13/08/2026
মহারাষ্ট্র সরকার সোমবার প্রায় ৮৩,৭০০ বর্গফুট বনভূমি তুলে দিল আদানি গোষ্ঠীর দুটি প্রকল্পের হাতে। রাজ্যের বন দপ্তর দুটি পৃথক সরকারি প্রস্তাব জারি করে এই জমি আদানি সিমেন্টেশন লিমিটেড এবং আদানি টোটাল গ্যাস লিমিটেডকে পাইয়ে দিয়েছে। এর মধ্যে বড় অংশটি, প্রায় ৬৯,৯৩৩ বর্গফুট বা ০.৬৪৯৭ হেক্টর সংরক্ষিত বন, নালা ম্যানগ্রোভ এবং খাঁড়ির ম্যানগ্রোভ জমি, রায়গড় জেলার আলিবাগ তালুকের শাহাপুর ও শাহাবাজ গ্রামে অবস্থিত। এই জমি আদানি সিমেন্টেশন ব্যবহার করবে তাদের রায়গড় সিমেন্ট বাল্ক টার্মিনালের জন্য একটি বার্থিং জেটি এবং কনভেয়র করিডোর তৈরিতে। বাকি প্রায় ১৩,৭৮৮ বর্গফুট বা ০.১২৮১ হেক্টর সংরক্ষিত ও চিহ্নিত বনভূমি গেছে আদানি টোটাল গ্যাসের হাতে, অমরাবতী শহর ও তার আশপাশে গ্যাস সরবরাহের পাইপলাইন বসানোর কাজে। সরকারি নির্দেশনামায় শর্ত রাখা হয়েছে বন দপ্তরের কর্মীদের অবাধ প্রবেশাধিকার থাকতে হবে, নইলে অনুমতি প্রত্যাহার হবে— কিন্তু এই শর্ত যে কাগজেই থেকে যাবে, বাস্তবে কার্যকর হবে না, তা মহারাষ্ট্রের প্রশাসনিক ইতিহাস দেখলেই বোঝা যায়।
ম্যানগ্রোভ বন কোনো ফাঁকা জমি নয়। কোঙ্কন উপকূলের এই ম্যানগ্রোভ ঝড়ের বিরুদ্ধে প্রাকৃতিক দেয়াল, মাছের প্রজননক্ষেত্র, স্থানীয় জেলে ও কৃষিজীবী মানুষের জীবিকার ভিত্তি। একবার কেটে ফেললে সেই বাস্তুতন্ত্র আর কখনও ফেরে না, ক্ষতিপূরণ বনায়নের নামে যা হয় তা স্রেফ হিসেবের প্রতারণা। অথচ একনাথ শিন্ডে সরকার একদিনে দুটি প্রস্তাব সই করে এই সংবেদনশীল জমি এক শিল্পগোষ্ঠীর হাতে তুলে দিল, কোনো প্রকৃত জনশুনানি ছাড়াই, স্থানীয় মানুষের সম্মতি না নিয়েই। এটা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, এটা একজন ধনকুবেরের ফরমায়েশ পূরণ।
কারণ এই ঘটনা বিচ্ছিন্ন কোনো ভুল নয়, এটা একটা প্যাটার্ন, একটা প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থা। গোন্দিয়ায় কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য দেড়শো হেক্টরের বেশি বনভূমি, রত্নাগিরিতে বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের নামে জমি অধিগ্রহণের অভিযোগ, মুম্বইয়ের লবণাক্ত জমি ধারাভি প্রকল্পের হাতে তুলে দেওয়া— মহারাষ্ট্রের প্রতিটি বড় জমি হস্তান্তরের ফাইলে একটাই নাম বারবার ফিরে আসে। এটা কাকতালীয় নয়, এটা শাসকযন্ত্রের সচেতন সিদ্ধান্ত। বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলোর সরকার আর আদানি গোষ্ঠীর মধ্যে যে সম্পর্ক, তাকে ভদ্র ভাষায় "ঘনিষ্ঠতা" বলা চলে না— এটা সরাসরি দালালি। রাজ্য প্রশাসন এখানে নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় নেই, তারা কাজ করছে আদানির জমি-সংগ্রাহক হিসেবে, বিনিময়ে যে রাজনৈতিক অর্থ ও সুবিধা আসে তার হিসেব প্রকাশ্যে কখনও আসে না।
পরিবেশ মন্ত্রক, বন দপ্তর, রাজ্য মন্ত্রিসভা— যাদের কাজ ছিল করপোরেট লোভ থেকে জঙ্গল আর মানুষকে রক্ষা করা, তারা আজ আদানির স্বাক্ষরকারী যন্ত্রে পরিণত হয়েছে। সাধারণ মানুষ একটুকরো জমির পাট্টার জন্য বছরের পর বছর সরকারি দপ্তরে ঘোরে, আর হাজার হাজার বর্গফুট সংরক্ষিত বন এক স্বাক্ষরে বদলে যায় ধনকুবেরের সম্পত্তিতে। এটাই আজকের ভারতের আসল ছবি— শাসক যার পক্ষে দাঁড়ানোর কথা ছিল জনগণের, সে দাঁড়িয়ে আছে আদানির পক্ষে, আর এই সরকার তার এজেন্ট হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে নির্লজ্জভাবে, প্রকাশ্যে, কোনো রাখঢাক ছাড়াই।