02/06/2022
আজকাল খুব একটা কথার প্রচলন হয়েছে - "দলিত সমাজ" অত্যাচারিত, ব্রাহ্মণ্যবাদীদের দ্বারা অত্যাচারিত ! এবং এই অত্যাচারের ফলেই নাকি বহু নিম্ন বর্ণের হিন্দু ধর্মান্তরিত হয়েছেন - বলা ভালো মুসলিম হয়েছেন, খৃষ্টান হয়েছেন - সেই বহুকাল আগে থেকে ! হিন্দু সমাজ বা হিন্দু সংস্কৃতি - নাকি ব্রাহ্মণ্যবাদী !! একটু আদিকাল থেকে দেখে আসা যাক :-
শ্রুতি থেকে বেদ যখন লিপিবদ্ধ হয় - যিনি লিপিবদ্ধ করেন - সেই ব্যাসদেব, তিনি ব্রাহ্মণ ছিলেন না ! ব্রাহ্মণ যখন পৈতা ধারণ করেন - তাঁকে যে "গায়ত্রী" মন্ত্র জপ্ করতে হয় বা পাঠ করতে হয়, সেই গায়ত্রী মন্ত্রের যিনি দ্রষ্টা - মহর্ষি বিশ্বামিত্র - তিনি ব্রাহ্মণ ছিলেন না ! দেবতারা যাঁর সাহায্যে - স্বর্গ পুনরুদ্ধার করেন এবং যাঁর আত্মত্যাগ জগৎ স্মরণীয়, সেই দধীচি মুনি - শূদ্র ছিলেন - ব্রাহ্মণ ছিলেন না ! যাঁকে দক্ষিণ ভারতের উদ্ধারকর্তা বলা হয় - সেই অগস্ত্য মুনি - শূদ্র ছিলেন, ব্রাহ্মণ ছিলেন না ! এরপরেও হিন্দু সংস্কৃতি ব্রাহ্মণ্যবাদী ?
ত্রেতা যুগে রচিত রামায়ণ - যিনি রচনা করলেন - মহর্ষি বাল্মীকি, ব্রাহ্মণ ছিলেন না(আজও দেখুন - উত্তর প্রদেশের বাল্মীকি যাঁরা, তাঁরা এস.সি.)! রামায়ণে সব থেকে শ্রদ্ধেয় চরিত্র - রাম, ক্ষত্রিয় ছিলেন - ব্রাহ্মণ নয় ! শ্রীরামের যুদ্ধ যাঁর বিরূদ্ধে - তিনি রাবণ, রাবণ ব্রাহ্মণ ছিলেন ! এরপরেও হিন্দু সংস্কৃতি - ব্রাহ্মণ্যবাদী ?
মহাভারতে তিন নীতির যুদ্ধ ! ধর্মনীতি, রাজনীতি এবং কূটনীতি ! ধর্মনীতি যিনি ধারণ করে আছেন তিনি শ্রীকৃষ্ণ ! রাজনীতি যিনি ধারণ করে আছেন - তিনি মহামতি বিদুর ! আর কূটনীতির ধারক - শকুনি ! ভারতীয় সভ্যতার প্রথম পূর্ণাঙ্গ মহামণ্ত্রী যাঁকে বলা হয় - সেই মহামতি বিদুর - ব্রাহ্মণ ছিলেন না, ছিলেন দাসী পুত্র ! মহাভারত যুগে শ্রীকৃষ্ণের পর যিনি সব থেকে জ্ঞানী ব্যক্তি - সেই মহামতি বিদুর শূদ্র ছিলেন - ব্রাহ্মণ ছিলেন না ! এরপরেও হিন্দু সংস্কৃতি ব্রাহ্মণ্যবাদী ?
প্রাচীন ভারতের সর্বশ্রেষ্ঠ তিন রাজবংশ - নন্দ বংশ (শূদ্র), মৌর্যবংশ(শূদ্র) এবং গুপ্ত বংশ(বৈশ্য) ! এঁরা কেউ ব্রাহ্মণ ছিলেন না ! এরপরেও যাঁদের রাজত্বের বিস্তৃতি, প্রায় মোগলদের রাজত্বের ভূখণ্ডের সমান বিস্তৃতি ছিলো - সেই পালবংশও ব্রাহ্মণ ছিলো না ! এমন কি সেন বংশও ব্রাহ্মণ ছিলো না ! তাহলে কখন ব্রাহ্মণ্যবাদীরা অব্রাহ্মণদের উপর অত্যাচার করেছিলো বলতে পারেন ? যখন প্রাচীন সব গল্পই দেখা যায়, দরিদ্র ব্রাহ্মণ - ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে প্রতিদিন ভিক্ষা করতে বের হচ্ছেন, ঘরে ব্রাহ্মণপত্নী পথ চেয়ে আছেন - কখন ব্রাহ্মণ ফিরবেন ভিক্ষা নিয়ে, - তারপর রান্না হবে - সেই ব্রাহ্মণগণ অত্যাচারী ?
আধুনিক যুগের ভারতের দিকপুরুষ - যিনি ব্রাহ্মণশ্রেষ্ঠ শ্রী রামকৃষ্ণের শিষ্য এবং যিনি রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন প্রতিষ্ঠা করেন, সেই স্বামী বিবেকানন্দ ব্রাহ্মণ ছিলেন না ! ভারত সেবাশ্রম সংঘের প্রতিষ্ঠাতা প্রণবানন্দ মহারাজ - ব্রাহ্মণ ছিলেন না ! আজ সারা বিশ্বে শ্রীকৃষ্ণ নাম মাহাত্ম্য বিতরণ, মন্দির প্রতিষ্ঠা হচ্ছে- যে সংগঠনের মাধ্যমে - সেই "ইসকন" এর প্রতিষ্ঠাতা শ্রীল প্রভুপাদ - ব্রাহ্মণ ছিলেন না ! তাহলে বলতে পারেন - কোথায় এই সংস্কৃতি ব্রাহ্মণ্যবাদী ????
হ্যাঁ এঁরা সকলেই - নিজ কর্ম গুণে ব্রাহ্মণশ্রেষ্ঠ, এবং কর্ম দ্বারাই ব্রাহ্মণ l গীতায় শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন - তিনি গুণ ও কর্মের ভিত্তিতে চারিবর্ণের সৃষ্টি করেছেন ! চারজাতি নয় !
আমাদের সংস্কৃতি কখনো কারও মাঝে বিভেদ রাখেনি ! নাহ্ - ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র - কারো মাঝে না ! ব্রাহ্মণশ্রেষ্ঠ শংকরাচার্য যেমন - মেথর কে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করতে পিছপা হননি, তেমননি - আমাদের সংস্কৃতি - পিছপা হয়নি শূদ্র থেকে ব্রাহ্মণকে সন্মান জানাতে ! আমাদের সংস্কৃতি - ব্রাহ্মণ শ্রেষ্ঠ শংকরাচার্য, রামকৃষ্ণ দেব, চৈতন্য মহাপ্রভু সবাই কে সম্মান দিয়েছে - তাঁদের কৃতকর্মের জন্য !
তবে কি - সেই সমাজে বা এই সমাজে বিভেদ ছিলো না - অত্যাচার ছিলো না ? অবশ্যই ছিলো - সেটা ধনী দরিদ্রের বিভেদ, দরিদ্রের উপর ধনীর অত্যাচার ! তাহলে - কেনোই বলা হয় - উচ্চজাতির প্রতি নিম্নজাতির অত্যাচার ছিলো ? কারণ - হাজার বছর পূর্বে সৃষ্টি হওয়া একটি চক্রান্ত যা আড়াইশত বছর পূর্বে আরও জোরদার হয় এবং এই হিন্দু সমাজকে ভেঙ্গে দেওয়ার জন্য যা - আজও সমান তালে চলছে ! না হলে বলুন তো প্রায় দু'কোটি "মতুয়া" সম্প্রদায়ের মানুষকে ইসলামিক পূর্ব পাকিস্তান বা ইসলাম প্রধান বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে এসে - ভারতে আশ্রয় নিতে হয় ? যদি- উচ্চবর্ণের অত্যাচারে নিম্নবর্ণের হিন্দুরা মুসলিম হয়ে থাকে ? আজও কেনো বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে আসতে হয় - প্রধানতঃ নিম্নবর্ণের হিন্দুদের ! বাংলাদেশ সংলগ্ন বর্ডার সাইট গুলি লক্ষ্য করুন - দেখবেন, বেশীর ভাগই তথাকথিত নিম্নবর্ণের হিন্দু ! কেনো - তাঁরা আজও মুসলিম নয় ? কারণ - যা আমাদের ইতিহাস পাল্টে গুলে খাওয়ানো হচ্ছে - তা ভুল ইতিহাস ! উল্লেখ করা যেতে পারে - পূর্ব পাকিস্তানের মন্ত্রী - যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলের কথা ! তাঁকে রাতের অন্ধকারে পালিয়ে আসতে হয়েছিলো - তিনি ক্ষমা পাননি - তিনি নিম্ন বর্ণের হিন্দু হলেও !
কোন সমাজ - ব্রাহ্মণ্যবাদী ছিলো ? কিভাবে ছিলো ? যেখানে হিন্দুদের সাতটি গোত্রই চতুর্বর্ণে দেখা যায় ! যেমন - ভরদ্বাজ গোত্র, ব্রাহ্মণের যেমন আছে তেমনি শূদ্রদেরও আছে ! কাশ্যপ গোত্র - ব্রাক্ষণ থেকে শূদ্র সবার মধ্যে আছে ! এতেই কি প্রমাণ হয় না - হিন্দুরা সাম্যে আশ্রিত ? প্রাচীন তিনটি উচ্চশিক্ষা কেন্দ্র, তক্ষশীলা - নালন্দা - কাশী তে দেখুন তো ক'জন ব্রাহ্মণ পণ্ডিত ছিলেন আর ক'জন অব্রাহ্মণ পণ্ডিত ! তারপরেও এই সংস্কৃতি নাকি - ব্রাহ্মণ্যবাদী সংস্কৃতি ????
সর্বশেষ উদাহরণ :- দলিত সম্প্রদায়ের - রামজি মালোজী শাকপাল ও ভীমারাই এর চৌদ্দতম তথা কনিষ্ঠ পুত্র ভীমরাও কে যিনি " ভীমরাও আম্বেদকর" নামে সারা পৃথিবীকে চিনিয়েছেন - তিনি ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ের "মহাদেব আম্বেদকর" (লক্ষ্য রাখুন - আম্বেদকর surname টি মারাঠি ব্রাহ্মণ surname) এবং যিনি - বাবাসাহেব ডঃ ভীমরাও রামজী আম্বেদকরকে উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পাঠিয়েছিলেন - তিনি বরদা'র মহারাজা - সায়াজী রাও একজন ব্রাহ্মণ !
শুধু তাই নয় - যাঁরা আজ ব্রাহ্মণদের ( তথাকথিত পৈতাধারী ব্রাহ্মণ) বিরুদ্ধে সব থেকে বেশি সোচ্চার - "মতুয়া" সম্প্রদায়, তাঁদের সম্প্রদায়ের নাম এবং তাঁদের উদ্ধারকর্তা পরম পূজনীয় শ্রীমৎ হরিচাঁদ ঠাকুর ও পূজনীয় গুরুচাঁদ ঠাকুরও ব্রাহ্মণই ছিলেন (পৈতাধারী ব্রাহ্মণই ছিলেন) l
হিন্দু সংস্কৃতিকে ভাঙতে যাঁরা তখন থেকে এখন একই ভাবে চক্রান্ত করে গেছেন - তাদেরকে উপযুক্ত জবাব দেওয়ার সময় এখনই ! কারণ আপনিও আপনার কর্মগুণে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য এবং শূদ্র !
"ব্রাহ্মণ আমার ভাই - চন্ডাল আমার ভাই - সবার শরীরে মানুষেরই রক্ত !"
(শ্রদ্ধেয় শিক্ষক ডঃ স্বরূপ প্রসাদ ঘোষ মহাশয়ের বক্তব্যে অনুপ্রাণিত হয়ে এই লেখা) l
অজানা ভারতবর্ষ Discover India 🇮🇳