়েছেন যে ক্লিনিকে CRISPR থেরাপি পৌঁছানোর সময় চার বছর থেকে কমে মাত্র তিন মাসে নামতে পারে। আর খরচ ২৫ মিলিয়ন ডলার থেকে কমে রোগীপ্রতি ২৫০,০০০ ডলারের নিচে আসতে পারে।
---
কিন্তু FDA-র পথ খোলা মানেই সব সমাধান নয়। লেখকরা চারটি বড় কাজের কথা বলেছেন যেগুলো না হলে এই সুযোগ কাজে লাগবে না।
প্রথমত, FDA-কে নিজেকে পরিবর্তন করতে হবে। CRISPR-on-demand থেরাপির আবেদনের স্রোত সামলাতে একটি দ্রুত-পর্যালোচনা দল দরকার, যেখানে জিনগত থেরাপি, উৎপাদন ও ক্লিনিকাল ট্রায়াল ডিজাইনে বিশেষজ্ঞরা থাকবেন। এবং রোগীদের পরিবার ও অ্যাডভোকেসি গ্রুপের সাথে সম্পর্ক আরো মজবুত করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, ডেটা শেয়ার করতে হবে। এখন আইন অনুযায়ী বিভিন্ন কোম্পানির জিনগত ওষুধের ডেটা গোপন রাখতে হয়। লেখকরা বলছেন এটা বড় কর্পোরেট প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে মানে রাখে, কিন্তু অনন্য মিউটেশনের রোগী ট্রিট করার ক্ষেত্রে এটা অর্থহীন। একটি সরকার-অর্থায়িত মার্কিন প্রচেষ্টায় ইতিমধ্যে গবেষকরা তাদের CRISPR ওষুধ তৈরির কাজের কাগজপত্র প্রকাশ করছেন এবং সাধারণত গোপন থাকা নথি FDA-র সাথে শেয়ার করছেন। এটাই নিয়ম হওয়া উচিত।
তৃতীয়ত, শুধু ড্রাগ অনুমোদন যথেষ্ট নয়। কোম্পানিগুলো ওষুধ তৈরি করবে না যদি কে তার খরচ দেবে সেটা স্পষ্ট না হয়। FDA-কে CMS-এর সাথে এখনই কাজ করতে হবে — অনুমোদনের পরে নয় — যাতে কোন রোগীরা এই চিকিৎসা পাবেন সেটা আগেই নির্ধারিত থাকে। অনুমোদন আর ক্ষতিপূরণের মধ্যে ফাঁক বারবার রোগীদের আটকে রেখেছে।
চতুর্থত, এই সুযোগ বৈশ্বিক হতে হবে। অনেক দেশে CRISPR প্ল্যাটফর্ম তৈরির সক্ষমতা বা নিয়ন্ত্রক দক্ষতা নেই। লেখকরা "মিনি-ফ্যাক্টরি" ধারণার কথা বলছেন — একটি ল্যাবরেটরিতে একটি কাস্টম থেরাপির সম্পূর্ণ উৎপাদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা, যা মুষ্টিমেয় এলিট একাডেমিক কেন্দ্র নয়, যেকোনো প্রশিক্ষিত হাসপাতালে ব্যবহার করা যাবে। এর সুফল প্রথমে পাবে মধ্যপ্রাচ্য, লাতিন আমেরিকা এবং এশিয়ার কিছু অংশ — যেখানে নবজাতক স্ক্রিনিং কার্যক্রম আছে।
---
এখানে একটা বিষয় বোঝা দরকার যা লেখকরা খুব সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন। CRISPR-এর অনুমোদনের পুরো প্রচলিত পদ্ধতিটা একটি ধারণার উপর দাঁড়িয়ে আছে — একটি নির্দিষ্ট ওষুধ নিরাপদ এবং কার্যকর প্রমাণ করতে হবে। কিন্তু যখন প্রতিটি রোগীর জন্য ওষুধটা আলাদা, তখন সেই ধারণাটাই আর কাজ করে না। এই বাস্তবতা থেকেই আসছে পরবর্তী বড় পরিবর্তনের ধারণা — ওষুধের জন্য অনুমোদন নয়, প্ল্যাটফর্মের জন্য অনুমোদন।
FDA ইতিমধ্যে ২০২৪ সালে Platform Technology Designation Program চালু করেছে। ইনফ্লুয়েঞ্জার নতুন স্ট্রেইনের বিরুদ্ধে দ্রুত ভ্যাকসিন তৈরিতে এই পদ্ধতি ইতিমধ্যে অনানুষ্ঠানিকভাবে ব্যবহার হচ্ছে। এখন সেটা CRISPR-এ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রয়োগ করার সময় এসেছে।
[CRISPR-Based Gene Therapies: From Preclinical to Clinical Treatments](https://consensus.app/papers/details/f1fb0c0165175602b9d8eb934fe25bca/?utm_source=claude_desktop) শীর্ষক একটি ২০২৪ সালের রিভিউ পেপারে দেখা গেছে যে CRISPR ক্লিনিকাল ট্রায়ালগুলো হিমোগ্লোবিনোপ্যাথি সহ বিভিন্ন রক্তের রোগে ইতিমধ্যে উৎসাহজনক ফলাফল দিচ্ছে, কিন্তু বিতরণ ব্যবস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। নতুন FDA পথ এই চ্যালেঞ্জগুলোর কিছু কার্যত সমাধান করতে পারে।
---
বাংলাদেশে প্রতি বছর হাজার হাজার শিশু জন্ম নেয় থ্যালাসেমিয়া, Primary Immunodeficiency, বিরল বিপাকীয় রোগ সহ বিভিন্ন জিনগত অসুখ নিয়ে। এর বেশিরভাগ রোগীই কোনোদিন সঠিক চিকিৎসা পায় না — কারণ চিকিৎসাই নেই, অথবা যা আছে তার দাম নাগালের বাইরে।
লেখকরা বলছেন মিনি-ফ্যাক্টরির সুবিধা প্রথমে পাবে যেসব দেশে নবজাতক স্ক্রিনিং কার্যক্রম আছে। বাংলাদেশে সেই কার্যক্রম এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে নেই। কিন্তু এই প্রযুক্তির উন্নতি এতটাই দ্রুত হচ্ছে যে প্রস্তুতি না থাকলে আমরা আরেকটি চিকিৎসা বিপ্লব পেছন থেকে দেখব।
আমাদের নীতিনির্ধারক, বিজ্ঞানী ও চিকিৎসকদের এখনই এই আলোচনায় যুক্ত হওয়ার সময়।
---
লেখকরা তাদের নিবন্ধ শেষ করেছেন একটি সাহসী বাক্যে — "জিন এডিটিংকে ক্লিনিকাল কেয়ারের মানদণ্ড করা সম্ভব, যদি নিয়ন্ত্রক, উৎপাদনকারী, বিজ্ঞানী, চিকিৎসক এবং যারা চিকিৎসার অর্থ দেয় তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হন। আমাদের কাছে বিজ্ঞান আছে, প্রযুক্তি আছে, চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা আছে — এবং এখন নিয়ন্ত্রক গতিও আছে।"
KJ Muldoon একা নয়। লক্ষ লক্ষ শিশু অপেক্ষা করছে।
তথ্যসূত্র: Urnov FD & Kassim SH. Nature 652, 857–859 (2026). DOI: 10.1038/d41586-026-01243-y; Laurent M et al. Cells. 2024; Cetin B et al. Expert Rev Mol Med. 2025; Musunuru K et al. N Engl J Med. 392, 2235–2243 (2025); Urnov F et al. Cytotherapy 27, 1151–1163 (2025)
এই পোস্টটি বৈজ্ঞানিক সচেতনতার উদ্দেশ্যে।
#জিনথেরাপি #বিরলরোগ #বাংলাদেশ #থ্যালাসেমিয়া #জিনবিজ্ঞান