23/06/2024
পড়ানোর আনন্দ হারিয়ে যাচ্ছে
------------------------------------
✒ প্রলয়ঙ্কর ভট্টাচার্য
বিভাগীয় প্রধান
দর্শন বিভাগ
কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়
------------------------------------
বেশ বুঝতে পারছি, পড়ানোর আনন্দটা চলে যাচ্ছে, হারিয়ে যাচ্ছে| ভালোবেসে পড়াতে এসেছিলাম| এখন দেখছি, নিজের ইচ্ছেমতো পড়াশোনা করা আর পড়ানো --- এ দুটি বাদ দিয়ে আর সব কিছুই করতে হচ্ছে|
শিক্ষকদের অনেকেই depression -এর শিকার হয়ে পড়ছেন, হতাশ হতোদ্যম হয়ে পড়ছেন, অন্তঃত যারা বিদ্যাচর্চার কাজটা মন দিয়ে ভালোবেসে করতে চান| এটা একটা জাতির সংকট| একদিকে promotion বিষয়ে নিরন্তর কাগজপত্র সাজিয়ে রাখার দমবন্ধ করা চাপ এবং মানদন্ডগুলো প্রয়োগের ক্ষেত্রে একটা কর্পোরেটসুলভ আমলাতান্ত্রিক নিয়মের ভজনা, clerical কাজগুলো সময়মতো শেষ করার চাপ, CBCS -এর সিলেবাস শেষ করার প্রবল অমানবিক চাপ, অন্যে API score তুলে ফেলল কিনা তার চাপ, বিদ্যাচর্চার ক্ষেত্রে নিজেদের পরিশীলিত ও পরিমার্জিত রাখার চাপ| যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ান, NET, স্কুল, কলেজ, ও বিশ্ববিদ্যালয়ের চাক্রী সক্রান্ত প্রশ্নের সদুত্তর দেবার চাপ তাদের ওপর থাকেই| তার ওপর ছাত্রছাত্রীদের পড়াশোনা বিষয়ে সামগ্রিক অনীহা ও নৈরাশ্য |
একটা বিষয় ভেবে দেখার মতো| কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর ক্ষেত্রে আমাদের যে প্রাথমিক কাজ (পড়ানো ও বিদ্যাচর্চা--teaching and learning, and creating creative minds and human resources )তার কোনো প্রতিফলন আমাদের প্রমোশনের ক্ষেত্রে গুরুত্ব পায় না| অন্য কোনো job-এর ক্ষেত্রে এমনটা হয় না|
একজন অধ্যাপক একই সঙ্গে তিনটি বিষয় নিয়ে চলেন, পড়ানো, রিসার্চ এবং clerical job . যিনি শুধু পড়াতেই চান তিনি রিসার্চ করবেনই এই বাধ্যতা থেকে তার পড়ানোর কাজটাও নষ্ট হয় , তা ছাড়া প্রতি বছর নতুন নতুনভাবে বিভিন্ন বিষয় পড়াতে গিয়ে একজন শিক্ষককে অনেককিছু পড়তে হয়, ভাবতে হয়, চর্চা করতে হয়, এও তো একপ্রকার রিসার্চ | সেখান থেকে স্বাভাবিকভাবেই কিছু লেখা তৈরি হবেই| সেটা সব শিক্ষক করছেন কিনা দেখা জরুরি| শুধু দেশে বিদেশে নিরন্তর ঘুরে ঘুরে seminar করলে সত্যিই কতটা teaching-learning উপকৃত হয় ভেবে দেখা প্রয়োজন | নাকি সেটা শুধু নিছক উৎসব আর বেড়ানো ! Seminar নিশ্চই প্রয়োজন, কিন্তু এই প্রমোশনের জন্যে এই নিরন্তর দৌড়ে বেড়ানোর কি কোনো সার্থকতা আছে?
যত অর্থ আমাদের higher education এ খরচ হয় তার বেশ খানিকটা primary and secondary education-এ খরচ করা উচিৎ বলে আমার মনে হয় |
আরো একটা কথা, বিদ্যাচর্চার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত নিয়ম-উপাসনা এক দম বন্ধ করা পরিবেশ তৈরি করে, পড়ানোর আনন্দটাই শেষ হয়ে যায় | আমাদের মাষ্টারমশাইরা যতটা এগিয়েছিলেন একটা মুক্ত পরিবেশে, আমরা কতটুকু পারছি!!
তা ছাড়াও, নিয়ম যখন ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া হয়, এবং যে নিয়মের সঙ্গে সরাসরি বিদ্যাচর্চা ও উদ্ভাবনি শক্তির কোনো সম্পর্ক থাকে না, শুধু থাকে সংখ্যার হিসেব, এবং পদ্ধতিগত ভাবনার মধ্যে অনেক অপ্রাসঙ্গিক বিষয় ঢুকে থাকে, কিছু কিছু ক্ষেত্রে এমন নিয়ম যা মেনে চলা প্রায় অসম্ভব ও একটা বিড়াট সময়সাপেক্ষ ব্যাপার, আর মানদন্ডগুলো শুধু নিয়মমাফিক পূরণ করলেই যখন সবটুকু পালন করা হয়, তখন তাকে কেন্দ্র করে নানান দূর্নীতি বাড়তে থাকে----যেমন পয়সা দিয়ে লেখা প্রকাশ করা যখন দরকার তখনি, দশ মিনিটে পেপার পড়া, পয়সা দিয়ে b.ed এর প্র্যাকটিকাল, ইত্যাদি |
Ph.D. --র যে নতুন নিয়ম সেখানেও আশঙ্কার জায়গা প্রচুর| এমনিতেই অধ্যাপকরা কতজনকে নেবেন সেটা ঠিক করে দেওয়া হয়েছে, ওদিকে প্রচুর নেট পাশ করে JRF পাচ্ছে, তাদের কি হবে? 70% score করে যদি সরাসরি Ph.D. তে ঢোকে তাও বেশ চিন্তার বিষয়, কোনো viva ছাড়াই, তাহলে তো যে কেউ যে কোনো বিষয় নিয়ে apply করলেই নিতে হবে | চিন্তার কথা| কোনো নিয়মের ক্ষেত্রেই শিক্ষকদের মতামত জানতে চাওয়া হয় না, যেমন NEP . এক কথায়, efficiency, knowledge and qualitative growth --এর কোনো গুরুত্ব নেই| যত্ন নিয়ে ভাবা ব্যাপারটা এখন বড্ড সেকেলে, একেলে ব্যাপার হলো বছর দু'য়েকের মধ্যে যে কোনো বিষয় নিয়ে রিসার্চ কম্প্লিট করে ফেলা, তা সে বিষয় যতই জটিল বা গভীর হোক না কেন, তাতে সংখ্যা তো বাড়বে |
সাধারণ ঘরের প্রান্তিক ছাত্রছাত্রীদের কথাও প্রকৃত অর্থে ভাবা হচ্ছে না, শুধুমাত্র কিছু অর্থ পাইয়ে দিলেই চলবে না| তারা ক্লাস করছে কিনা, কোথায় অন্য অসুবিধাগুলো রয়েছে দেখা প্রয়োজন |
শিক্ষকরা ক্লান্ত, নৈরাশ্যের শিকার| একদল হয়তো পড়াতে চান না, তাদের কথা আলাদা| এরপর কোনো ভালো ছাত্রছাত্রী পড়ানো বা research -এ আসবেই না| Univ -এর autonomy খুব জরুরি, কিন্তু সেটা ভুলে যাওয়ার লক্ষণ এই নিয়মগুলোর মধ্যে প্রতিফলিত হচ্ছে |
✒ প্রলয়ঙ্কর ভট্টাচার্য
বিভাগীয় প্রধান
দর্শন বিভাগ
কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়