নব দিগন্ত

নব দিগন্ত কি লিখবো?
কলমে - "রক্ত"
মগজে - "বারুদের গন্ধ"!

25/08/2026

শহরের কোলাহল যখন ধীরে ধীরে স্তব্ধ হয়ে আসে, তখন ভাগীরথীর পাড়ে বসলে বোঝা যায়—নীরবতারও নিজস্ব একটি ভাষা আছে। সন্ধ্যার আলো নিভে আসে, নদীর জলে শহরের অস্পষ্ট প্রতিচ্ছবি কাঁপে, আর দূরের মন্দির থেকে ভেসে আসে ঘণ্টাধ্বনি।
ঢং... ঢং... ঢং...
সেই শব্দ যেন শুধু পূজার আহ্বান নয়। মনে হয়, বহুদিনের ঘুমন্ত বিবেককে কেউ ধীরে ধীরে জাগিয়ে দিচ্ছে।

সেদিন নদীর পাড়ে বসে ছিলাম। চারদিকে মানুষ ছিল, অথচ মনে হচ্ছিল আমি একা। মাথার মধ্যে জমে ছিল এক পৃথিবী বিষণ্ণ চিন্তা। কিছু হারিয়ে যাওয়া সম্পর্ক, কিছু অপূর্ণ ইচ্ছা, কিছু প্রশ্ন—যাদের উত্তর সময়ও যেন দিতে পারেনি।
সামনে ভাগীরথীর জল বয়ে চলেছে।

নদীকে দেখতে দেখতে হঠাৎ মনে হলো—মানুষ আর নদীর মধ্যে পার্থক্য খুব বেশি নয়। দুজনকেই চলতে হয়। দুজনের পথেই আসে বাধা, ভাঙন, স্রোতের পরিবর্তন। তবু নদী কখনও পিছনে ফিরে নিজের পুরোনো জলকে ধরে রাখতে চায় না।
মানুষ পারে না।
মানুষ স্মৃতি আঁকড়ে ধরে থাকে।
হারিয়ে যাওয়া মানুষকে মনে রাখে, পুরোনো দিনের কথাকে বুকের মধ্যে জমিয়ে রাখে, ভেঙে যাওয়া স্বপ্নের সামনে দাঁড়িয়ে বারবার ভাবে—“যদি আবার শুরু করা যেত!”
কিন্তু সময়ের কোনো ‘যদি’ নেই।
সময় শুধু এগিয়ে যায়।
দূরের মন্দিরে আবার ঘণ্টা বাজল।
ঢং...
শব্দটি নদীর ওপারে গিয়ে মিলিয়ে গেল।

তখন মনে হলো, এই ঘণ্টাধ্বনির মধ্যেই যেন জীবনের সবচেয়ে বড় সত্য লুকিয়ে আছে। ঘণ্টা বাজে, শব্দ ছড়িয়ে পড়ে, তারপর ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায়। মানুষের জীবনও কি তাই নয়?
জন্মের পর আমরা শব্দ তৈরি করি—কথা বলি, ভালোবাসি, রাগ করি, স্বপ্ন দেখি, লড়াই করি। তারপর একদিন সেই শব্দ থেমে যায়। কিন্তু তার প্রতিধ্বনি থেকে যায় অন্য মানুষের স্মৃতিতে।
তাহলে জীবনের সার্থকতা কোথায়?
দীর্ঘ জীবনে?
অসংখ্য সম্পদে?
নাকি মানুষের মনে রেখে যাওয়া সামান্য মানবিকতায়?
সম্ভবত শেষ প্রশ্নটির উত্তরই সবচেয়ে গভীর।
কারণ ইতিহাসে কত মানুষের নাম হারিয়ে গেছে, কিন্তু তাদের একটি ভালো কাজ আজও মানুষের জীবন বদলে দিয়েছে। আবার কত নাম আলোয় থেকেও সময়ের সঙ্গে অন্ধকারে হারিয়ে গেছে।

অতএব, মানুষ কতদিন বাঁচল—তার চেয়ে বড় প্রশ্ন, সে বেঁচে থাকাকালীন কতটা মানুষ হয়ে উঠতে পেরেছিল।
ভাগীরথী তখনও বয়ে চলেছে।
তার জলের কাছে রাজা-প্রজা, ধনী-দরিদ্র, বিজয়ী-পরাজিত—সবাই সমান। নদী কাউকে আলাদা করে না। সে শুধু বহন করে চলে মানুষের সভ্যতার ইতিহাস, তার আনন্দ, তার কান্না, তার অহংকার এবং তার পতন।
শহর বদলায়।
মানুষ বদলায়।
রাজনীতি বদলায়।
প্রজন্ম বদলায়।
কিন্তু নদী তার নিজস্ব গতিতে বলে যায়—কোনো কিছুই স্থায়ী নয়।
আমরা যে বাড়িটিকে চিরদিনের ঠিকানা ভাবি, একদিন সেটিও অন্য কারও হয়ে যায়। যে মানুষটিকে ছাড়া পৃথিবী অসম্পূর্ণ মনে হয়, একদিন তার স্মৃতির সঙ্গেই পথ চলতে হয়। যে দুঃখকে আজ অসহনীয় মনে হয়, সময়ের দূরত্বে দাঁড়িয়ে সেটিই হয়তো আমাদের সবচেয়ে বড় শিক্ষায় পরিণত হয়।
এই কারণেই হয়তো জীবনকে শুধু সুখের হিসাব দিয়ে বিচার করা যায় না।
দুঃখও জীবনের শিক্ষক।
বিচ্ছেদও শিক্ষক।
অপেক্ষাও শিক্ষক।
আর নদী—সে সবচেয়ে পুরোনো শিক্ষক।
সন্ধ্যা তখন অন্ধকারে ঢেকে গেছে। নদীর ওপারের আলো আরও স্পষ্ট। বাতাসে শীতলতা নেমেছে। মন্দিরের ঘণ্টা আবার বেজে উঠল।
ঢং... ঢং... ঢং...
আমি উঠে দাঁড়ালাম।
বিষণ্ণতা তখনও ছিল। কিন্তু বিষণ্ণতার অর্থ বদলে গেছে।
আগে মনে হতো, দুঃখ মানেই জীবনের পরাজয়।
সেদিন মনে হলো—দুঃখ আসলে জীবনের গভীরতার প্রমাণও হতে পারে। যে মানুষ ভালোবাসেনি, সে হারানোর ব্যথা জানে না। যে স্বপ্ন দেখেনি, সে ভাঙার শব্দ শোনেনি।
জীবন তাই নিখুঁত হওয়ার গল্প নয়।
জীবন অসম্পূর্ণতার মধ্যেও অর্থ খুঁজে নেওয়ার গল্প।
ভাগীরথীর পাড় থেকে শহরের দিকে হাঁটতে হাঁটতে মনে হলো—আগামীকাল হয়তো সবকিছু বদলে যাবে না। সমস্যাগুলো থাকবে, কিছু প্রশ্নের উত্তর মিলবে না, কিছু মানুষ দূরেই থাকবে।
তবু সকাল হবে।
মানুষ ঘুম থেকে উঠবে।
দোকান খুলবে।
শহর আবার শব্দে ভরে যাবে।
আর ভাগীরথী?
সে তখনও বয়ে যাবে।
গতকালের জলকে ধরে না রেখে আজকের জল নিয়ে, আগামীকালের অজানা সমুদ্রের দিকে।
হয়তো আমাদেরও তাই শেখা উচিত।
সব হারানো জিনিস ফিরে পাওয়ার চেষ্টা নয়—
কিছু হারানোকে মেনে নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়া।
কারণ নদী কখনও তার পেছনের পথ মুছে ফেলে না; শুধু সেই পথকে অতিক্রম করে সামনে এগিয়ে যায়।
আর দূরের মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনি যেন প্রতিদিন সন্ধ্যায় আমাদের মনে করিয়ে দেয়—

সময় থামে না।
জীবন অপেক্ষা করে না।
তাই যতদিন আছি,
মানুষ হয়ে বেঁচে থাকাই সবচেয়ে বড় দর্শন।

Rubel Sekh ফেসবুক থেকে নেওয়া।কতদিন আর...?একটি ঘটনা ঘটবে... দেশ উত্তাল হবে। সোশ্যাল মিডিয়া ভরে যাবে  -এ।তারপর...? সময় ...
07/07/2026

Rubel Sekh ফেসবুক থেকে নেওয়া।

কতদিন আর...?

একটি ঘটনা ঘটবে... দেশ উত্তাল হবে। সোশ্যাল মিডিয়া ভরে যাবে -এ।

তারপর...?
সময় এগিয়ে যাবে। প্রতিবাদের আওয়াজ ম্লান হবে। স্মৃতি ফিকে হয়ে যাবে।

এরই মধ্যে আবার কোনো ঘর অন্ধকার হবে। আবার কোনো মা সন্তান হারাবেন। আবার কোনো বোনের স্বপ্ন থেমে যাবে। আর আমরা আবার নতুন একটি লিখব।

সময় বদলায়। ক্যালেন্ডারের পাতা বদলায়। সরকার বদলায়। ক্ষমতার মুখ বদলায়।
কিন্তু বদলায় না নারীর নিরাপত্তাহীনতা। বদলায় না বিচারহীনতার দীর্ঘ অপেক্ষা।

অজস্র ধর্ষণ, নারী নির্যাতন, শিশুদের ওপর পাশবিক অপরাধ—একটির পর একটি ঘটেই চলেছে। প্রতিবারই ক্ষোভের ঝড় ওঠে, তারপর নেমে আসে নীরবতার দীর্ঘ রাত।

আরএসএস পরিচালিত বিজেপি বারবার গরুকে "মা" বলে রাজনীতি করে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—এই দেশের মায়েরা বোনেরা কি নিরাপত্তা পায়?

একটি সভ্য রাষ্ট্রের পরিচয় ধর্মীয় আবেগের প্রদর্শনে নয়; তার পরিচয় নির্ভর করে নাগরিকের জীবন, নিরাপত্তা ও সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করা। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, ন্যায়বিচার এবং একজন নারী কতটা নিরাপদে বাঁচতে পারেন, আর অপরাধী কত দ্রুত আইনের মুখোমুখি হয়—সেখানেই।

জনারণ্যের ভিড়ে, মোমবাতির মিছিলে, প্রতিবাদের স্লোগানের মাঝেও—
মানুষের ছদ্মবেশে ঘুরে বেড়ায় হায়নারা।

মা, বোন, দিদি, কাকিমা, কন্যা, শিক্ষিকা—
সম্পর্কের এই পরিচয়গুলো কি আজ কেবলই মুখোশ হয়ে যাচ্ছে?

নারী কি শুধুই একটি শরীর?
তবে মাতৃত্বের গৌরব, মানুষের প্রতি সম্মান, মর্যাদা—
এসবের স্থান কোথায়?

প্রতিটি এমন ঘটনার পর রয়ে যায়
শুধু ঘৃণা, লজ্জা, ক্ষোভ আর অসীম যন্ত্রণা।

বিচার শুধু একটি ঘটনার জন্য নয়— বিচার এমন একটি সমাজের জন্য, যেখানে আর কোনো বোনের, কোনো মায়ের, কোনো কন্যার নামের আগে লিখতে না হয়।



photo - copy

মানুষ পাওয়ার গল্পটাই বেশি বলে,হারানোর গল্পগুলো নীরবে বয়ে বেড়ায়।অথচ জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা আসে সেই হারিয়েই।"
03/07/2026

মানুষ পাওয়ার গল্পটাই বেশি বলে,
হারানোর গল্পগুলো নীরবে বয়ে বেড়ায়।
অথচ জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা আসে সেই হারিয়েই।"

বাংলার অগ্নিযুগের ইতিহাসে এমন কিছু তরুণ বিপ্লবীর নাম রয়েছে, যাঁদের জীবন ছিল এক অবিরাম পালিয়ে বেড়ানো, সংগ্রাম আর আত্মত...
16/06/2026

বাংলার অগ্নিযুগের ইতিহাসে এমন কিছু তরুণ বিপ্লবীর নাম রয়েছে, যাঁদের জীবন ছিল এক অবিরাম পালিয়ে বেড়ানো, সংগ্রাম আর আত্মত্যাগের কাহিনী। সেইসব সাহসী বিপ্লবীদের অন্যতম ছিলেন নলিনীকান্ত বাগচী। অল্প বয়সেই দেশের স্বাধীনতার জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন এই দুর্ধর্ষ বিপ্লবী।

১৮৯৬ সালে মুর্শিদাবাদের কাঞ্চনতলায় জন্মগ্রহণ করেন নলিনীকান্ত বাগচী। তাঁর পিতার নাম ছিল ভুবনমোহন বাগচী। তাঁদের আদি নিবাস ছিল নদিয়া জেলার শিকারপুরে। ছোটবেলা থেকেই নলিনীকান্ত ছিলেন মেধাবী, দৃঢ়চেতা এবং সাহসী মানসিকতার এক তরুণ।

বহরমপুরের কৃষ্ণনাথ কলেজে পড়াশোনার সময়ই তিনি গোপনে যুক্ত হন বিপ্লবী দলে। ধীরে ধীরে ব্রিটিশ পুলিশের সন্দেহের তালিকায় চলে আসেন তিনি। পুলিশের নজর এড়াতে কখনও পাটনার বাকিপুর কলেজে, কখনও ভাগলপুর কলেজে গিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যান। এই বিপদসংকুল জীবনযাত্রার মাঝেও তিনি আই.এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। কিন্তু স্বাধীনতার সংগ্রামের পথ তাঁকে আর স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে দেয়নি। এরপর শুরু হয় তাঁর আত্মগোপনের জীবন।

নলিনীকান্ত একসময় দানাপুরের সিপাহীদের মধ্যেও বিদ্রোহ সংগঠনের চেষ্টা করেছিলেন। পরে দলের নির্দেশে তিনি গৌহাটীর আটগাঁও এলাকায় আত্মগোপন করে থাকেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন বিপ্লবী সতীশচন্দ্র পাকড়াশী। কিন্তু সেখানেও শান্তি ছিল না। খবর পেয়ে পুলিশ হানা দেয় তাঁদের আস্তানায়। শুরু হয় সশস্ত্র সংঘর্ষ। মৃত্যুকে সামনে রেখেও দু’জন কোনরকমে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন।

সেখান থেকে তাঁরা আশ্রয় নেন পাহাড়ি এলাকায়। কিন্তু দুর্ভাগ্য যেন তাঁদের পিছু ছাড়ছিল না। নবগ্রহ পাহাড়ে আবারও পুলিশের আক্রমণের মুখে পড়েন। জীবন বাঁচাতে ছয় দিন না খেয়ে, না ঘুমিয়ে মুসলিম ছদ্মবেশে পায়ে হেঁটে পৌঁছে যান লামডিং স্টেশনে। এই ঘটনাগুলো শুধু এক বিপ্লবীর পালিয়ে বেড়ানোর কাহিনী নয়— এগুলো এক তরুণের অদম্য সাহস ও দেশের প্রতি গভীর ভালোবাসার ইতিহাস।

অনেক কষ্টের পর অসুস্থ অবস্থায় কলকাতায় পৌঁছান নলিনীকান্ত। বসন্ত রোগে আক্রান্ত হয়ে কলকাতার ময়দানে পড়ে ছিলেন তিনি। সেই সময় তাঁর এক বিপ্লবী বন্ধু তাঁকে উদ্ধার করে সুস্থ করে তোলেন। সুস্থ হওয়ার পর তিনি আবারও বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে যোগ দেন এবং ঢাকার কলতাবাজারে চৈতন্য দে-র বাড়িতে আত্মগোপন করেন।

তারিখটি ছিল ১৯১৮ সালের ১৫ জুন। কলতাবাজারের সেই বাড়িটিই ছিল বিপ্লবীদের এক গোপন ঘাঁটি। সেখানে ছিলেন নলিনীকান্ত বাগচী ও বিপ্লবী তারিণী মজুমদার। গভীর রাতে পুলিশ চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে বাড়িটি। পালানোর আর কোনও পথ ছিল না। শুরু হয় তুমুল গুলির লড়াই।

দীর্ঘক্ষণ ধরে চলা সেই সংঘর্ষে তারিণী মজুমদার গুরুতর আহত হন। পুলিশের একজন সদস্য নিহত হয় এবং আরও অনেকে আহত হয়। কিছুক্ষণ পর ঘটনাস্থলেই নিহত হন তারিণী মজুমদার। অন্যদিকে আহত অবস্থায় গ্রেপ্তার হন নলিনীকান্ত বাগচী।

গ্রেপ্তারের পর শুরু হয় নির্মম অত্যাচার। ব্রিটিশ পুলিশ তাঁর কাছ থেকে বিপ্লবীদের গোপন তথ্য আদায় করতে চেয়েছিল। কিন্তু অমানুষিক যন্ত্রণা সহ্য করেও নলিনীকান্ত একটিবারের জন্যও কোনও সাথীর নাম প্রকাশ করেননি। দেশের প্রতি, সংগঠনের প্রতি তাঁর আনুগত্য ছিল মৃত্যুর চেয়েও বড়।

অবশেষে ১৯১৮ সালের ১৬ জুন পরের দিন শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন এই বীর বিপ্লবী। শেষ হয়ে যায় এক তরুণের সংগ্রামী জীবন, কিন্তু জন্ম নেয় এক অমর ইতিহাস।

পরে বিপ্লবীদের আশ্রয় দেওয়ার অপরাধে চৈতন্য দে-কে গ্রেপ্তার করে ব্রিটিশ সরকার এবং তাঁকে দশ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

নলিনীকান্ত বাগচীর জীবন আমাদের শেখায়— স্বাধীনতা কখনও বিনা ত্যাগে আসে না। তাঁর সাহস, আত্মত্যাগ এবং নীরব দেশপ্রেম আজও ইতিহাসের পাতায় দীপ্ত হয়ে আছে।

শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি বীর বিপ্লবী নলিনীকান্ত বাগচীকে।

— ✍️ লেখায়: প্রকাশ রায়

পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য এবং ভারত সরকার স্বাধীনতার সাত দশক পরেও, ১। সুস্থ এবং স্বাভাবিক একটা পরিবেশ উপহার দিতে পারেনি। ওয়ার্ল্ড ...
15/06/2026

পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য এবং ভারত সরকার স্বাধীনতার সাত দশক পরেও,

১। সুস্থ এবং স্বাভাবিক একটা পরিবেশ উপহার দিতে পারেনি। ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশনের আজকের তথ্য বলছে পৃথিবীর প্রথম সবচেয়ে বেশি বায়ু দূষিত ১০ টি শহরের মধ্যে সাতটি আমাদের দেশে।
২। নারী নিরাপত্তা দিতে পারেনি দেশ। এনসিআরবির দেওয়া তথ্য বলছে, প্রতিদিন ৮৬ টির আশেপাশে ধর্ষ/ণের ঘটনা ঘটে ভারতে।
৩। কৃষকদের ভালো রাখতে পেরেছে কি? না। প্রতিবছর হিন্দুস্থানের মানচিত্রে ১০ হাজার কৃষক আত্মহত্যা করেন ফসলের দাম না পেয়ে। দুর্যোগ, অনাবৃষ্টির পর ফসল নষ্ঠ হলে সরকারি সাহায্য না পেয়ে।
৪। কংগ্রেস, বিজেপি, জনতা সরকার কেউই গত সাত দশকে স্বচ্ছ গঙ্গা, যমুনা, গোদাবরী দিতে পারেনি। নদীকে পুজো করেছে মানুষ, কিন্তু সেই নদীতে প্রতিদিন বাড়ছে দূষণ। শুখিয়ে যাচ্ছে ইছামতি, নাওভাঙ্গা, জলঙ্গি, খঞ্জনা। হেলদোল নেই কোনো সরকারের। নদীর যেমন দূষণের পরিমান বাড়ছে, তেমনিই পানীয় জলে বাড়ছে রোগ। পিআইবির দেওয়া তথ্য বলছে প্রতিবছর দু লাখ মানুষ মারা যান পানীয় জল খেয়ে।
৫। গুজরাট, রাজস্থান, উত্তরপ্রদেশ, ঝাড়খণ্ড, বাঁকুড়া, পুরুলিয়ায় মানুষ প্রতি গরমে পানীয় জল পাননা। ১০০% ভারতীয় পরিবারের ঘরে পানীয় জল পৌঁছনোর ব্যবস্থা করে দিতে পারেনি বিজেপি সরকার। গরমকালে মাটি খুঁড়ে জল পেতে প্রতি গরমে কয়েক কিলোমিটার পেরোতে হয় আজও গুজরাটেই।
৬। প্রতি বছর ৩০-৪০ টা ট্রেন এক্সিডেন্ট হয়। ভারতীয় রেল আজও মানুষের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে পারেনি। ট্রেনের দেরিতে আসার ঘটনা তো সাউথ ইস্টার্ন রেলের রেকর্ড।
৮। আজও দেশের সরকার সঠিক পরীক্ষার পরিকাঠামো তৈরী করতে পারেনি বলে প্রশ্নপত্র বাইরে বেরিয়ে যায়। বাতিল হয় নিটের মত সর্বভারতীয় পরীক্ষা।
৯। বড়বড় বাতেলা, জিডিপিতে চতুর্থ হয়ে দেশের মানুষকে পড়াশুনো করবার সঠিক বন্দোবস্ত করতে পারেনি বলে, ২০২৬ এর ভারতে একজন মানুষকে নিজের আপনজনের মৃতদেহ নিয়ে ব্যাঙ্কে যেতে হয় টাকা তোলবার জন্য।
১০। ট্রেনের খাবারে দুর্গন্ধ, পোকা। বন্দে ভারত, রাজধানীর মত ফ্ল্যাগশিপ ট্রেন ছাড়া বেশিরভাগ ট্রেনেই টয়েলেটের অবস্থা তথৈবচ।
১১। এই বাংলায় আজও এমন গ্রাম আছে যেখানে মানুষের জন্মের শংসাপত্র নেই বলে বাচ্ছারা স্কুলে ভর্তি হতে পারেনা। মিড্ ডে মিল পায় না। বিদ্যুৎ পরিষেবা নেই আজও সেই গ্রাম সহ এই দেশের ৭ মিলিয়ন মানুষের ঘরে। (ভারত সরকার অধীনস্ত পিআইবির দেওয়া তথ্য)
১২। দক্ষিণ ভারত ছাড়া দেশের কোথায় সঠিক বন্দোবস্ত রয়েছে স্বাস্থ পরিষেবার? পশ্চিমবঙ্গ থেকে সাধারণ ফার্মাসিস্ট, কম্পাউন্ডাররা গিয়ে ডাক্তারি করেন উত্তরপ্রদেশ, রাজস্থানে। হাসপাতালের বেডে ইঁদুর গুড়ে বেড়ানোর ভিডিও ভাইরাল হয়। বেড মেলেনা। সঠিক এম্বুলেন্স পরিষেবা নেই দেশের ৬৫ শতাংশ গ্রামীণ মানুষের কাছে।
১৩। সিআইটিইউ জানাচ্ছে চার মিলিয়ন মানুষের মাথায় ছাদ নেই হিন্দুস্থানের মানচিত্রে। প্রধানমন্ত্রী অবস্ যোজনা পৌঁছয়নি ওদের কাছে।
১৪। সংগঠিত ক্ষেত্রে হপ্তান্তে জাপানে একজন শ্রমিকের রোজগার ৭৮ হাজার টাকা। আর ভারতে সেটা ৪২০০ টাকার আশেপাশে।
১৫। স্কুলে মেয়েদের জন্য টয়লেট নেই ভারতের ৯৫৫৯২ টি স্কুলে। ইলেক্ট্রিসিটির অভাব, গরমে ফ্যান না থাকা ২০২৬ এও বর্তমান।
১৬। প্রতিবছর নদী ভাঙছে পশ্চিমবঙ্গ, উড়িষ্যা, আসামে। হাজার হাজার মানুষ ঘরছাড়া। বাঁধ দেওয়ার ক্ষমতা নেই রাজ্য, কেন্দ্র কারো।
১৭। অভয়ার মা জিতলেন বটে। তবু প্রতিদিন এদেশের মেয়েরা নির্যাতিত। নির্ভয়ার পর ফের দিল্লিতে বাসে গণধ/র্ষণ হয়। কয়েকদিন আগেই বেহালায় ধর্ষ/ণ। উন্নাও, হাতরাসে রাজনৈতিক এবং ধর্মীয় প্রভাব খাটিয়ে পার পেয়ে যায় দোষী। ভারতে প্রতি বছর ২৯ হাজারের কিছু বেশি ধ/র্ষণের ঘটনা অভিযোগ আকারে নথিভুক্ত হয়।
১৮। এনসিআরবি জানাচ্ছে প্রতিবছর দেশে ১৮০০ মানুষ প্রশাসনিক অত্যাচারে জুডিসিয়াল কাস্টোডিতেই মারা যায়। ট্রায়াল পর্যন্ত শুরু হয়না তিন লাখের আশপাশে আসামির।

এমন অনেক কাজ আছে, যেগুলি দেশ, রাজ্যের সরকারের করবার কথা। কিন্তু করেনি। একদল মানুষ হকার উচ্ছেদের পক্ষে গিয়ে লিখছেন, ব্যবসা করতে গেলে ট্রেড লাইসেন্স, জিএসটি, আইটি ফাইল, ব্যাংক একাউন্ট, মূলধন, মিউনিসিপালিটি ট্যাক্স ইত্যাদির ব্যবস্থা করতে হবে। কারণ সেটিই বৈধ।
সঠিক বলেছেন।

কিন্তু উপরের আঠেরোটি প্রশ্নের উত্তরে ভারত, পশ্চিমবঙ্গ সরকার হেরে গিয়েছে। ক্ষমতায় যেই দল থাকুক না কেন, আজও সরকারের করণীয় কাজগুলি সঠিকভাবে তারা পালন করতে পারেনি। মানুষকে নূন্যতম খাদ্য, বাসস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে পারেনি। রেল পারেনি সঠিক সময়ে ট্রেন চালাতে। তাই ওই গরিব হকার কাকু, কাকিমা যদি কোনো নথি দেখতে না পারেন, তবু তাদের ব্যবসা করতে দিতে হবে। রেল কিংবা সরকারি কোনো প্রতিষ্ঠান কোনো ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান নয়। জাপান, ইউরোপের মতো রেলব্যবস্থা চালু করতে গেলে আগে নাগরিকের জীবনের সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য ক্ষেত্রগুলিতে সরকার সঠিক কর্তব্য পালন করুক।

রাজনীতির ময়দানে জনপ্রিয়তা, সমালোচনা, সমর্থন কিংবা বিরোধিতা—এসব কখনোই স্থায়ী নয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জনমত বদলায়, মানু...
12/06/2026

রাজনীতির ময়দানে জনপ্রিয়তা, সমালোচনা, সমর্থন কিংবা বিরোধিতা—এসব কখনোই স্থায়ী নয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জনমত বদলায়, মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলায়, আর নতুন নতুন ঘটনাপ্রবাহ সেই পরিবর্তনকে আরও ত্বরান্বিত করে। অনেক সময় কোনো ব্যক্তি বা জননেতা ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন, আবার কোনো বিতর্ক, সিদ্ধান্ত বা রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে সেই জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়ে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—মানুষের ভালোবাসা ও আস্থা কি সত্যিই চিরতরে হারিয়ে যায়, নাকি তা কেবল সময়ের প্রভাবে আড়ালে চলে যায়?
ইতিহাস বলছে, বহু ব্যক্তি এমন সময়ের মুখোমুখি হয়েছেন যখন তাঁদের জনপ্রিয়তা কমে গিয়েছিল, কিন্তু পরবর্তীতে কাজ, আচরণ এবং মানুষের সঙ্গে পুনরায় সংযোগ স্থাপনের মাধ্যমে তাঁরা আবার মানুষের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন। কারণ শেষ পর্যন্ত মানুষের মনে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে সততা, নিষ্ঠা এবং বাস্তব কাজের মূল্যায়ন।
এই প্রেক্ষাপটে কোয়েল মল্লিককে নিয়ে নানা আলোচনা ও মতামত দেখা যায়। কেউ মনে করেন মানুষের মধ্যে তাঁর প্রতি আগের সেই ভালোবাসা ও গ্রহণযোগ্যতা এখনও রয়ে গেছে, শুধু প্রকাশের সুযোগ কমে গেছে। আবার কেউ মনে করেন সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের পছন্দ ও প্রত্যাশা বদলে যাওয়ায় সেই অবস্থান আর আগের মতো নেই।
আপনার কী মত? কোয়েল মল্লিকের প্রতি মানুষের ভালোবাসা ও আস্থা কি আবার আগের মতো ফিরে আসতে পারে? নাকি সময়ের সঙ্গে সেই সম্পর্ক নতুন রূপ নিয়েছে? আপনার যুক্তিসহ মতামত কমেন্টে জানান।

অজয় মুখার্জি ✅প্রণব মুখার্জি ✅মমতা ব্যানার্জী ❓যাঁরা মনে করছেন তৃণমূল কংগ্রেসের কোনও প্রতিষ্ঠাতা নেতা দল ছেড়ে যাওয়ার ...
10/06/2026

অজয় মুখার্জি ✅
প্রণব মুখার্জি ✅
মমতা ব্যানার্জী ❓

যাঁরা মনে করছেন তৃণমূল কংগ্রেসের কোনও প্রতিষ্ঠাতা নেতা দল ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় এক অভূতপূর্ব রাজনৈতিক ঘটনা ঘটছে, তাঁদের জানা উচিত—দেশ ও রাজ্যের রাজনীতিতে এমন ঘটনা নতুন নয়।
পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ও স্বাধীনতা সংগ্রামী অজয় মুখার্জি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বাংলা কংগ্রেস। আবার প্রণব মুখার্জি ১৯৮৬ সালে কংগ্রেসের সঙ্গে মতবিরোধের জেরে রাষ্ট্রীয় সমাজবাদী কংগ্রেস গঠন করেছিলেন, যা পরে ১৯৮৯ সালে পুনরায় ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস-এর সঙ্গে মিশে যায়।রাজনীতিতে দল গঠন, দলত্যাগ, ভাঙন ও পুনর্মিলন রাজনীতিতে নতুন কিছু নয়। তাই কোনও নেতার দল ছাড়া যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান সুনিশ্চিত করা।

(এটা শুধুমাত্র বাংলার কয়টি উদাহরণ)

একটা সময় মুর্শিদাবাদ শুধু একটি প্রশাসনিক জেলা ছিল না, ছিল রাজনৈতিক শিক্ষা, গণচেতনা এবং প্রগতিশীল চিন্তার এক উজ্জ্বল কেন...
10/06/2026

একটা সময় মুর্শিদাবাদ শুধু একটি প্রশাসনিক জেলা ছিল না, ছিল রাজনৈতিক শিক্ষা, গণচেতনা এবং প্রগতিশীল চিন্তার এক উজ্জ্বল কেন্দ্র। এই মাটি দেখেছে ত্রিদিব চৌধুরী, ননী ভট্টাচার্য, রেজাউল করিম, সৈয়দ বদরুদ্দোজার মতো ব্যক্তিত্বদের; যাঁরা রাজনীতিকে ক্ষমতার অলিন্দে প্রবেশের পথ হিসেবে নয়, মানুষের মুক্তি, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম হিসেবে দেখতেন।

সেই সময় রাজনীতি মানে ছিল মতাদর্শ। রাজনীতি মানে ছিল সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন। রাজনৈতিক বিরোধ ছিল, মতপার্থক্য ছিল, তর্ক-বিতর্ক ছিল; কিন্তু মানুষের মধ্যে ঘৃণার দেয়াল তুলে ক্ষমতা দখলের প্রতিযোগিতা ছিল না। নেতারা মানুষের কাছে যেতেন ভোট চাইতে নয়, মানুষের পাশে দাঁড়াতে। রাজনৈতিক কর্মীরা পরিচিত ছিলেন তাঁদের আদর্শ, ত্যাগ এবং সংগ্রামের জন্য।

আজ সেই মুর্শিদাবাদ যেন এক গভীর রাজনৈতিক সংকটের মুখোমুখি। আদর্শের জায়গায় এসেছে সুযোগসন্ধানিতা, নীতির জায়গায় ব্যক্তিস্বার্থ, রাজনৈতিক চর্চার জায়গায় কেবল নির্বাচনী অঙ্ক। দলবদল আজ আর ব্যতিক্রম নয়, প্রায় নিয়মে পরিণত হয়েছে। যে রাজনীতি মানুষের অধিকার, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, কৃষক-শ্রমিকের জীবনযুদ্ধের কথা বলার কথা ছিল, সেই রাজনীতির বড় অংশ আজ পরিচয় ও বিভাজনের ব্যবসায় ব্যস্ত।

দেশের রাজনৈতিক পরিসরেও আজ এক বিপজ্জনক প্রবণতা স্পষ্ট। ধর্ম, জাতি এবং সম্প্রদায়ের ভিত্তিতে মানুষের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে রাজনৈতিক লাভ তোলার চেষ্টা ক্রমশ বেড়েই চলেছে। এই রাজনীতি শুধু গণতন্ত্রের জন্য নয়, ভারতের বহুত্ববাদী চেতনার জন্যও এক বড় চ্যালেঞ্জ।

এই পরিস্থিতিতে মুর্শিদাবাদের ঐতিহাসিক ভূমিকা নতুন করে স্মরণ করা জরুরি। কারণ এই জেলার রাজনৈতিক ঐতিহ্য আমাদের শেখায়—মানুষকে বিভক্ত করে নয়, ঐক্যবদ্ধ করেই সমাজের অগ্রগতি সম্ভব। ত্রিদিব চৌধুরীরা আমাদের শিখিয়েছেন রাজনীতি মানে মানুষের পক্ষে দাঁড়ানো। ননী ভট্টাচার্যরা শিখিয়েছেন নীতির সঙ্গে আপস না করার সাহস। রেজাউল করিমরা দেখিয়েছেন ধর্মনিরপেক্ষতা শুধু একটি শব্দ নয়, একটি জীবনদর্শন।

আজ মুর্শিদাবাদের মানুষকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে—আমরা কি ঘৃণা, বিভাজন ও সুযোগসন্ধানী রাজনীতির কাছে আত্মসমর্পণ করব, নাকি আমাদের গৌরবময় রাজনৈতিক ঐতিহ্যকে পুনরুদ্ধার করব? আমরা কি রাজনৈতিক চরিত্রহীনতার এই অন্ধকারকে মেনে নেব, নাকি নতুন প্রজন্মের হাতে তুলে দেব আদর্শ, যুক্তিবাদ, সম্প্রীতি এবং প্রগতির রাজনীতি?

মুর্শিদাবাদকে বাঁচাতে হলে, সমাজকে বাঁচাতে হলে, বাংলাকে বাঁচাতে হলে আবার ফিরিয়ে আনতে হবে সেই রাজনৈতিক সংস্কৃতি, যেখানে মানুষের পরিচয় তার ধর্ম নয়, তার নাগরিকত্ব; তার ভোট নয়, তার অধিকার; তার সম্প্রদায় নয়, তার মানবিক মর্যাদা।

সময় এসেছে আবার ত্রিদিব চৌধুরীদের রাজনীতি, ননী ভট্টাচার্যদের সততা, রেজাউল করিমদের ধর্মনিরপেক্ষ চেতনা এবং প্রগতিশীল গণআন্দোলনের ঐতিহ্যকে নতুন করে ধারণ করার।

কারণ ইতিহাস কখনও শূন্যস্থান পছন্দ করে না। যদি আদর্শের রাজনীতি পিছিয়ে যায়, তবে বিভেদের রাজনীতি সেই জায়গা দখল করে নেয়। তাই মুর্শিদাবাদের ভবিষ্যৎ রক্ষার লড়াই আসলে তার রাজনৈতিক আত্মাকে পুনরুদ্ধারের লড়াই।

আসুন, আমরা আবার এমন এক মুর্শিদাবাদ গড়ার স্বপ্ন দেখি—যেখানে রাজনীতি হবে মানুষের জন্য, সমাজের জন্য, সম্প্রীতির জন্য; ক্ষমতার জন্য নয়।

বস্তি উচ্ছেদ: সেকাল ও একাল, উন্নয়ন ও পুনর্বাসনের প্রশ্নস্বাধীনতার পর ভারতবর্ষে নগরায়নের গতি যত বেড়েছে, ততই বেড়েছে শহ...
09/06/2026

বস্তি উচ্ছেদ: সেকাল ও একাল, উন্নয়ন ও পুনর্বাসনের প্রশ্ন

স্বাধীনতার পর ভারতবর্ষে নগরায়নের গতি যত বেড়েছে, ততই বেড়েছে শহরমুখী মানুষের সংখ্যা। কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং উন্নত জীবনের আশায় গ্রাম থেকে লক্ষ লক্ষ মানুষ শহরে এসে বসতি গড়েছেন। কিন্তু শহরের পরিকল্পিত বিকাশের বাইরে থাকা এই মানুষদের বড় অংশই বস্তি, ঝুপড়ি বা অনানুষ্ঠানিক বসতিতে আশ্রয় নিয়েছেন। ফলে স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত ভারতের নগর উন্নয়নের ইতিহাস একদিকে যেমন নতুন রাস্তা, সেতু, আবাসন ও শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার ইতিহাস, তেমনি বস্তি উচ্ছেদ এবং পুনর্বাসন নিয়ে দীর্ঘ বিতর্কেরও ইতিহাস।

স্বাধীনতার পর কংগ্রেস শাসনামলে দেশের বড় শহরগুলিতে নগর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে একাধিক বস্তি উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হয়। তৎকালীন সরকারের যুক্তি ছিল, অপরিকল্পিত বসতি শহরের স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও পরিকাঠামোর উপর চাপ সৃষ্টি করছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন রাজ্যে বস্তি উন্নয়ন ও পুনর্বাসনের নীতিও গ্রহণ করা হয়। পশ্চিমবঙ্গে বস্তি উচ্ছেদ ও পুনর্বাসন সংক্রান্ত আইন প্রণয়ন করা হয় এবং সরকারি আবাসন প্রকল্পের মাধ্যমে কিছু মানুষের পুনর্বাসনের চেষ্টা করা হয়। তবে বাস্তবে পুনর্বাসন সবক্ষেত্রে কার্যকর হয়নি। অনেক ক্ষেত্রেই উচ্ছেদ হওয়া মানুষদের অভিযোগ ছিল, বিকল্প বাসস্থান কর্মস্থল থেকে অনেক দূরে হওয়ায় তাদের জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে পুনর্বাসন কেবল মাথার উপর ছাদ দেওয়ার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকেনি; তা জীবিকা, শিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তার সঙ্গেও জড়িয়ে পড়ে।

পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট সরকার দীর্ঘ ৩৪ বছর ক্ষমতায় ছিল। এই সময় ভূমি সংস্কার, পঞ্চায়েত ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ এবং কৃষকদের কিছু অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য বামফ্রন্ট প্রশংসা পায়। কিন্তু শহরাঞ্চলে উচ্ছেদ নীতি নিয়ে বিতর্কও তৈরি হয়। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ১৯৯৬ সালের ‘অপারেশন সানশাইন’। কলকাতার ফুটপাত ও রাস্তা দখলমুক্ত করার নামে হাজার হাজার হকারকে উচ্ছেদ করা হয়। সরকারের বক্তব্য ছিল, শহরের যান চলাচল ও নাগরিক সুবিধার জন্য এটি প্রয়োজনীয়। কিন্তু বিরোধী রাজনৈতিক দল, মানবাধিকার সংগঠন এবং হকার সংগঠনগুলির একাংশ অভিযোগ তোলে যে জীবিকার বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়া এই উচ্ছেদ সামাজিকভাবে অন্যায়। একইভাবে কলকাতা ও শহরতলির বিভিন্ন এলাকায় রেললাইন বা সরকারি জমির ধারে বসবাসকারী মানুষের উচ্ছেদ নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়। বামফ্রন্ট সরকার অনেক ক্ষেত্রে পুনর্বাসনের কথা বললেও বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।

২০১১ সালে তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় আসার পর ‘মা-মাটি-মানুষ’-এর রাজনীতির কথা বলা হয়। গরিব ও প্রান্তিক মানুষের উন্নয়নের লক্ষ্যে একাধিক সামাজিক প্রকল্প চালু হয়। কিন্তু নগর উন্নয়ন, রাস্তা সম্প্রসারণ, সৌন্দর্যায়ন প্রকল্প, জলাশয় সংস্কার বা অবৈধ দখল উচ্ছেদের নামে বিভিন্ন এলাকায় উচ্ছেদ অভিযানও পরিচালিত হয়। কলকাতা ও সংলগ্ন অঞ্চলের বেশ কয়েকটি উচ্ছেদ অভিযানকে কেন্দ্র করে নাগরিক সমাজের একাংশ প্রশ্ন তোলে যে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা পর্যাপ্ত ছিল কি না। সরকারের দাবি ছিল আইন মেনেই কাজ করা হচ্ছে এবং বহু ক্ষেত্রেই বিকল্প আবাসনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। অন্যদিকে ক্ষতিগ্রস্তদের একাংশের অভিযোগ ছিল, পুনর্বাসন প্রকল্প বাস্তব চাহিদা পূরণ করতে পারেনি। ফলে উচ্ছেদ বনাম পুনর্বাসন বিতর্ক অব্যাহত থাকে।

সাম্প্রতিক সময়ে বিজেপি শাসিত বিভিন্ন রাজ্যে ‘বুলডোজার রাজনীতি’ শব্দবন্ধটি জাতীয় স্তরে আলোচিত হয়েছে। উত্তর প্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, দিল্লির কিছু অংশ এবং অন্যান্য রাজ্যে অবৈধ নির্মাণ উচ্ছেদের নামে বড় আকারের অভিযান চালানো হয়েছে। সরকারের সমর্থকদের মতে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, অবৈধ দখল রোধ এবং নগর পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য এই পদক্ষেপ প্রয়োজনীয়। কিন্তু মানবাধিকার সংগঠন, বিরোধী রাজনৈতিক দল এবং নাগরিক সমাজের একাংশ অভিযোগ করেছে যে অনেক ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত নোটিশ, আইনি প্রক্রিয়া এবং পুনর্বাসনের ব্যবস্থা ছাড়াই উচ্ছেদ করা হয়েছে। দেশের বিভিন্ন আদালতও বারবার উল্লেখ করেছে যে কোনো উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়া, মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং পুনর্বাসনের প্রশ্নকে গুরুত্ব দিতে হবে।

আসলে স্বাধীনতার পর সাত দশকেরও বেশি সময় পার হয়ে গেলেও বস্তি উচ্ছেদের প্রশ্নে একটি মৌলিক দ্বন্দ্ব থেকেই গেছে। একদিকে শহরের পরিকল্পিত উন্নয়ন, পরিবেশ রক্ষা, যান চলাচলের সুবিধা এবং পরিকাঠামো নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। অন্যদিকে রয়েছে লক্ষ লক্ষ গরিব মানুষের বাসস্থান ও জীবিকার অধিকার। সরকার যেই দলেরই হোক— কংগ্রেস, বামফ্রন্ট, তৃণমূল কংগ্রেস বা বিজেপি— প্রত্যেক সময়েই উন্নয়নের যুক্তি দেখিয়ে উচ্ছেদ হয়েছে। পার্থক্য হয়েছে মূলত পুনর্বাসনের পরিমাণ, মান এবং বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে।

প্রশ্ন হলো, উন্নয়ন কি শুধুমাত্র জমি খালি করার নাম? একটি ফ্লাইওভার, মেট্রো প্রকল্প বা আধুনিক নগর কেন্দ্র অবশ্যই প্রয়োজনীয়। কিন্তু সেই উন্নয়নের মূল্য যদি গরিব মানুষের মাথার উপর থাকা একমাত্র আশ্রয় হারানো হয়, তাহলে সেই উন্নয়নের নৈতিক ভিত্তি প্রশ্নের মুখে পড়ে। কারণ শহরের অর্থনীতি মূলত শ্রমজীবী মানুষদের উপর নির্ভরশীল। নির্মাণ শ্রমিক, রিকশাচালক, গৃহকর্মী, হকার, পরিবহন কর্মী বা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা শহরের অপরিহার্য অংশ। তাদের বাদ দিয়ে কোনো শহরের উন্নয়ন সম্ভব নয়।

তাই বস্তি উচ্ছেদ নিয়ে আলোচনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হওয়া উচিত পুনর্বাসন। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতি এবং ভারতের সংবিধানের চেতনা অনুযায়ী, মানুষের মর্যাদাপূর্ণ জীবনের অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কোনো উচ্ছেদের আগে বিকল্প বাসস্থান, বিশুদ্ধ জল, বিদ্যুৎ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং জীবিকার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। পুনর্বাসনকে দয়া বা অনুগ্রহ হিসেবে নয়, নাগরিক অধিকার হিসেবে দেখতে হবে।

সেকাল হোক বা একাল, উচ্ছেদের ঘটনাগুলি আমাদের একটি শিক্ষা দেয়— উন্নয়ন ও মানবাধিকারের মধ্যে কৃত্রিম দ্বন্দ্ব সৃষ্টি না করে উভয়কে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। শহর সুন্দর হোক, আধুনিক হোক, কিন্তু সেই শহরের নির্মাতা শ্রমজীবী মানুষদের স্থানচ্যুত করে নয়। প্রকৃত উন্নয়ন তখনই সম্ভব, যখন রাষ্ট্র উন্নয়নের পাশাপাশি মানুষের জীবন, জীবিকা ও মর্যাদাকেও সমান গুরুত্ব দেবে। কারণ একটি সভ্য সমাজের পরিচয় কেবল তার উঁচু অট্টালিকায় নয়, বরং সবচেয়ে দুর্বল মানুষটির প্রতি তার আচরণে প্রকাশ পায়।

07/06/2026

Address

Berhampore
Murshidabad

Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when নব দিগন্ত posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Shortcuts

Share