কেরানীগঞ্জের ইতিহাস
কররানীরা আফগান ও পাঠান জাতির একটি উন্নত শাখা শেরশাহ ও তার ছেলে ইসলাম শাহ আফগানিস্তানে কিরান এলাকা থেকে এসে একটি পৃথক বংশের সূচনা করেন। তাজ খান কররানীই সর্বপ্রথম এই বংশকে বাংলার ইতিহাসে সুপরিচিত করেন। তাজ খানের মৃত্যুর পর ভাই সলেমান কররানী বাংলার সিংহাসনে আরোহন করেন। (১৫৬৫-১৫৭২ খ্রীঃ)। তার মৃত্যুও পর বায়েজীদ কররানী এবং তাকে হত্যা করে দাউদ খান কররানী। (১৫৭২ খ্রীঃ) বাংলার কররান
ী শাসক গোষ্ঠির শেষ স্বাধীন বাদশাহ রাজত্ব করেন।
এদিকে ক্রমশঃ রাজ্য বিস্তারের অভিযানে পাটনা বিজয়ের পর বাদশা আকবর তার বিশ্বস্ত সেনাপতি মুনীম খানকে বাংলা জয় করার নির্দেশ দেন। মুনীম খান তার অভিযান পরিচালনায় বর্তমান দিনাজপুর ও দক্ষিনে বাকেরগঞ্জ হয়ে ঢাকার সোনার গায়ে প্রবেশ করেন। সর্বত্রই আফগানরা মুগলবাহিনীর প্রতিরোধে ব্যর্থ হয়ে বুড়িগঙ্গা পার হয়ে দক্ষিন তীরে পশ্চাদপসরন করে।
কররানীদের এ স্থানে কিছু কাল অবস্থানই সম্ভবতঃ কেরানীগঞ্জ নামের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট। ’’ কথাটি হওয়া উচিত ছিল কররানগঞ্জ। কিন্তু ইষ্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানীর আমলে এক বিশেষ সম্প্রদায়ের মুসলিম নাম পরিবর্তন করে কিম্বা নামের বিকৃত রূপ দিয়ে লিখা বা উচ্চারন করা একটি মতলবী ফ্যাশন ছিল, যার ফলে কেরানীগঞ্জের নাম প্রচারিত হতে থাকে।
১৬৬.৮৭ বর্গ কিলোমিটার জুড়ে ১২ ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত হয়েছে কেরনীগঞ্জ উপজেলা। আগে থানা প্রশাসনের অফিস ছিল ঢাকার এস. ডি. ও অফিসের নিকট ছোট্ট একটি কক্ষে। তারপর থানা প্রশাসনের অফিস চলে আসে জিনজিরায় চেয়ারম্যান আলীমুদ্দিন সাহেবের বাড়ীর ভাড়া করা একটি কামরায়। সেখান থেকে কেরানীগঞ্জ থানা প্রশাসনের কর্মকান্ড পরিচালিত হতো।
কেরানীগঞ্জ থানা থেকে উপজেলায় রূপ নেয় ১৯৮৩ সনে, প্রেসিডেন্ট এরশাদের আমলে। উপজেলার প্রথম চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন জিনজিরার ব্যবসায়ী হাজী নাছির উদ্দিন। প্রথম উপজেলা নির্বাহী অফিসার হয়ে আসেন জনাব ফরহাদুর রহমান।
কেরানীগঞ্জ বাংলাদেশের ঢাকা জেলার একটি প্রশাসনিক এলাকা। কেরানীগঞ্জের সাবেক আয়তন বর্তমান কেরানীগঞ্জ থেকে শুরু করে ঢাকা মহানগর সহ গাজীপুরের একাংশ- এই বৃহত্তর এলাকাটি কেরানীগঞ্জ থানার অন্তর্ভুক্ত ছিলো।
কেরানীগঞ্জ দ্বীপাকার বলে মোঘল আমলের এক পর্যায়ে এই স্থানের নাম হয় পারজোয়ার। কেরানীগঞ্জের উত্তর ও পূর্ব সীমান্তে রয়েছে বুড়িগঙ্গা, পশ্চিম- দক্ষিণ সীমান্তে রয়েছে ধলেশ্বরী । মোঘল আমলে ধলেশ্বরী নদীর নাম ছিল ঢল সওয়ার। জোয়ার শব্দের অর্থ অঞ্চল এবং পার শব্দের অর্থ তট। সম্ভবত এই জন্যই মোঘল আমলে এই এলাকার নাম রাখা হয়েছিল পারজোয়ার যা আজও কেরানীগঞ্জের ছোট একটি এলাকার নাম হিসেবে বিদ্যমান।
ঐতিহাসিকভাবে, ১৭৫৭ সালে শাসক পরিবর্তনের পর নবাব সিরাজউদ্দৌলার স্ত্রী এবং তার এক খালা কেরানীগঞ্জের জিঞ্জিরাতে কারাবন্দী ছিলেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় কৌশলগতভাবে বিশেষত গেরিলা যুদ্ধের ক্ষেত্রে কেরানীগঞ্জ এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ঢাকা শহরে পরিচালিত অধিকাংশ গেরিলা যুদ্ধ পরিকল্পনা ও পরিচালনা করা হয় কেরানীগঞ্জ থেকে এবং এজন্য অনেক মূল্যও দিতে হয়েছে।