28/05/2026
আয়াত:
وَلِکُلِّ اُمَّۃٍ جَعَلۡنَا مَنۡسَکًا لِّیَذۡکُرُوا اسۡمَ اللّٰہِ عَلٰی مَا رَزَقَہُمۡ مِّنۡۢ بَہِیۡمَۃِ الۡاَنۡعَامِ ؕ فَاِلٰـہُکُمۡ اِلٰہٌ وَّاحِدٌ فَلَہٗۤ اَسۡلِمُوۡا ؕ وَبَشِّرِ الۡمُخۡبِتِیۡنَ ۙ
অনুবাদ: আমি প্রত্যেক উম্মতের জন্য কুরবানীর নিয়ম করে দিয়েছি যাতে আল্লাহ তাদেরকে যে চতুষ্পদ জন্তুসমূহ দিয়েছেন তাতে তারা আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে। তোমাদের মাবুদ একই মাবুদ। সুতরাং তোমরা তাঁরই আনুগত্য করবে। আর সুসংবাদ দাও বিনীতদেরকে।
তাফসীর: (উপরে হেরেম-শরীফে কোরবানী করার যে আদেশ বর্ণিত হয়েছে, এতে কেউ যেন মনে না করে যে, আসল উদ্দেশ্য হেরেমের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা। প্রকৃতপক্ষে আসল উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর সম্মান ও তাঁর নৈকট্য লাভ করা। যবেহকৃত জন্তু ও যবেহর স্থান এর উপায় মাত্র এবং স্থানের বিশেষত্ব কোন কোন রহস্যের কারণে। যদি এই বিশেষত্ব আসল উদ্দেশ্য হতো, তবে কোন শরীয়তেই তা পরিবর্তন হতো না। কিন্তু এগুলোর পরিবর্তন সবারই জানা। তবে আসল উদ্দেশ্য আল্লাহর নৈকট্য, এটা সব শরীয়তে সংরক্ষিত আছে। সেমতে) আমি (যত শরীয়ত অতিক্রান্ত হয়েছে, তাদের) প্রত্যেক উম্মতের জন্য কোরবানী নির্ধারণ করেছিলাম, যাতে তারা আল্লাহর দেয়া চতুষ্পদ জন্তুদের উপর আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে (সুতরাং এই নাম উচ্চারণ করাই আসল উদ্দেশ্য ছিল)। অতএব (এ থেকে বুঝা গেল যে,) তোমাদের উপাস্য একই আল্লাহ্ (যাঁর নাম উচ্চারণ করে নৈকট্য লাভের আদেশ সবাইকে করা হতো)। সুতরাং তোমরা সর্বান্তকরণে তাঁরই হয়ে থাক (অর্থাৎ খাঁটি তওহীদপন্থী থাক, কোন স্থান ইত্যাদিকে আসল সম্মানাই মনে করে শিরকের বিন্দু পরিমাণ নামগন্ধ নিজেদের আমলে প্রবিষ্ট হতে দিও না।) এবং হে মুহাম্মদ (সা), যারা আমার এই শিক্ষা অনুসরণ করে) আপনি (আল্লাহর বিধানাবলীর সামনে) মস্তক নতকারীদেরকে (জান্নাত ইত্যাদির) সুসংবাদ শুনিয়ে দিন। যারা (এই খাঁটি তওহীদের বরকতে) এমন যে, যখন (তাদের সামনে) আল্লাহর (বিধানাবলী, গুণাবলী, ওয়াদা ও সতর্কবাণী) স্মরণ করা হয়, তখন তাদের অন্তর ভীত হয় এবং যারা বিপদাপদে সবর করে এবং যারা নামায কায়েম করে এবং যারা আমি যা দিয়েছি, তা থেকে (আদেশ তওফীক অনুযায়ী) ব্যয় করে (অর্থাৎ খাঁটি তওহীদ এমন বরকতময় যে, এর বদৌলতে মাসিক, দৈহিক ও আর্থিক উৎকর্ষ সৃষ্টি হয়ে যায়। এমনিভাবে উপরে আল্লাহর নিদর্শনাবলীর প্রতি সম্মান প্রদর্শন প্রসঙ্গে কোন কোন উপকার লাভ নিষিদ্ধ বলে জানা গেছে। এ থেকেও সন্দেহ করা উচিত নয় যে, কোরবানী আসল সম্মানার্হ। কেননা, তা দ্বারাও আল্লাহ ও তাঁর ধর্মের প্রতি সম্মান প্রদর্শন উদ্দেশ্য। বিশেষত্বগুলো তার একটি পন্থা মাত্র। সুতরাং কোরবানীর উট ও গরুকে (এমনিভাবে ছাগল-ভেড়াকে) আমি আল্লাহর (ধর্মের) স্মৃতি করেছি (এ সম্পর্কিত বিধানাবলীর জ্ঞানার্জন ও আমল দ্বারা আল্লাহর মাহাত্ম্য ও ধর্মের সম্বনে প্রকাশ পায়। আল্লাহর নামে উৎসর্গিত জন্তু দ্বারা উপকৃত হওয়ার ব্যাপারে রূপক মালিকের মতামত অগ্রাহ্য হলে তার দাসত্ব এবং সত্যিকার মালিক আল্লাহর উপাস্যতা প্রকাশ পায় এবং এই ধর্মীয় রহস্য ছাড়া) এসব জন্তুর মধ্যে তোমাদের (আরও) উপকার আছে (যেমন পার্থিব উপকার নিজে খাওয়া ও অপরকে খাওয়ানো এবং পারলৌকিক উপকার সওয়াব।) সুতরাং (যখন এতে এসব রহস্য আছে, তখন) এগুলোর উপর দণ্ডায়মান অবস্থায় (যবেহ করার সময়) আল্লাহর নাম উচ্চারণ কর। (এটা শুধু উটের জন্যে বলা হয়েছে। কারণ, উটকে দণ্ডায়মান অবস্থায় যবেহ করা উত্তম। কারণ এতে যবেহ ও আত্মা নির্গমন সহজ হয়। সুতরাং এর ফলে পারলৌকিক উপকার অর্থাৎ সওয়াব অর্জিত হলো এবং আল্লাহর মাহাত্ম্য প্রকাশ পেল। কেননা, তাঁর নামে একটি প্রাণের কোরবানী হলো। ফলে তিনি যে স্রষ্টা এবং এটা যে সৃষ্টি, তা প্রকাশ করে দেয়া হলো।) অতঃপর যখন উট কাত হয়ে পড়ে যায় (এবং ঠাণ্ডা হয়ে যায়), তখন তা থেকে তোমরাও যাও এবং আহার করাও যে যাচ্ঞা করে, তাকে এবং যে যাচ্ঞা করে না, তাকে (এরা بائس فقير এর দুই প্রকার। এটা পার্থিব উপকারও।) এমনিভাবে আমি এসব জন্তুকে তোমাদের অধীন করে দিয়েছি (তোমরা দুর্বল এবং তারা শক্তিশালী। এতদসত্ত্বেও তোমরা তাদেরকে এভাবে যবেহ করতে পার), যাতে তোমরা (এই অধীন করার কারণে আল্লাহ তা’আলার) কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর। (এই রহস্য প্রত্যেক যবেহর মধ্যে—কোরবানীর হোক বা না হোক। অতঃপর যবেহর বিশেষত্বগুলো যে আসল উদ্দেশ্য নয়, তা একটি যুক্তির মাধ্যমে বর্ণনা করা হচ্ছে যে, দেখ, এটা জানা কথা.) আল্লাহ্ তা’আলার কাছে এগুলোর গোশত ও রক্ত পৌঁছে না; কিন্তু তাঁর কাছে তোমাদের তাকওয়া (নৈকট্যের নিয়ত এবং আন্তরিকতা যার শাখা, অবশ্য) পৌছে। (সুতরাং এটাই আসল উদ্দেশ্য প্রমাণিত হলো। উপরে كَذَلِكَ سَخَّرَهَا لَكُمْ বলে অধীন করার একটি সাধারণ রহস্য বর্ণনা করা হয়েছিল। অর্থাৎ কোরবানী হোক বা না হোক। অতঃপর অধীন করার একটি বিশেষ রহস্য অর্থাৎ কোরবানী হওয়ার দিক দিয়ে বর্ণনা করা হচ্ছে :) এমনিভাবে আল্লাহ তাআলা এসব জন্তুকে তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন, যাতে তোমরা (এগুলোকে আল্লাহর পথে কোরবানী করে) আল্লাহর মাহাত্ম্য ঘোষণা কর এ কারণে যে, তিনি তোমাদেরকে (এভাবে কোরবানী করার) তওফীক নিয়েছেন। (নতুবা আল্লাহর তওফীক পথপ্রদর্শক না হলে হয় যবেহর মধ্যেই সন্দেহ করে এই ইবাদত থেকে বঞ্চিত থাকতে, না হয় অন্যের নামে যবেহ করতে।) এবং হে মুহাম্মদ (সা)]আপনি আন্তরিকতাশীলদেরকে সুসংবাদ শুনিয়ে দিন (পূর্বেকার সুসংবাদ আন্তরিকতার শাখা সম্পর্কে ছিল। এটা বিশেষ করে আন্তরিকতা সম্পর্কে)।
وَلِكُلِّ أُمَّةٍ جَعَلْنَا مَنْسَكًا
আরবী ভাষায় منسك ও نسك কয়েক অর্থে ব্যবহৃত হয়। এক. জন্তু কোরবানী করা, দুই. হজ্জের ক্রিয়াকর্ম এবং তিন. ইবাদত। কোরআন পাকে বিভিন্ন স্থানে এই শব্দটি তিন অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। আলোচ্য আয়াতে তিন অর্থই হতে পারে। এ কারণেই তফসীরকারক মুজাহিদ প্রমুখ এখানে منسك এর অর্থ কোরবানী নিয়েছেন। আয়াতের অর্থ হবে এই যে, এই উম্মতকে কোরবানীর যে আদেশ দেওয়া হয়েছে, তা কোন নতুন আদেশ নয়, পূর্ববর্তী উম্মতদেরকেও কোরবানীর আদেশ দেওয়া হয়েছিল। কাতাদাহ্ দ্বিতীয় অর্থ নিয়েছেন। তাঁর মতে আয়াতের অর্থ এই যে, হজ্জের ক্রিয়াকর্ম যেমন এই উম্মতের উপর আরোপ করা হয়েছে, তেমনি পূর্ববর্তী উম্মতদের উপরও হজ্জ ফরয করা হয়েছিল। ইবনে আরাফা তৃতীয় অর্থ ধরে আয়াতের অর্থ করেছেন যে, আমি আল্লাহর ইবাদত পূর্ববর্তী উম্মতদের উপরও ফরয করেছিলাম। ইবাদতের পদ্ধতিতে কিছু কিছু পার্থক্য সব উম্মতেই ছিল; কিন্তু মূল ইবাদত সবার মধ্যে অভিন্ন ছিল।
وَبَشِّرِ الْمُخْبِتِينَ
আরবী ভাষায় خبت শব্দের অর্থ নিম্নভূমি। এ কারণে এমন ব্যক্তিকে خبيت বলা হয়, যে নিজেকে হেয় মনে করে। এ জন্যই কাতাদাহ ও মুজাহিদ مُخْبِتِينَ এর অর্থ করেছেন বিনয়ী। আমর ইবনে আউস বলেনঃ এমন লোকদেরকে مُخْبِتِينَ বলা হয়, যারা অন্যের উপর যুলুম করে না। কেউ তাদের উপর যুলুম করলে তারা তার প্রতিশোধ নেয় না। সুফিয়ান বলেনঃ যারা সুখে-দুঃখে, স্বাচ্ছন্দ্যে ও অভাব-অনটনে আল্লাহর ফয়সালা ও তকদীরে সন্তুষ্ট থাকে, তারাই مُخْبِتِينَ
وجل— وَجِلَتْ قُلُوبُهُمْ
এর আসল অর্থ ঐ ভয়ভীতি, যা কাহারও মাহাত্ম্যের কারণে অন্তরে সৃষ্টি হয়। আল্লাহর সৎকর্মপরায়ণ বান্দাদের অবস্থা এই যে, আল্লাহ্ তা’আলার যিকর ও নাম শুনে তাদের অন্তরে এক বিশেষ ভীতি সঞ্চার হয়ে যায়।
وَالْبُدْنَ جَعَلْنَاهَا لَكُمْ مِنْ شَعَائِرِ اللَّهِ
পূর্বে বর্ণিত হয়েছে যে, ইসলাম ধর্মের আলামতরূপে গণ্য হয়, এমন বিশেষ বিধি-বিধান ও ইবাদতকে বলা হয়। কোরবানীও এমন বিধানাবলীর অন্যতম। কাজেই এ ধরনের বিধানসমূহ পালন করা অধিক গুরুত্বপূর্ণ।
صواف — فَاذْكُرُوا اسْمَ اللَّهِ عَلَيْهَا صَوَافَّ
শব্দের অর্থ সারিবদ্ধভাবে। আবদুল্লাহ ইবনে উমর এর তফসীর প্রসঙ্গে বলেনঃ জন্তু তিন পায়ে ভর দিয়ে দণ্ডায়মান থাকবে এবং এক পা বাঁধা থাকবে। উটের জন্য এই নিয়ম। দণ্ডায়মান অবস্থায় উট কোরবানী করা সুন্নত ও উত্তম। অবশিষ্ট সব জন্তুকে শোয়া অবস্থায় যবেহ্ করা সুন্নত।
فَإِذَا وَجَبَتْ جُنُوبُهَا
এখানে وجبت -এর অর্থ سقطت; যেমন বাকপদ্ধতিতে বলা হয় وجبت الشمس অর্থাৎ সূর্য ঢলে পড়েছে। এখানে জন্তুর প্রাণ নির্গত হওয়া বুঝানো হয়েছে। الْقَانِعَ وَالْمُعْتَرَّ যাদেরকে কোরবানীর গোশ্ত দেওয়া উচিত, পূর্ববর্তী আয়াতে তাদেরকে بائس فقير বলা হয়েছে। এর অর্থ দুঃস্থ অভাবগ্রস্ত। এই আয়াতে তৎস্থলে قانع ومعتر শব্দদ্বয়ের দ্বারা তার তফসীর করা হয়েছে। قانع ঐ অভাবগ্রস্ত ফকিরকে বলা হয়, যে কারও কাছে যাচ্ঞা করে না, দরিদ্র্য সত্ত্বেও স্বস্থানে বসে থাকে এবং কেউ কিছু দিলে তাতেই সন্তুষ্ট থাকে। পক্ষান্তরে معتر ঐ ফকিরকে বলা হয়, যে কিছু পাওয়ার আশায় অন্যত্র গমন করে মুখে সওয়াল করুক বা না করুক। —(মাযহারী)
ইবাদতের বিশেষ পদ্ধতি আসল উদ্দেশ্য নয়; বরং মনের তাকওয়া ও আনুগত্যই আসল উদ্দেশ্যঃ لَنْ يَنَالَ اللَّهَ لُحُومُهَا —বাক্যে একথা বলা উদ্দেশ্য যে, কোরবানী একটি মহান ইবাদত ; কিন্তু আল্লাহর কাছে এর গোশত ও রক্ত পৌঁছে না এবং কোরবানীর উদ্দেশ্যও এগুলো নয় ; বরং আসল উদ্দেশ্য জন্তুর উপর আল্লাহর নাম উচ্চারণ করা এবং পূর্ণ আন্তরিকতা সহকারে পালনকর্তার আদেশ পালন করা। অন্য সব ইবাদতের মূল উদ্দেশ্যও তাই। নামাযে ওঠাবসা করা, রোযায় ক্ষুধার্ত ও পিপাসার্ত থাকা আসল উদ্দেশ্য নয়; বরং আল্লাহর আদেশ পালন করাই আসল লক্ষ্য। আন্তরিকতা ও মহব্বতবর্জিত ইবাদত প্রাণহীন কাঠামো মাত্র। কিন্তু ইবাদতের শরীয়তসম্মত কাঠামোও এ-কারণে জরুরী যে, আল্লাহর পক্ষ থেকে তার আদেশ পালনের জন্য এই কাঠামো নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে।والله اعلم
তাফসীরে মা‘আরেফুল কুরআন।
রেফারেন্স: সূরা হজ্জ ৩৪ নং আয়াত