15/09/2016
পৃথিবীতে একজন অত্যন্তজ্ঞানী এবং অভিজ্ঞ সত্ত্বা আছে, যে আমাদের সাইকোলজি নিয়ে খেলা করে আমাদেরকে প্রতিদিন না বুঝে অন্যায় কাজে ডুবিয়ে রাখে, নিজেদের সাথে প্রতারণা করায় এবং আমাদের পরিবারে মধ্যে আগুন জালিয়ে দেয়। আমাদের জলদি উপলব্ধি করা দরকার সে কে। কারণ যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা আমাদের প্রতি মুহূর্তের সঙ্গী, আমাদের সবচেয়ে বড় শত্রু শয়তান সম্পর্কে অজ্ঞ থাকবো; সে কিভাবে কাজ করে, কিভাবে সে মানুষকে ধোঁকা দেয়, কিভাবে আমাদের চিন্তাকে প্রভাবিত করে – এগুলো না বুঝবো; ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা না জেনে, না বুঝেপ্রতিনিয়ত তারই পরিকল্পনাগুলো সফল করতে বিনা পারিশ্রমিকে তার হয়ে কাজ করতে থাকবো।শয়তানের মানুষকে ধীরে ধীরে শেষ করার কয়েকটি প্রধান পদ্ধতি হলঃ*.নিজেকে যথেষ্ট ভালো মানুষ বলে বিশ্বাস করানো এবং নিজের অন্যায় কাজগুলো নিজেই যুক্তি দিয়ে ন্যায় কাজ বলে নিজেকে মানিয়ে নেওয়া। যেমন – আপনি ঘুষ দিয়ে ভাবছেন সেটা কোনো দোষের কিছু না, কারণ আপনি নিজে তো ঘুষ খাচ্ছেন না। আর ঘুষ না দিলে তো আপনি কাজটা অন্য কোনো ভাবে করাতে পারতেন না। তাই এই ঘুষ দেওয়াটা নিশ্চয়ই হালাল। এভাবে আপনি ‘হালাল ঘুষ’ এর প্রচলন শুরু করেন। একইভাবে ধীরে ধীরে হালাল সুদ, হালাল লোণ, হালাল ইনস্যুরেন্স, হালাল লটারি – এরকম অনেক কিছুই হালাল হয়ে যাওয়া শুরু হয় আপনার কাছে।শয়তান যেভাবে আদমের (আ) সামনে নত না হওয়ার জন্য যুক্তিতর্ক দিয়ে আল্লাহকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিল যে, সে যা করেছে সেটাই ঠিক, সেরকম আপনি যুক্তি দিয়ে আল্লাহকে বোঝানোর চেষ্টা করেন কোন হারামটা আসলে হারাম না। এভাবে আপনি শয়তানের দলের একজন হয়ে যান।*.আরেকটি পদ্ধতি হল – ধর্মে কোন বাধ্যবাধকতানেই – এটা বিশ্বাস করানো। আল্লাহর উপর বিশ্বাস থাকলেই হল। ধর্মীয় রীতিনীতি গুলো আসলে কিছু আনুষ্ঠানিকতা। সবার জন্য নামায, রোযা করা লাগে না। হজ্জ করতে গেলে যদি দেশে দুর্যোগ হয়, তখন পরিবারকে বাঁচাবে কে? মানুষকে যাকাত দিয়ে কি হবে? তারা তো আর যাকাত পেয়ে সচ্ছল হয়ে যাচ্ছে না। শয়তান নিজে যেমন ঠিকই আল্লাহকে বিশ্বাস করে, কিন্তু নামায, রোযা, যাকাত ইত্যাদি ধর্মীয় রীতিনীতি গুলো কিছুই মানে না, ঠিক সেভাবে সে আপনাকেও মানুষরূপী শয়তান বানিয়ে ফেলে।*.চাকরি, ব্যবসা, পড়ালেখা ইত্যাদি দৈনন্দিন কাজগুলোকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে বিশ্বাস করানো এবং মনে করা যে – আল্লাহর সাথে আমার চুক্তি আছে, আল্লাহ আমাকে মাফ করে দিবে। যেমন –আমি একজন ডাক্তার! আমি মানুষের জীবনবাঁচাই! আমার নিশ্চয়ই পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়ার দরকার নেই? আমি তো সেই সময়ে কয়েকজন রুগীর জীবন বাঁচাতে পারি। কোনটা বেশি জরুরি? নামায পড়া না মানুষের জীবন বাঁচানো? আল্লাহ নিশ্চয়ই আমাকে মাফ করে দিবে।*.সবসময় টাকা পয়সা, সম্পত্তি, সুখ হারানোর ভয়ের মধ্যে রাখা। যেমন, আপনার এক গরিব আত্মীয় চিকিৎসার জন্য আপনার কাছে টাকা চাইতে আসলো, কিন্তু আপনি ভাবা শুরু করলেন –এই লোকটাকে কয়েক হাজার টাকা দিলে তো আমার বাড়ি কেনার জন্য জমানো সত্তুর লাখ টাকা কমেযাবে, আমার বাড়ি কেনা পিছিয়ে যাবে! কালকে যদি আমার চাকরি চলে যায়, তাহলে তো আর আমার বাড়ি কেনা হবে না? যদি এক মাস পরে বাড়ির দামহঠাৎ করে বেড়ে যায়?*.নিজেকে দিয়ে অন্যায় করাতে না পারলে, কাছের মানুষদেরকে দিয়ে ভুলিয়ে ভালিয়ে অন্যায় করানো। যেমন, আপনি বহুদিন চেষ্টার পর আজকে শেষ পর্যন্ত কু’রআন নিয়ে বসেছেন পড়ার জন্য, কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই আপনার স্বামী বাস্ত্রী এসে আপনাকে টিভিতে একটা অনুষ্ঠান দেখার জন্য তাগাদা দেওয়া শুরু করলো। অথবা আপনি অনেক আয়োজন করে বসেছেন একটা ইসলামিক আর্টিকেল পড়বেন, কিন্তু পড়া শুরু করতে না করতেই বন্ধুর ফোন –দোস্ত, চল্ কালকে ‘ইয়ে’করতে যাই।শুরু হল আধা ঘণ্টা ফোনে কথা, তারপর রাতের খাওয়া, টিভি এবং ঘুম। আপনার আর সেদিন আর্টিকেল পড়া হল না। তার পর কয়েক সপ্তাহ পার হয়ে গেল, আপনি ভুলে গেলেন সেই আর্টিকেলের কথা।*.উপরের প্রত্যেকটা পদ্ধতি পড়ার সময় আপনার আশেপাশের কারও না কারও কথা মনে হচ্ছিল এবং আপনি মনে মনে ভাবছিলেন –তাইতো! এগুলো সবই দেখি ওর সাথে মিলে যায়!আপনার ভেতরে এই যে চিন্তাটা হচ্ছে, যেখানে আপনি মনে করছেন আপনার এই সমস্যাগুলোর কোনোটাই নেই, এগুলো সবই হচ্ছে আপনার আশেপাশের মানুষদের সমস্যা– এটা শয়তান আপনার ভেতরে ঢুকিয়ে দিচ্ছে। সে সবদিক থেকে চেষ্টা করবে যেন আপনি কখনও মনে না করেন এই আর্টিকেলে যতগুলো সমস্যা আপনি শিখবেন, তার কোনটা আপনার ভেতরেও আছে।শয়তানের মানুষকে বোকা বানানোর এই পদ্ধতি গুলো শয়তান হাজার হাজার বছর ধরে সফল ভাবে ব্যবহার করে আসছে। পৃথিবীতে বিলিয়ন মানুষকেসে প্রতিনিয়ত বোকা বানিয়ে যাচ্ছে। আপনি যদি তার সহযোগী হয়ে তার মহাপরিকল্পনা সফল করতে বিনা পারিশ্রমিকে তার হয়ে কাজ করতে না চান, তাহলে আসুন আমরা ভালো করে বোঝার চেষ্টা করি কিভাবে শয়তান কাজ করে।শয়তান আসলে কিপ্রথমত, আমাদেরকে ভালো করে বুঝতে হবে ইবলিস এবং তার শয়তান বাহিনী আসলে কি ধরণের সত্তা এবং আল্লাহ তাদেরকে কতখানি ক্ষমতা দিয়েছেন এবং কি ধরণের খারাপ কাজ শয়তান আপনাকে দিয়ে করায়, আর কি ধরণের খারাপ কাজ আপনি নিজে আপনারনিজের প্রবৃত্তির কারণে করেন। প্রথমে শয়তানের সংজ্ঞা কি ভালো ভাবে জানা দরকারঃশয়তানঃ মানুষ বা জ্বিন, যারা ইবলিস এবং তার উদ্দেশ্যকে বাস্তবায়ন করতে সাহায্য করে।ইবলিস এক মহা জ্ঞানী সত্তা। সে একজন জ্বিন ছিল, যাদেরকে আল্লাহ ﷻ মানুষ সৃষ্টি করার অনেক আগেই সৃষ্টি করেছিলেন [আল-হিজর ১৫:২৭]। সে আল্লাহর ﷻ ইবাদত করে এতটাই উপরে উঠতে পেরেছিল যে, আল্লাহ ﷻ তার সাথে কথা বলতেন এবং আল্লাহর ﷻ মহাপরিকল্পনার অনেক কিছুই সে জানতো। এছাড়াও সে তার যোগ্যতার কারণে আল্লাহর ﷻ কাছের সন্মানিত ফেরেশতাদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয়ে গিয়েছিল।[৪] কিন্তু তারপর ঘটলো এক বিস্ময়কর ঘটনা, যার পর এত সন্মানিত এবং জ্ঞানী এক সত্তা তার সবকিছু হারিয়ে ফেললো। আমরা অনেকেই ছোট বেলায় ইবলিসের এই অবাধ্যতার ঘটনাটা শুনেছি এবং ভেবেছি – “ছি, ইবলিস কি বোকা, সে এত বড় ভুল কিভাবে করলো।” আবার অনেকে ভেবেছি – “আহারে বেচারা ইবলিস। আল্লাহ ﷻ ইবলিসকে একটা ভুলের জন্য এত বড় শাস্তি দিল? এত বড় একজন সত্তাকে সারা জীবনের জন্য বের করে দিলো? শাস্তিটা বেশি হয়ে গেল না?” শুধু তাই না, এই ধারণা থেকে Devil Worshipper ‘শয়তান পূজারী ধর্ম’ তৈরি হয়ে গেছে, যার অনুসারীরা মনে করে সেদিন ইবলিসের সাথে অন্যায় করা হয়েছিল এবং তারা ইবলিসের উপাসনা করে এবং অপেক্ষা করছে কবে ইবলিসের সাথে ‘গডের’ শেষ যুদ্ধ হবে, যেদিন তারা ইবলিসের সহযোগিতা করবে।আমাদের ভালো করে বোঝা দরকার সেদিন কী ঘটেছিল। ধরুন, আপনি আপনার চাকরি জীবনের প্রথম থেকে একটা কোম্পানিতে নিষ্ঠার সাথে কাজ করে আসছেন। গত ত্রিশ বছর কঠোর পরিশ্রম করে আপনি একজন মামুলি কেরানি থেকে আজকে কোম্পানির প্রেসিডেন্ট হয়েছেন। আপনার সাথে কোম্পানির চেয়ারম্যানের অনেক ভালো সম্পর্ক,আপনি তার অনেক কাছের একজন মানুষ। কিন্তু হঠাৎ একদিন আপনার চেয়ারম্যান আপনাকে বলল যে,সদ্য অক্সফোর্ড থেকে গ্রাজুয়েট একজন তরুন ছেলে কালকে থেকে কোম্পানির প্রেসিডেন্ট হবেএবং আপনাকে তার অধীনে ভাইস-প্রেসিডেন্ট হিসেবে কাজ করতে হবে। আপনার অবস্থা তখন কী হবে? একজন সদ্য গ্রাজুয়েট হবে প্রেসিডেন্ট, আর আপনি যেখানে ত্রিশ বছর ধরে কোম্পানিতে কাজ করছেন, সেখানে আপনি হবেন তার অধীনে একজন কর্মচারী! আপনার সাথে এতো বড় অন্যায়?আপাতত দৃষ্টিতে মনে হতে পারে, ইবলিসের এই প্রতিক্রিয়াটা স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু এখানে অনেক চিন্তার ব্যাপার আছে। প্রথমত, ইবলিসের আল্লাহর ﷻ অস্তিত্ব সম্পর্কে সম্পূর্ণ ধারণা ছিল। আপনি, আমি নিজের চোখে আল্লাহকে দেখিনি, নিজের কানে আল্লাহকে শুনিনি। আমরা কোনো ফেরেশতাকেও কোনোদিন দেখিনি। আপনার-আমার পক্ষে আল্লাহ্র ﷻ প্রতি সম্পূর্ণ অবিচল, অটুট বিশ্বাস রাখাটা যথেষ্ট কঠিন। কিন্তু ইবলিস নিজে আল্লাহর সাথে কথা বলতে পারতো। এমনকি সে সন্মানিত ফেরেশতাদের সাথেও থাকতো। তার জন্য আল্লাহকেﷻ প্রভু হিসেবে মেনে, কোনো ধরণের প্রশ্ন না করে, তাঁর আদেশ মেনে চলাটাই স্বাভাবিক ছিল। আল্লাহর ﷻ অবস্থান কত উপরে এবং সে কত নিচে; আল্লাহর ﷻ অস্তিত্ব যে কত ব্যাপক, তাঁর ক্ষমতা যে কত বিশাল এবং সে আল্লাহর ﷻ তুলনায় কত দুর্বল একজন মামুলি সৃষ্টি—এগুলো তার খুব ভালো ভাবে জানা থাকার কথা। সৃষ্টি জগতের মধ্যে আল্লাহর ﷻ প্রতি সবচেয়ে বেশি বিশ্বাসী এবং সবচেয়ে বেশি অনুগতদের মধ্যে একজন হওয়ার কথা তার। কিন্তু এই সবকিছু দেখার, শোনার এবং জানার পরেও, সে কিভাবে আল্লাহর ﷻ আদেশের উপর সোজা ‘না’ করে দিল, সেটা এক বিস্ময়কর ঘটনা। কু’রআনে পরে কয়েকটি সূরায় আল্লাহ ﷻ ইবলিসের সাথে সেদিন তাঁর যে কথোপকথন হয়েছিল, তা আমাদেরকে জানিয়েছেনঃআল্লাহ বললেন, “ইবলিস, যাকে আমি নিজের হাতে সৃষ্টি করেছি, তার প্রতি তুমি অনুগত হতে পারলে না কেন? তুমি কি তখন অহংকার করছিলে, নাকি তুমি নিজেকে মহিমান্বিতদের একজন মনে করো?” – [সাদ ৩৮:৭৫]স্রষ্টার কাছ থেকে এত কঠিন একটা প্রশ্ন সরাসরি শোনার পরে স্বাভাবিক ভাবেই ইবলিসের উচিৎ ছিল সাথে সাথে ক্ষমা চাওয়া এবং স্বীকারকরা যে, সে বড় ভুল করে ফেলেছে, তাকে মাফ করে দেওয়া হোক। কিন্তু সে তা না করে উলটো আল্লাহকে ﷻ বোঝানোর চেষ্টা করলোঃসে বলল, “আমি ওর থেকে বড়। আপনি আমাকে আগুন থেকে বানিয়েছেন, আর ওকে বানিয়েছেন মাটি থেকে।” [সাদ ৩৮:৭৬]ইবলিস কিন্তু বলতে পারতো, “আমি আপনার কত বছর থেকে ইবাদত করছি, আপনার কত কাছের আমি, আপনার প্রতি কত অনুগত, আর আপনি আমাকে বলছেন নতুন একজনের কাছে নত হতে?” অথবা সে বলতে পারতো, “আমাকে কেন ওই নতুন সৃষ্টির প্রতি অনুগত হতে হবে, তা আমাকে বুঝিয়ে বলবেন কি, যাতে আমি নিজেকে বোঝাতে পারি?” সে এর কোনোটাই করেনি। সে কার মুখের উপর ‘না’ বলছে, কাকে যুক্তি দিয়েবোঝানোর চেষ্টা করছে—সেটা সে ভুলে গিয়েছিল।ইবলিসের এই মানসিকতা কিছু মানুষের মধ্যেও আছে। যেমন, চৌধুরী সাহেব মনে করেন: পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়া, ত্রিশটা রোজা রাখার আসলে কোনো দরকার নেই। এই সব নামায, রোজা শুধু ওই সব অর্ধ-শিক্ষিত, অল্প-জ্ঞানী ‘মোল্লা’ টাইপের মানুষদের জন্য দরকার, যারা এখনও তার মত চিন্তার গভীরতা এবং উপলব্ধির উচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেন