18/02/2017
কৌশলে কাটলো বিএনপি থেকে নির্বাচিত সিটি মেয়রের ৫ বছর
কুমিল্লা সিটি করপোরেশন
মো. লুত্ফুর রহমান, কুমিল্লা প্রতিনিধি১৬ ফেব্রুয়ারী, ২০১৭ ইং
কৌশলে কাটলো বিএনপি থেকে নির্বাচিত সিটি মেয়রের ৫ বছর
ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের স্থানীয় সংসদ সদস্য ও অন্যান্য নেতৃবন্দের সাথে আপস-রফা ও সমঝোতার ব্যতিক্রমধর্মী দৃষ্টান্ত স্থাপন করে মেয়াদ পূর্ণ করেছেন কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশনের (কুসিক) বিএনপি দলীয় মেয়র মনিরুল হক সাক্কু। গত পাঁচ বছরে কুমিল্লা নগরের উন্নয়ন হয়েছে অনেকটা পৌরসভার আদলে। পূরণ হয়নি নগরবাসীর প্রত্যাশার সিকিভাগও। প্রকল্পের নামে সরকারের কোটি কোটি টাকা ব্যয় হলেও এর সুফল পায়নি নগরবাসী। শহরজুড়ে ছড়িয়ে আছে অপ্রয়োজনীয় ও যথেচ্ছ খরচের নজির। বিভিন্ন ক্ষেত্রে পরিকল্পিত উন্নয়ন না হলেও সমঝোতা আর ভাগ-বাটোয়ারায় মেয়রের অত্যন্ত কাছের এবং সরকার দলীয় কিছু ঠিকাদারের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়েছে। গত কয়েকদিন ধরে বিভিন্ন এলাকা ঘুরে বাসিন্দা ও বিশিষ্টজনদের সাথে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মেয়রের কাছের কয়েকজন জানান, ‘দেশের কয়েকটি সিটি কর্পোরেশনের বিএনপি দলীয় মেয়রের পরিণতি দেখেছেন কুমিল্লা সিটি মেয়র বিএনপি নেতা মো. মনিরুল হক সাক্কু। তাই তিনি সাবধানী হয়ে নিজেকে ওই পরিণতি থেকে রক্ষার জন্য সরকার দলের সাথে সমঝোতার মাধ্যমে মেয়াদ পূর্ণ করেছেন। এ কারণে বিভিন্ন উন্নয়ন কাজে ভাগ-বাটোয়ারাসহ নানা অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ঠিকাদার ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, নাম শুনিনি এমন পত্রিকায় অনেক দরপত্র বিজ্ঞপ্তি ছাপা হয়—যা খুঁজেও পাইনি।
জানা যায়, ২০১১ সালের ২৩ জুন স্থানীয় সরকার বিভাগ কুমিল্লা ও সদর দক্ষিণ পৌরসভাকে বিলুপ্ত করে ৫৩.০৪ বর্গ কি.মি. আয়তনের কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশন ঘোষণা করে। ২০১২ সালের ৫ জানুয়ারি প্রথম নির্বাচনে মেয়র পদে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীকে হারিয়ে নির্বাচিত হন কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপি’র যুগ্ম সম্পাদক মো. মনিরুল হক সাক্কু। দায়িত্ব গ্রহণের পর সিটি কর্পোরেশনের এলাকা বর্ধিতকরণের জন্য মাস্টারপ্লান গ্রহণ করা হয়। কিন্তু মেয়াদের শেষ পর্যায়ে এ প্রস্তাবনা পাঠানো হয় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে। নির্বাচন কমিশন নারায়ণগঞ্জ ও কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন একযোগে আয়োজন করার পরিকল্পনার কথা জানালেও উল্লেখিত ‘মাস্টারপ্লান’ বাস্তবায়ন নিয়ে আদালতে এক রিট দায়েরের কারণে নিষেধাজ্ঞায় কুমিল্লার নির্বাচন আটকে যায়। পরে রিট আবেদন নিষ্পত্তি হওয়ায় বাধা কাটে। এরই মধ্যে স্থানীয় সরকার বিভাগ এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে কুমিল্লা জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর আলমকে অতিরিক্ত দায়িত্ব প্রদান করে এ সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক পদে নিয়োগ দিয়েছে। এভাবেই গত ৭ ফেব্রুয়ারি শেষ হয়েছে এ সিটির মেয়র, কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত কাউন্সিলরদের পাঁচ বছরের মেয়াদ।
নাগরিক সমাজের লোকজন অভিযোগ করেন, নগরীর গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা ও প্রতিষ্ঠানের পাশে বাগান করা ও প্লাস্টিকের ফুল দিয়ে বাগান সাজানো, চৌরাস্তায় জমকালো ইলেক্ট্রনিক বিলবোর্ড স্থাপন সর্বোপরি বিভিন্ন স্থানে মেয়রের বড় আকারের স্থায়ী রঙিন ছবি স্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু রাস্তা, ড্রেন ও কালভার্ট নির্মাণ-সংস্কার, যানজট নিরসন, জলাবদ্ধতা দূরীকরণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন ইত্যাদি নাগরিক সেবা প্রদানে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি।
সূত্র জানায়, কথামত কাজ না করায় সিটি মেয়রের কাছের লোক হিসেবে পরিচিত প্রভাবশালী ঠিকাদার বাদলের হাতে গত ৩০ জানুয়ারি নিজ কার্যালয়ে লাঞ্ছিত হন কুসিকের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (চ:দা:) মো. তারিকুল ইসলাম। এদিকে মেয়াদের শেষ পর্যায়ে গতবছরের ২৯ সেপ্টেম্বর সিটি কর্পোরেশনের ইমারত নির্মাণসংক্রান্ত স্থায়ী কমিটির এক সভাতেই ৬৭৪টি এবং পরে চলতি বছরের ৩১ জানুয়ারি ২৫৪টি ভবনের নকশা অনুমোদন দেয়। এর মধ্যে ২৯ সেপ্টেম্বরের সভায় একটি ভবনের নকশা অনুমোদনের বিপক্ষে বিশেষজ্ঞ মতামত দেওয়ায় মেয়রের সামনেই কয়েকজন প্রভাবশালী কাউন্সিলরের হাতে লাঞ্ছনা ও মারধরের শিকার হন ওই প্রকৌশলী মো. তারিকুল ইসলাম। তাছাড়া নগরীর বিভিন্ন সড়কের পার্শ্ব দখল করে অবৈধ দোকান-পাটসহ স্থাপনা গড়ে উঠলেও তা অপসারণে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। শুধু তাই নয়, নগরীর ছোটরা এলাকায় ড্রেন ও জনগণের চলাচলের রাস্তা দখল করে প্রভাব খাটিয়ে ২নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর বিল্লাল হোসেন নির্মাণ করেছেন অবৈধ কার্যালয়।
অপরদিকে সিটির দক্ষিণাংশের ৯টি ওয়ার্ডের অধিকাংশ এলাকা এখনো জলাশয়, কৃষি জমি ও গ্রামীণ জনপদ। চৌয়ারা, দিশাবন্দ, কাজীপাড়া, মাটিয়ারা, বামিশাসহ কয়েকটি গ্রামের লোকজন জানান, ‘আমরা সিটি কর্পোরেশনের ধার্যকৃত সকল প্রকার ট্যাক্স নিয়মিত পরিশোধ করে আসছি, কিন্তু ইউনিয়ন থেকে পৌরসভা এবং পাঁচ বছর যাবত্ সিটির বাসিন্দা হয়ে নাগরিক সেবা কী পেলাম তাই বুঝি না!
এছাড়া নগরীর কেন্দ্রস্থল কান্দিরপাড়ে প্রধান সড়কের পাশের সরকারি জায়গা দখল করে ১৬ কোটি ১২ লক্ষাধিক টাকা ব্যয়ে ছয়তলা বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণ করে সিটি কর্পোরেশন। জেলা প্রশাসন ওই জায়গার মালিকানা দাবি করে স্থাপনা অপসারণের জন্য সিটি কর্পোরেশনকে নোটিস দেয়। কিন্তু এরই মধ্যে মার্কেট নির্মাণসহ দোকান বেচা-বিক্রির কাজ সম্পন্ন হয়ে গেছে। এসব বিষয়ে মো. মনিরুল হক (সাক্কু) সাংবাদিকদের জানান, ‘বিএনপি করায় আমি এমনিতেই ছিলাম বৈষম্যের শিকার। প্রথমদিকে স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে বছরে আট কোটি টাকা করে পেতাম, পরে তা চার কোটিতে নেমে এসেছে। মিথ্যে বলে লাভ নেই, সাপের মতো আঁকাবাঁকা হয়ে লোকাল এমপির সঙ্গে মিলে-মিশে সাধ্যমত নগরীর উন্নয়ন করেছি। এত প্রতিকূলতার মধ্যেও গত পাঁচ বছরে প্রায় ৩৮০ কোটি টাকার কাজ করেছি।’ তিনি আরও জানান, দায়িত্ব গ্রহণের পর ৩৬ জন কাউন্সিলরের মাধ্যমে রাস্তা-ঘাট, হাট-বাজার, ফুটপাত-ড্রেনসহ অনেক উন্নয়ন ও জনকল্যাণমূলক কাজ হয়েছে। পার্কের আধুনিকায়নসহ বিনোদন কেন্দ্র ও সড়কের পাশে সৌন্দর্যমণ্ডিত স্থান নির্মাণ করা হয়। উন্নয়নের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখতে আয়ের উত্স বৃদ্ধি করার জন্য মার্কেট নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।