04/04/2026
'চিলমারী-রৌমারী ব্রহ্মপুত্র সেতু'
গত ০২ এপ্রিল সংসদের প্রথম অধিবেশনে কুড়িগ্রাম-৪ আসনের মাননীয় সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান ব্রহ্মপুত্র নদের উপর চিলমারী-রৌমারী সেতু বাস্তবায়নের দাবি উত্থাপন করেন।
২০২১ সালে বাংলাদেশ সরকার JV Consultant- TYPSA, BCL, DevCon, DDC, Nippon Koei এবং Dohwa কে ২০২০-২০৫০ সময়কালের জন্য বাংলাদেশের একটি সমন্বিত পরিবহন মাস্টার প্ল্যান প্রণয়নের দায়িত্ব দেয়, যার লক্ষ্য ছিল আগামী ৩০ বছরের জন্য স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো প্রকল্প নির্ধারণ ও অগ্রাধিকার দেওয়া। এই প্রকল্পের আওতায় কুড়িগ্রামের চিলমারী-রৌমারী সড়কে ব্রহ্মপুত্র নদে সেতু নির্মাণের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ২০২২ সালে শুরু হয়ে ২০২৪ সালের এপ্রিলে সম্পন্ন হয়।
সমীক্ষায় Institute of Water Modeling-এর সুপারিশের ভিত্তিতে চারটি সম্ভাব্য স্থান বিবেচনা করা হয়, যার মধ্যে অপশন-৪ (ফকিরেরহাট, চিলমারী - চরশৌলমারী, রৌমারী) সবচেয়ে উপযুক্ত হিসেবে নির্বাচিত হয়। প্রস্তাবিত সেতুটি হবে ১০.৭৮ কিলোমিটার দীর্ঘ স্টিল ট্রাস সেতু, যার মূল স্প্যান ৮.৯ কিমি এবং অ্যাপ্রোচ স্প্যান ১.৮৮ কিমি; এছাড়া ১৪.৪ কিমি সংযোগ সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়নে মোট ৫৪ মাস সময় লাগবে, যার মধ্যে শেষ ১২ মাস পরীক্ষণ ও কমিশনিংয়ের জন্য নির্ধারিত। সমীক্ষা অনুযায়ী যদি প্রকল্পটি ২০২৫ সালে বাস্তবায়ন শুরু হতো, তাহলে সেতুটি ২০৩০ সালে চালু হওয়ার কথা বলা হয়েছিল এবং মোট প্রকল্পকাল ধরা হয়েছিল ৩৫ বছর, যেখানে ৫ বছর নির্মাণ পর্যায় এবং ৩০ বছর পরিচালন পর্যায় হিসেবে বিবেচিত। এ প্রকল্পে মোট বিনিয়োগ ব্যয় ধরা হয়েছে ২৩,৬৯৯.০৮ কোটি টাকা।
সেতুটির অর্থনৈতিক ব্যয়-সুবিধা বিশ্লেষণ (Cost-Benefit Analysis) দুইভাবে করা হয়েছে - একবার ভারতীয় ট্রাফিক ধরে এবং আরেকবার তা ছাড়া।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রকল্পটি দেশের অর্থনীতির জন্য লাভজনক। ভারতের ট্রাফিক অন্তর্ভুক্ত হলে EIRR ১৫.৪৫% এবং BCR ১.৮৯, যা নির্দেশ করে প্রতি ১ টাকার বিনিয়োগে ১.৮৯ টাকার সমপরিমাণ অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়া যাবে এবং ২০৪৭ সালের মধ্যে বিনিয়োগের অর্থ উঠে আসবে। ভারতের ট্রাফিক না থাকলেও প্রকল্পটি অর্থনৈতিকভাবে কার্যকর থাকে, যদিও লাভ কিছুটা কমে যায়।
তবে আর্থিক বিশ্লেষণে প্রকল্পটির দুর্বলতা স্পষ্ট। শুধুমাত্র সরকারি অর্থায়নে প্রকল্পটির F-IRR মাত্র ৫.২১%, যা প্রয়োজনীয় ১২% এর তুলনায় অনেক কম এবং F-NPV ঋণাত্মক। অর্থাৎ প্রকল্পটি নিজস্ব আয়ের মাধ্যমে ব্যয় তুলতে সক্ষম নয়। ঋণসহ (levered) বিশ্লেষণেও F-IRR ৬.৯০% হলেও তা এখনও কাঙ্ক্ষিত মানের নিচে থাকে।
PPP (Public-Private Partnership) কাঠামোয় বিশ্লেষণে দেখা যায়, ভারতের ট্রাফিক থাকলে প্রয়োজনীয় Viability Gap Funding (VGF) ৩৯.৩%, যা বাংলাদেশের আইনগত সীমা ৪০% এর মধ্যে থাকায় প্রকল্পটি বাস্তবায়নযোগ্য। কিন্তু ভারতের ট্রাফিক না থাকলে VGF ৪৩.১% হয়ে যায়, যা অনুমোদিত সীমার বাইরে, ফলে PPP মডেলেও প্রকল্পটি তখন বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় না।
সার্বিকভাবে বলা যায়, প্রকল্পটি অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হলেও আর্থিকভাবে স্বনির্ভর নয়। এর বাস্তবায়ন নির্ভর করছে সরকারি ভর্তুকি, PPP কাঠামো এবং বিশেষ করে ভারতীয় ট্রাফিক বা বিদেশি অর্থায়নের ওপর। তাই শুধুমাত্র বাংলাদেশ সরকারের একক অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা কঠিন, বরং বহুমুখী অর্থায়ন ও আঞ্চলিক ট্রাফিক সংযোগের ওপরই এর সফলতা নির্ভরশীল।
@ব্রহ্মপুত্র, চিলমারী & @চিলমারী নদী বন্দর
ছবি: কুড়িগ্রাম জেলার চিলমারী-রৌমারী সড়কে প্রস্তাবিত ব্রহ্মপুত্র নদের উপর ১০.৭৮ কিলোমিটার দীর্ঘ স্টীল ট্রাস (Steel-Truss) সেতুর নকশা।