19/05/2025
এক বাদশাহর দরবারে একজন জাদুকর ছিলেন। তার অনেক খ্যাতি ছিল। একসময় তিনি বৃদ্ধ হন। তখন বাদশাহকে একজন বুদ্ধিমান বালক এনে দিতে বললেন, যাকে তিনি তার যাদুবিদ্যা শেখাবেন। এরপর বাদশাহ যাদুরকরকে একটি বুদ্ধিমান বালক দিলেন।
এরপর থেকে বালকটি যাদুকরের কাছে যেত। একই পথে একজন ধর্মীয় পণ্ডিতের বাড়িও ছিল। আসা-যাওয়ার পথে বালকটি ওই পন্ডিতের কাছেও গিয়ে বসত। তার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনত। প্রতি ধীরে ধীরে ধর্মীয় পন্ডিতের প্রতি মুগ্ধতা তৈরি হয় বালকটির।
একদিন বালকটি যাওয়ার পথে দেখল বিশাল একটি জন্তু বসে আছে। সেটিকে এড়িয়ে সামনে যাওয়ার কোনো পথ নেই। বালকটি ভাবল, এটা জাদুকরি নাকি সত্য, তা পরীক্ষা করে দেখার এটিই উপযুক্ত সময়। সে একটি পাথরের টুকরা কুড়িয়ে নিয়ে বলল, ‘হে আল্লাহ, যদি পন্ডিতের আমল তোমার কাছে জাদুকরের আমলের চেয়ে ভালো এবং পছন্দের বলে মনে হয়, তাহলে এই জন্তুকে মেরে ফেল, যাতে মানুষের যাতায়াতের পথটি খুলে যায়।’ এই বলে বালকটি পাথর ছুড়লে জন্তুটি মারা গেল।
বালক পরে পন্ডিতের কাছে এসে সব খুলে বলল। তখন তিনি বললেন, ‘বাবা, এবার তুমি জ্ঞানের পূর্ণতায় পৌঁছে গেছ। তোমার পরীক্ষা শুরু হতে চলেছে। এই পরীক্ষায় কোনোভাবেই আমার নাম প্রকাশ করবে না।’
সেই বালকটিকে আল্লাহ অলৌকিক ক্ষমতা দিলেন। সে অন্ধ ও কুষ্ঠরোগে আক্রান্তসহ বহু রোগীর জন্য দোয়া করতে লাগল। তারাও সুস্থ হয়ে উঠতে লাগল। তবে কেবল যারা খ্রিষ্টধর্মে ঈমান আনত, তারাই তার দোয়ায় উপকার পেত। একদিন বাদশাহর এক ঘনিষ্ঠ ব্যক্তির চোখের অন্ধত্বও তার দোয়ায় সেরে গেল। তার অলৌকিক ক্ষমতার খবর ই*হুদি বাদশাহর কানে গেলে তিনি বিচলিত হয়ে পড়লেন। বালকটির ধর্মে ইমান আনা কিছু লোককে বাদশাহর আদেশে হ*ত্যা করা হলো। বালকটিকেও হ*ত্যার উদ্দেশ্যে কয়েকজন লোককে ডেকে তিনি বললেন, ‘ওকে উঁচু পাহাড়ের ওপর নিয়ে গিয়ে নিচে ফেলে দাও।’
বালক আল্লাহর কাছে দোয়া করলে পাহাড় কাঁপতে লাগল। ফলে সে ছাড়া সবাই পাহাড় থেকে পড়ে মারা গেল। বালকটি বেঁচে গেল। বালক বাদশাহকে বলল, ‘আপনি যদি আমাকে হ*ত্যা করতেই চান, তাহলে এর সঠিক পদ্ধতি হলো একটি খোলা ময়দানে মানুষ জমায়েত করুন। এরপর বালকের রবের নামে “বিসমিল্লাহি রাব্বিল গোলাম” —এই কথা বলে আমার গায়ে তির ছুড়ুন। তাহলে আমি মারা যাব।’ কথাটির অর্থ ছিল বালকের প্রভুর নামে শুরু করছি। আর বাদশাহ তা-ই করলেন। বালকটি মারা গেল। কিন্তু সেখানে উপস্থিত লোকজন সমবেত কণ্ঠে বলে উঠল, ‘আমরা এই বালকের রবের প্রতি ইমান আনলাম।’
বাদশাহ এবার আরও বেশি বিচলিত হয়ে পড়লেন। তিনি তাদের জন্য গর্ত খুঁড়ে তাতে আগুন জ্বালানোর আদেশ দিলেন। এরপর বললেন, ‘যারা যারা এই বালকের ধর্ম থেকে ফিরে না আসবে, তাদের এই গর্তে ফেলে দাও।’ একে একে সব ইমানদার এগিয়ে এসে সেই গর্তে লাফ দিল। শেষে এল একটি নারীর পালা। তার সঙ্গে একটি শিশুও ছিল। তিনি একটু ইতস্তত করলে শিশুটি বলে উঠল, ‘মা, ধৈর্য ধরুন। আপনি সত্যের ওপর আছেন।’
এই ঘটনার উল্লেখ করেছেন মহান আল্লাহ। সুরা বুরুজের ৪ থেকে ১০ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘অভিশপ্ত হয়েছিল (অগ্নিকুণ্ডের) লোকেরা, ওরা ইন্ধন সংযোগ করে তার (অগ্নিকুণ্ডের) পাশে বসে থাকত এবং দেখত বিশ্বাসীদের ওপর তারা যে অত্যাচার করত। ওরা তাদের ওপর প্রতিশোধ নিয়েছিল শুধু এই কারণে যে তারা বিশ্বাস করত পরম শক্তিমান, পরম প্রশংসনীয় আল্লাহর, যিনি আকাশ ও পৃথিবীর সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। আর আল্লাহ তো সর্ব বিষয়ে স্রষ্টা। যারা বিশ্বাসী নরনারীকে নির্যাতন করেছে ও তারপর তওবা করেনি, তাদের জন্য আছে জাহান্নামের শাস্তি আর দহন যন্ত্রণা।’
বাদশাহ ও এক বুদ্ধিমান বালকের বিস্ময়কর এই কাহিনীটি শুনিয়েছেন মহানবী (সা:)। সাহাবি সুহাইব রুমি রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুরর বরাতে একটি হাদিস পাওয়া যায়। এটি সহিহ মুসলিম শরিফের ৩ হাজার ৫ নম্বর হাদিস।
তবে ঘটনা এখানেই শেষ নয়। এরপর সেই আগুন বাদশাহ ও তাঁর দলবলকেও গ্রাস করে নেয় এবং পুরো শহর পুড়িয়ে ছাই করে দেয়। এভাবেই আল্লাহর আজাব সেই অবাধ্য শাসক ও তাঁর সহযোগীদের ধ্বংস করেছিল। তবে আগুনে মুমিনদের কোনো কষ্ট হয়নি। কারণ হিসেবে রবি ইবনে আনাস (রহ.) বলেন, ‘মুমিনদের আগুনে ফেলে দেওয়ার পর আগুন তাঁদের গায়ে লাগার আগেই আল্লাহ তাআলা তাদের জান কবজ করে নিয়েছিলেন। এভাবেই তিনি মুমিনদের দহন-যন্ত্রণা থেকে রক্ষা করেন। ফলে তাদের মৃতদেহই কেবল আগুনে পুড়েছিল। এরপর আগুন আরও বেশি জ্বলে ওঠে এবং তার লেলিহান শিখা পুরো শহরে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে যারা ইমানদারদের আগুনে দগ্ধ হওয়ার তামাশা দেখছিল, তারাও সেই আগুনে পুড়ে ভস্ম হয়ে যায়।’ (ফাতহুল কাদির)
প্রকৃত ইমানদার ব্যক্তির যেকোনো সময় যেকোনো কঠিন পরিক্ষার সম্মুখীন হওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকা উচিত। আমাদের জীবন আল্লাহ তায়ালারই জন্য।