25/07/2019
জ্যামটা ইদানীং প্রচুর বেড়ে গেছে।
জ্যামে বসে সময় কাটানোর একটা ভালো উপায় হচ্ছে বই পড়া। যেহেতু আমাকে প্রায় প্রতিদিনই ঢাকার এমাথা-ওমাথা ক্রস করতে হয় তাই আমার ব্যাগে কোনো না কোনো বই থাকেই।
সেদিন পড়ছিলাম নেলসন ম্যান্ডেলার আত্মজীবনী। বেশ ডুবে গিয়েছিলাম বইটায়। হঠাৎ পাশ থেকে শুনি, এক লোক ভারী গলায় জিজ্ঞেস করছেন, 'কার বই পড়েন? ম্যান্ডেলার?'
আমি মুখ তুলে তাকালাম। বইয়ে ডুবে থাকার কারণে পাশে কে বসেছে খেয়াল করি নি। ত্রিশোর্ধ্ব বয়স, স্বাস্থ্যবান। মুখে চাপ দাড়ি। গায়ের রঙ কালো।
উনি বলে চললেন, এই বিপ্লবী নেতা সারাজীবন বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে গেছেন। লাভ কি হয়েছে? রেসিজম ছিল, রেসিজম আছে, রেসিজম থাকবে। এটা শুধু আফ্রিকার না, যেকোনো দেশের যেকোনো কালো মানুষের মনের কথা।
আমি প্রতিবাদ করলাম। বললাম, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে রেসিজমের বোধহয় তেমন ইমপ্যাক্ট নেই।
লোকটা আমার কথা হেসেই উড়িয়ে দিল। বলল, কোন দুনিয়ায় যে থাকেন ভাই। কালো মানুষের গল্প শুনতে চান? বই রাখেন, আমার গল্প শোনেন। মজা পাবেন।
লোকটা শুরু করল-................................................................................
'আমার নাম রাকিব। কিন্তু জীবনের বেশির ভাগ সময় লোকে আমাকে 'কালা রাকিব' বলেই ডেকেছে। পরিবার থেকে স্কুল, স্কুল থেকে কলেজ, কলেজ থেকে ভার্সিটি- এমন কোনো জায়গা নেই যেখানে আমার গায়ের রঙ নিয়ে খোটা শুনতে হয় নি।
মানুষ আমাকে ডাক দিতো কাল্লু, কাউলা কিংবা নিগ্রো বলে। জিম্বাবুয়ের যখন খেলা চলতো তখন বন্ধু-বান্ধব বলতো আমার জাত ভাইদের নাকি খেলা চলে। মানুষজন এসে আমার মায়ের কানে কানে বলতো, রাকিব যে কালো, ওর কাছে তো কেউ মেয়ে বিয়ে দিবে না। ইভেন টিচাররা ক্লাসে পড়া জিজ্ঞেস করার সময় ডাক দিতো 'এই কালো ছেলে...দাঁড়াও'।
জগৎ নিষ্ঠুরভাবে সৌন্দর্যের পূজারী- এটা আমি ছোটবেলাতেই বুঝে ফেলি। মানুষজন বলে, দেহের সৌন্দর্য প্রধান নয়, মনের সৌন্দর্যই আসল। এটা যে কি পরিমাণ ভুয়া কথা তা আমি টের পেয়েছি প্রেমের চেষ্টা করতে গিয়ে। যেই মেয়েকে একটু ভালো লাগতো, সেই-ই আমাকে রিজেক্ট করে দিতো। আরে...দেখতে ভালো না হইলে কে আমার মনের সৌন্দর্য খুঁজে বের করতে আসবে?
কলেজে উঠলাম। ততোদিনে আমি আমার মনকে বুঝ দিয়ে ফেলেছি। কেউ কালা-টালা, অসুন্দর বললেও আমার আর তেমন গায়ে লাগে না। ক্লাসে আরেকজন রাকিব ছিল। টম ক্রুজের মতো ফর্সা আর হ্যান্ডসাম। ওর নাম দিল সবাই ধলা রাকিব। আর আমি কালা রাকিব। ধলা রাকিবের উপর প্রতিদিন তিন-চারটা মেয়ে ক্রাশ খায়। আর কালা রাকিব? ফরেভার এলোন।
এইসময় বজ্রপাতের মতো আমার জীবনে একজনের আগমন ঘটল, নাম তার শায়লা। আমাদের জেলার ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেটের মেয়ে। হুমায়ূন আহমেদের বইয়ের নায়িকাদের যেমন বিবরণ থাকে, তেমন সুন্দর। প্রথম দেখাতেই আমি ধপাস করে প্রেমে পড়ে গেলাম।
শায়লার সাথে কেউ সাহস করে কথা বলতে পারছিল না। লোকমুখে শোনা যেত, শায়লার তিন বড়ভাই আছে। তিনজনই বডি বিল্ডার। শায়লার সাথে কাউকে দেখলে নাকি হাড্ডি- গুড্ডি ভেঙে নদীতে ভাসিয়ে দেবে।
আর আমার কি ভাগ্য! ক্লাসে আসার এক সপ্তাহ পর শায়লা আমার কাছে এসে বলল-
'রাকিব, শুনেছি তুমি খুব ভালো নোট তোলো। আমাকে কি তোমার বাংলা নোট খাতাটা একটু দিতে পারবে?'
আমি পারলে বলি- নোট খাতা কেন আমার জীবনটাই নিয়ে যাও! আর ওই প্রথম ক্লাসে কেউ আমাকে কালা রাকিব বাদে শুধু রাকিব ডেকেছিল। আনন্দে আমার চোখে পানি এসে গিয়েছিল প্রায়।
আমি নোট খাতা দিলাম। ফোন নাম্বার বিনিময় হল। (তখন ফেসবুক ছিল না)। তারপর ফোনে কথা বলা শুরু।
আমি রোজ রাত বারোটার পর ওকে ফোন দিতাম। ডিজুসের সারা রাত ফ্রি অফার চলতো। আমি ঘন্টার পর ঘন্টা কথা বলতাম। আমার ফোন রাখতে মনই চাইতো না।
সে বড় সুখের সময় ছিল। জীবনের সেরা কয়েকটি দিন। কিন্তু নক্ষত্রেরও নাকি একদিন মরে যেতে হয়। আমার সুখের ঘোর শেষ হল ক্লাসমেট খালেদের একটা কথায়- 'শুনেছিস,ধলা রাকিব নাকি শায়লাকে প্রপোজ করবে!'
আমার মাথায় বাজ পড়লেও আমি এতো অবাক হতাম না। দৌড়ে গেলাম ধলার কাছে।
- কোন সাহসে তুই শায়লাকে প্রপোজ করবি?
'কেন করব না?', নির্বিকারভাবে ধলা রাকিব বলল।
- জানিস না, আমি ওর সাথে কত কথা বলি। ওকে পছন্দ করি?
- আমিও ওর সাথে সপ্তাহখানেক ধরে কথা বলছি। ও বলেছে তোদের মধ্যে কিছু হয় নাই।
- হয় নাই, হবে! সময় কি শেষ?
- ভাই বাদ দে তো, ওরে আমার ভাল্লাগছে। আর আমার যারে ভাল্লাগে আমি তারে নিয়া নিই।
দুই ঘন্টা ধলা রাকিবকে বোঝালাম। ভয় দেখালাম, বারণ করলাম, অনুনয় বিনয় করলাম। রাকিবের মন গলে না। শেষমেশ কেঁদে ফেললাম। আমার কান্না দেখে রাকিবের একটু দয়া হল।
সে বলল, ঠিক আছে। আমরা তাহলে শায়লাকেই ডিসাইড করতে দেই। সামনের আঠারো অক্টোবর ওর জন্মদিন। ঠিক রাত বারোটায় আমরা দুজন একসাথে ওকে প্রপোজ করব। শায়লা যাকে পছন্দ করবে, ও তার হবে। বাকি যে থাকবে, অন্য রাস্তা ধরবে। খেলা যখন হবে ফেয়ার গ্রাউন্ডেই হোক।
আমি মেনে নিলাম। এইটুকুই অনেক পাওয়া। আমার মন বলছিল শায়লা অনেক সেন্সিবল মেয়ে, ও হয়তো আমার ভালোবাসাটুকু বুঝবে।
আঠারো অক্টোবর ঠিক এগারোটা উনষাট মিনিটে আমরা চোরের মতো দুজনে দুটো গোলাপ ফুল নিয়ে ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেটের বাড়ির পাঁচিল টপকালাম। পাইপ বেয়ে শায়লার ব্যালকনিতে উঠলাম। শায়লা আমাদের দেখে ভূত দেখার মতো চমকে উঠল।
আমরা কাঁপাকাঁপা গলায় বললাম, 'হ্যাপি বার্থডে শায়লা। উই বোথ লাভ ইউ।'................................................................................
বাস তখন খামারবাড়ি থেমে আছে। ভদ্রলোক বললেন, 'কি ভাবছেন? শায়লা আমাকে চুজ করেছিল?
আমি মাথা নেড়ে সম্মতি জানালাম। লোকটা মৃদু হেসে বলল- ভাই রে, জীবন গল্প উপন্যাস না। শায়লা আমাকে পছন্দ করে নি। ওর বলা কথাগুলো এখনও আমার কানে বাজে।
শায়লা বলেছিল- 'রাকিব, তোমার মতো ফ্রেশ মাইন্ড আর ওয়েল পার্সোনালিটির ছেলে আমি আর দেখি নি। তুমি অনেক ভালো মানুষ। কিন্তু কিন্তু...আমি তোমাকে নিয়ে ওভাবে কখনো ভাবি নি। তুমি আমার কাছে সবসময় একজন ভালো বন্ধুর মতো ছিলে এবং থাকবে। আমি বরং (ধলাকে দেখিয়ে) ওর সাথেই সম্পর্কে যেতে চাই।'
আমার হৃদয়টা তখন সশব্দে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। এমনকি আমি চিইই করে দুনিয়া কাঁপানো একটা শব্দ পর্যন্ত শুনলাম।
তারপর মনে হল, ব্যাপার কি! হৃদয় ভাঙার শব্দ তো এতো জোরে হতে পারে না!
আসলে শায়লার বড়ভাই কথার আওয়াজ শুনে 'কে ওখানে...' ডাক দিয়ে ছুটে এসেছে। পেছনে আরো দুই ভাই। মুহূর্তের মধ্যে বাড়িতে হুড়োহুড়ি পড়ে গেল। চিৎকার-চেঁচামেচি। ধলা রাকিবের কলার ধরে লিভিং রুমে নিয়ে গেল তারা। সেখানে নিয়ে বেদম মার। বেগতিক দেখে শায়লাও আর ধলার পক্ষ নিল না। সম্পর্কের ব্যাপারটা অস্বীকার করে গেল।
ধলা রাকিবের বাপ-মাকে ডাকলেন ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব। বলে দিলেন, তাদের ছেলে যেন আর কখনো শায়লার ধারে কাছে না যায়। গেলে তিনি খুন করে ফেলবেন। রাকিবের বাবা-মা ওর কলেজ বদলে নিয়ে গেলেন। ধলা রাকিব আর কখনো শায়লার সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করে নি।
ধলা চলে যাওয়ার পর শায়লা বেশ একা হয়ে পড়ে। আমি ওর বন্ধুত্বে্র হাত কখনো ছাড়ি নি। ও কলেজ থেকে ঢাকায়- ভার্সিটিতে পড়তে আসে, আমিও ওর সাথে আসি। ততোদিনে ও বেশ স্বাধীন এবং ম্যাচিউরড হয়েছে। ফাইনালি আমি অনার্স চতুর্থ বর্ষে এসে ফ্রেন্ডজোন ভাঙ্গতে পারি। পুনরায় প্রপোজ করি ওকে। ও এক্সেপ্ট করে। আল্লাহর ইচ্ছায়, শি ইজ মাই ওয়াইফ নাও।..............................................................
কন্ডাকটার ডাকছে- 'ধানমন্ডি সাতাইশ। ধানমন্ডি সাতাইশ।'
ভদ্রলোক উঠে দাঁড়ান। আমি একটু আমতা আমতা করছিলাম। তারপর বলেই ফেলি- ভাই, আমার একটা প্রশ্ন ছিল।
লোকটা ফিরলেন। বললেন, 'আমি বোধহয় আপনার প্রশ্নটা জানি। করেন'
আমি বললাম, 'ওই দিন রাতে শায়লা আপুর ভাইয়েরা আপনার ফ্রেন্ডকে ধরে মাইর দেয়। অথচ আপনি ওখানেই ছিলেন। আপনাকে কিছু বলে নি কেন?'
লোকটা মুচকি হেসে বলল, এটাকেই বোধহয় নিয়তি বলে। শায়লার ব্যালকনিতে ছিল ঘুটঘুটে অন্ধকার। ঐদিন জীবনে প্রথম আমি আমার গায়ের রং এর জন্য অ্যাডভান্টেজ পাই। ওরা আমাকে অন্ধকারে দেখতে পায় নি ।।