30/03/2026
সচেতনতামূলক পোস্ট::
সাম্প্রতিক সময়ে হাম (Measles) রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা যাচ্ছে, যা অত্যন্ত সংক্রামক এবং উদ্বেগজনক। ইতোমধ্যে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। এমনকি যেসব দেশে টিকাদানের হার বেশি, সেখানেও এই ধরনের প্রাদুর্ভাব হতে পারে—বিশেষ করে COVID-19 সময়কালে টিকাদান কমে যাওয়ার কারণে। উন্নত দেশগুলোতেও, যেমন যুক্তরাষ্ট্রে, যেখানে ২০০০ সালে হাম নির্মূল ঘোষণা করা হয়েছিল, সেখানেও আবার সংক্রমণ দেখা গেছে।
হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি রোগ। একজন আক্রান্ত ব্যক্তি গড়ে ১২ থেকে ১৮ জনকে সংক্রমিত করতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—র্যাশ ওঠার আগেই রোগটি সংক্রমণ ছড়াতে পারে। প্রড্রোমাল পর্যায়ে (জ্বরের সময়) রোগী কাশি বা শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে সহজেই অন্যদের সংক্রমিত করতে পারে, বিশেষ করে ভিড় বা বন্ধ জায়গায়।
চিকিৎসকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণগুলো হলো—জ্বর এবং “3 C”: Coryza (নাক দিয়ে পানি পড়া), Conjunctivitis (চোখ লাল হওয়া), Cough (কাশি)। মুখের ভেতরে Koplik spot দেখা গেলে তা হাম রোগের জন্য বিশেষ লক্ষণ (pathognomonic)। র্যাশ সাধারণত মুখ থেকে শুরু হয়ে ধীরে ধীরে শরীরের নিচের দিকে (ট্রাঙ্ক ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গ) ছড়িয়ে পড়ে।
প্রায় ৩০% ক্ষেত্রে জটিলতা দেখা দিতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে—নিউমোনিয়া, চোখের সমস্যা, অপুষ্টি ইত্যাদি। এছাড়া post-infectious encephalitis, inclusion body encephalitis দ্রুত ঘটতে পারে এবং মৃত্যুর ঝুঁকি থাকে। আর SSPE (Subacute Sclerosing Panencephalitis) দেরিতে হলেও মারাত্মক স্নায়বিক জটিলতা সৃষ্টি করে।
এই রোগের কোনো নির্দিষ্ট অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা নেই—চিকিৎসা মূলত supportive। শুধুমাত্র secondary bacterial infection (যেমন নিউমোনিয়া বা এনসেফালাইটিস) হলে অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয়।
প্রাদুর্ভাবের সময় রোগটি কর্তৃপক্ষকে জানানো বাধ্যতামূলক এবং outbreak investigation জরুরি। যেসব শিশু টিকা নেয়নি বা অসম্পূর্ণ টিকাপ্রাপ্ত—তাদের দ্রুত টিকাদান করতে হবে। রোগীকে আইসোলেশনে রাখতে হবে এবং হাসপাতালে কঠোর infection prevention and control (IPC) ব্যবস্থা নিতে হবে—contact ও droplet precaution সহ।
হাসপাতালে রোগীর সংস্পর্শে গেলে অবশ্যই মাস্ক ও গ্লাভস ব্যবহার করতে হবে। রোগী যে বেড বা সরঞ্জাম ব্যবহার করেছে, তা ১–২ ঘণ্টা সময় নিয়ে ভালোভাবে জীবাণুমুক্ত করতে হবে।
প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য এক ডোজ ভ্যাকসিন প্রয়োজন, আর যাদের ইমিউন সিস্টেম দুর্বল তাদের অতিরিক্ত বুস্টার ডোজ লাগতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে Vitamin A দেওয়া উপকারী, কারণ এর অভাব হামজনিত জটিলতা বাড়ায়।
এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা। তাই বিশেষ করে হাসপাতালে সবার জন্য IPC মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি। গণমাধ্যমকেও সচেতন থাকতে হবে—হাসপাতালে রোগী বা স্বজনদের কাছে গেলে তারাও সংক্রমিত হতে পারে।
বাংলাদেশে প্রায় ৯৫% মানুষের মধ্যে ইমিউনিটি থাকলেও এখনো অনেক ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী রয়েছে—যেমন গর্ভবতী নারী, ক্যান্সার রোগী, কেমোথেরাপি গ্রহণকারী, স্টেরয়েড বা বায়োলজিক থেরাপি গ্রহণকারী এবং অটোইমিউন রোগী।
যেহেতু কোনো নির্দিষ্ট অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা নেই, তাই টিকাই সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা। বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত যে, হাম ভ্যাকসিন নিরাপদ এবং এটি অটিজম বা অটোইমিউন রোগ সৃষ্টি করে না।
সবার প্রতি আহ্বান—হাম অত্যন্ত সংক্রামক রোগ, তাই সতর্ক থাকুন। রোগীর সংস্পর্শে গেলে এবং হাসপাতালে থাকলে অবশ্যই মাস্ক ও গ্লাভস ব্যবহার করুন।
-প্রফেসর ডা. রোবেদ আমিন স্যার (Copied)