05/01/2017
অনুমান ১৭৮০ সালের শেষের দিকে বর্তমান এই কুমিল্লা অঞ্চলের অথবা তখনকার ডিষ্ট্রিক সেটেলমেন্ট কালেক্টর পদে নিয়োগ লাভ করেন ইংরেজ সাহেব
”আলেকজান্ডার” তখন উনার বয়স প্রায় 45 বছর, তিনি লন্ডনে বিবাহিত এবং চার সন্তানের জনক ছিলেন, সমসাময়িককালে অন্যান্য দায়িত্বে ছিলেন মিঃ টমসন, মিঃ পল, কুমিল্লার সুয়াগাজী এলাকার জমিদার বাড়ী বর্তমানের বিএনপি নেত্রী রাবেয়া চৌধুরীদের বাড়িতে আথিতেয়তা গ্রহন করেছিলেন, প্রথম ওখানে থেকেই উনার দায়িত্ব পালন করতেন, জমিদার বাড়িতে বিভিন্ন কারণে আসা যাওয়ার বা দায়িত্ব পালন করার সময় মিঃ আলেকজান্ডারের চোখে পরে আনিন্দ্য সুন্দুরী 14/15 বছর বয়সী সুয়াগাজী গ্রামের মেয়ে ”মাসুমা খাতুন” এর উপর, তারপর মাসুমার ঠিকানা যোগার করে তিনি তাকে বিবাহ করার প্রস্তাব দেন, ততকালীন মাওলানাদের মতামত নিলেন যে বিবাহ করা যাবে, যেহেতু তিনি img_20160922_181539_processedছিলেন খৃষ্ট্রান ধর্মের আর মাসুমা খাতুনরা ইসলাম ধর্মের অনুসারী, ফতোয়া যোগার করা হলো যে ”আহলে কিতাব বা একেশ্বরবাদীদের মধ্যে যার যার ধর্ম ঠিক রেখেও বিবাহ বৈধ” এরপর শুভক্ষণে তাদের বিবাহ হলো এরপর আলেকজান্ডার সাহেবের আরো পদোন্নতি হয়, বর্তমান যে কুমিল্লার ডিসির বাংলো রয়েছে সেখানে স্বস্ত্রীক বসবাসের জন্য আসেন, এভাবে বসবাস করে আসছিলেন কিন্তু কোন কারণে তাদের কোন সন্তান হয়নি, এর মধ্যে মিঃ আলেকজান্ডার কয়েকবারই অবকাশ যাপনে ইংল্যান্ড গিয়ে আবার ফিরে এসেছিলেন, ১৮’শ শতকের প্রাক্কালে মিঃ আলেকজান্ডার সাহেবের ততকালীন বাংলাদেশের দায়িত্ব শেষ হয় এবং উনাকে ফিরে যেতে হবে আবার লন্ডনে, তখন মিঃ আলেকজান্ডার সাহেব তার স্ত্রী মাসুমা খাতুনকে উনার সাথে লন্ডনে যাবার কথা বললে মাসুমা খাতুন সম্মত হননি, স্বামীর নিকট তার ইচ্ছে ব্যাক্ত করেন যে আপনি চলে গেলে এই সরকারী বাংলোতে তো আর আমি থাকতে পারবোনা আবার আমি বাবার বাড়িতেও যাবোনা ওখানেও তো তেমন কেউ নাই, মাসুমা খাতুন তখন তার স্বামীর নিকট প্রস্তাব রাখেন যে আমাকে একটা জায়গা দেওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়ে যান যাতে আমি বাড়ি করে বসবাস করতে পারি, সন্তানাদিও নাই বাকি জীবন চালানোর ব্যবস্থা করে দিয়ে যাবেন, আর আমার ঘরের পাশে একটা মসজিদ ও পুকুর বানাতে চাই, আর কিছু চাইনা, তখন মিঃ আলেকজান্ডার স্ত্রীর ইচ্ছে পূরনের জন্য যত পরিমাণ ধনসম্পদ দরকার তার ব্যবস্থা করে দেন প্রথমে বর্তমান যে ছোটরা এলাকায় একটি জঙ্গলের মত জায়গা ছিলো সেটার মধ্যে জঙ্গল পরিস্কার করে এক রুম করে কিন্তু দোতলা একটি বাড়ি নির্মাণ করে দেন, রায়তী স্বত্বে বেশ পরিমাণ জায়গার ব্যবস্থা করে দেন, মসজিদ নির্মাণের জন্যে যাবতীয় লোক ও মালামাল যোগার করে তাদের দায়িত্ব প্রদান করেন, বাড়ির লাগোয়া উত্তর পাশে মসজিদের জন্য নির্ধারণ করে দেন, বাড়ি ও মসজিদের পূর্ব পাশে প্রায় অনুমান ২০০ শতক জায়গায় একটি পুকুর খননের পরিকল্পণা প্রনয়ণ করেন, সে মোতাবেক কাজ শুরু হয়, তখন সময়কাল ১৮০৫ সালে মিঃ আলেকজান্ডার সকল কিছুর ব্যবস্থা করে দিয়ে স্ত্রী মাসুমা খাতুনের নিকট থেকে বিদায় নিয়ে ইংল্যান্ড চলেযান, মাসুমা খাতুন এই জঙ্গলের মধ্যে তৈরী বাড়িতেই বসবাস করতে থাকেন, পাশাপাশি মসজিদের নির্মাণ কাজও চলতে থাকে, ইতিমধ্যে পুকুর খনন সম্পন্ন হয়, পুকুরের মাটি দিয়েই মসজিদের আশেপাশের জঙ্গল পরিস্কার করে ভিটি তৈরী করা হয়, তখন এই জঙ্গলের উত্তর-পূর্ব কর্ণারে ”মগ” জাতির একটি বড় পরিবার আগে থেকেই বসবাস করতো বিশেষ ছাউনীর ঘর আর প্রধান জীবীকা ছিলো জলা ভূমিতে মাছ ধরা আর পশু শিকার, জঙ্গল কমতে শুরু করলে ”মগীদের” সংখ্যা কিছু কমতে থাকে, আর বাকিরা এখানের কাজে শ্রমিক হিসাবে যোগ দেয়, সে জন্যে মগীদের বসবাসের জায়গাটির নাম বর্তমানেও মগবাড়ি হিসাবে রয়েছে” যা হউক মসজিদ নির্মাণ শেষ হতে হতে ১৮০৭ সাল পর্যন্ত সময় লেগে যায়, তাই প্রতিষ্ঠা কাল হিসাবে ১৮০৭ বলা যায়, তখন মাসুমা খাতুনের বোনের ছেলে কাজী আমির আহমেদ 15/16 বছরের কুরআনে হাফেজ ও ক্বারিয়ানা পাশ ছিলেন, মাসুমা খাতুনের খোঁজ খবর মাঝে মধ্যে তিনিই নিতে আসতেন, তখন মাসুমা খাতুন মসজিদের মোতওয়াল্লী হিসেবে তাকে নিয়োগ দেওয়ার চিন্তা করেন, মসজিদের উত্তর পাশে আমির আহমেদের থাকার জন্য একটি ঘর নির্মাণ করে দেন, কথিত আছে তাকে মাসুমা খাতুন বলেন তুমি এই মসজিদের সকল দায়িত্ব পালন করবা প্রতিদিন তেল কুপি জ্বালানোর কাজ করবা মৃর্ত্যুর আগ পর্যন্ত, আর আমি মারা গেলে আমার ঘরের পশ্চিম পাশে কবর দিবা, তুমিই আমার জানাযা পড়াবা, এরপর এই বোনের ছেলে আমির আহমেদ এলাকায় বিবাহ পড়াতেন, ইমামতি করতেন, তারপর বেশ কিছুদিন পর মাসুমা খাতুন ইন্তেকাল করেন, তার কথামত তাকে সেখানেই কবর দেওয়া হয়, সেই কাজী আমির আহমেদ বিবাহ করেন ও উনার মৃর্ত্যু পর্যন্ত তিনি এই মোতওয়াল্লী ইমামমতি ও কাজীর দায়িত্ব পালন করে গেছেন,
@ #সারকথা
সেটেলমেন্ট কালেক্টর আলেকজান্ডারের নিঃসন্তান স্ত্রী এই জঙ্গল বাড়ীতে জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত খুব নিড়িবিলি জীবন যাপন করার কারণে সাধারন মানুষ দূর থেকে পর্যবেক্ষণ করতো, তখন একলা বসবাস ও এই জায়গাটা মাসুমা খাতুন আসার আগে ঘণ জঙ্গল ছিলো এইসব কারণে মাসুমা খাতুনকে ”জংলীবিবি” বলে ডাকতো, আর তাই তার প্রতিষ্ঠিত মসজিদটির নামও পরে যায় ”জংলীবিবির মসজিদ”
@ # যে এলাকায়
মসজিদটি নির্মিত সেখানকার নতুন প্রজন্মসহ অধিবাসীদের বেশিরভাগই জানে না কারুকাজ খচিত মসজিদটির নির্মাণ ইতিহাস। মসজিদটির নাম
”জংলীবিবির মসজিদ” সম্প্রতি প্রাচীন এ
মসজিদটির সংস্কার ও সম্প্রসারণ কাজ শুরু হয়েছে। আর তা করতে গিয়ে যাতে মসজিদের প্রাচীন স্থাপত্যশৈলীর ক্ষতিসাধন না হয় সেদিকে মসজিদ কমিটিকে খেয়াল রাখার অনুরোধ
জানিয়েছেন মুসল্লীরা। কুমিল্লা নগরীর ছোটরা এলাকায় অবস্থিত প্রায়
দু’শ বছরের প্রাচীন জংলীবিবির মসজিদের তিনদিক থেকে যাওয়া যায়। জজকোর্ট চৌমুহনীর পশ্চিম দিকের রাস্তা দিয়ে,মগবাড়ি চৌহমুনী পার হয়ে দক্ষিণ দিকের গলি পথে এবং জেলখানার পূর্বদিকের সড়ক হয়ে গেলেও মসজিদটি দেখা যায়। ১৮০৭
খ্রিস্টাব্দে মসজিদটি ছোটরা এলাকায় নির্মিত হয়। কুমিল্লার সেটেলমেন্ট কালেক্টর আলেকজান্ডার এর বাঙালী সহধর্মিনী ছিলেন মাসুমা খাতুন ওরফে জংলীবিবি। প্রাচীন স্থাপত্য শিল্পের অপূর্ব নিদর্শন মনোরম কারুকাজের ঐতিহ্য বহন করছে ছোটরার জংলীবিবি মসজিদটি। তিন গম্বুজ বিশিষ্ট জংলীবিবির মসজিদটি আয়তনের দিক থেকে দৈর্ঘ্যে ৪০ ফুট এবং প্রস্থ ১৩ ফুট। আবার বারান্দার দিক থেকে আয়তনে দৈর্ঘ্য ৪০ ফুট প্রস্থ ৮ ফুট। উত্তর দক্ষিণে লম্বা মসজিদের দেয়ালের পুরুত্ব¡ ৩ ফুট। মসজিদের সামনে বড় একটি পুকুর
রয়েছে। মসজিদের সামনে রয়েছে অর্ধগোলাকৃতির ছোট-বড় তিনটি খিলানপথ। যা মসজিদের
প্রবেশপথ। মসজিদের চার কোণায়
চারটি অষ্টকোণাকৃতির কারুকাজ খচিত উঁচু পিলার রয়েছে। মসজিদের ভেতরের অংশও দৃষ্টিনন্দন
কারুকাজে ভরা। সময়ের পরিক্রমায় সবকিছুতে যখন আধুনিকতার
ছোঁয়া ভর করেছে। তখন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোও তাতে পিছিয়ে নেই। এসব মসজিদের কোনটির
আগের স্থাপত্যশৈলীর রূপ পরিবর্তন
করে আধুনিকায়ন করা হয়েছে।
কোনটি স্থাপত্যশৈলী ঠিক রেখে সংস্কার
বা ভেঙে নতুন করে নির্মাণের
পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে।
তেমনিভাবে জংলীবিবি মসজিদেরও সংস্কার ও সম্প্রসারণ কাজ শুরু হয়েছে।এদিকে দিন দিন মুসল্লীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় মসজিদটি সম্প্রসারণ ও বহুতল ভবন করার কাজ আস্তে ধীরে চলছে। নির্মিত এই মসজিদ একটি ইতিহাস। মসজিদটি সংস্কার করতে গিয়ে যাতে কোনভাবেই এটির প্রাচীন স্থাপত্যশৈলী ধ্বংস না হয় এব্যাপারে মসজিদ কমিটিকে সজাগ থাকতে হবে, তাছাড়াও মসজিদটির আন্ডারে যে বড় পুকুরটি রয়েছে, তার চারপাশে মানব বসতি গড়ে উঠেছে এবং গনবসতির ক্রমাগত চাপে ময়লা মাটি ফেলে দখল হয়ে চলেছে তাই এই ব্যাপারে এবং পুকুরটিকে কচুরীপানা মুক্ত করা উচিত,ঐতীয্যবাহী জংলীবিবির মসজিদ ও পুকুরটি সংরক্ষণ করার জন্য কুমিল্লাবাসী সকলের সাধ্যানুযায়ী ভূমিকা রাখার জন্য এগিয়ে আসা জরুরী, জরুরী ভিত্তিতে সবাই এগিয়ে আসলেই আমার এই লেখাটি সার্থকতা লাভ করবে বলে আমার বিশ্বাস ||