05/02/2020
এ এক বড় অদ্ভুত বই। এমন বই আর লেখা হয়েছে কিনা সন্দেহ।
"সাভারকার হিরো হয়েই জন্মেছিলেন" এইটা ওই বই এর মূল থিম। দামোদর বিনায়ক সাভারকার, এই নামটির সাথে ও তার কর্মকান্ডের সাথে বিভিন্ন সময়ে দেশবাসীর সাথে পরিচয় করানোর জন্য যে বইটির সাহায্য নেওয়া হয় তার নাম 'লাইফ অফ ব্যারিস্টার সাভারকার'। একটি জীবনীমূলক গ্রন্থ। লেখকের নাম চিত্রগুপ্ত। বইটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯২৬ সালে, মাদ্রাজে। এই বইয়ের লেখক চিত্রগুপ্ত কে নিয়ে কিঞ্চিৎ কৌতূহলের সৃষ্টি হয়। ১৭৬০ এর দশকে রঘুনাথ যাদব নামে এক লেখক এই 'চিত্রগুপ্ত' নামে কিছু জীবনীমূলক বই লিখেছিলেন বটে, কিন্তু তিনি আর এই লেখক তো এক হতে পারেন না।
এর পরে ১৯৩৯ সালে বইটির পরিমার্জিত সংস্করণ প্রকাশ করেন হিন্দু মহাসভার এক কর্মকর্তা ইন্দ্র প্রকাশ, দিল্লিতে। ততদিনে সাভারকার জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার ব্যবস্থা করেছেন মুচলেখার বিনিময়ে, হিন্দু মহাসভার নেতা হয়েছেন। নেতার জীবনী নিয়ে স্বভাবতই তার অনুগামীরা উচ্ছসিত হলেন আর একবার। বিশেষ করে এমন এক জীবনী যার ছত্রে ছত্রে তাদের নেতাকে প্রশংসায় ভরিয়ে দেওয়া হয়েছে, বীর বিশেষণে ভূষিত করা হয়েছে। লেখক চিত্রগুপ্ত সম্বন্ধে কৌতূহলটা আরেকবার জেগে উঠেছিল। কিন্তু পরিচয় জানা যায় নি। সবাই ধরেই নিয়েছিলেন যে এটি নায়কের পরিচিত কোনও অনুগামীরা ছদ্মনাম।
সাভারকারের মৃত্যুর প্রায় দুই যুগ পরে ১৯৮৭ সালে বইটির দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়। প্রকাশক সংস্থার নাম 'বীর সাভারকার প্রকাশনা', যারা সাভারকার এর বইয়ের অফিসিয়াল প্রকাশক।
এই বই এর ২৬শে জানুয়ারিতে লিখিত মুখবন্ধে ডা: রবীন্দ্র বামন রামদাস খোলসা করে বলে দেন যে চিত্রগুপ্ত আর কেউ নয়, সাভারকার নিজেই। ব্রিটিশ আমলে ছদ্মনাম এর আড়াল এর একটা তাও যুক্তি ছিল। স্বাধীন ভারতে ওই নাম টিঁকিয়ে রাখার সপক্ষে কোনও যুক্তি স্বয়ং রামদাসও হাজির করতে পারেন নি, "মিস্ট্রি" বা 'রহস্য' বলে ছেড়ে দিয়েছেন। বেচারা রামদাস। তিনি ভক্ত লোক ছিলেন। তার পক্ষে আসল কারণটা লেখা সম্ভব ছিল না।
জীবনী গ্রন্থে গ্রন্থকার যার জীবনী লিখছেন তাকে নানা বিধ প্রশংসায় ভরিয়ে দিয়েছেন এই ঘটনা নতুন কিছু নয়। অধিকাংশ জীবনীমূলক বইতেই এ জিনিষ দেখা যায়। উল্টোদিকে আত্মজীবনীতে এই জিনিসের চল খুব কম। মানুষ স্বভাবগত ভদ্রতা সৌজন্যের খাতিরে এমন খোলাখুলি নিজের প্রশংসা করে না। সাভারকার এর একটি ব্যতিক্রম। উনি লিখেছিলেন আত্মজীবনী যার পাতায় পাতায় লজ্জাসরমের মাথা খেয়ে নিজেকে প্রশংসায় ভরিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু পাছে লোকে তাকে এ নিয়ে চেপে ধরে তাই ওই আত্মজীবনীটাকে সাজালেন জীবনীর রূপ দিয়ে, ছদ্মনাম এ লিখে।
আত্মপ্রচারের এই অদ্ভুত ট্যাকটিক্স সত্যিই প্রশংসার যোগ্য। সেই ১৯২৬ থেকে ১৯৮৭ সাল অবধি তার অনুগামী সহ অসংখ্য সাধারণ পাঠকতো বটেই, এমন কি ঐতিহাসিকদের পর্যন্ত ঘোল খাইয়ে ছেড়ে দিয়েছিলেন সাভারকার তার ওই কৌশল দিয়ে। নিজেই নিজেকে এমন বিশেষণে ভূষিত করলেন যে সেটা প্রবাদ হয়ে গেল।
আত্মপ্রচার তথা প্রচারের এমন কৌশল পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মিথ্যেবাদী নাৎসি নেতা ও মন্ত্রী গোয়েবলস ও বের করতে পারেন নি। আর আজকের আইটি সেল এর ভাইটি তো সাভারকারের কাছে শিশু। কাঁচা সব ঢপ দেয় যেগুলো দু মিনিটে ধরা পরে যায়। তাই তাদের কাছে অনুরোধ, আপনারা ভাই নিজের গুরুর কাছে ফিরে যান, তার কাছ থেকে কিছু শিখুন। কিছুই শিখতে পারলেন না। ছ্যাঃ ছ্যাঃ।