25/04/2020
The_Haunter_Of_The_Dark
পর্ব-২
মায়ের কথা শুনে আমি স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলাম কিছুক্ষণ । একটু পর আমিই বলে উঠলাম, “গালে মশা বসেছিল, বেশি জোরে চড় মেরে ফেলি যার কারণে গাল লাল হয়ে আছে । মা আর কিছু বললেন না, নিজের কাজে মন দিলেন । আমি বাথরুমে গিয়ে আয়নাতে নিজের গাল দেখে নিলাম । গালে পাঁচ আঙ্গুলের ছাপ বসে আছে । এবার আর কোনো দ্বিধা রইল না । আমি এখন নিশ্চিত আমি কোনো স্বপ্ন দেখছি না । আমি ঘুমালে অন্য কোনো সময়ে চলে যাই। কিন্তু কেন? আর এসব ঘটার মানে কি? কোনো বিপদের সংকেত নয় তো? মাথার ভিতর হাজার প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে ।কোনটির উত্তর নেই আমার কাছে । গালে হাত দিতেই ব্যথায় আঁতকে উঠলাম । গালটা অনেক জ্বলছে । একটু পানি মেরে বাথরুম থেকে বের হয়ে নিজের রুমে চলে গেলাম ।
রাতে
খাবার শেষ করে নিজ রুমে এসে বসলাম মাত্র । ঘুমাবো কিনা ভাবছি । ভেবে একটা জিনিস পেলাম যে আমি তো আজীবন না ঘুমিয়ে থাকতে পারব না । আজ নয় তো কাল ঘুমাতেই হবে । তাহলে আজই ঘুমাবো । দেখা যাক আজ রাতে কি দেখি । এসব দেখার কারণ হয়ত এক জানতে পারব। ঘুমিয়ে পড়লাম ।
চোখ মেলে দেখি আমি বন্দি শালার এক কোণে বসে আছি । সামনে তাকিয়ে দেখি বন্দিগণ পালিয়ে যাচ্ছে । জেল খানার দরজারটা সবাই মিলে ভেঙ্গে ফেলেছে । একটু পর কিছু সংখ্যক প্রহরী এসে তাদের বাঁধা দিতে লাগল । দুই দলের মাঝে মারামারি শুরু হয়ে গেল। এই সুযোগ জেল থেকে আমি পালিয়ে গেলাম । জেল থেকে বের হতেই তিনজন প্রহরীর সম্মুখিন হলাম। লম্বায় তারা আট ফুট । আর আমি পাঁচ ফুট সাত ইঞ্চি । তারা দৌড়ে এগিয়ে আসতে লাগল আমার দিকে । আমিও পালানোর জন্যে বিপরীত দিকে দৌড় দিলাম। দৌড়াতে দৌড়াতে এক সময় দেয়ালের সামনে এসে ঠেকলাম । এখন কি করব আমি? এদিক ওদিক তাকিয়ে কোনো পথ দেখলাম না । নিচের দিকে তাকিয়ে দেখলাম বড় সড় একটা পাইপ জাতীয় কিছু । সেটার ভিতর প্রবেশ করলাম । ভিতরে বিচ্ছিরি গন্ধ । একটু পর সামনে আলো দেখলাম । পাইপ থেকে বের হতেই ধপ করে নিচে পড়ে গেলাম । উঠে আশে পাশে তাকিয়ে দেখি ময়লা পানি সব । চারিদিকে নানান পাইপের খোলা মুখ । সব পানি এসে এখানে জমছে । সেই সব পানি বড় মুখের একটা পাইপের ভিতর দিয়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছে । বড় পাইটা অনুসরণ করে এগুতে লাগলাম । ময়লা পানির গন্ধে বমি পাচ্ছে । এগুতে এগুতে এক সময় পাইপ থেকে বের হয়ে গেলাম । সূর্যের আলো মুখে পড়ছে । আশে পাশে তাকিয়ে দেখি এখানে সব ময়লা পানি । শহরের সব ময়লা পানি এখানেই ফেলা হয় । পানি থেকে উঠে এলাম । শরীর থেকে দুর্গন্ধ বের হচ্ছে । একটু দূর যেতেই আচমকা মাটি কাঁপা শুরু করল । আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখি পুরো আকাশ মেঘাচ্ছন্ন । মুষুলধারে বৃষ্টি শুরু হলো । শরীর থেকে সব ময়লা পানি ধুয়ে চলে গেল । অনেক দূর হাঁটলাম । প্রায় দুই ঘন্টা হাঁটার পর একটা পরিপূর্ণ পিরামিড দেখলাম । বিশালাকার পিরামিডের প্রবেশ পথটা খোলা । কোনো প্রহরীও নেই । পিরামিডের ভেতরটা দেখার প্রবল আগ্রহ জন্মাল । পিরামিডের ভেতরে প্রবেশ করলাম । পিরামিডের দেয়ালে মশাল দেখতে পেলাম । মশালগুলো পুরো পিরামিডকে আলোকিত করে রেখেছে । মশালগুলো দেখে বুঝা যাচ্ছে যেন একটু আগেই ধরানো হয়েছে ।তাহলে কি ভিতরে কেউ আছে? ফিরে যাব নাকি বাহিরে? বাহিরের দিকে পা বাড়াতেই প্রহরীদের কথোপকথন শুনতে পেলাম । ভাষাটা বুঝতে পারি নি । তবে মনে হলো যেন তারা পিরামিডটা দেখে অসম্ভব ভয় পেয়েছে । দুই মিনিট হবে পিরামিডের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল তারা । তারপর এক রকম দৌড়েই পালিয়ে গেল তারা ।
পিরামিডের একটু ভেতরে ঢুকলাম আমি । আয়তাকার পাথরের দেয়াল বিশিষ্ট একটা কক্ষ । কক্ষের সামনের তিন দিকে, তিনটে পথ গেছে । একটা পথের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম । ঠিক তখনই আবার মাটি কাঁপতে লাগল । আমার কাছে মনে হলো আমি যেন মাটির নিচে চলে যাচ্ছি । কিন্তু তাকিয়ে দেখলাম আমি পিরামিডের ভিতরে, একই স্থানে । মনের ভুল না তো?
পিছনের দিকে তাকাতেই প্রবেশ পথে চোখ পড়ল । বাহিরের মরুর বালি আকাশে উঠছে । যেন হঠাৎ মরুর বুক ফুলে উঠেছে । আচমকা একটা অজানা ভয় সারা দেহে ছড়িয়ে গেল । একটু পর আন্দাজ করলাম পিরামিডটা কি মরুর তলে চলে যাচ্ছে নাকি । দৌড়ে গেলাম প্রবেশ পথের দিকে । ব্যর্থ হলাম বের হতে । অনেক আগেই মরুর বালির নিচে চাপা পড়ে গেছে পিরামিডটা । প্রবেশ পথে এখন বালি আর বালি । বালিগুলো ধীরে ধীরে পিরামিডের ভেতর আসছে । বাঁচতে হলে ভেতরের দিকে যেতে হবে । নইলে মরুর বালির নিচে পিরামিডের মতো আমিও চাপা পড়ে যাব । আবার ভেতরে গেলাম, সামনে তিনটে পথ । দ্রুত ডান পাশের পথটায় প্রবেশ করলাম । একটু এগুতেই একটা কক্ষে এসে পৌঁছালাম । সামনে চারটে বাক্স । বাক্সগুলো বড় বড় । কাছে গিয়ে বাক্সগুলো দেখে বুঝতে পারলাম, এই বাক্সগুলোর ভিতর হয়ত কাউকে মমি করে রাখা হয়েছে । একবার সখ জগলো মমি দেখার, কিন্তু পরোক্ষণে সখটা চলে গেল । কিছু অজানা কন্ঠস্বর পাচ্ছি । কিন্তু কক্ষে শব্দের উৎপত্তি খুঁজে পেলাম না । শুনেছিলাম পিরামিডে গুপ্ত চেম্বার থাকে । যেখানে নানান মূল্যবান রত্ন থাকে । তাহলে কি শব্দটা সেই গুপ্ত কক্ষ থেকে আসছে?
একটু পর মনে হলো মমির বাক্স থেকে আসছে না তো? সারা শরীরের লোম দাঁড়িয়ে গেল । পালানোর কোনো উপায় নেই, না জানি মাটির ক'শত ফুট গভীরে আছি । আমাকে পিরামিড থেকে বের হতে হবে । আবার শব্দ পেলাম । একটা বয়স্ক লোকের কণ্ঠ মনে হলো । মমির বাক্সের পাশেই ছিলাম, কিন্তু সেখান থেকে কোনো শব্দ আসে নি । মনে হলো বাম পাশের দেয়ালটা থেকে এসেছে । মুহূর্তের মধ্যেই ভয়টা কেটে গেল । এগিয়ে গেলাম দেয়ালের দিকে । দেয়ালে কান পেতে রাখলাম । মিনিট কয়েক পরে আবার বয়স্ক কন্ঠটা পেলাম । স্পষ্ট লোকটার কথা শুনতে পাচ্ছি । লোকটা কাউকে বলছেন, “বাক্সটা খুলার কোনো চাবি তো দেখছি না এখন কি করব আমরা?’’
আরেকজন লোক বললেন, “বাক্সটা ভেঙ্গে ফেলি । ’’
“পাগল হলেন নাকি? বাক্সটা জানেনই চাবি ছাড়া কোনো ভাবেই খুলা যাবে না । ’’
এরপর কিছু সময় কোনো শব্দ পেলাম না । আমার কাছে তাদের কথার রহস্য থেকে অন্য আরেকটা বিষয় আজব লাগছে । বিষয়টা হলো আমি তাদের ভাষা কি করে বুঝতে পারছি?
অন্যদিকে
মরুর বুক ছিঁড়ে দৈত্যের মতো দাঁড়িয়ে থাকা আগন্তুক পিরামিডকে দেখে অনেক ভয় পেয়েছে প্রহরীগুলো । তারা এসে মহামান্য সিপাহিকে বিষয়টি বললেন । সেনাপ্রধান ছুটে গেলেন ফাও বাদশার কাছে ।
সেনাপ্রধান রাজ দরবারে বাদশার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন । তিনি বললেন, “মহামান্য বাদশার জয় হোক । ’’
ফাও বাদশা বলে উঠলেন, “কি সংবাদ নিয়ে আসলে? ’’
“মহামান্য বাদশা বন্দি শালার বিদ্রোহকারীদের কঠোর শাস্তি দেয়া হয়েছে । তবে একজন পালিয়ে গিয়েছিল । আমাদের প্রহরী তার পিছু নিতে নিতে উত্তর দিকে যায় । সেখানে তারা একটা পিরামিড দেখে । যেটা আমাদের নয়, আচমকা মরুর বুকে কোথা থেকে জন্ম নিয়েছে । ’’
বাদশা সেনাপ্রধানের কথা শুনে বললেন, “পিরামিডের ভেতর কেউ যায় নি তো?’’
“না বাদশা । তবে আমাদের সন্দেহ আছে, হতে পারে পালিয়ে যাওয়া অপরাধীটা পিরামিডের ভেতর আশ্রয় নিয়েছিল । ’’
বাদশার মুখে স্পষ্ট চিন্তার ছাপ । চিন্তার ছাপ দেখে সেনাপ্রধান বললেন, “মহামান্য বাদশা চিন্তিত কেন?’’
“সন্দেহ হচ্ছে ভবিষ্যৎবাণী যদি সত্য হয়ে যায় । ’’
“মহামান্য বাদশা যদি ভবিষ্যৎবাণী সম্পর্কে আমাকে বলেন তাহলে আমি কৃতজ্ঞ হব।’’
“ভবিষ্যৎবাণী নিয়ে কয়েকটা কিতাব রয়েছে । এর মধ্যে একটা হলো আমাদের নগরী ধ্বংস নিয়ে । বইটিতে বলা হয়েছে অভিশপ্ত সেই জীবটার কথা । সে জীবটা অন্ধকারে থাকে । সেই পিরামিডের ভেতর একটা পথ রয়েছে । যেটা বন্ধ । তবে ভবিষ্যৎবাণী অনুসারে কেউ সেই পথটা খুলে দিবে । অন্ধকার জগতের সাথে পৃথিবীর সংযোগ ঘটবে । ধ্বংস হয়ে যাবে আমাদের নগরী । ’’
“আশা করি তেমন কোনো কিছুই ঘটবে না । বাদশাকে জবান দিচ্ছি এই সমস্যার সমাধান আমি করব । ’’
অন্যদিকে
দেয়ালের ওপার থেকে একটু পর কিছু হিস হিস শব্দ ভেসে আসলো । দেয়ালে এক হাত ছিল আমার । আচমকা একটা পাথরে টুকরোতে হাত লাগলে পিরামিড কেঁপে উঠে । ধীরে ধীরে দেয়াল সরে যায় । দেয়ালের ওপারে স্পষ্ট একটা বিশালাকার ধূসর বর্ণের সাপ দেখলাম । সাপটি একটা মানুষকে গিলে খাচ্ছে । নিচে আরো এক জনের মৃত দেহ পড়ে আছে । লোকটার শরীর হালকা নীল দেখাচ্ছে । সাপের বিষের প্রভাব । আমি নড়া চড়া বন্ধ করে দিলাম । সাপটা আমায় দেখতে পেলে রক্ষা নেই । ধীরে ধীরে হাত টেনে দেয়ালের সেই স্থানে চাপ দিলাম । পিরামিড কাঁপতে লাগল । কিন্তু দেয়াল লেগে যাবার আগেই বিশালাকার সাপটি লেজ দিয়ে আঘাত করলো । ভেঙ্গে গেল পাথরের দেয়াল । সাপের মুখে থাকা লোকটার মৃত দেহ ফেলে দিয়ে আমার দিকে এগুতে লাগল ।
মৃত্যু সন্নিকটে..
চলবে….