05/02/2026
যেখানে একসময় আমাদের বাগান ছিল, সেখানে এখন চারতলা বিল্ডিং। গত বছরই তুলেছি। মানুষ বেড়েছে, শহর বেড়েছে, আবাসনের চাহিদাও বেড়েছে। জমি কি আর ফেলে রাখা যায়? বিল্ডিং তুললে ভালো আয় হয়—এই সরল অঙ্ক থেকেই সিদ্ধান্ত। নতুন বিল্ডিংয়ের এক ফ্লোরে আমরা থাকি, বাকিগুলো ভাড়া। পুরোনো বিল্ডিংটাও এখন পুরো ভাড়া দেয়া।
সব ঠিকঠাকই চলছিল।
একদিন সকালে হঠাৎ ঘুম ভাঙল অদ্ভুত এক চিৎকারে। জানালা খুলে দেখি, একটা টিয়া পাখি এসে রেলিংয়ে বসে আছে। ভোরের নীরবতা ভেঙে তার কর্কশ ডাক কানে এসে লাগছে।
মনে হচ্ছে টিয়া পাখিটা বলছে,
— “এই শুয়র! এই শুয়র!”
আমি চমকে উঠলাম। টিয়া কি সত্যিই এমন বলছে? না কি আমার অপরাধবোধই শব্দগুলোকে এমন করে শুনাচ্ছে?
একসময় এই জায়গাটায় ছিল বিশাল আমগাছ, পেয়ারা, নারকেল। সকাল হলে টিয়ারা দল বেঁধে আসত। গাছের ডালে ডালে ঝুলে ফল খেত, ঝগড়া করত, আবার উড়ে যেত। এখন সেই গাছ নেই, আছে কংক্রিটের দেয়াল, লিফট, গ্রিল দেওয়া বারান্দা।
টিয়াটা আবার ডাক দিল। একই শব্দ। এবার আর বিরক্ত লাগল না বরং একটু ভয় হলো, কেমন যেন বুকের ভেতর অনুশোচনা হলো।
আমি মনে করার চেষ্টা করলাম—গাছ কাটার দিনটা। শ্রমিকদের করাতের শব্দ, ধুপ করে পড়া গাছ, পাতার কান্নার মতো শব্দ। টিয়ার বাসা ভেঙে পড়া। তখন এসব ভাবিনি। ভেবেছি ফ্ল্যাট, ভাড়া, ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা।
কিন্তু টিয়া কি সেই হিসাব বোঝে?
তার ঘর ছিল ওই গাছ। তার সকালের ডাক ছিল পাতার ফাঁকে সূর্যের সঙ্গে কথা বলা। আজ সে এসে দাঁড়িয়েছে আমার বারান্দায়—ঘরহীন এক প্রতিবাদ নিয়ে।
আমি ধীরে জানালাটা বন্ধ করলাম। কিন্তু শব্দটা বন্ধ হলো না। কারণ সেটা আর কানে নয়—মাথার ভেতরে বাজছে, তার ডাক বুকে বিধছে।
হঠাৎ মনে হলো, আমরা কি সত্যিই উন্নতি করছি? নাকি একটু একটু করে সবুজের জায়গা দখল করে নিজেদেরই গলা টিপে ধরছি?
পরদিন সকালে বারান্দায় একটি টব রাখলাম। ছোট একটা গাছ লাগালাম। জানি, এতে টিয়ার ঘর ফিরে আসবে না। তবু মনে হলো—অন্তত ক্ষমা চাওয়ার একটা চেষ্টা।
দূরে কোথাও টিয়ার ডাক শোনা গেল। আজ আর শব্দটা গালি মনে হলো না।
মনে হলো, ও বলছে—
“সবকিছু নিলেও, একটু জায়গা রেখে দিও। পৃথিবী তো শুধু তোমাদের না। আমরাও তো পৃথিবীর অংশ। আমাদের জন্য কি একটুও জায়গা রাখবেনা?”
(ফেসবুক ওয়াল থেকে কালেক্টড পোস্ট)