23/01/2026
ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন বহু অসামান্য ব্যক্তিত্বকে আমাদের সামনে নিয়ে এসেছে। তার মধ্যে বোধহয় সুভাষচন্দ্র অন্যতম উজ্জ্বল এক চরিত্র। পরাধীন দেশকে মুক্ত করতে সুভাষচন্দ্র যে দুর্জয় সাহসের পরিচয় দিয়েছিলেন তা এক কথায় অতুলনীয়। কোটি, কোটি মানুষের চোখে তিনি একজন আইকন। এই রাজনৈতিক দুর্যোগের সময়ে যেখানে রাজনৈতিক দল ও নেতারা দুর্নীতি, ঘৃণা, গণতন্ত্র হত্যার মতো জঘন্য খেলায় মেতেছে উঠছে তখন নেতাজির সমাজ-রাজনৈতিক, সম্প্রীতি, গণতান্ত্রিক আদর্শ, তাঁর জাতি-দেশ গঠনের ভুমিকা ও প্রচেষ্টাকে প্রচার ও প্রসারের মাধ্যমেই আমরা এক আদর্শ দেশ ও সমাজ পেতে পারি।
তিনি জন্মেছিলেন ১৮৯৭ সালে আজকের দিনে ওড়িশার কটকে। তিনি ছিলেন কংগ্রেস দলের বামপন্থী নেতা। পরে, কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে তৈরি করেন ফরওয়ার্ড ব্লক। ছিলেন আজাদ হিন্দ ফৌজ (ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মি)-র সর্বাধিনায়ক। কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে তাঁর উচ্চশিক্ষা শুরু হয়। পরে স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে দর্শনে অনার্স ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯১৯ সালে ইংল্যান্ডে গিয়ে সাফল্যের সাথে ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসে যোগদান করেন। কিন্তু সিভিল সার্ভিস থেকে ইস্তফা দিয়ে চিত্তরঞ্জন দাশের নেতৃত্বে ভারতের জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে যোগ দেন। ১৯২৪ সালে সুভাষ বসুকে কলকাতা কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নিযুক্ত করা হয়। ১৯৩০ সালে তিনি অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে গান্ধীর লবণ সত্যাগ্রহ আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন এবং এ জন্য তাঁকে আবার কারারুদ্ধ করা হয়। জেল থেকে মুক্তি লাভের পর তিনি ১৯৩১-এর গান্ধী-আরউইন চুক্তির বিরোধিতা করেন। ১৯৩৮ সালে সুভাষ সর্বসম্মতিক্রমে কংগ্রেস সভাপতি নির্বাচিত হন। পরের বছর তিনি ঐ একই পদে পুনঃনির্বাচিত হন। দলের আভ্যন্তরীণ কোন্দলের দরুন ১৯৩৯ সালের এপ্রিলে তিনি কংগ্রেস সভাপতি পদে ইস্তফা দেন। তাঁর রাজনৈতিক মতাদর্শ প্রচার ও জোরদার করার জন্য তিনি ঐ বছরই কংগ্রেসের ভেতরেই ফরওয়ার্ড ব্লক প্রতিষ্ঠা করে সাধারণভাবে সারা ভারতে এবং বিশেষ করে বাংলায় বিপ্লবী শক্তিগুলিকে সুসংহত করতে প্রয়াসী হন।
তিনি ফরওয়ার্ড ব্লক ও কিষাণ সভার যুক্ত উদ্যোগে ১৯৪০ সালের মার্চে বিহারের রামগড়ে এক আপোসবিরোধী সম্মেলনের আয়োজন করেন। ১৯৪০ সালের জুন মাসে নিখিল ভারত ফরওয়ার্ড ব্লকের নাগপুর অধিবেশনে তাঁর নেতৃত্বে ভারতে অস্থায়ী জাতীয় সরকার প্রতিষ্ঠার দাবি উত্থাপন করা হয়। ১৯৪০ সালের জুলাই মাসে সুভাষচন্দ্র বসুকে কলকাতার হলওয়েল মনুমেন্ট অপসারণ আন্দোলনে জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়। কারাবন্দি থাকাকালে তিনি অনশন ধর্মঘট শুরু করেন এবং ডিসেম্বর মাসে তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়। তবে স্বগৃহে অন্তরীন হন। কিন্তু ১৯৪১ সালের ২৬ জানুয়ারি সুভাষচন্দ্র গোপনে কলকাতা ত্যাগ করেন। পরে কাবুল হয়ে বিপদসঙ্কুল পথ পেরিয়ে রাশিয়ায় যান। সেখান থেকে বার্লিনে পৌঁছানোর পর তিনি ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন সংগঠনের জন্য জার্মানির সমর্থন লাভ করেন। তিনি ভারতের জন্য অস্থায়ী স্বাধীন সরকার গঠন করেন এবং বার্লিন থেকে নিয়মিত বেতার সম্প্রচারের মাধ্যমে তাঁর ধ্যানধারণা প্রচার করতে থাকেন। তিনি জার্মানি থেকে জাপানের সঙ্গেও যোগাযোগ স্থাপন করেন। জার্মানি ও জাপান সরকারের সমর্থন লাভ করে সুভাষ সিঙ্গাপুর অভিমুখে একটি সাবমেরিনে তাঁর যাত্রা শুরু করেন এবং ১৯৪৩ সালের ২ জুলাই সেখানে পৌঁছেন। জাপানিদের হাতে ভারতীয় যুদ্ধবন্দিরা সিঙ্গাপুরে তাঁর উপস্থিতিতে বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা প্রকাশ করে। ইতিমধ্যে জাপানে অবস্থানরত অন্যতম ভারতীয় বিপ্লবী রাসবিহারী বসু পূর্ব এশিয়ায় ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলন সংগঠিত করেন। তিনি আজাদ হিন্দ ফৌজ (Indian National Army) গঠন করেন। রাসবিহারী বসু আনুষ্ঠানিকভাবে আজাদ হিন্দ ফৌজের দায়িত্বভার সুভাষ বসুকে অর্পণ করেন। ১৯৪৩ সালের ২৫ আগস্ট সুভাষ আই.এন.এ-র (INA) সর্বাধিনায়ক হন এবং ঐ একই বছর ২১ অক্টোবর অস্থায়ী আজাদ হিন্দ সরকার গঠনের কথা ঘোষণা করেন। ১৯৪৪ সালের জানুয়ারি মাসে তিনি রেঙ্গুনে আইএনএ-র সদরদপ্তর স্থানান্তর করেন। তিনি রেঙ্গুন থেকে ভারত-বার্মা সীমান্তে ব্রিটিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করেন এবং ভারতের দিকে অগ্রসর হন। ১৯৪৪-এর মার্চ মাসে তিনি তাঁর এ অগ্রাভিযানে ইম্ফল ও কোহিমায় দুটি ব্রিটিশ সামরিক চৌকি দখল করেন ও সেখানে স্বাধীন ভারতের পতাকা উত্তোলন করেন। ১৯৪৫ সালের আগস্ট মাসে তাইহোকুতে এক বিমান দুর্ঘটনায় পড়েন তিনি।
আজ যখন দেশের শাসক ভারতকে হিন্দুরাষ্ট্রে পরিনত করতে উঠেপড়ে লেগেছে, তখন সুভাষচন্দ্রের জীবনাদর্শের কথা ব্যাপকভাবে প্রচার করা প্রয়োজন। তাঁর ভাবনায় স্বাধীন ভারত হবে 'সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র' যেখানে প্রতিটি নাগরিক সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দাসত্ব থেকে মুক্ত হবে। তিনি যে কর্মসূচি রচনা করেন তাতে কৃষক, শ্রমিক, যুবক ও নারীদের সংগঠিত করা, জাতিভেদ প্রথার অবসান ঘটানো, সর্বপ্রকার সামাজিক ও ধর্মীয় কুসংস্কার সমূলে উৎপাটন করা ইত্যাদির প্রতি বিশেষভাবে গুরুত্ব আরোপ করা হয়।
সুভাষ চন্দ্র বসু বলতেন এক সৈনিক হিসেবে সর্বদা তিনটি আদর্শ দ্বারা চালিত হবে। এই আদর্শগুলি হল- সত্য, কর্তব্য ও আত্মবলিদান। যে সিপাহী দেশের প্রতি বিশ্বস্ত থাকে এবং দেশের জন্য কর্তব্য ও বলিদান দিতে সর্বদা প্রস্তুত থাকে, সে অজেয়। তুমিও যদি অজেয় হতে চাও তাহলে এই তিনটি আদর্শ মেনে চল। সিঙ্গাপুরে দেওয়া একটি বক্তৃতায় তিনি বলেছিলেন, সব থেকে বড় অপরাধ অন্যায়কে সহ্য করা এবং অন্যায়কারীর সঙ্গে সমঝোতা করা।
ভারতের এই মহান সন্তানকে কুর্নিশ জানাই।
ভাঙড় বিধানসভা, আইএসএফ