ইলিশানদী

  • Home
  • ইলিশানদী

ইলিশানদী River in Bhola

01/12/2025

বইটি বরিশাল জেলার মেঘনা নদীর তীরবর্তী এক হিন্দু গ্রাম এলাকায় দুই শতাধিক বছর ধরে বসবাসকারী মধ্যবিত্ত পরিবারগোষ্ঠীর একটি কাহিনী হলেও এখানে তৎকালীন সমাজচিত্রও ধরা পড়েছে। সময় মূলত গত শতকের চল্লিশের দশক, লেখকের কৈশোরকাল।
চল্লিশের দশক নিঃসন্দেহে একটি তরঙ্গ বিক্ষুব্ধ কাল। এ সময় যেমন উত্তাল স্বাধীনতা সংগ্রাম (অগস্ট আন্দোলন ১৯৪২), আজাদ হিন্দ ফৌজের অভিযান (১৯৪৪-১৯৪৫) হয়েছে, তেমনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ (১৯৩৯-১৯৪৫), ১৯৪৩ সালের মন্বন্তর, পাকিস্তান সৃষ্টির জন্য মুসলমান সমাজের অংশবিশেষের প্রত্যক্ষ সংগ্রাম তথা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা (১৯৪৬), দেশবিভাগজনিত কারণে হিন্দুদের ব্যাপক দেশত্যাগ ঘটেছে-মুসলমানরাও অবশ্য অপেক্ষাকৃত স্বল্পসংখ্যায় তাঁদের বাস্তুভূমি ছেড়ে গেছেন।
এবার আমাদের বাসস্থানের কথা। আমাদের গ্রামের নাম গোয়ালভাওর। পাশ্ববর্তী গ্রামগুলি হল পূর্বে দাদপুর, উত্তরে গোবিন্দপুর ও মল্লিকপুর, পশ্চিমে পোমা আর দক্ষিণে বাংলাবাজার, নলগোড়া ও দূরে উলানিয়া। থানা বা পুলিশ স্টেশনের নাম হিজলা, পরগনা উত্তর সাহাবাজপুর, মহকুমা-বরিশাল সদর নর্থ, জেলা- বরিশাল (পূর্বতন নাম বাকরগঞ্জ)। এলাকাটি মেঘনা নদীর কূলে অবস্থিত, বস্তুত আমাদের গ্রাম থেকে নদী মাত্র দু মাইল দূরে। এখানে আমি পরগনার উল্লেখ করেছি। পরগনা একটি পারসিক শব্দ; মুসলমান (পাঠান ও মোঘল) রাজত্বকালে সরকারি রাজস্ব আদায়ের সুবিধার জন্য এমন বিভাগ ব্যবস্থা বঙ্গে প্রচলিত ছিল। পরগনা বস্তুত গ্রাম সমষ্টি। পশ্চিমবঙ্গেও এখনও শব্দটি জীবিত আছে চব্বিশ পরগনা জেলার নামের মধ্য দিয়ে। অনুরূপ একটি পারসিক শব্দ 'ডিহি'।
আমাদের পরিবারে প্রত্যেকদিন সকালে কালীগঞ্জ বাজার থেকে মাছ কিনে আনা হত অন্তত একসের। মাছ বড় সাইজের না হলে সাধারণত 'হালি' হিসাবে মাছ বিক্রি হত, পাঁচটিতে এক হালি। বাজারটি আমাদের বাড়ি থেকে জোরে হাঁটা পথে ২০-২৫ মিনিট দূরে, নদীর পাড়ে। দুধের ন্যায় মাছ দৈনন্দিন খাদ্য-দু'বেলাই। পাঁঠার মাংসের দোকান ছিল না। বিয়ে-সাদি বা কালীমনসা পূজার বলির পাঁঠার মাংস বছরে কয়েকদিন মাত্র খেতে পাওয়া যেত। তবে সারা শীতকাল কচ্ছপের মাংস লভ্য ছিল, কচ্ছপের ডিমও বিশেষ স্বাদু। বাবার মাংসের প্রতি মাছের চেয়ে পক্ষপাতিত্ব ছিল মনে হয়। একবার সজারুর মাংস কোনো বাড়ির থেকে রান্না করে পাঠিয়েছিল, মা বা আমরা ভাই-বোনেরা স্পর্শ করিনি, বাবা কিন্তু তৃপ্তি সহকারে খেয়েছিলেন। বাবা নিজে কখনো বাজারে যেতেন না, কাজের লোক বা ছেলেরাই হাটবাজার করত। বাবা মাঝেমাঝে সকালের দিকে গ্রামের বাইরে ঘুরে এসে বলতেন—খুব ভাল মাছ বাজারে উঠেছে, দামও বেশি নয়। মা অনুযোগের সুরে বলতেন, "বলে কী লাভ, কিছু কিনে আনলে পারতে।" সাধারণত বাবার উত্তর হত, ভাবলাম সকালের বাজার থেকে কেউ নিশ্চয়ই মাছ এনেছে, আমি আনলে বেশি হত না। তোমাদের কাজও বাড়ত। সব্জি অনেক কিছু বাড়ির ক্ষেতে, বাগানে হত। যেমন, ডাঁটা, নানারকম শাক, লাউ, কুমড়ো, বেগুন। ঝিঙ্গে গাছ একটু বড় হলেই পিসিমা মাচা তৈরি করে দেবার জন্য বাবাকে তাগিদ দিতেন। এছাড়া দুবেলা গাছের গোড়ায় জল সিঞ্চন তাঁর নিত্য-নৈমিত্তিক কাজ ছিল। বাগানে বীচি কলার মোচা ধরলে, লোক লাগিয়ে মোচা পাড়া হত। কাঁঠালি, চিনি চাঁপা, মর্তমান গাছের মোচা সাধারণত কাটা হত না। ঝড়-বৃষ্টিতে কলা গাছ মাটিতে পড়ে গেলে, থোড় বের করে আনা হত। ফলে হাট থেকে তরকারি বিশেষ আনতে হত না। কচুর শাক অনেক রকম ছিল, প্রধানত বেগুনি ও সবুজ রংয়ের। বেগুনিটাই পছন্দ ছিল। ছাইয়ের গাদার কাছে গজানো মানকচুর কন্দ শীতকালে তোলা হত। পিসিমা লাউ-কুমড়ো গাছের গোড়ায় সকাল-বিকাল দুবেলাই জলের সেচ দিতেন। সেজন্য মাটির পুরানো কলসি বা জালায় জল ভরে রাখতেন এমন জায়গায় যেখানে রোদ পড়ে না। আমি ছোট বয়সে কয়েকবার কলসি ভেঙ্গে দিয়েছিলাম, কাছের বাগানে কলাগাছও হাত-দা দিয়ে কেটেছি। পিসিমা দু'একবার রাগ করে বাবার কাছে গিয়ে ভাইপোর কীর্তিকাহিনী বলতেন। বাবা শুনতেন, বলতেন, "হাঁড়ির কি অভাব পড়েছে, না জলের? ছেলেমানুষ দুদিন ভেঙ্গেছে পরে আর করবে না।" পিসিমা বিড়বিড় করে চলে যেতেন। আমিও অবশ্য ভাঙ্গাকাটার খেলা বেশি দিন চালাইনি। একটু বড় হয়ে ছোট কোদাল দিয়ে পালং শাক, লাল শাকের জন্য খেত কুপিয়েছি, মাটির ডেলা ভেঙ্গেছি-পিসিমার প্রশংসাও পেয়েছি। জালা ভাঙ্গা বা বাগানে কলাগাছ কাটার জন্য পিসিমা কিন্তু কোনদিন আমাকে সরাসরি বকুনি দেননি, বিড়বিড় করে মনের দুঃখ মনেই রেখেছেন, মাকেও নালিশ করেননি।
আমাদের এলাকায় বর্ষার প্রথম থেকে ইলিশ মাছ বাজারে উঠতে আরম্ভ করত। প্রথম দিকে দু-এক আনা দাম হলেও, আষাঢ়-শ্রাবণে ২ পয়সায় একটা গোটা ইলিশ বাজারে পাওয়া যেত সেটা ১৯৪০-৪১ সাল। ১৯৪৫ সালে একটা মাঝারি সাইজের ইলিশের দাম অন্তত ১ টাকা ছিল। মেঘনার এ দিকটায় ইলিশ মাছ খুব ধরা পড়ত। বস্তুত, উত্তর সাহাবাজপুর পরগনা ও দক্ষিণ সাহাবাজপুরের মাঝখানে নদীটির নামই ছিল ইশা, যা মেঘনারই একটি শাখা। কোনো কোনো বছর এত বেশি ইলিশ মাছ ধরা পড়ত, জেলেরা এক পয়সায় ৪/৫টি ইলিশের মাথা বিক্রি করতেন, সঙ্গে ডিম ফাউ। মাছ যখন বেশি ধরা পড়ত, তখন টিনে ভরে বরিশাল শহরে বা অন্য জায়গায় চালান হত, তবে সংস্কৃত হয়ে। মাথা শুধু কাটা যেত না, পেট থেকে ডিম, 'লুকা' (লিভার বা যকৃত) ইত্যাদি সরিয়ে রাখা হত। মাছ খণ্ড খণ্ড করে নুনের জলে টিনে ভরে টিনের মুখ সিল (seal) করে পাঠানো হত; কখনও বা নুন-হলুদ মেখে গোটা মাছ। তবে গোটা মাছের ক্ষেত্রেও মুণ্ডু ও পেটের ভিতর থেকে ডিম ইত্যাদি সরিয়ে রাখা হত। ইলিশ মাছ কখনো নদীর পাড়ে ভাল করে শুকিয়ে বস্তা ভরে রক্তানি হত। মনে আছে, একবার এত বেশি মাছ উঠতে লাগল যে ইলিশ মাছই লোকজনের প্রধান খাদ্য হয়ে উঠল। ফলে, পেট ছেড়ে দিল। কলেরার অবস্থা। খবর পেয়ে থানা (হিজলা) থেকে স্যানিটারি ইনস্পেক্টর সাহেব সাইকেলে পেয়াদা নিয়ে বাজারে ঢোল শহরত দিয়ে ইলিশ মাছ বিক্রি কয়েকদিনের জন্য বন্ধ করে দিলেন আর বাজারের সব মাছ মাটিতে পুঁতে দিলেন। কেউ 'টু' শব্দটি করলেন না, সবাই মেনে নিলেন। কলেরার ইঞ্জেকশন দিতে আরম্ভ হতেই লোকজনের ইলিশ কেনায় ভাঁটা পড়ল। সূচের ফোঁড় না ইলিশ? ফোঁড়ের ভয়ই জয়ী হল।
ইলিশের কতরকম পদ তৈরি হত! ভাজা, ভাপে, পাতুরি, ঝোল-ঝাল তো রয়েছেই, ঝোলে কেউ শুধু লংকা (লাল বা সবুজ) সাথে কচি বেগুন বা কাঁচা কুমড়ো; কেউ আবার সরষে বাটা দিতেন। মা আমাদের প্রায়শই ইলিশের 'পোলাও' তৈরি করতেন, এখনকার বিরিয়ানির রকমফের, তবে কম আঁচে নয়। মাছের নিজস্ব এত তেল থাকত, সরষের তেল বিশেষ দিতে হত না। মাছের তেলে মাছ ভাজা। শীত বা বর্ষাকালে মাছ বেশি পাওয়া গেলে মাছের পাতুরি হত একটু ভিন্ন রকমে। মশলা মাখিয়ে উনুনের পাশে কলাপাতায় মুড়ে সাজিয়ে দেওয়া হত। ধীরে ধীরে মাছ সিদ্ধ হয়ে যেত। অসচ্ছল পরিবারে পাতুরি রান্না মনে হয় সাধারণ রেওয়াজ ছিল, এতে সরষের তেল কিছু কম খরচ হত, পাতুরি তৈরি ভালই হত, স্বাদুও। নানারকম মাছের পাতুরি।
📕
পুরানো বালাম চালের ভাত
সচ্চিদানন্দ দত্ত রায়
প্রথম প্রকাশ
ডিসেম্বর ২০১৫

10/04/2024
23/09/2020

Address

রামদাশপুর

৮৩০০

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when ইলিশানদী posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Contact The Organization

Send a message to ইলিশানদী:

  • Want your organization to be the top-listed Government Service?

Share