17/10/2023
ফিলিস্তিন সংকটঃ
**************
এক.
কয়েকদিন থেকে অবজার্ভ করছি। পশ্চিমা মিডিয়ার সংবাদ ফলো করছি। আরব মিডিয়ার সংবাদও দেখার চেষ্টা করছি। সেই সাথে আমাদের উপমহাদেশ আর অন্যান্য মুসলিম-অমুসলিম দেশের অবস্থান সম্পর্কেও জানার চেষ্টা করেছি। এগুলো দেখার পর মনে হলো কিছু অবজারভেশন এবং জিজ্ঞাসা শেয়ার করা উচিত।
ফিলিস্তিন প্রায় ৭৫ বছর ধরে মানবনিধন নামক অত্যাচারের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। সকাল বেলা বাসা থেকে বের হওয়ার সময় পরিবারের সদস্য থেকে বিদায় নিয়ে বের হয়, রাতে দেখা হওয়ার সম্ভাবনা নাই মনে করে। রাতে ঘুমানোর সময় কালিমা পড়ে সবার সাথে শেষ দেখা করে ঘুমায় ঘুমের ঘরে বিস্ফোরিত হয়ে মরার ভয়ে। এতগুলো বছর ধরে প্রায় প্রতিদিন তাদের বাড়ীতে জানাযার নামাজ হয়, বাবার কোলে শিশু থাকে, সন্তানের কাঁধে বাবা, মা, বয়োবৃদ্ধরা পর্যন্ত ছাড় পায় না। আজ পর্যন্ত এই গণহত্যা কেউ বন্ধ করার জন্য কার্যকরভাবে এগিয়ে আসে নি। কেউ না।
একবার ভাবুন তো, আপনার ঘরে যদি আপনার কোলের শিশু সন্তানের লাশ পড়ে থাকতো, আপনার মা যদি ধ্বসে পড়া দালানের নীচে চাপা পড়ে মরে পড়ে থাকতো, আপনার বাবা যদি বোমার বিস্ফোরণে পুড়ে ভস্মীভূত হয়ে যেত, আপনার কেমন লাগতো। আপনার ছেলেটাকে যদি তুলে নিয়ে বছরের পর বছর জালিমের কারাগারে অত্যাচার করতে থাকতো, আপনার কেমন লাগতো। এগুলো নিজেকে দিয়ে ভাবুন, কারণ মুসলমান ভাইদের কষ্ট ফিল করার মতো অনুভূতি আমাদের অনেক আগেই আমরা বেচে দিয়েছি। এগুলো টাকার কাছে আর মসনদের রাজনীতির কাছে বিক্রি হয়ে গেছে।
ফিলিস্তীনিদের দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। কেউ তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসে নি। একমাত্র আল্লাহর সাহায্যের উপর ভরসা করে তারা লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। আপনাদের কি মনে হয়, যেই গাযায় পানির সংযোগ নেই, বিদ্যুৎ নেই, কদিন পরপর খাবার সাপ্লাই বন্ধ করে দেয়া হয়, বোমার বিস্ফোরণে ধুলো ধূসরিত হয়ে থাকে সেই গাযায় কেন তারা নিজেদের জীবন দেয়ার পণ করে বসে আছে। কেন সেখান থেকে তাদের সরাতে পারছে না। কারণ এই গাযা দখল করে ইসরাঈল আক্বসা কেড়ে নিবে। আর সেটা ফিলিস্তীনিরা বেঁচে থাকতে হতে দিবে না। আল-আক্বসা রক্ষায় তারা জীবন দিবে। তাদের জন্মভূমি রক্ষায় তারা জীবন দিবে।
গত কয়েকদিনের আমাদের বাংলাদেশের মুসলিম উম্মাহর অবস্থান দেখুন আর ইসরাইলকে সমর্থন দেয়া পশ্চিমাদের অবস্থান দেখুন। তুলনা করুন। আমেরিকা রণতরী পাঠিয়েছে ইসরাইলের সমর্থনে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন সাহায্যের ঘোষণা দিয়েছে। পশিচমের দেশে দেশে ইসরাইলী পতাকা উত্তোলন করা হচ্ছে।
এবার বলেন, কোন মুসলিম দেশ এখনো কোন রকম যুদ্ধ সহায়তা পাঠিয়েছে ফিলিস্তীনে? কেউ ফিলিস্তীনের সমর্থনে প্রকাশ্যে কোন বক্তব্য দিয়েছে? কয়টা দেশ ফিলিস্তীনের সমর্থনে রাষ্ট্রীয়ভাবে ফিলিস্তীনের পতাকা উত্তোলনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে?
উল্টো কি করেছে মুসলিম দেশের নেতারা? জর্ডান তার বন্দর খুলে দিয়েছে ইসরাইলের জন্য পাঠানো মার্কিন রণতরী পৌঁছানোর জন্য। দুবাইয়ের আমীর সিরিয়ার আসাদকে নিষেধ করে দিয়েছে যেন ফিলিস্তীনে কোন সাহায্য না পাঠায়। তুরস্ক তো অনেক আগে স্বীকৃতি দিয়ে রেখেছে। কাতার সাহায্য করছে, কিন্তু প্রকাশ্যে পশ্চিমাদের মতো না, ইরান হামাসকে ব্যাক-আপ দিচ্ছে শুনছি, কিন্তু প্রকাশ্যে না। সৌদি আরব তো সমর্থন দেয়ার আগে মার্কিন অনুমতির অপেক্ষা করতে হয়।
একবার ইসরাইলে আক্রমণ হলে যদি পশ্চিমাবিশ্ব এত নড়চড়ে বসতে পারে, কত হাজার বার ফিলিস্তীনে আক্রমণ হলে পরে মুসলিমরা এগিয়ে আসবে? পশ্চিমা দেশগুলো থেকে হাজার হাজার ইয়াহুদী যাচ্ছে ইসরাইলের পক্ষে যুদ্ধে যোগদান করতে, কতজন মুসলিম গিয়েছে এখন পর্যন্ত ফিলিস্তীনকে সাহায্য করতে?
পশ্চিমা মিডিয়া প্রচার করছে ইসরাইল ইন ওয়ার, ফিলিস্তীনে কি যুদ্ধ চলছে না? সেটা কি কখনো বলেছে তারা? ইসরাইলে যারা মারা গেছে তাদের দেখানো হচ্ছে কিলড হিসেবে, আর ফিলিস্তিনীদের দেখানো হচ্ছে মারা গেছে। কেন? মুসলিম বিশ্ব কি কখনো পশ্চিমাদের এসব একমুখী নীতির বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস দেখিয়েছে?
ইসরাইলে দেখানো হচ্ছে হামাস সব শিশু আর বৃদ্ধদের হত্যা করেছে, ফিলিস্তীনে কি এতবছর ধরে কেবল যোদ্ধাদেরকেই হত্যা করা হচ্ছে, কোন সিভিলিয়ানকে হত্যা করে নাই? এগুলো নিয়ে কেউ কথা বলছে না কেন?
আরব দেশগুলো কি পারে? ঐ যে যুদ্ধ থেমে আসার পর কয়েক হাজার বযান্ডেজ পাঠাবে ক্ষততে লাগানোর জন্য, কয়েক হাজার রুটি পাঠাবে এক বেলা খাওয়ার জন্য, আর গনপ্রতিরোধ দশ ডলার করে টাকা পাঠাবে দেখানোর জন্য আমরা সাহায্য পাঠিয়েছ্। তোমাদের এই সাহায্য দিয়ে হচ্ছেটা কি? যে সাহায্য ফিলিস্তীনিদের জন্মভূমি রক্ষার যুদ্ধ থামাতে পারছে না, এই সাহায্য তোমাদের কাছে চাইছে কে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর কি আরব বিশ্ব দিতে পারবে? নিজের মসনদ রক্ষা করার তাড়া ছাড়া আর কিছু কি আছে তাদের চিন্তায়?
দুই.
যাই হোক, এবার আপনাদেরকে কিছু পরামর্শ দেই।
প্রথমত যারা এই ইস্যুতে অল্পবিস্তর সচেতন আছেন অন্তত, সবার প্রতি অনুরোধ ফিলিস্তীনের মানচিত্র সম্পর্কে একটু স্বচ্ছ ধারণা নেয়ার চেষ্টা করেন। চারপাশের দেশগুলোর ও শহরগুলোর অবস্থান জানার চেষ্টা করেন। কাজে লাগবে।
দ্বিতীয়ত বিভিন্ন মিডিয়ার সংবাদ তুলনা করা শেখেন। যাঁদের Rashomon effect সম্পর্কে ধারণা আছে, তারা এই ইস্যুতে সেটার প্রয়োগ বুঝার চেষ্টা করেন। যারা জানেন না, একটু গুগল করে জেনে নেন।
তৃতীয়ত আরব-ইসরাইলের মাঝে চারটা যুদ্ধ হয়েছে সবাই জানেন কম-বেশি। কিন্তু প্রেক্ষাপট, কারণ, ফলাফল জানেন খুব কম সংখ্যক। ইতিহাস জানার চেষ্টা করেন।
অবনী অনিমেষ
সংগঠক
জাতীয় যুব ঐক্য
সদস্য
গণতন্ত্রী পার্টি
কেন্দ্রীয় কমিটি