25/08/2026
শহরের কোলাহল যখন ধীরে ধীরে স্তব্ধ হয়ে আসে, তখন ভাগীরথীর পাড়ে বসলে বোঝা যায়—নীরবতারও নিজস্ব একটি ভাষা আছে। সন্ধ্যার আলো নিভে আসে, নদীর জলে শহরের অস্পষ্ট প্রতিচ্ছবি কাঁপে, আর দূরের মন্দির থেকে ভেসে আসে ঘণ্টাধ্বনি।
ঢং... ঢং... ঢং...
সেই শব্দ যেন শুধু পূজার আহ্বান নয়। মনে হয়, বহুদিনের ঘুমন্ত বিবেককে কেউ ধীরে ধীরে জাগিয়ে দিচ্ছে।
সেদিন নদীর পাড়ে বসে ছিলাম। চারদিকে মানুষ ছিল, অথচ মনে হচ্ছিল আমি একা। মাথার মধ্যে জমে ছিল এক পৃথিবী বিষণ্ণ চিন্তা। কিছু হারিয়ে যাওয়া সম্পর্ক, কিছু অপূর্ণ ইচ্ছা, কিছু প্রশ্ন—যাদের উত্তর সময়ও যেন দিতে পারেনি।
সামনে ভাগীরথীর জল বয়ে চলেছে।
নদীকে দেখতে দেখতে হঠাৎ মনে হলো—মানুষ আর নদীর মধ্যে পার্থক্য খুব বেশি নয়। দুজনকেই চলতে হয়। দুজনের পথেই আসে বাধা, ভাঙন, স্রোতের পরিবর্তন। তবু নদী কখনও পিছনে ফিরে নিজের পুরোনো জলকে ধরে রাখতে চায় না।
মানুষ পারে না।
মানুষ স্মৃতি আঁকড়ে ধরে থাকে।
হারিয়ে যাওয়া মানুষকে মনে রাখে, পুরোনো দিনের কথাকে বুকের মধ্যে জমিয়ে রাখে, ভেঙে যাওয়া স্বপ্নের সামনে দাঁড়িয়ে বারবার ভাবে—“যদি আবার শুরু করা যেত!”
কিন্তু সময়ের কোনো ‘যদি’ নেই।
সময় শুধু এগিয়ে যায়।
দূরের মন্দিরে আবার ঘণ্টা বাজল।
ঢং...
শব্দটি নদীর ওপারে গিয়ে মিলিয়ে গেল।
তখন মনে হলো, এই ঘণ্টাধ্বনির মধ্যেই যেন জীবনের সবচেয়ে বড় সত্য লুকিয়ে আছে। ঘণ্টা বাজে, শব্দ ছড়িয়ে পড়ে, তারপর ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায়। মানুষের জীবনও কি তাই নয়?
জন্মের পর আমরা শব্দ তৈরি করি—কথা বলি, ভালোবাসি, রাগ করি, স্বপ্ন দেখি, লড়াই করি। তারপর একদিন সেই শব্দ থেমে যায়। কিন্তু তার প্রতিধ্বনি থেকে যায় অন্য মানুষের স্মৃতিতে।
তাহলে জীবনের সার্থকতা কোথায়?
দীর্ঘ জীবনে?
অসংখ্য সম্পদে?
নাকি মানুষের মনে রেখে যাওয়া সামান্য মানবিকতায়?
সম্ভবত শেষ প্রশ্নটির উত্তরই সবচেয়ে গভীর।
কারণ ইতিহাসে কত মানুষের নাম হারিয়ে গেছে, কিন্তু তাদের একটি ভালো কাজ আজও মানুষের জীবন বদলে দিয়েছে। আবার কত নাম আলোয় থেকেও সময়ের সঙ্গে অন্ধকারে হারিয়ে গেছে।
অতএব, মানুষ কতদিন বাঁচল—তার চেয়ে বড় প্রশ্ন, সে বেঁচে থাকাকালীন কতটা মানুষ হয়ে উঠতে পেরেছিল।
ভাগীরথী তখনও বয়ে চলেছে।
তার জলের কাছে রাজা-প্রজা, ধনী-দরিদ্র, বিজয়ী-পরাজিত—সবাই সমান। নদী কাউকে আলাদা করে না। সে শুধু বহন করে চলে মানুষের সভ্যতার ইতিহাস, তার আনন্দ, তার কান্না, তার অহংকার এবং তার পতন।
শহর বদলায়।
মানুষ বদলায়।
রাজনীতি বদলায়।
প্রজন্ম বদলায়।
কিন্তু নদী তার নিজস্ব গতিতে বলে যায়—কোনো কিছুই স্থায়ী নয়।
আমরা যে বাড়িটিকে চিরদিনের ঠিকানা ভাবি, একদিন সেটিও অন্য কারও হয়ে যায়। যে মানুষটিকে ছাড়া পৃথিবী অসম্পূর্ণ মনে হয়, একদিন তার স্মৃতির সঙ্গেই পথ চলতে হয়। যে দুঃখকে আজ অসহনীয় মনে হয়, সময়ের দূরত্বে দাঁড়িয়ে সেটিই হয়তো আমাদের সবচেয়ে বড় শিক্ষায় পরিণত হয়।
এই কারণেই হয়তো জীবনকে শুধু সুখের হিসাব দিয়ে বিচার করা যায় না।
দুঃখও জীবনের শিক্ষক।
বিচ্ছেদও শিক্ষক।
অপেক্ষাও শিক্ষক।
আর নদী—সে সবচেয়ে পুরোনো শিক্ষক।
সন্ধ্যা তখন অন্ধকারে ঢেকে গেছে। নদীর ওপারের আলো আরও স্পষ্ট। বাতাসে শীতলতা নেমেছে। মন্দিরের ঘণ্টা আবার বেজে উঠল।
ঢং... ঢং... ঢং...
আমি উঠে দাঁড়ালাম।
বিষণ্ণতা তখনও ছিল। কিন্তু বিষণ্ণতার অর্থ বদলে গেছে।
আগে মনে হতো, দুঃখ মানেই জীবনের পরাজয়।
সেদিন মনে হলো—দুঃখ আসলে জীবনের গভীরতার প্রমাণও হতে পারে। যে মানুষ ভালোবাসেনি, সে হারানোর ব্যথা জানে না। যে স্বপ্ন দেখেনি, সে ভাঙার শব্দ শোনেনি।
জীবন তাই নিখুঁত হওয়ার গল্প নয়।
জীবন অসম্পূর্ণতার মধ্যেও অর্থ খুঁজে নেওয়ার গল্প।
ভাগীরথীর পাড় থেকে শহরের দিকে হাঁটতে হাঁটতে মনে হলো—আগামীকাল হয়তো সবকিছু বদলে যাবে না। সমস্যাগুলো থাকবে, কিছু প্রশ্নের উত্তর মিলবে না, কিছু মানুষ দূরেই থাকবে।
তবু সকাল হবে।
মানুষ ঘুম থেকে উঠবে।
দোকান খুলবে।
শহর আবার শব্দে ভরে যাবে।
আর ভাগীরথী?
সে তখনও বয়ে যাবে।
গতকালের জলকে ধরে না রেখে আজকের জল নিয়ে, আগামীকালের অজানা সমুদ্রের দিকে।
হয়তো আমাদেরও তাই শেখা উচিত।
সব হারানো জিনিস ফিরে পাওয়ার চেষ্টা নয়—
কিছু হারানোকে মেনে নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়া।
কারণ নদী কখনও তার পেছনের পথ মুছে ফেলে না; শুধু সেই পথকে অতিক্রম করে সামনে এগিয়ে যায়।
আর দূরের মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনি যেন প্রতিদিন সন্ধ্যায় আমাদের মনে করিয়ে দেয়—
সময় থামে না।
জীবন অপেক্ষা করে না।
তাই যতদিন আছি,
মানুষ হয়ে বেঁচে থাকাই সবচেয়ে বড় দর্শন।