01/01/2022
আজ সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংহতি দিবস।
কি ঘটেছিলো সেদিন ?
জানতে হলে লিখাটি পড়ুন।
-------------------------------------
সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংগ্রামের অগ্নি স্পর্ধিত ইতিহাস
লিখেছেন জিলানী শুভ :
১ জানুয়ারি, ইংরেজি বছরের প্রথম দিন। সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংগ্রামে একটি স্বর্ণোজ্জ্বল ইতিহাস, অগ্নিস্পর্ধিত চেতনার দিন। সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে শোষিত, মেহনতি জনগণের আন্তর্জাতিক ঐক্য, সংহতি, মৈত্রী সংগ্রামে অনন্য সাধারণ, অভূতপূর্ব ইতিহাস রচনার দিন। ১৯৭৩ সালের ১ জানুয়ারি, সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে সদ্য বিশ্বের মানচিত্রে জন্ম নেওয়া রাষ্ট্র বাংলাদেশে সর্বপ্রথম রাজপথ রঞ্জিত হয় ছাত্রদের রক্তে, তৎকালীন পুলিশের গুলিতে ভিয়েতনাম সংহতি মিছিলের কর্মসূচিতে। শহীদ হন ছাত্র ইউনিয়ন নেতা মতিউল ইসলাম, মীর্জা কাদের। আহত হন পরাগ মাহবুব, ফরীদ হোসেন, আমীরুল ইসলাম, সুলতান আহমেদসহ আরো অনেকে। ভিয়েতনামে তখন চলছে সাম্রাজ্যবাদের মোড়ল মার্কিন সামরিক আগ্রাসন। মার্কিন আগ্রাসনের প্রতিবাদে ছাত্র ইউনিয়ন ও ডাকসুর এই যৌথ কর্মসূচির লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী অবস্থানে রাখার জন্য গণ আন্দোলন গড়ে তোলা। ষাটের দশক থেকেই ভিয়েতনাম বাংলাদেশের মানুষের কাছে আবেগপূর্ণ একটি নাম। বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের গেরিলা যোদ্ধাদের অনুপ্রাণিত করেছিলো ভিয়েতনামের রণাঙ্গনের নানান কাহিনি। আঙ্কেল হো’র বাহিনী কর্তৃক আঙ্কেল স্যাম এর বাহিনীর পর্যদুস্ত হওয়ার ঘটনা, গেরিলা যুদ্ধের কৌশল ৭১’র গেরিলা যোদ্ধাদের অনুপ্রাণিত করেছে, উদ্দীপনা যুগিয়েছে। সাড়ে নয় মাস সশস্ত্র মুক্তি সংগ্রামের পর সাম্রাজ্যবাদের রক্ত চক্ষুকে উপেক্ষা করে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করলেও ভিয়েতনামে মার্কিন আগ্রাসন তখনও চলছে। ১৯৭২ সালে ভিয়েতনামে মার্কিন সামরিক আগ্রাসন তীব্রতর হয়। ভিয়েতনামের আকাশে বি-৫২ বোমারু বিমান, নাপাম বোমা, রাসায়নিক বোমা ব্যবহার করে বিশ্ব মানবতাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এই বর্বরতার বিরুদ্ধে স্বাভাবিকভাবেই দেশের ছাত্র সমাজ ও ছাত্র ইউনিয়ন প্রতিবাদ মুখর হয়ে ওঠে। জোরদার হয় ভিয়েতনাম সংহতি আন্দোলন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী প্রতিবাদী জঙ্গি কর্মসূচি ছাত্র সমাজকে আকৃষ্ট করে। সমগ্র দেশের বিভিন্ন স্থানে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ছাত্রদের প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হতে থাকে। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পরিচালিত ইন্সটিটিউট এ ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ হয়, চট্টগ্রামে ইউএসআইএস এর সামনে বিক্ষোভ ও ভাংচুরের ঘটনা ঘটে। ঢাকায় বাংলা একাডেমী বই মেলায় ইউএসআইএস’র স্টল ভাংচুর ও তছনছ করে ছাত্ররা। ছাত্র ইউনিয়ন ও ডাকসু যৌথভাবে এই সমস্ত প্রতিবাদ কেন্দ্রীভূত করে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী গণ আন্দোলন গড়ে তোলার লক্ষ্যে ১ জানুয়ারি ১৯৭৩ সালে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংহতি দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নেয়। সিদ্ধান্ত নেয়া হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলা থেকে ছাত্র সমাবেশ শেষ করে ভিয়েতনামে মার্কিন আগ্রাসন বন্ধের দাবিতে আদমজী কোর্টস্থ মার্কিন দূতাবাসে স্মারকলিপি প্রেরণ করা হবে। বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের তৎকালীন সভাপতি ও ডাকসুর ভিপি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমের সভাপতিত্বে বটতলায় ছাত্র সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয় ও পরবর্তীতে মার্কিন দূতাবাস অভিমুখে শুরু হয় প্রতিবাদী মিছিল। তৎকালীন ইউএসআইএস (মার্কিন তথ্য কেন্দ্রের) সামনে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সহস্র কণ্ঠের শ্লোগানে প্রকম্পিত মিছিল আসা মাত্র পুলিশ গুলিবর্ষণ শুরু করে। পুলিশের গুলিতে রাজপথে লুটিয়ে পড়ে ছাত্ররা। শহীদ হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছাত্র ইউনিয়ন নেতা মতিউল ইসলাম ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থী মীর্জা কাদের। মতিউল-কাদেরের আত্মত্যাগ সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী গণমানুষের মুক্তির আন্দোলনকে এক অনন্য মাত্রায় পৌঁছে দিয়েছিলো। বিশ্বব্যাপী সাম্রাজ্যবাদবিরোধী লড়াইয়ে গণমানুষের ঐক্য ও সংহতির নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত স্থাপন করলো। মতিউল-কাদেরের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে ভিয়েতনাম সংহতি আন্দোলন গণআন্দোলনের রূপ লাভ করে। আন্দোলনের তীব্রতায় তৎকালীন সরকার ভিয়েতনামের অস্থায়ী বিপ্লবী সরকারকে স্বীকৃতি প্রদান করে। ঢাকায় ভিয়েতনামের দূতাবাস খোলা ও ইউএসআইএস’কে প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়। ২০০০ সালে ভিয়েতনাম সরকার শহীদ মতিউল ইসলাম ও মীর্জা কাদেরকে ভিয়েতনামের জাতীয় বীর হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ১৯৭৩ সালের ১ জানুয়ারির পর প্রায় ৪ দশকের বেশি সময় অতিক্রান্ত হয়েছে। যে সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে সমাজতান্ত্রিক সংগ্রাম ও ’৬০ এর ’৭০ এর দশকে বিশ্বজুড়ে মানবমুক্তির সংগ্রাম সাম্রাজ্যবাদকে পরাস্ত করে এগিয়ে চলেছিলো তার বিপরীতে ’৯০ এর দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নের এর ভাঙনের পর বর্তমানে বিশ্বব্যাপী আমরা দেখছি ইঙ্গ-মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ দখলদারিত্ব ও লুণ্ঠনকে ছড়িয়ে দেয়ার লক্ষ্যে আগ্রাসী চেহারায় হাজির হয়েছে। তাই, সাম্রাজ্যবাদ সম্পর্কে ও তার স্বরূপ সম্পর্কে সচেতন পাঠ নেওয়া সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী লড়াইয়ের একটি অবিকল্প কর্তব্য। সাম্রাজ্যবাদ হলো– একটি সমন্বিত বিশ্ব ব্যবস্থায়, জাতীয় অর্থনীতি সমূহের পুঁজিকৃত (সমষ্টিগত) অবস্থা, যা গুণগতভাবে বর্ধিত উৎপাদনের সামাজিকীকরণের সাথে সংযুুক্ত আর যেখানে সমস্ত পৃথিবীর ভাগ বাটোয়ারা পুঁজিবাদী শ্রেণির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। বরাবরই জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুঁজির মাঝে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব দেখা যায়, পাশাপাশি পুঁজির ভিন্ন ভিন্ন ধরন বিভিন্ন পুঁজিবাদী গোষ্ঠী এবং তাদের স্বতন্ত্র ও সমষ্টিগত স্বার্থের মধ্যেও অসংগতি পরিলক্ষিত হয়। সাধারণ অর্থে দুধরনের সমাজ কাঠামোর মধ্য দিয়ে সাম্রাজ্যবাদ বিশেষভাবে চিহ্নিত হয়েছে। তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য- যেখানে পুঁজি পুঞ্জীভূত হয় (কেন্দ্র বা কোর) এবং যে সমাজ কাঠামোয় উদ্বৃত্ত মূল্য (মুনাফা) তৈরি হয়। সাম্রাজ্যবাদী কাঠামোতেই ক্ষমতাসীন পুঁজিবাদী শ্রেণির মূল নিহিত, যা অন্যান্য সমাজ কাঠামোর ওপর অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক ও ভাবাদর্শিকভাবে পুরোপুরি আধিপত্য বজায় রাখে ও শোষণ-নিপীড়ন চালায়। সোভিয়েত বিপ্লবের মহানায়ক ভ.ই লেনিন, ‘সাম্রাজ্যবাদ-পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ পর্যায়’ গ্রন্থে বলেন- “সাম্রাজ্যবাদ হলো পুঁজিবাদের বিকাশের সর্বোচ্চ পযায়। আর বিংশ শতকেই পুঁজিবাদ এখানে পৌঁছেছে, যে সকল জাতীয় রাষ্ট্রগুলি গঠন করা ছাড়া সামন্তবাদকে ছুড়ে ফেলা সম্ভব ছিল না সেই পুরোনো রাষ্ট্রের সীমাগুলো এখন পুঁজিবাদের বিকাশের পক্ষে সংকীর্ণ হয়ে পড়েছে। পুঁজিবাদ পুঁজির কেন্দ্রীভবনকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে গেছে যে শিল্পের এক একটা সমগ্র শাখাই নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে ধনকুবের পুঁজিপতিদের দ্বারা গঠিত সিন্ডিকেট, ট্রাস্ট ও সমিতিগুলোর দ্বারা এবং কোথাও উপনিবেশরূপে, কোথাও অন্য দেশগুলোকে লগ্নী পুঁজির হাজারো শৃংখলে শৃংখলিত করে। প্রায় সমস্ত দুনিয়াটাই ভাগ হয়ে গেছে পুঁজির প্রভুদের মধ্যে।” ১৯৯০ পরবর্তী সময়ে সাম্রাজ্যবাদ নতুন পন্থায় তার আগ্রাসন চালানোর জন্য উদ্যত হয়েছে। নব্য উপনিবেশবাদ সাম্রাজ্যবাদের আধুনিক সেই তৎপরতা যা বর্তমানে বিশ্বব্যাপী পুঁজির বিশ্বায়ন ও কয়েক শো কর্পোরেশন এর হাতে সমগ্র বিশ্ব মুঠোবন্দি হয়ে পড়ে। কর্পোরেশনগুলো বিভিন্ন দেশের “সংরক্ষিত” ক্ষেত্রগুলোতে তাদের আগমনের সুযোগ তৈরিতে সেসব দেশের সরকারগুলোর উপর চাপ প্রয়োগ করে বিশ্বব্যাংক, গ্যাট, আই.এম.এফ এর মতো সাম্রাজ্যবাদের এজেন্টদের দিয়ে। এভাবে কর্পোরেশনগুলো তাদের পণ্য, পুঁজি, পরিষেবা আর প্রযুক্তির অবাধ অনুপ্রবেশ ঘটায় নয়াউপনিবেশগুলোতে। ভ.ই. লেনিন তাঁর ‘জাতি এবং উপনিবেশ সংক্রান্ত প্রশ্ন’ তে নয়া উপনিবেশবাদকে এভাবে ব্যাখ্যা করেছেন,–‘সমস্ত দেশের, বিশেষ করে পিছিয়ে থাকা দেশগুলোর ব্যাপকতম জনগণের মধ্যে লাগাতারভাবে আগে ব্যাখ্যা করতে হবে এবং ফাঁস করে দিতে হবে সাম্রাজ্যবাদীরা সুনির্দিষ্টভাবে যে ভাঁওতা দিয়ে থাকে তার আসল চেহারাটিকে। এরা রাজনৈতিক স্বাধীনতার ছদ্মবেশের আড়ালে অর্থনৈতিকভাবে লগ্নিপুঁজি ও সামরিক দিক থেকে তাদের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল রাষ্ট্র তৈরি করে থাকে”। ১৯৬৬ সালে হাভানায় প্রথম আফ্রো-এশিয়া ল্যাটিন আমেরিকান জনগণের সংহতি সম্মেলনে গৃহীত “উপনিবেশবাদ ও নয়া উপনিবেশবাদ” সংক্রান্ত এক দলিলে বলা হয়– “নিজের প্রাধান্য নিশ্চিত করার জন্য সাম্রাজ্যবাদ প্রত্যেকটি দেশের জাতীয় সাংস্কৃতিক এবং নৈতিক মূল্যবোধগুলিকে ধ্বংস করে এবং প্রাধান্য বজায় রাখার জন্য একটি সিস্টেম দাঁড় করায়, যার মধ্যে রয়েছে সামরিকীকরণ, সামরিক ঘাঁটি স্থাপন, সাম্রাজ্যবাদী দেশের টেকনিক্যাল উপদেষ্টা সমেত নিপীড়ন চালানোর বিভিন্ন সংস্থা গঠন, গোপন সামরিক চুক্তি স্বাক্ষর, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন যুদ্ধবাজ জোট গঠন, পুতুল সরকার বসানোর তৎপরতা, সামরিক ক্যু, রাজনৈতিক হত্যা, আই.এম.এফ, উন্নয়ন ও পুনর্গঠন সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক ব্যাংক (আইবিআরভি) এর মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে একাজে ব্যবহার করে।” আসলে সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্র ও বহুজাতিক কর্পোরেশনগুলোর সম্পর্ক হলো পারস্পরিক মিথোজীবীতার (সিমবায়োটিক), বহুজাতিক কর্পোরেশনের মুনাফা সর্বোচ্চ করার জন্য কাঁচামালের উৎসের দখল ও নিয়ন্ত্রণের জন্য যেমন সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রের নানান সহায়তা প্রয়োজন তেমনি সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রের সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তি বজায় রাখার জন্য বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের উপর নির্ভর করা দরকার। ১৯৯৫ সালে উরুগুয়ে রাউন্ড ও গ্যাট চুক্তি করা হয় একচেটিয়া পুঁজির আন্তর্জাতিকীকরণের তাগিদ থেকে। বাংলাদেশে সাম্রাজ্যবাদ তার স্বার্থ সংরক্ষণ করছে বিশ্বব্যাংক, আই.এম.এফ, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মাধ্যমে বিনা যুদ্ধে, আইনি প্রক্রিয়ায়, বিভিন্ন উন্নয়ন মডেলের মাধ্যমে। সরকার, আমলাতন্ত্র, বৃহৎ কমিশনভোগীদের সাথে তার অন্যতম বাহন হিসেবে কাজ করছে কনসালটেন্ট, কর্পোরেট মিডিয়া, এন.জিও কিংবা সুশীল সমাজ। তাই বাংলাদেশে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন নেমে আসে, ‘আগে উন্নয়ন পরে গণতন্ত্র’ বুলির আড়ালে শিক্ষা ধ্বংসের ইউজিসি’র ২০ বছর মেয়াদি কৌশলপত্র, বহুজাতিক করর্পোরেশনের হাতে জ্বালানি সম্পাদ তুলে দেয়ার ‘পিএসসি-২০১২’, ‘টিকফা’ প্রভৃতি চুক্তির নামে। তাই, বাংলাদেশে সাম্রাজ্যবাদের আগ্রাসন ও লুণ্ঠনকে চিনতে হবে বহু গোপন ও প্রকাশ্য চুক্তি, উন্নয়ননীতি, শাসকগোষ্ঠীর শিক্ষাদর্শনের মধ্যে। এমতাবস্থায় বাংলাদেশের বাম-প্রগতিশীল শক্তির অবিকল্প কর্তব্য হচ্ছে, সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তোলা। বিভিন্ন গণআন্দোলন, শ্রেণিভিত্তিক আন্দোলনের ভেতর দিয়ে এই ভূ-খণ্ডের কিছু মৌলিক দ্বন্দ্ব আমাদের বিবেচনায় নিয়ে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রামকে সামনে অগ্রসর করে নিয়ে যেতে হবে। যা অবশ্যই বাস্তবতার নিরীখে পরিবর্তনশীল। দ্বন্দ্বগুলো হলো– সাম্রাজ্যবাদের দালাল শাসকগোষ্ঠীর সাথে ব্যাপক জনগণের দ্বন্দ্ব; কৃষকের সাথে অনুৎপাদক ভূমি মালিকের দ্বন্দ্ব; সামরিক ও বেসামরিক দালাল বুর্জোয়া শ্রেণির সাথে শ্রমিক শ্রেণির দ্বন্দ্ব; ব্যাপক জনগণের সাথে কর্পোরেট সাম্রাজ্যবাদ ও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের দ্বন্দ্ব; ফ্যাসিবাদী শাসক শ্রেণির সাথে নিপীড়িত জাতিসত্ত্বাসমূহের দ্বন্দ্ব। মানবমুক্তির সংগ্রাম, মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম, শোষণ বৈষম্যহীন সমাজতান্ত্রিক সমাজ-রাষ্ট্র বিনির্মাণের সংগ্রামকে অগ্রসর করে সাম্রাজ্যবাদকে পরাজিত করা ভিন্ন কোনও বিকল্প আমাদের সামনে নেই। আমরা যারা মানবমুক্তির সংগ্রামের কাফেলায় ইতোমধ্যে নিজেদের সংযুক্ত করেছি আমাদের কর্তব্য সম্পর্কে আমাদের সচেতন হতে হবে। মনে রাখতে হবে– সাম্রাজ্যবাদ, ফ্যাসিবাদ, উপনিবেশবাদ, প্রতিক্রিয়াশীল বুর্জোয়া জাতি-রাষ্ট্র কর্তৃক জাতিগত নিপীড়নের বিরুদ্ধে দৃঢ়ভাবে দাঁড়াতে হবে; জাতিগত সাম্প্রদায়িকতার বিপক্ষে দাঁড়ানো ও জাতিদ্বন্দ্বের শান্তিপূর্ণ সমাধানের পক্ষে দাঁড়াতে হবে; নিজস্ব জাতিসত্ত্বার প্রতিক্রিয়াশীল শাসকগোষ্ঠীর অন্য জাতিসত্ত্বার প্রতি বিদ্বেষ, বৈরীতা ও আধিপত্যবাদী মনোভাবের আপসহীন বিরোধিতা করতে হবে; সাম্রাজ্যবাদী জাতিকে নয়, সাম্রাজ্যবাদকে বিবেচনায় নিয়ে সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ ও আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম গড়ে তুলতে হবে; সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রামে উপনিবেশিক ও নয়া উপনিবেশিক রাষ্ট্রসহ সমগ্র বিশ্ব তথা সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোর শ্রমজীবী মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে কর্পোরেট সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সংহতি গড়ে তুলতে হবে। সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আগামীর সংগ্রামে ১ জানুয়ারি, ১৯৭৩ অনির্বাণ শিখা হিসেবে প্রজ্জ্বলিত থাকবে। শহীদ মতিউল ইসলাম ও শহীদ মির্জা কাদের চিরঞ্জীব ও চিরভাস্বর হয়ে থাকবেন সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী লড়াইয়ে, মানবতার মুক্তির সংগ্রামে।