10/19/2025
#*কর্মফল* #
মনুষ্যদেহে দুটি ব্যাপার ঘটে
১)-পুরাতন কর্মের ফলভোগ এবং ২)নতুন পুরুষার্থ। অন্যান্য জীবের কেবলমাত্র পুরাতন কর্মেরই ফলভোগ হয়ে থাকে, অর্থাৎ কীট-পতঙ্গ, পশুপক্ষী, দেবতা, ব্রহ্মলোক পর্যন্ত সমস্ত জীবই ভোগযোনির অন্তর্গত । সেইজন্য তাদের প্রতিটি পশুপক্ষী, কীট-পতঙ্গ ইত্যাদি যা কিছু কর্ম করে, তা সমস্তই তাদের কর্মফলেরই ভোগ। কারণ তারা যে কর্ম করে তা সবটাই প্রারব্ধ অনুযায়ী আগে থেকেই ঠিক হয়ে আছে।
পূর্বজন্ম কৃত কর্ম, যাকে আমরা ইহ জন্মের অদৃষ্ট বা ভাগ্য বলি, তার কোনোভাবেই পরিবর্তন করা সম্ভব নয়।
ভাগ্য দুই ধরনের - ১) নিয়ত ভাগ্য ও ২) অনিয়ত ভাগ্য।
নিয়ত ভাগ্য (নিয়ন্ত্রিত বা পূর্বনির্ধারিত ভাগ্য)
নিয়ত ভাগ্য বোঝায় এমন এক ধরনের ভাগ্য যা পরিবর্তনযোগ্য নয়। এটি জন্মের পূর্বে নির্ধারিত হয়, এবং মানুষের চেষ্টায় এর পরিবর্তন করা যায় না।নিয়ত ভাগ্য স্থির বা অপরিবর্তনশীল। যেমন মানুষের জন্মস্থান,গায়ের রঙ,গঠন, জাত, লিঙ্গ, রোগ-অসুখ (বংশানুক্রমিক) ইত্যাদি। এগুলি সব পূর্বজন্মের কর্মের ফল অনুযায়ী নির্ধারিত হয়।দেবতা বা সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছায় বা পূর্বকৃত কর্মে এটি স্থির হয়। যেমন: কেউ দরিদ্র পরিবারে জন্মালেও হয়তো বিশাল বুদ্ধিমত্তা নিয়ে জন্মেছে — এটা তার নিয়ত ভাগ্যের অংশ।
আর অনিয়ত ভাগ্য (পরিবর্তনশীল ভাগ্য)
অনিয়ত ভাগ্য এমন এক ভাগ্য যা মানুষের চেষ্টা, সাধনা, আচরণ ও কর্ম দিয়ে গড়া যায়। এটি পরিবর্তনযোগ্য এবং এটি নির্ভর করে বর্তমান জীবনের কাজের ওপর।
অধ্যবসায়, শিক্ষা, আচরণ, দান, নৈতিকতা ইত্যাদি দিয়ে গঠিত হয়। মানুষ চেষ্টা করলে নিজের অবস্থার উন্নতি ঘটাতে পারে। ধর্মীয় মতে, সদকর্ম করলে ভবিষ্যৎ জন্মেও সুফল পাওয়া যায়। যেমন: কেউ দরিদ্র হয়ে জন্মালেও কঠোর পরিশ্রম করে ধনী বা সম্মানিত ব্যক্তি হতে পারে।অনিয়ত ভাগ্য নিজ প্রচেষ্টা, উদ্যম বা পুরুষকার দ্বারা পরিবর্তন সম্ভব।তাই একে নতুন পুরুষার্থ বলে । এখন প্রশ্ন জাগতে পারে নিয়ত ভাগ্য অপরিবর্তনশীল, অনিয়ত ভাগ্য পরিশ্রম দ্বারা পরিবর্তন করা সম্ভব তাহলে গ্রহ প্রতিকার অর্থাৎ রত্ন ধারণ, ধাতু, মূল বা কবচ ধারনের কি প্রয়োজন? হ্যাঁ, এটারও প্রয়োজন আছে। যাদের পুরুষকারের অভাব তাদের জন্য এবং সার্বিকভাবে নিয়ত ও অনিয়ত ভাগ্যের মন্দ দিকটির প্রশমনের জন্য গ্রহ প্রতিকারের প্রয়োজন আছে। গ্রহ প্রতিকার দ্বারা গ্রহ দোষ সম্পূর্ণভাবে কাটানো সম্ভব নয়। মাত্র ২০ শতাংশ কমলেও সম্পূর্ণ প্রশমিত হয় না। যেমন বৃষ্টি হলে ছাতার ব্যাবহার করা হয়, তাতে যেমন বৃষ্টিপাত বন্ধ হয়না কিন্তু কাজ মিটে যায়। গরমে যেমন আমরা ফ্যান বা এসি চালাই, তাতে যেমন বাইরের তাপমাত্রার বিন্দুমাত্র হেরফের হয়না কিন্তু আমরা ঘরের ভেতর আরাম বা স্বস্তি অনুভব করি (এমন বহু উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে)। রত্ন, ধাতু, গ্রহমূল, কবচ ধারনের উপযোগিতাও ততটুকুই। তবে রত্নই হোক বা ধাতুই হোক বা কবচই হোক, সেগুলি যেনো বিশুদ্ধ ও সঠিক নির্বাচনের মাধ্যমে হয়। সর্বোপরি ইষ্ট চিন্তা, ইষ্ট স্মরণ এবং গুরুকৃপা অত্যন্ত ফলদায়ী।
হিন্দু দর্শনে বলা হয়: "পুরুষার্থ" বা মানুষের চেষ্টা দিয়ে ভাগ্যও পাল্টানো সম্ভব।
"ভাগ্য বড় না পুরুষার্থ?" — এই প্রশ্নের উত্তরে অনেক সাধক বলেন: "পুরুষার্থই বড়" — কারণ অনিয়ত ভাগ্যকে মানুষ নিজের কর্ম দিয়ে গড়ে তোলে।
নিয়ত ভাগ্য আমাদের হাতে নেই, তবে অনিয়ত ভাগ্য গড়ার ক্ষমতা আমাদের মধ্যে আছে। ভাগ্যে যদি কিছু দিক থেকে বাঁধাও থাকে, তবু সদ্চেষ্টা ও সৎকর্ম মানুষকে সাফল্যের পথে এগিয়ে দেয়।
কর্ম মানে কাজ, চিন্তা বা ইচ্ছা—যে কোনো ইচ্ছাপ্রসূত কার্যকলাপ। প্রতিটি কর্মের একটা প্রতিক্রিয়া থাকে, যেটা এই জন্মে বা ভবিষ্যৎ জন্মে ফলাফল আকারে ফিরে আসে। একে বলে ফল বা ফলাফল।
কেউ যদি সদাচরণ করে, তাহলে সে ভবিষ্যতে সুখ পায়।
যদি কেউ দুঃকর্ম করে (যেমন: মিথ্যা বলা, হত্যা, চুরি), তাহলে তার ফল ভোগ করতে হয় দুঃখ, কষ্ট বা দুর্ভাগ্য আকারে।
এতে বিশেষভাবে বোঝার বিষয়টি হল এই যে, মনুষ্য-জীবনে প্রারব্ধ অনুযায়ী শুভ-অশুভ যে সমস্ত পরিস্থিতির উদ্ভব হয় সেগুলি মানুষ সুখদায়ক বা দুঃখদায়ক বলে মনে করতে পারে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সেই সব পরিস্থিতিতে সুখী বা দুঃখী হওয়া কর্মের ফল নয়, বরং তা মুর্খতার পরিচায়ক। কারণ পরিস্থিতির উদ্ভব বাইরে থেকেই হয় আর সুখী বা দুঃখী হয় স্বয়ং নিজে। সেই পরিস্থিতির সঙ্গে করেই মানুষ সুখ বা দুঃখের ভোক্তা হয়।
মানুষ যদি সুখ-দুঃখ পরিস্থিতির সঙ্গে একাত্মতা না হয়ে তার সদুপযোগ করে, তবে সেই পরিস্থিতিই তার উদ্ধারের সাধন-সামগ্রী হয়ে উঠতে পারে।
সুখদায়ী পরিস্থিতির সদুপযোগ হল-অপরের সেবা করা এবং দুঃখদায়ী পরিস্থিতির সদুপযোগ হল-সুখভোগের ইচ্ছা পরিত্যাগ করা।
দুঃখদায়ক পরিস্থিতিতে মানুষের কখনো উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত নয়, বরং চিন্তা করা উচিত যে আমি সুখভোগের - আশায় প্রথমে পাপ হয়েছে , এখন সেই পাপ দুঃখদায়ক পরিস্থিতি রূপে এসে শেষ হচ্ছে। এতে একটি লাভ হচ্ছে এই যে, ওই পাপের প্রায়শ্চিত্ত হচ্ছে এবং আমার-শুদ্ধিকরণ হচ্ছে।
আর অন্য লাভ হল এই যে, এটি সতর্কবার্তা বহন করে যে, আমি যদি আবার সুখভোগের আশায় পাপ করে থাকি তবে পরে আবার এইরূপ দুঃখদায়ক পরিস্থিতির উদ্ভব হবে। সুতরাং সুখভোগের আশায় আর কোনো কাজ করা উচিত নয়, বরং প্রাণীমাত্রেরই হিতের জন্য কাজ করা উচিত।
রাধে রাধে