27/01/2026
একটি পীচঢালা রাজপথের আত্মকথা
(গোহাইল রোড)
আমাকে আজ তোমরা চেনো গোহাইল রোড নামে। বগুড়া শহর থেকে নাটোরের দিকে যে দীর্ঘ কালো পীচঢালা পথ ছুটে গেছে, সেই আমি। প্রতিদিন আমার বুকের ওপর দিয়ে অগণিত মানুষ ছুটে চলে—কেউ জীবিকার তাগিদে, কেউ স্বপ্নের খোঁজে, কেউবা শুধু ফেরার পথে। কিন্তু আমার জন্ম এমন ছিল না, আমার শুরুর গল্পটা ছিল অনেক নিরিবিলি, অনেক ধীর।
এক সময় আমি ছিলাম কাঁচা মাটির পথ। আমার শরীরে পীচের কোনো আস্তরণ ছিল না—ছিল ধুলো, ছিল কাদা, ছিল প্রকৃতির স্পর্শ। মানুষ তখন পায়ে হেঁটে আমাকে পার হতো, মাঝে মাঝে ধীরে ধীরে গরুর গাড়ি এগিয়ে যেত আমার বুক চিরে। আমার দুই পাশে মাঠ, জঙ্গল আর জনপদ মিলেমিশে একাকার ছিল। দিনের আলোয় শেয়াল নির্ভয়ে আমাকে অতিক্রম করত, রাতের নীরবতায় পশুপাখির ডাক আমার সঙ্গী হতো। তখন তাড়া ছিল না, ভয় ছিল না—জীবন ছিল ধীর ও স্বাভাবিক।
তারপর এলো শাসনের সময়। বৃটিশ আমলে প্রয়োজনের তাগিদে আমাকে শক্ত করা হলো। কাঁচা পথ থেকে আমি পাকা হয়ে উঠলাম, আমার গায়ে চাপানো হলো পীচ। আমার বুকের ওপর দিয়ে চলতে শুরু করল রিকশা, সাইকেল, পরে মোটরগাড়ি। মানুষের চলাচল বাড়ল, শহরের শ্বাস দ্রুত হতে লাগল। ব্যস্ততা আমার শরীরে বাসা বাঁধল। আমি কিছু বলিনি—কারণ চলাই তো আমার নিয়তি, বহন করাই তো আমার ধর্ম।
কিন্তু ১৯৭১ সাল আমার জীবনের সবচেয়ে রক্তাক্ত অধ্যায়। এই পথ দিয়েই গিয়েছে যুদ্ধের যান, ট্যাংক আর কামান। প্রতিটি বিস্ফোরণে আমার বুক কেঁপে উঠেছিল। কত তরুণ শহীদের রক্তে আমি রঞ্জিত হয়েছি—সেই দাগ আজও আমার শরীর ভুলে যেতে পারেনি। স্বাধীনতার জন্য মানুষের যে অসীম ত্যাগ, আমি তা খুব কাছ থেকে দেখেছি, নিজের শরীরে ধারণ করেছি। ইতিহাস আমার ওপর দিয়েই হেঁটে গেছে, রক্ত আর অগ্নির ছাপ রেখে।
স্বাধীনতার পর আমি হয়ে উঠলাম একটি স্বাধীন দেশের পথ। আমার শরীরে জমতে থাকল অসংখ্য মানুষের না বলা স্মৃতি। কত শিশু আমাকে ধরে স্কুলে গেছে, কত তরুণ স্বপ্নের ভার কাঁধে নিয়ে হেঁটেছে। অসুস্থ মানুষকে তাড়াহুড়ো করে আমার বুকের ওপর শুইয়ে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। আবার কত মৃত মানুষকে আমি পৌঁছে দিয়েছি শেষ যাত্রায়—স্বজনদের কান্না আর আহাজারিতে আমি ভারী হয়ে উঠেছি।
ঈদের সময় আমি আনন্দে মুখর হয়েছি, মানুষের ফেরার উচ্ছ্বাসে আমার শরীর ভরে উঠেছে। কুরবানির রক্তে আবার লাল হয়েছি আমি। জয়ের মিছিল, রাজনৈতিক আন্দোলনের স্লোগান, সংগ্রামের পদধ্বনি—সবকিছুই আমার শরীরে লেখা আছে অদৃশ্য ইতিহাস হয়ে। আমি নীরবে সব সহ্য করেছি, সব বয়ে নিয়েছি।
আজ আমি গর্বিত, কারণ এত সুখ–দুঃখ, রক্ত–স্বপ্ন, আশা–হতাশা বহন করেছি। তবু আমি অবহেলিত। আমার বুকজুড়ে এখন খানাখন্দ, কোথাও পীচ উঠে গেছে, কোথাও গর্তে জমে থাকে স্থবির নোংরা জল। পাঁচ-সাত বছর পরপর সামান্য পরিচর্যা হয়, কিন্তু তা আমার ক্লান্ত শরীরের জন্য যথেষ্ট নয়। আমি ক্লান্ত, তবু থেমে নেই। প্রতিদিন আবার মানুষ, যানবাহন আর ইতিহাস নিজের শরীরে তুলে নিয়ে চলেছি।
আমি শুধু একটি রাস্তা নই। আমি স্মৃতির ধারক, সময়ের নীরব সাক্ষী। আমাকে অবহেলা কোরো না—কারণ তোমাদের প্রতিটি যাত্রা, প্রতিটি ফেরা, প্রতিটি গন্তব্যে আমার অস্তিত্ব জড়িয়ে আছে।
লেখাঃ Zunnun Sadi
কপি করতে চাইলে, করতে পারেন। কিন্তু নিজের নামে চালিয়ে নিজেকে চোর প্রমাণ করবেন না প্লিজ।