19/03/2026
২৬ বছর আগে আটকে আছে বিএনপি
শিক্ষামন্ত্রীর বয়স বাড়েনি
সারা দুনিয়া এখন আনন্দময় শিক্ষার দিকে ঝুঁকছে। বিশ্বের কোথাও এখন আর প্রাথমিকে ভর্তির জন্য শিশুদের পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয় না। যে যেখানে বসবাস করে, সেই এলাকার (ক্যাচমেন্ট এরিয়া) পরিচয় দিয়েই তার স্কুলে ভর্তি নিশ্চিত হয়। আর বাংলাদেশে? আমাদের শিক্ষামন্ত্রী যেন ২৬ বছর আগের অতীতেই আটকে গেছেন। তিনি যেন জেদ ধরেছেন, তাঁর বয়স আর বাড়বে না, চিন্তার কোনো বিকাশ হবে না।
অবস্থা দেখে নোবেলজয়ী জার্মান সাহিত্যিক গুন্টার গ্রাসের বিখ্যাত উপন্যাস 'দ্য টিন ড্রাম'-এর মূল চরিত্র অস্কার মাতজেরাতের কথা মনে পড়ে যায়। তিন বছর বয়সে অস্কার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সে আর শারীরিকভাবে বড় হবে না। প্রাপ্তবয়স্কদের জগতের ভণ্ডামি, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা, ফ্যাসিবাদ এবং শ্রেণি বৈষম্যের বিরুদ্ধে সেটি ছিল তার এক অদ্ভুত কিন্তু জোরালো প্রতিবাদ। তবে অস্কারের বড় না হতে চাওয়া এবং আমাদের শিক্ষামন্ত্রী মিলনের 'বড় না হওয়া'র মধ্যে বিস্তর ফারাক রয়েছে। অস্কারের থেমে যাওয়াটা ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক শৈল্পিক প্রতিবাদ, আর শিক্ষামন্ত্রীর এই আটকে থাকাটা স্রেফ অজ্ঞতা।
শুধু মন্ত্রী নন, মনে হচ্ছে খোদ বিএনপিও আর এগোতে চায় না। তারা সেই ২৬ বছর আগের পুরনো উন্নয়ন তত্ত্ব দিয়েই আজকের আধুনিক দুনিয়া মাপতে চাইছে। ঠিক এই পশ্চাৎপদ চিন্তাধারার কারণেই ববি হাজ্জাজকে উচ্চশিক্ষা থেকে সরিয়ে কেবল প্রাথমিক শিক্ষায় প্রতিমন্ত্রী করা হয়েছে। আর প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতার চূড়ান্ত উদাহরণ হিসেবে তাঁর ঘাড়ের ওপর আবার খোদ প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাকেও বসিয়ে দেওয়া হয়েছে।
২০১১ শিশু আইন ও আইনি ব্যত্যয়
বাংলাদেশে ২০১১ সালে প্রণীত শিশু নীতি এবং শিশু আইন অনুযায়ী, শিশুদের ওপর কোনো প্রকার শারীরিক বা মানসিক চাপ সৃষ্টি করা দণ্ডনীয়। ৫-৬ বছর বয়সী একটি শিশুকে ভর্তি পরীক্ষায় বসানো তার ওপর প্রচণ্ড মানসিক চাপ সৃষ্টি করে, যা স্পষ্টভাবে এই আইনের পরিপন্থী। ২০১১ সাল থেকে যে লটারি পদ্ধতি চালু হয়েছিল, তার মূল ভিত্তিই ছিল—শিক্ষা সবার অধিকার, কোনো নির্দিষ্ট মেধাবী গোষ্ঠীর সুযোগ নয়। ভর্তি পরীক্ষা পুনরায় চালু করা মানে সেই আইনি সুরক্ষার দেয়াল ভেঙে দেওয়া।
আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারের বিচ্যুতি
বাংলাদেশ ১৯৯০ সালে
জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদে স্বাক্ষর ও অনুসমর্থন করেছে। এই সনদের আর্টিকেল ২৮ অনুযায়ী, প্রাথমিক শিক্ষা হবে সবার জন্য বাধ্যতামূলক এবং বিনামূল্যে। একইসাথে আর্টিকেল ৩ বলে, যেকোনো সিদ্ধান্তে ‘শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ’ (Best interest of the child) সবার আগে দেখতে হবে। ৫ বছরের শিশুর পরীক্ষা নেওয়া কোনোভাবেই তার স্বার্থ রক্ষা করে না। সই করা দেশ হিসেবে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক এই অঙ্গীকার থেকে পিছু হটতে পারে না।
জাতিসংঘ ও বৈশ্বিক
সংস্থাগুলোর কঠোর বিরোধিতা
ইউনেস্কো এবং ইউনিসেফ ছোট শিশুদের জন্য প্রথাগত ভর্তি পরীক্ষার তীব্র বিরোধিতা করে। তাদের মতে, ৫ বছর বয়সে একটি শিশুর মেধা নির্ণয়ের কোনো সঠিক বৈশ্বিক মাপকাঠি নেই। এই অবৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন ও পরীক্ষা পদ্ধতি শৈশবেই শিশুর মধ্যে পড়াশোনার প্রতি অনীহা ও ভয় সৃষ্টি করে। শিক্ষা কোনো দয়া নয় যে এটি অর্জন করতে পরীক্ষা দিতে হবে; এটি রাষ্ট্রের বাধ্যবাধকতা।
ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য ও বিভাজন
ভর্তি পরীক্ষা সামাজিকভাবে একটি বড় বৈষম্য তৈরি করে। উদাহরণস্বরূপ, একটি সচ্ছল পরিবারের শিশু ৩ বছর বয়স থেকে নামী কোচিং সেন্টারে ভর্তি হতে পারে বা ঘরে প্রাইভেট টিউটর রাখতে পারে। কিন্তু একজন রিকশাচালক বা নিম্নবিত্ত মানুষের সন্তানের সেই সুযোগ নেই। ফলে ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে কেবল সচ্ছল পরিবারের শিশুরা ভালো স্কুলগুলো দখল করে নেবে, আর দরিদ্ররা ছিটকে পড়বে। এটি শিক্ষার মাধ্যমে একটি ‘এলিট শ্রেণি’ তৈরি করার সামন্ততান্ত্রিক মানসিকতা।
আফ্রিকাতেও নেই এই নিয়ম
ইউরোপ, আমেরিকা, কানাডা বা অস্ট্রেলিয়ার মতো উন্নত বিশ্বে সরকারি প্রাথমিক স্কুলে ভর্তির কোনো পরীক্ষাই নেই। এমনকি আফ্রিকার অনেক উন্নয়নশীল দেশেও (যেমন রুয়ান্ডা বা ইথিওপিয়া) সরকারি স্কুলে সরাসরি ভর্তির নিয়ম। এমনকি মন্ত্রীর নিজের পরিবার যেখানে বসবাস করে, সেই আমেরিকাতেও ক্যাচমেন্ট এরিয়া অনুযায়ী ভর্তি হয়। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের ‘Right to Education Act’ অনুযায়ী ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া আইনত দণ্ডনীয়। যখন পুরো পৃথিবী শিশুদের জন্য ‘পরীক্ষাহীন শৈশব’ নিশ্চিত করছে, তখন বাংলাদেশে এই নিয়ম ফিরিয়ে আনা মধ্যযুগীয় চিন্তারই বহিঃপ্রকাশ।
নীতিনির্ধারকদের ভিশন ও
অ্যাকাডেমিক সক্ষমতার সংকট
বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী আনম এহসানুল হক মিলন ২০০১ ’ সালে নকল প্রতিরোধে ভূমিকা রেখে জনশ্রুতি পেলেও, ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে তাঁর প্রতিটি সিদ্ধান্ত মনে হয় নব্বই দশকেই আটকে আছে। এআই’র যুগে চোথা নকল দূর করাকে সফলতার সর্বোচ্চ মান মনে করা আসলে যুগের অবাস্তব এক ধারণা। নিজের সন্তানদের আমেরিকায় রেখে সেখানকার আধুনিক ব্যবস্থায় বড় করে, দেশের সাধারণ শিশুদের তিনি ৩০ বছর পেছনের সেই অন্ধকার যুগে ফিরিয়ে নিতে চান। গবেষণার দিক থেকে তাঁর সক্ষমতা মূলত কারিগরি শিক্ষার প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ, যার সাথে শিশু মনস্তত্ত্ব বা প্রাথমিক শিক্ষার কোনো সম্পর্ক নেই। সার্চ কমিটি গঠন করে নাটকীয় সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে দলীয় কর্মী ভিসি নিয়োগ দেওয়া কিংবা বিশদ পরিকল্পনা ছাড়াই চটজলদি পপুলিজম ক্যাশ করতে প্রাথমিকে ভর্তি যুদ্ধের ঘোষণা—প্রমাণ করে তিনি আসলে ফেসবুকের বাবলে বাস করা একজন প্রাচীন মানুষ।
বিএনপির রূপকল্পহীন
রাজনীতি ও সমন্বয়হীনতা
দেশের কোটি কোটি শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নিয়ে বিএনপির সুচিন্তিত কোনো পরিকল্পনা নেই যা ১০, ২০ বা ৩০ বছর মেয়াদী। তাদের আমলে শিক্ষার মান উন্নয়নের চেয়ে ‘যারেতারে ভিসি’ বানানো বা দলীয়করণেই ছিল সব মনোযোগ। নতুন প্রজন্মের মেধাবীদের বেছে নিতেও তারা ব্যর্থ হয়েছে। ববি হাজ্জাজের মতো অক্সফোর্ডে পড়া এবং উচ্চশিক্ষার সাথে দীর্ঘ এক যুগ সম্পৃক্ত ব্যক্তিকে উচ্চশিক্ষা থেকে সরিয়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষায় দেওয়ার মাধ্যমে তাঁর পোর্টফোলিও সীমিত করা হয়েছে। এতে
বর্তমান মন্ত্রিসভায় উচ্চশিক্ষার বুঝাপড়া সম্পন্ন ব্যক্তিদের প্রাথমিকে এনে এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আলাদা উপদেষ্টাদের মাধ্যমে সিদ্ধান্তের ‘নানা পকেট’ বানিয়ে মন্ত্রণালয়ে এক ধরনের নিয়ন্ত্রীত বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে।
উন্নয়ন প্রকল্প বন্ধ বনাম
আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত
অনেকে ভাবছেন ৫ আগস্ট আসলে ফ্যাসিবাদ মুক্ত করে বিশাল একটা বিপ্লবের সূচনা তারা করেছেন। জনগনের আত্মত্যাগ ও বীরত্ব দেখলে এই অভ্যুত্থানের অনেকবড় ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে। কিন্তু জনগনের আত্মত্যাগ ও অভিপ্রায় উপজীব্য করে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ আসলে এই অভ্যুত্থান দখল করেছে। এর ফলে যা কিছু বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজন ছিল তার সবকিছুইর বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় ডক্টর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার। বলা যেতে পারে ফ্যাসিবাদ তাড়ানোর নাম করে দেশটির চৌদ্দটা বাজিয়ে দিয়ে গেছে। বিএনপির উচিত ছিলো, সরকার গঠনের প্রথম দিনেই একটি কমিশন গঠন করে লীগ সরকারের সময় নেয়া প্রকল্পগুলোর স্বল্প ও দীর্ঘ মেয়াদী প্রভাব মূল্যায়ন করা। এসব প্রকল্পের ভেতর যেগুলো প্রয়োজন, সেগুলোকে চালু করা বাকিগুলো পরিস্থিতি অনুযায়ী বন্ধ রাখা।
বিএনপি সেটা করেনি। সেও ডক্টর মুহাম্মদ ইউনূসের রেখে যাওয়া ধংসের ওপর করতোল বাজাচ্ছে। এরকম একটি প্রকল্পের কথা বলি।
মাদারীপুরের শিবচরে ১০০ একর জমির ওপর বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় প্রায় ১,৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে 'শেখ হাসিনা ইনস্টিটিউট অব ফ্রন্টিয়ার টেকনোলজি' প্রকল্পটি নেয়া হয়।
এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি নির্মাণ হলে প্রযুক্তি শিক্ষার চিত্র বদলে যেতো বাংলাদেশে। এখানে এআই, রোবোটিক্স, বিগ ডেটা ও ব্লকচেইনের ওপর বিশেষায়িত স্কুলিং ও গবেষণার ব্যবস্থা ছিল। এটি চালু হলে ১০-২০ বছর মেয়াদে বাংলাদেশের তরুণরা বিশ্ববাজারে প্রযুক্তিগত নেতৃত্বে বড় জায়গা করে নিতে পারতো। ইন্টেরিম সরকার প্রকল্পটি বন্ধ করে দিয়েছে।
বন্ধ করেছে কারণ, বাংলাদেশকে পরনির্ভরশীল করতে চায়। এরকম আরও অনেক ঘটনার নাম নিতে পারবো, যেগুলো বন্ধ করে দিয়েছে, যে প্রকল্পগুলোর প্রায় সব কাজ শেষ। এর মধ্যে কিছু প্রকল্পর কাজ বন্ধ করে দিয়ে সেসব আবার জুলাই আন্দোলনে ক্ষতিগ্রস্তদের কল্যান তহবিলে টাকা নেয়া হয়েছে। এটা রিতিমত পাগলামি।
জাতিসংঘ ও দাতা সংস্থাগুলো বছরে প্রায় ৫ থেকে ৭ হাজার কোটি টাকার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহায়তা দেয় বাংলাদেশের শিক্ষা খাতে। প্রাথমিকে এই অবৈজ্ঞানিক ভর্তি পরীক্ষা চালু করলে এই বড় অংকের বিদেশি সাহায্য এবং বৈশ্বিক ভাবমূর্তি—উভয়ই হুমকির মুখে পড়বে। একদিকে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার পথ রুদ্ধ করা, অন্যদিকে দুনিয়ার কোথাও নেই এমন এক বৈষম্যমূলক ‘ভর্তি পরীক্ষা’ ফিরিয়ে আনা মূলত শিক্ষাকে অন্ধকার যুগে ঠেলে দেওয়ারই লক্ষণ। শিশুদের সুন্দর শৈশব নিশ্চিত করতে এই পশ্চাৎপদ পদ্ধতি বাতিলের কোনো বিকল্প নেই।
ফটোকার্ড : Dhaka Report