16/05/2026
ব্যাংকিং খাতে লুটপাট
লেখক: এম কবির হাসান প্রফেসর অব ফিন্যান্স এবং মফেট চেয়ার প্রফেসর, ইউনিভার্সিটি অব নিউ অরলিন্স, যুক্তরাষ্ট্র।
📌 প্রবন্ধের সারকথা
১. ব্যাংকিং সংকটের মূল কারণ কারিগরি নয়, নৈতিক
লেখকের মতে, বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের সমস্যাকে অনেকেই অনাদায়ী ঋণ, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা বা নিয়ন্ত্রক দুর্বলতার মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখেন। কিন্তু প্রকৃত সমস্যা আরও গভীরে—রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি এবং নৈতিক পতন।
________________________________________
২. খেলাপি ঋণের ভয়াবহ চিত্র
২০২৪ সালের শেষ নাগাদ অনাদায়ী ঋণের হার ২০.২ শতাংশে পৌঁছেছে, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে রেকর্ড পর্যায়ের। এর প্রায় ৮০ শতাংশই রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর। এটি দেখায় যে রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলো রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
________________________________________
৩. গবেষণার ফলাফল: রাজনৈতিক হস্তক্ষেপই প্রধান কারণ
লেখকের গবেষণায় ব্যাংক, বাংলাদেশ ব্যাংক, একাডেমিয়া ও গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের মধ্যে পরিচালিত জরিপে দেখা গেছে:
• ২৮% উত্তরদাতা নৈতিক ব্যর্থতার প্রধান কারণ হিসেবে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপকে চিহ্নিত করেছেন।
• ৭৫% বলেছেন, দলীয় চাপের কারণে ঋণ অনুমোদন ও পুনঃতফসিলীকরণে ব্যাপক আপস হয়েছে।
• একজনও প্রযুক্তিগত অদক্ষতাকে প্রধান কারণ বলেননি।
________________________________________
৪. রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর ব্যাংক লুট
লেখক উদাহরণ হিসেবে Beximco Group এবং S. Alam Group-এর কথা উল্লেখ করেছেন।
• বেক্সিমকো একাই Janata Bank থেকে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে।
• এস আলম গ্রুপ Islami Bank Bangladesh PLC-সহ একাধিক ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ নিয়ে আর্থিক ব্যবস্থা দুর্বল করেছে।
________________________________________
৫. ইসলামি ব্যাংকিংও রাজনৈতিক দখলের শিকার
ইসলামি ব্যাংকিংয়ের নৈতিক ভিত্তি—সুদবিরোধিতা, সম্পদভিত্তিক অর্থায়ন, স্বচ্ছতা—থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক শক্তি এসব প্রতিষ্ঠানকেও নিয়ন্ত্রণ করেছে। শরিয়াহ সুপারভাইজরি বোর্ড অনেক ক্ষেত্রে নিষ্ক্রিয় বা প্রভাবিত হয়েছে।
________________________________________
৬. বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকা
লেখক দেখিয়েছেন যে Bangladesh Bank-ও অনেক ক্ষেত্রে নীরব দর্শক বা সহযোগীর ভূমিকা পালন করেছে। নিয়ম শিথিলকরণ, সুদের হার কৃত্রিমভাবে নির্ধারণ, পরিদর্শন স্থগিত রাখা—এসব সিদ্ধান্ত পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করেছে।
________________________________________
৭. আইন যথেষ্ট নয়, দরকার নৈতিক পুনর্গঠন
২০২৫ সালের ‘ব্যাংক রেজোল্যুশন অর্ডিন্যান্স’কে লেখক ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। তবে তাঁর মতে, আইন প্রণয়ন যথেষ্ট নয়; রাজনৈতিক সদিচ্ছা, নৈতিক নেতৃত্ব এবং প্রতিষ্ঠানগত স্বাধীনতা ছাড়া প্রকৃত সংস্কার সম্ভব নয়।
________________________________________
🎯 লেখকের মূল বার্তা
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের সংকটকে কেবল আর্থিক বা প্রশাসনিক সমস্যা হিসেবে দেখলে হবে না। এটি মূলত একটি নৈতিক ও রাজনৈতিক সংকট। যতদিন রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, দুর্নীতি এবং ক্ষমতার অপব্যবহার বন্ধ না হবে, ততদিন কোনো প্রযুক্তিগত সংস্কারই কার্যকর হবে না।
________________________________________
🏛️ বৃহত্তর শিক্ষা
এই নিবন্ধের অন্তর্নিহিত শিক্ষা হলো:
প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয় তখনই, যখন নৈতিকতা ও জবাবদিহি ভেঙে পড়ে।
একটি দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা তার অর্থনীতির হৃদপিণ্ড। যদি এই হৃদপিণ্ড রাজনৈতিকভাবে আক্রান্ত হয়, তবে পুরো অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়ে।