18/10/2017
ছেলে আমার পুলিশের কর্মকর্তা, ভাতিজা তো অমুক এলাকার বাঘ, ভাইস্তা আমার বিরাট অফিসার, আমি কার ভাই জানেন? ব্লা ব্লা ব্লা……………… এগুলো পুলিশে কর্মরত কর্মকর্তাদের স্বজন বা বন্ধুদের কমন ডায়ালগ। অবশ্য কথা গুলোতে যে কাজ হয় না, তা না। কাজ হয় বলেই এই কথা গুলা এত বেশি শোনা যায়। আমি পুলিশ পরিবারের একজন নবীন সদস্য। সবে মাত্র হামাগুড়ি দিতে শিখেছি বলা যায়। সিনিয়র স্যারদের কাজ দেখে কাজ শেখাই আমার কাজ। হাজারটা ভুল করে একটা কাজ ঠিক মত করতে পারলেই বিরাট খুশি।
অপর দিকে, আশেপাশের মানুষের ধারণা, আমাদের চাকরিটাই হল তদবিরের চাকরি। তদবির শোনা আর তদবির করা। আমার এই কথাতে আমার ফ্রেন্ডলিস্টের অনেকেই আহত হতে পারেন, কিন্তু সত্য কথা একটু তিতাই হয়। আমি খুব কাছের আত্মীয় ছাড়া তেমন কারো বাসায় দাওয়াত খেতে যাই না। সত্যি বলতে, পুলিশকে কেউ অকারণে খাওয়ায় না বোধ করি। সবই বিনিয়োগ!!! সেদিন গেলাম এক অতি কাছের আত্মীয়র বাড়িতে। অনেক দিন পর দেখা। সালাম আর কুশলাদির পরের প্রথম কথা, আমার জমিটায় তো এই ঝামেলা, কিছু করা যায় না? দ্বিতীয় কথা, আমার ছেলেটার তো কোন চাকরির জোগাড় করে দিতে পারলানা, তুমি নাকি বিরাট অফিসার??? শেষের কথা, বাড়িতে আসবা যখন, পুলিশের বড় গাড়িটা নিয়ে আসতে পারলানা??
আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি, ৯৯.৯৯% পুলিশ অফিসারের এই অভিজ্ঞতা আছে। প্রচণ্ড বিরক্ত হয়ে উত্তর দিয়ে বসলাম, আমি কি তদবির শুনতে আসছি এখানে?? আমি কি চাকরির ঝুলি নিয়ে বসছি? নাকি আপনাদের প্রভাব চারদিকে দেখানোর গুরু দায়িত্বটা আমার? চলে আসার সময় বললাম, আমি একজন পুলিশ কর্মকর্তা ঠিক আছে, কিন্তু আমি আপনাদের আত্মীয়, এটা আগে মনে রাখবেন, আমার প্রফেসনাল পরিচয়ের চেয়ে এই পরিচয়টা অনেক বড়। আপনাদের একজন হয়ে আপনাদের সাথে কথা বলতেই ভাল লাগে।
স্কুল বা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হবার পরে যে ছেলেটি কোনদিন ভুল করেও কল দেয়নি, নিজের বিয়ের অনুষ্ঠানেও বলার প্রয়োজন মনে করেনি, ফেসবুকে ম্যাসেজ সিন করেও রিপ্লাই দেয়নি, বাইক নিয়ে ধরা খেলে ঠিকই ফোন দেয়, আর আমিও আমার অধস্তন কর্মকর্তাকে অনুরোধ করি ছেড়ে দেয়ার জন্য। ২০০ টাকার জন্য মানুষ ফোন দিতে কুণ্ঠা বোধ করেনা। অনেকে আগে থেকেই বলে রাখে, আমি হুট করে ফোনে ধরিয়ে দিলে যেন মনে করি সার্জেন্ট ধরসে!!! বাহ, কি আবদার!!! সবাইকে বলি, কোন ইমারজেন্সিতে কল দিতে, কিছু মানুষ ২৪ ঘণ্টাই মনে হয় ইমারজেন্সিতে থাকে। এটা যেন পৈত্রিক সুত্রে পাওয়া অধিকার!!
অনেকে তো সার্জেন্টদের সাথে খারাপ আচরণ করতেও বাদ রাখেনা। মনে রাখবেন, সার্জেন্ট কেবল আমাকে সম্মান করে আপনাকে ছেড়ে দেয়, আমার কথায় আপনাকে ছেড়ে দিতে সে বাধ্য না।
এবার আসি চাকরির কথায়। আমি বি সি এস এর ফর্ম পূরণ থেকে শুরু করে চাকরিতে জয়েন করার মাঝে চলে গেছে প্রায় ৪০ মাস!!! তার উপর দুনিয়ার বেহেস্ত সারদার পুলিশ একাডেমী তো আছেই!!! একটা চাকরি অনেক কঠিন ব্যাপার, সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। যারা আমার কাছে চাকরির কথা বলেন, তাদের কাছে একটা জিজ্ঞাসা, আমিও তো চাকরি করি। চাকরি দেয়ার ক্ষমতা আমার থাকলে আমি নিজে চাকরি করব কেন??? আর যারা এভাবে চাকরি চান, তারা খুবই সিলেকটিভ!! সরকারি চাকরি লাগবে, কারণ বেসরকারি চাকরি যেকোনো সময় চলে যেতে পারে। আপনি ঠিকমত কাজ না করলে আপনাকে কেন চাকরিতে রাখবে?? ঢাকার বাইরে চাকরি করবেনা, যেন দেশের ১৭ কোটি মানুষ ঢাকায় থাকে। খুব বেশি কষ্ট করাটা তার সাথে যায়না, ডেস্ক জব হলে ভাল হয়। সবাই যদি ডেস্ক এ কাজ করে, তাহলে ফিল্ডে কে যাবে ভাই?? আর কষ্টের কথা বলবেন? যারা সারদা পুলিশ একাডেমী যাওয়ার আগে আর পরে আমাকে দেখেছেন, তারা চেহারা আর গায়ে ৩/৪ ধরণের শেড দেখলে বুঝবেন, কষ্ট কাকে বলে। এখনও আমাদের সহকারী / অতিরিক্ত পুলিশ সুপারগণ রাতভর পদ্মা নদীতে অভিযান চালান যেন আপনারা কয়দিন পর বড় ইলিশ খেতে পারেন। সকালেও দেখবেন অফিস করছেন তারা।
আরেকটা বড় অভিযোগ, বড় অফিসার হয়ে গেছে, এখন তো চেনেই না, কল রিসিভ করেনা। পুলিশ অফিসারদের একটা অফিসিয়াল নাম্বার থাকে, যেটা অধিকাংশ সময়ই বিজি থাকে আপনাদের কারণেই। সাথে থাকে একটা ওয়ারলেস, অনেক সময় সিনিয়র স্যারদের সাথে থাকতে হয়, যেখানে ফোন রিসিভ না করাটাই উত্তম। এতগুলা ফিল্টারিং স্টেজ পেরিয়ে আপনার কল টা ধরতে না পারলেই হয়ে গেলাম অহংকারী!!! আর সবসময় কথা বলতে ভালও লাগেনা, এটা মানতে আপনারা নারাজ। পুলিশের কাজই তো আপনার কথা শোনা, তাইনা?
আপনার টাকা অমুকে নিয়েছে, অনেকদিন ধরে দিচ্ছে না। কোন ডকুমেন্ট আছে?? না, নাই। জিডি বা মামলা করেন। না ভাই, আইনি ঝামেলার কি দরকার? তাহলে কিভাবে হেল্প করব? কোন প্রমাণই তো নেই, সাক্ষীও দেখাতে পারছেন না। ভাই, ফোন দিয়ে একটু ভয় দেখান, আপনারে কিছু দিবনে!! আপনার এই ফাঁদে পা দেয়া মানেই সাধের চাকরিটা নড়বড়ে করে দেয়া।
আপনার টাকা গায়ের জোরে উঠানোর দায়িত্ব পুলিশের না। আমরা পুলিশ, ডাকাত বা সন্ত্রাসী না। আমরা অস্ত্রধারী (বি সি এস) ক্যাডার
এই পুলিশ অফিসারই যখন একটা পার্সোনাল দামি গাড়িতে চড়ে বেড়ায়, আপনারাই বলেন, ঘুষের টাকা। তার স্ত্রী যদি একটু বেশি গহনা পরে, সেটা হয়ে যায় আসামির গিফট, বাচ্চাটা যদি ইংলিশ মিডিয়ামে পরে, সেটাও আপনার গায়ে চুল্কানির সৃষ্টি করে। কেন ভাই?? হতদরিদ্র পরিবার ছাড়া কি কেউ পুলিশে চাকরি পাবেনা???তার কি বাবার টাকা থাকতে নেই? নাকি সবাই শুধু পেটের দায়ে পুলিশে আসে? এমন অনেক অফিসার আছেন, যারা শুয়ে বসে খেলেও পৈত্রিক সম্পত্তি শেষ হবেনা। তবুও তারা এসেছেন দেশকে সেবা দিতে, পুলিশ সার্ভিসকে ভালবেসে। আর পুলিশের একটা মিশনে যথেষ্ট টাকা আসে।
পুলিশ আর আর্মড ফোর্সে চাকরি করে হালাল উপায়ে কোটিপতি হওয়া যায়, কথাটা মাথায় রেখে তারপর কমেন্ট করবেন। আর পরশ্রীকাতরতা মানুষকে কখনো সুখ দেয়না।
এটা সত্যি, পুলিশের কথাকে মানুষ ইজ্জত করে। একবার কেন, হাজার বার ফোন দেবেন, যদি কেউ আপনার সাথে অন্যায় করে, যদি আপনি পুলিশের কাছে কাঙ্ক্ষিত সেবা না পান। কিন্তু নিজেই অপরাধী হয়ে যদি বলেন তদবির করতে, সেটা আমাদের মাথাকে নিচু করে দেয়, সেই সাথে নষ্ট করে দেয় আপনার সাথে আমার সম্পর্ক, সেটা হতে পারে পারসোনাল বা প্রফেশনাল। একটু সোজা ভাবে চিন্তা করুন, দেখবেন, কাউকে অন্যায় তদবির করা লাগবেনা। মাথা উঁচু করে চলতে পারবেন। আর দয়া করে মনে রাখবেন, পুলিশও মানুষ, আপনাদের মতই |
(Khorshed Alam স্যারের লেখা)
#এডমিন
#বিপি_হেল্পলাইন