প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য্যের শীর্ষস্থান দখলকারী বিশ্বের অন্যতম পর্যটন নগরী ক্যাপ্টেন কক্সের স্মৃতিবিজড়িত প্রত্নতাত্ত্বিক জনপদ কক্সবাজার জেলার চকরিয়া উপজেলার শান্ত-নিবিড় নিরুপদ্রব গ্রাম বরইতলী। যেখানে জলরঙে কাঁদামাটি মানুষের জীবনের প্রতিচ্ছবি গড়ে উঠে যুগের সভ্যতা। আবহমান কাল থেকে এই পাললিক জনপদের মানুষেরা কৃষিকে উপজীব্য করে জীবীকা সম্পাদন করে। এপার মানুষের মৌসুমি সংগ্রামে টিকে থাকার তীক্ষ্ণ অভিজ্ঞতা
বিরাজমান।
উৎপত্তিঃ
বড়ইতলী বা বরইতলী দুই নামেই এলাকাটি পরিচিত। নামটির ব্যুৎপত্তির ক্ষেত্রে অনেক মতভেদ রয়েছে। তবে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য মত হল, চারপাশে পাহাড় বেষ্টিত বলে স্থানীয় ভাষায় একে থলি বলা হত। সেখান থেকে ক্রমান্বয়ে বড় থলি, বড় তলি থেকে বড়ইতলী নাম হয়। যা চট্টগ্রামের আঞ্চলিক উচ্চারণে বরইতলী নামে পরিচিত।
আয়তন ও জনসংখ্যা:
বরইতলী ইউনিয়নের আয়তন ৬৫০০ একর (২৬.৩১ বর্গ কিলোমিটার)।
স্থানাঙ্ক:
২১°৪৯.৫′ উত্তর ৯২°৪.৫′ পূর্ব/২১.৮২৫০° উত্তর ৯২.০৭৫০° পূর্ব।
জনসংখ্যা ২০১১ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী বরইতলী ইউনিয়নের লোকসংখ্যা ৩৭,৮০১ জন। এর মধ্যে পুরুষ ১৯,৫৭৯ জন এবং মহিলা ১৮,২২২ জন। তৎমধ্যে (….) জন হিন্দু সম্প্রদায়ও রয়েছে।
মোট ভোটার সংখ্যা: ১৬৬৮২ জন, পুরুষ: ৮২৪৭, মহিলা: ৮,৪৩৫ জন। ধারণা মতে বর্তমানে জনসংখ্যা ৫০ হাজার ছোঁই।
অবস্থান ও সীমানা:
চকরিয়া উপজেলার উত্তরাংশে বরইতলী ইউনিয়নের অবস্থান। চকরিয়া উপজেলা সদর থেকে এ ইউনিয়নের দূরত্ব প্রায় ৯ কিলোমিটার। এ ইউনিয়নের দক্ষিণে কৈয়ারবিল ইউনিয়ন , পূর্ব বড় ভেওলা ইউনিয়ন ও ভেওলা মানিকচর ইউনিয়ন; পশ্চিমে
পেকুয়া উপজেলার পেকুয়া ইউনিয়ন ও শিলখালী ইউনিয়ন; উত্তরে হারবাং ইউনিয়ন; পূর্বে বান্দরবান জেলার লামা উপজেলার আজিজনগর ও ফাইতং ইউনিয়ন অবস্থিত।
প্রশাসনিক কাঠামো:
ইউপি কোড় নং ৪২২১৬১৬। বরইতলী ইউনিয়ন চকরিয়া উপজেলার আওতাধীন ২নং ইউনিয়ন পরিষদ। এ ইউনিয়নের প্রশাসনিক কার্যক্রম চকরিয়া থানার আওতাধীন। এ ইউনিয়ন জাতীয় সংসদের ২৯৪ নং নির্বাচনী এলাকা কক্সবাজার-১ এর অংশ।
বরইতলী ইউনিয়ন সরকারপ্রধান:
মোহাম্মদ ছালেকুজ্জমান। বিগত ২৬ ডিসেম্বর ২০২১ ; রবিবার, গণতান্ত্রিক প্রেক্ষিতে সরাসরি ভোটে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হন। পিতা: মাস্টার জিয়াউল হক। বাসা: মৌলভী নমিউদ্দিন বাড়ী, গ্রাম: ৪নং ওয়ার্ড উপর পাড়া, ডাকঘর: বরইতলী।
ওয়ার্ডভিত্তিক গ্রাম/মহল্লা:
৯ টি ওয়ার্ড নিয়ে ৫৮ টি গ্রাম রয়েছে।
* ১নং ওয়ার্ড ডেইঙ্গাকাটা, পূর্ব ডেইঙ্গাকাটা, কৃষ্ণকাটা, বোরহান উদ্দিন কাটা
* ২নং ওয়ার্ড রসুলাবাদ, হিন্দুপাড়া, পশ্চিম খয়রাতিপাড়া, সুধাংশু পাহাড় দক্ষিণ পাড়া
* ৩নং ওয়ার্ড পূর্ব খয়রাতিপাড়া, মাইজপাড়া, পূর্ব হিন্দুপাড়া, মহাজেরপাড়া, পূর্ব মহাজেরপাড়া, কাটাখালী, উপরঘোনা, ভিলিজার পাড়া, চেমছড়ি পাড়া, মৌলভীপাড়া, রাজাইল্যারবিল মুসলিম পাড়া,
বড়ঘোনা
* ৪নং ওয়ার্ড উপর বরইতলী, বাংলাপাড়া, ছড়ার পূর্বকূল, মরাইল্যা বাপের পাড়া, কুতুবদিয়া পাড়া, তেইল্যাকাটা, দরগাহপাড়া, আলমনগর
* ৫নং ওয়ার্ড সিকদারপাড়া, ফকিরপাড়া, চাঁদের বাপের পাড়া, মাহমুদনগর, পাহাড়তলী, বানিয়ারছড়া, ছড়ার পূর্বকূল, পূর্ব বানিয়ারছড়া
* ৬নং ওয়ার্ড ফতেহ আলী সিকদার পাড়া, মাদ্রাসাপাড়া, ছড়ার পূর্বকূল, মিয়াজীপাড়া, শীলপাড়া
* ৭নং ওয়ার্ড বিবিরখীল, বিবিরখীল চরপাড়া, জেলেপাড়া, শীলপাড়া, মছনিয়াকাটা, ডেবলতলী
* ৮নং ওয়ার্ড সবুজপাড়া, মুড়াপাড়া, হাফালিয়াকাটা, খাজানগর, ল্যাং মিয়াজী পাড়া
* ৯নং ওয়ার্ড সিকদারপাড়া, সর্দারপাড়া, মৌলভীপাড়া, গোবিন্দপুর দক্ষিণ পাড়া
শিক্ষা ব্যবস্থা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান: বরইতলী ইউনিয়নের স্বাক্ষরতার হার ৫১.৬০। এ ইউনিয়নে ১টি ফাজিল মাদ্রাসা, ৫টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ২টি দাখিল মাদ্রাসা, কওমি মাদ্রাসা ২টি ও ১২টি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে।
যোগাযোগ ব্যবস্থা: বরইতলী ইউনিয়নে যোগাযোগের প্রধান সড়ক হল চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক। সব ধরণের যানবাহনে যোগাযোগ করা যায়। বরইতলী ইউনিয়নের নয়নাভিরাম সড়ক (পেকুয়া রাস্তার মাথা) থেকে পেকুয়া, কুতুবদিয়া দুইটি উপজেলার একমাত্র দ্বার।
এতে পাঁকা ব্রিজ: ১৪ টি; পাকা রাস্তা: ২৭ কি.মি.; অাধা পাঁকা রাস্তা: ২১ কি.মি; কাঁচা রাস্তা: ৯৬ কি.মি; বেড়ীবাঁধ: ১৫ কি. মি.।
অর্থনীতি: বরইতলী ইউনিয়নের অধিকাংশ মানুষের পেশা কৃষি। কৃষি উপযোগ্য জমি ৯৫০ হেক্টর। এতে কৃষি অর্থনীতির প্রধান চালিকা শক্তি। প্রধান ফসল ধান হলেও বিভিন্ন সবজিও চাষ হয় এখানে। বরইতলী বাজার তথা গরুর বাজার এ অঞ্চলের সবজির অন্যতম বৃহৎ পাইকারী বাজার। বিশাল এলাকাজুড়ে গোলাপের চাষ এই অঞ্চলকে ভিন্নতা দিয়েছে। এছাড়াও অনেকে মাছের খামার ও মুরগীর খামার করেন। কিছু তামাক চাষও এখানে হয়।
স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্র ও ক্লিনিক: ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় ১ টি ও কমিউনিটি ক্লিনিক ৪ টি
* শান্তির বাজার কমিউনিটি ক্লিনিক
* খয়রাতি পাড়া কমিউনিটি ক্লিনিক
* পহরচাঁদা কমিউনিটি ক্লিনিক
* ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল আজিজ কমিউনিটি ক্লিনিক
ধর্মীয় উপাসনালয়: বরইতলী ইউনিয়নে ৬৮টি মসজিদ ও ১০টি মন্দির রয়েছে।
খাল ও নদী: বরইতলীর মূল প্রাণ হচ্ছে সোনাইছড়ি খাল। সাতকানিয়ার “মুলা” নামক পাহাড়ের পাদদেশ হতে সৃষ্ট হয়ে বান্দরবন পার্বত্য জেলার পুকখাইয়্যারঝিরি, উত্তর বরইতলীর পূর্বপাশে পাহাড় ঘেঁষে এসে উত্তর বরইতলীর বিশাল সমতল ভূমির উপর দিয়ে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক অতিক্রম করে মধ্য বরইতলীর উপর দিয়ে দক্ষিণ-পশ্চিমে গিয়ে মাতামুহুরি নদীতে পতিত হয়েছে। এর দৈর্ঘ্য অানুমানিক ২০ কি.মি.। বরইতলী ইউনিয়নের দক্ষিণ পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে মাতামুহুরী নদী।
হাট-বাজার বরইতলী ইউনিয়নের প্রধান প্রধান হাট/বাজারগুলো হল বানিয়ারছড়া বাজার, হিন্দু পাড়া টাইম বাজার, কুতুব বাজার (ডাণ্ডি বাজার), একতা বাজার (গুরু বাজার) এবং শান্তির বাজার।
দর্শনীয় স্থান:
* বিবি ফাতেমা (র.) কূপ, মছনিয়াকাটা
* মনোমুগ্ধকর গোলাপ বাগান
* নয়নাভিরাম সড়ক
* বরইতলী মৎস্য খামার
* পাহাড়িয়া বনাঞ্চল
কৃতী ব্যক্তিত্ব:
* খতিবে আযম মাওলানা ছিদ্দিক আহমদ (রহ.); বিশিষ্ট আলেমে দ্বীন, বাগ্মী ও রাজনীতিবিদ।
* আলহাজ্ব ফজলুল করিম চৌধুরী; সমাজসেবক ও শিক্ষানুরাগী।
* গোলাম কাদের ডেপুটি; কক্সবাজারের সর্বপ্রথম এম.এ ও ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট।
* লকনুল হোছাইন চৌধুরী; প্রাক্তন ভাইস প্রেসিডেন্ট, অবিভক্ত হারবাং ইউনিয়ন।
* পাঁচকড়ি মুহুরী সিকদার; প্রতিষ্ঠাতা, বরইতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
* মাওলানা নাঈম উদ্দিন; প্রাক্তন জেলা বোর্ড সদস্য, চট্টগ্রাম জেলা।
* নতুন চন্দ্র দে; কবি, সাহিত্যিক ও জমিদার।
উপসংহার: সুপ্রাচীনকাল হতে এই অঞ্চলের মানুষেরা তাদের ইতিহাস ঐতিহ্য তথা অাদিত্যকে সম্মান ও অক্ষত করে রেখেছেন। এই দু’পারের মানুষের সংগ্রামী জীবন যেন ইতিহাসে বিরল। সাদামাটা জীবনের আবহমান বাংলার রাখালিয়া সবগ্রাম যেন চিত্রিত চির অম্লান।
সূত্রঃ ইউনিয়ন তথ্যভাণ্ডার ও উইকিপিডিয়া।
�সম্পাদনায়�
�প্রত্যয় মাহমুদ