24/05/2026
সমুদ্রের নিচের উষ্ণ স্রোত: আগামী দিনের আবহাওয়ার নতুন গল্প
এল নিনো হলো প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের পানির অস্বাভাবিক উষ্ণতা বৃদ্ধি। অপরদিকে যখন সমুদ্রের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি বেড়ে যায়, তখন সেটিকে “সুপার এল নিনো” বলা হয়। এমন ঘটনা সাধারণত ১০ থেকে ১৫ বছরে একবার ঘটে এবং এর প্রভাব অনেক বেশি দীর্ঘস্থায়ী ও বিস্তৃত হয়। এটি পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের আবহাওয়ার ওপর বড় প্রভাব ফেলে, যেমন খরা, অতিবৃষ্টি, তাপপ্রবাহ, ঘূর্ণিঝড়ের পরিবর্তন ইত্যাদি।
বিশেষজ্ঞদের মতে প্রশান্ত মহাসাগরের (Pacific Ocean) গভীরে প্রায় ৯ হাজার মাইল দীর্ঘ একটি অস্বাভাবিক উষ্ণ পানির প্রবাহ তৈরি হয়েছে এবং ২০২৬ সালের সম্ভাব্য এল নিনোটি গত ১৪০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী হতে পারে। এই সমুদ্রের গভীর স্তরে বিস্তৃত উষ্ণ পানির দীর্ঘ তরঙ্গকে বিজ্ঞানীরা কেলভিন ওয়েভ (Kelvin Wave) নামে নামকরণ করেছেন, কারণ এটি বিজ্ঞানী লর্ড কেলভিন কর্তৃক বর্ণিত ঘূর্ণায়মান পৃথিবীতে সীমান্ত-অনুসরণকারী (boundary-trapped) তরঙ্গগত গতির তাত্ত্বিক কাঠামোর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
আমরা অনেকেই ভাবছি এল নিনো শুধু দূরের কোনো দেশের আবহাওয়ার ঘটনা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এর প্রভাব বাংলাদেশেও খুব স্পষ্টভাবে অনুভূত হতে পারে। অতিরিক্ত গরম, দীর্ঘস্থায়ী হিটওয়েভ, অনিয়মিত বর্ষা, কোথাও অতিবৃষ্টি আবার কোথাও খরা; এসবই এল নিনোর সম্ভাব্য প্রভাব। এছাড়াও এর প্রভাবে দক্ষিণ এশিয়ায় মৌসুমি বৃষ্টিপাত দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ কারণ আমাদের কৃষি, মৎস্য, উপকূলীয় জীবন ও খাদ্য নিরাপত্তা সরাসরি আবহাওয়ার সাথে জড়িত। যদি বর্ষা দেরিতে আসে বা বৃষ্টির ধরণ অস্বাভাবিক হয়, তাহলে ধান উৎপাদন, মাছের প্রজনন, নদী ও উপকূলীয় বাস্তুসংস্থান প্রায় সবকিছুর ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। সমুদ্রের পানির তাপমাত্রা বেড়ে গেলে সামুদ্রিক মাছের মাইগ্রেশন, শৈবাল ব্লুম, ক্ষতিকারক শৈবাল ব্লুম (HABs) এবং উপকূলীয় মাছ চাষে বড় পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।
তবে বিজ্ঞানীরা এটাও বলছেন, এখনো শতভাগ নিশ্চিতভাবে “সুপার এল নিনো” ঘোষণা করার সময় আসেনি। কারণ এল নিনো তৈরি হওয়া নির্ভর করে সমুদ্র ও বায়ুমণ্ডলের জটিল পারস্পরিক ক্রিয়ার ওপর। অতীতে কয়েকবার শক্তিশালী পূর্বাভাস দিলেও তা দুর্বল হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এবারের সমুদ্রের তাপমাত্রা, কেলভিন ওয়েভ এবং বৈশ্বিক উষ্ণায়নের বর্তমান পরিস্থিতি বিজ্ঞানীদের উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের এই সময়ে বাংলাদেশকে শুধু দুর্যোগের পরে নয়, আগেই প্রস্তুতি নিতে হবে। কৃষি, পানি ব্যবস্থাপনা, উপকূলীয় সুরক্ষা, মৎস্য ও ব্লু-ইকোনমি খাতে এখন থেকেই অভিযোজন পরিকল্পনা আরও শক্তিশালী করা জরুরি। কারণ সমুদ্রের নিচের এই উষ্ণ স্রোত হয়তো আগামী দিনের আবহাওয়ার নতুন গল্প লিখতে শুরু করেছে।