পিরোজপুর জেলার পঞ্চম বৃহত্তম উপজেলা বা থানা ভান্ডারিয়া। ১৯১২ সালের আগ পর্যন্ত এ থানায় শুধু পুলিশ ফাড়ি ছিল। ১৭৯৩ সালে স্থাপিত টগরা থানার অধিক্ষেত্রের অধীনে এ অঞ্চলের পুলিশ প্রশাসন কার্য পরিচালিত হতো। পরে পিরোজপুর মহকুমার প্রশাসনিক সুবিধার জন্য ১৯১২ সালে ভান্ডারিয়াকে পূর্ণাঙ্গ থানায় রূপ দেওয়া হয়।
এ থানার ভূভাগ সৈয়দপুর পরগনার অন্তর্গত। পরগনাটির জমিদারী পোনাবালিয়ার চৌধূরীরা বন্দোবস্ত গ্রহণ
করে। ব্রিটিশ সরকারের ঢাকাস্থ কানুনগো ভগীরথ সিং চক্রান্ত করে পরগনাটির মালিক স্বতন্ত্র দুই অংশে বিভিক্ত করে দশ আনা অংশ ঢাকার মিত্রজিৎ সিংহ এবং বাকি ছয় আনা অংশ বিরজারতন দাস-কে বন্দোবস্ত এনে দেয়। ফরিদপুর জেলার গেরদা নিবাসী শেখ দৌলত মতান্তরে দৌলত মীর এ অঞ্চলের কিছু সম্পত্তির বন্দোবস্ত গ্রহণ করেন। জঙ্গলকেটে বিস্তীর্ন এলাকা আবাদযোগ্য করে তোলেন। তার মৃত্যুর পর তার দুই পুত্র গগন এবংমোহন উত্তারাধিকার সূত্রে সম্পত্তি প্রাপ্ত হন।
সেই সময় এ অঞ্চলের জমির উর্বরতা উৎকর্ষের কথা চারিদিকে ছড়িয়ে যায়। প্রমত্তা কচা নদীর পলি বিধৌত এবং প্রচুর ফলন সমৃদ্ধ এ অঞ্চল। ধান ও রবি শস্যের ফলন এবং সরবরাহ এ অঞ্চলে প্রতি দূর-দূরান্তেরলোক এবং বণিকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। কেউ কেউ জমি বন্দোবস্ত পাবার লক্ষ্যে আবার কেউ কেউ ব্যবসা বাণিজ্য করার লক্ষ্যে এখানে এসে ভিড় জমাতে থাকে।
তখন বরিশালকে বলা হোত বাংলার শস্যভান্ডার। আর এ বিরাট শস্য ভান্ডারের পঞ্চাৎভূমি বা সরবরাহ কেন্দ্র বা স্থল ছিল ভান্ডারিয়াসহ পাশ্ববর্তী অঞ্চলসমূহ। ভান্ডারিয়ায় প্রচুর ধান-চালের উৎপাদন এবং রবিশস্যের ফলন বাজারজাত করার লক্ষ্যে পোনাবালিয়া থেকে আগত চৌধুরী জমিদারদের স্মৃতির উদ্দেশে আখ্যায়িত পোনা নদীর তীরে বহু গুদাম সংশ্লিষ্ট বাজার ও এক জনপদ সৃষ্টি হয়, পরে একারণে যার নাম হয় ভান্ডারিয়।
বাজারে ধান-চাল, রবিশস্য এবং অন্যান্য জিনিসপত্রের প্রচুর আমদানি হোত। এ বাজারে দূর-দূরন্তর ব্যবসায়ীরা এসে ক্রয়-বিক্রয় সম্পন্ন করে ফিরে যেত। এ বাজারের ক্রয়-বিক্রয়যোগ্য মালামালের প্রাচুর্যের কারণে দোকানগুলো ভান্ডারে রূপান্তরিত হোত। এ জন্যে ভান্ডার শব্দ থেকে ভান্ডারিয়া নামের প্রচলন ঘটে বলে লোকশ্রুতি আছে। এককালে জনৈক খ্যাতনামা ব্যবসায়ী রাজেন্দ্র নাথ পোদ্দারের ছিল ধান-চালের বিরাট আড়ৎ বা ভান্ডার। পোদ্দারের ভান্ডার থেকেও ভান্ডারিয়া নামটি উৎসারিত হতে পারে।
ভান্ডারিয়া সংশ্লিষ্ট উত্তরের গ্রামটির নাম লক্ষ্মীপুরা। প্রাচুর্যে সমৃদ্ধ গ্রামবাসীর গোলা ভড়া ধান ছিল। গৃহস্থবাড়ির সমৃদ্ধির প্রতীক গোলাটিকে লক্ষ্মীর গোলা বলায় সম্ভবতঃ গ্রামটি লক্ষ্মীপুরা হিসাবে আখ্যায়িত হয়। ভান্ডারিয়া থেকে কিছু দূরে (বর্তমানে কাঠালিয়ধীন) বানাইতে গৃহস্থের ঘরে ঘরে ধান ভানাইয়ের কাজ চলতো। ভানাই থেকে বানাই হয়। ভান্ডারিয়ার উত্তর-পশ্চিমে ভিটাবাড়িয়া গ্রাম। ভিটায় রবিশস্যের ফলন ছিল। ভান্ডারিয়ার দক্ষিণ পশ্চিমে ধাওয়া গ্রামটির আদিবাসীদের অনেকেই ধাওয়াই কাজে লিপ্ত ছিল। ফলতঃ গ্রামটির নাম ধাওয়া হয়। যা ভান্ডারিয়া নামের সমর্থনে প্রাচুর্যের উঙ্গিত বহন করে।