24/05/2026
ন্যায়বিচার, আদিম প্রতিশোধস্পৃহা এবং এক বিরল বাঙালি: বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য
(C) Biplab Pal
সভ্যতার মাপকাঠি কেবল গগনচুম্বী ইমারত বা প্রযুক্তির উৎকর্ষে নিহিত না; একটি সমাজ কতটা সভ্য, তার প্রকৃত বিচার মানুষের আদিম, পাশবিক প্রতিশোধস্পৃহাকে শৃঙ্খলিত করে 'আইনের শাসন' (Rule of Law) প্রতিষ্ঠার ক্ষমতায়।
আজকের চরম উত্তাল, আবেগ ও ক্ষোভে মথিত বাংলার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে প্রবীণ আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য ঠিক সেই সভ্যতারই এক নিঃসঙ্গ এবং অকুতোভয় কাণ্ডারী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। সত্যনিষ্ঠা, আদর্শবাদ এবং পেশাগত দায়বদ্ধতার যে মহীরুহ তিনি স্থাপন করেছেন, তার জন্য এই বিরল বাঙালিকে আমি সশ্রদ্ধ কুর্নিশ জানাই। তাঁর এই অবস্থান অনুধাবন করতে গেলে সস্তা আবেগের ঊর্ধ্বে উঠে এক গভীর দার্শনিক প্রজ্ঞার প্রয়োজন।
বর্তমান পশ্চিমবঙ্গ রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে এক অভূতপূর্ব সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁর দলের নেতা-কর্মীরা আজ বাংলার সাধারণ মানুষের কাছে চরম ঘৃণার পাত্রে পরিণত হয়েছেন। বিগত দেড় দশক ধরে তারা বাংলার বুকে যে সীমাহীন দুর্নীতি, অনাচার ও স্বৈরাচার চালিয়েছেন, তার ফলে আপামর জনতার মনে পুঞ্জীভূত হয়েছে এক তীব্র প্রতিশোধস্পৃহা। মানুষ আজ মরিয়া; তাদের চোখেমুখে এখন কেবলই বদলার আগুন—দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত অন্যায়ের চরম প্রতিশোধ নেওয়ার তৃষ্ণা।
ঠিক এই ভয়ংকর অস্থিরতার মধ্যেই একটি মন্তব্য গোটা রাজ্যকে যেন বিদ্যুত্স্পৃষ্ট করেছে। যে মানুষটি গত পনেরো বছর ধরে শাসকদলের দুর্নীতির বিরুদ্ধে রাজপথে এবং আদালতের এজলাসে একাই মহীরুহের মতো লড়াই করেছেন, যিনি মমতা জমানার বিরুদ্ধে আইনি লড়াই করা তর্কাতীতভাবে শ্রেষ্ঠ এবং সবচেয়ে তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমান আইনজীবী—সেই বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য যখন স্থির কণ্ঠে ঘোষণা করেন, "যখন মমতার কেউ থাকবে না, তাঁর পক্ষে দাঁড়ানোর জন্য আমি থাকব," তখন প্রতিটি বাঙালি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যায়।
রাস্তার মোড়ে মোড়ে, চায়ের কাপের আড্ডায় উন্মত্ত জনতা আজ 'উকিল বিকাশ'-কে অভিশাপ দিচ্ছে। মানুষ ভাবছে, তিনি হয়তো আপস করেছেন, হয়তো তিনি টাকার কাছে বিক্রি হয়ে গেছেন। কিন্তু এই ধারণা আগাগোড়াই এক চরম ভ্রান্তি এবং আমাদের চেতনার অগভীরতার নগ্ন প্রকাশ। নিরেট সত্যটি হলো—প্রজ্ঞা, চেতনা, নীতি এবং রাষ্ট্রদর্শনের দিক থেকে বাংলার সাধারণ মানুষ এই প্রাজ্ঞ আইনজীবীর চেয়ে যোজন যোজন পিছিয়ে আছেন।
বিকাশবাবু ঠিক কী করছেন এবং কেন করছেন, তা বুঝতে গেলে আমাদের মানব-ইতিহাসের আদিমতম অধ্যায়ে ফিরে যেতে হবে; বুঝতে হবে আইন ও আইনজীবীর অস্তিত্বের প্রকৃত কারণ।
একবার চোখ বন্ধ করে ভাবুন তো সেই অন্ধকার প্রাচীন পৃথিবীর কথা। যখন রাষ্ট্র ছিল না, সংবিধানের পাতা লেখা হয়নি, বিচারক বা কাঠগড়া ছিল না—তখন মানুষ কীভাবে 'ন্যায়বিচার' পেত? হোমো স্যাপিয়েন্স বা নিয়ানডার্থালরা কীভাবে অপরাধীকে শাস্তি দিত? এর উত্তর বড়ই লোমহর্ষক। আইনের জন্মের আগে পৃথিবীতে সুবিচারের কোনো স্থান ছিল না, যা ছিল তা হলো কেবলই 'প্রতিশোধ'—অন্ধ, পাশবিক প্রতিশোধ, যা গোষ্ঠীর দ্বারা অনুমোদিত হতো। প্রাচীন ভারতে একেই বলা হতো 'মাৎস্যন্যায়'—যেখানে বড় মাছ ছোট মাছকে গিলে খায়।
ধরুন, কোনো এক ব্যক্তি আপনার কন্যাকে হত্যা বা ধর্ষণ করেছে। প্রাচীন সমাজব্যবস্থায় এর শাস্তি কী হতো? সমাজ ভুক্তভোগীর পরিবারকে অধিকার দিত অপরাধীর পরিবারের কোনো নিষ্পাপ সদস্যের (যেমন তার কন্যাকে) ওপর ঠিক একই রকম পাশবিক অত্যাচার চালানোর। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি, বিশ্বের কিছু অন্ধকার প্রান্তে, যেমন আফগানিস্তান বা পাকিস্তানের কিছু প্রত্যন্ত ধর্মান্ধ ও উপজাতীয় (Tribal) সমাজে আজও এই 'বদলির বিচার' বা পাশবিক প্রথা টিকে আছে। কিন্তু মানুষ দ্রুতই বুঝতে পেরেছিল, এই অন্ধ আক্রোশের পথ ধরে চললে মানবজাতি ধ্বংস হয়ে যাবে। মহাত্মা গান্ধীর সেই অমোঘ বাণী আমরা সবাই জানি—"চোখের বদলে চোখ নিলে, একদিন গোটা পৃথিবীটাই অন্ধ হয়ে যাবে।"
এই বোধ থেকেই প্রাচীন মেসোপটেমীয় সভ্যতায় রাজা হামুরাবির হাত ধরে (Code of Hammurabi) পৃথিবীতে প্রথম আইনি কাঠামোর উদ্ভব ঘটে। কেন? কারণ একটি সমাজ কখনোই কেবল প্রতিশোধের মাধ্যমে ন্যায়বিচার পরিবেশন করে টিকে থাকতে পারে না। আইনের মূল উদ্দেশ্য অপরাধীর ওপর পাশবিক আক্রোশ মেটানো নয়। আইনের উদ্দেশ্য হলো—ভবিষ্যতে অপরাধ প্রতিরোধ করা, অপরাধীর সংশোধন, সমাজকে সুরক্ষিত করা এবং একটি নৈর্ব্যক্তিক (Impersonal) ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থার মাধ্যমে সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করা।
তবে দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আধুনিক গণতান্ত্রিক রাজনীতি অনেক সময় প্রাতিষ্ঠানিক অপরাধীকরণের (Criminalization of politics) জন্য ইন্ধন জোগায়। আর যখন সেই দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থার পতন হয়, তখন উন্মত্ত জনতা ফরাসি বিপ্লবের সময়ের মতো গিলোটিন চায়, চায় 'মব জাস্টিস' বা রাস্তার মোড়ে গণপিটুনি দিয়ে বিচার করতে। কিন্তু একজন প্রকৃত আইনজীবী জানেন, এই জনরোষ ন্যায়বিচারের সবচেয়ে বড় শত্রু।
এখানেই বিশ্বসাহিত্যের এবং ইতিহাসের কিছু ধ্রুপদী চরিত্র আমাদের মনে পড়ে যায়। হার্পার লি-র কালজয়ী উপন্যাস 'টু কিল আ মকিংবার্ড' (To Kill a Mockingbird)-এর সেই বিখ্যাত আইনজীবী অ্যাটিকাস ফিঞ্চ (Atticus Finch)-এর কথা ভাবুন। গোটা সমাজের চোখে সবচেয়ে ঘৃণিত এক মানুষের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। সমাজ যখন তাঁকে অভিশাপ দিচ্ছে, তখন তিনি বলেছিলেন, "সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতের ওপর ভিত্তি করে যা চলে না, তা হলো মানুষের বিবেক এবং আদালত।"
ইতিহাসের পাতা থেকে আরও একটি অনবদ্য দৃষ্টান্ত দেওয়া যায়। ১৭৭০ সালে আমেরিকায় 'বোস্টন ম্যাসাকার'-এর সময় ব্রিটিশ সেনারা গুলি চালিয়ে সাধারণ আমেরিকানদের হত্যা করেছিল। গোটা আমেরিকা যখন ঘৃণায় ফুটছে এবং ঘাতক ব্রিটিশ সেনাদের ফাঁসি চাইছে, তখন সেই ব্রিটিশদের পক্ষে আইনি লড়াই লড়তে এগিয়ে এসেছিলেন স্বয়ং আমেরিকার স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম স্থপতি, প্রখ্যাত আইনজীবী জন অ্যাডামস (John Adams)। দেশবাসী তাঁকে দেশদ্রোহী বলেছিল, কিন্তু তিনি জানতেন, সমাজ যদি ঘৃণিত অপরাধীকেও আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার না দেয়, তবে সেই সমাজে আইনের শাসন বলে কিছু থাকে না। আজ জনরোষের চাপে ঘৃণিত ব্যক্তির আইনি অধিকার কেড়ে নিলে, কাল সেই একই জনরোষ নিরীহ মানুষেরও অধিকার কেড়ে নেবে।
বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য আজ বাংলার বুকে সেই অ্যাটিকাস ফিঞ্চ বা জন অ্যাডামস-এর ভূমিকাই পালন করছেন। তিনি আমাদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন যে, একটি সুস্থ বিচারব্যবস্থায় এটি অপরিহার্য—প্রত্যেক অপরাধী, সে যত বড় বা জঘন্য স্বৈরাচারীই হোক না কেন, সে যেন আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ আইনজীবীর সাহায্য পায়।
কেন এই শ্রেষ্ঠ আইনজীবীর প্রয়োজন? কারণ একজন চরম ক্ষমতাবান অপরাধীও যখন তার পক্ষের সেরা আইনি সুরক্ষা পাওয়ার পর, নিরপেক্ষ বিচারকের সামনে অকাট্য প্রমাণ এবং দীর্ঘ আইনি জেরার কষ্টিপাথরে যাচাই হয়ে দোষী সাব্যস্ত হয়—কেবল তখনই প্রকৃত ন্যায়বিচার জয়যুক্ত হয়। তখন ইতিহাস আর বলতে পারে না যে, তাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে, নিছক রাজনৈতিক আক্রোশে বা 'উইচ হান্ট' (Witch-hunt) করে ফাঁসানো হয়েছে। বিকাশবাবু মমতার পক্ষে দাঁড়ালে এটা নিশ্চিত হবে যে, বিচারপ্রক্রিয়ায় কোনো ফাঁকফোকর ছিল না। আর সেই নিশ্ছিদ্র বিচারের পর যখন তাকে শাস্তি দেওয়া হবে, তখন তা হবে শাশ্বত, অকাট্য এবং ঐতিহাসিক।
মানুষ তখন শিক্ষা নেবে যে, এই সমাজ উন্মত্ত জনতার হুংকারে বা রাস্তার আবেগে চলে না; এই সমাজ চলে আইনের শাসনে। বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য ব্যক্তিগত আক্রোশ, রাজনৈতিক শত্রুতা এবং জনপ্রিয়তার সস্তা হাততালির মোহ ত্যাগ করে, আইনের প্রকৃত দর্শনের প্রতি এই অবিচল আস্থা দেখাচ্ছেন। তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নামক কোনো ব্যক্তিকে বাঁচানোর কথা বলছেন না; তিনি বাঁচানোর কথা বলছেন 'আইন' নামক সেই পবিত্র ধারণাকে, যা আমাদের সভ্য করে রেখেছে।
জনতার সাময়িক উত্তেজনার কাছে মাথা নত না করে, একা দাঁড়িয়ে সভ্যতার এই কঠিনতম পাঠটি পড়ানোর জন্য বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য সত্যিই এক বিরল, স্থিতধী এবং প্রজ্ঞাবান বাঙালি। ইতিহাস একদিন আবেগের ধোঁয়াশা কাটিয়ে উঠবে, এবং সেদিন প্রতিশোধকামী জনতার ভিড়ে নৈতিকতার পাহাড় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই মানুষটিকে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম চিরকাল সশ্রদ্ধ স্যালুট জানাবে।