19/07/2026
মেজর সত্য গুপ্ত: ঢাকা থেকে রাইটার্স হয়ে বাগুর পথচলা
জন্ম: ১৮ জুলাই ১৯০২, তেজগাঁও, ঢাকা | প্রয়াণ: ১৯ জানুয়ারি ১৯৬, বাগু, উত্তর ২৪ পরগনা
১৯০২ সালের ১৮ই জুলাই আজকের দিনে, তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার ঢাকা জেলার তেজগাঁও অঞ্চলে এক শিক্ষিত ও দেশপ্রেমিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন *সত্য গুপ্ত*। পিতা প্যারীমোহন গুপ্ত ছিলেন সমাজসচেতন মানুষ। ছোটবেলা থেকেই সত্য গুপ্ত ছিলেন মেধাবী ও দৃঢ়চেতা।
শিক্ষা ও বিপ্লবে প্রবেশ
১৯১৯ সালে ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল থেকে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাস করেন। এরপর ঢাকা কলেজে ভর্তি হন। ঠিক তখনই শুরু হয় অসহযোগ আন্দোলন ১৯২১। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ, অশ্বিনীকুমার দত্তের বক্তৃতা ও গান্ধীজীর ডাকে সাড়া দিয়ে তিনি আই.এ পরীক্ষা বয়কট করে পড়াশোনা ছেড়ে আন্দোলনে ঝাঁপ দেন।
বিপ্লবী জীবনের হাতেখড়ি হেমচন্দ্র ঘোষের "মুক্তি সংঘ"-র মাধ্যমে। পরে যুক্ত হন অনুশীলন সমিতির সঙ্গেও। অস্ত্রসংগ্রহ, গুপ্ত বৈঠক, প্রচারপত্র বিলি - সব কাজেই তিনি ছিলেন অগ্রণী।
কলকাতা ও বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স
১৯২৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম.এ পাস করার পর ১৯২৭ সালে সংগঠনের নির্দেশে কলকাতায় আসেন। এখানেই ঘনিষ্ঠতা হয় *সুভাষচন্দ্র বসু ও শরৎচন্দ্র বসু*র সঙ্গে। সুভাষচন্দ্রের সাংগঠনিক ভাবনা ও যুবশক্তিকে কাজে লাগানোর আদর্শ তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
১৯২৮ সালের কলকাতা কংগ্রেস অধিবেশনে সুভাষচন্দ্রের নেতৃত্বে গঠিত হয় "বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স" বা B.V.। সামরিক কায়দায় প্রশিক্ষিত এই স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর নেতৃত্বের দায়িত্ব পেয়ে সত্য গুপ্ত "মেজর" উপাধিতে ভূষিত হন। B.V.-র সর্বাধিনায়ক ছিলেন স্বয়ং সুভাষচন্দ্র।
রাইটার্স আক্রমণ ও দীর্ঘ কারাবাস
B.V. ছিল ব্রিটিশ অত্যাচারের বিরুদ্ধে সরাসরি প্রতিরোধের সংগঠন।
1. ১৯৩০, ২৯শে আগস্ট: পুলিশ কমিশনার চার্লস টেগার্টকে হত্যার পরিকল্পনায় জড়িত থাকার অভিযোগে প্রথমবার গ্রেপ্তার হন। প্রমাণের অভাবে মুক্তি পান।
2. ১৯৩০, ৮ই ডিসেম্বর: বিনয়-বাদল-দীনেশের ঐতিহাসিক *রাইটার্স বিল্ডিং আক্রমণ। এই ঘটনার পর ব্রিটিশ সরকার B.V. নেতাদের উপর দমনপীড়ন শুরু করে। মেজর সত্য গুপ্ত পুনরায় গ্রেপ্তার হন এবং "রাজবন্দি" হিসেবে চিহ্নিত হন।
এরপর টানা ৮ বছর তাঁকে দেশের বিভিন্ন জেলে বন্দি করে রাখা হয় - *আলিপুর সেন্ট্রাল জেল, বক্সার জেল, মিয়াঁওয়ালি জেল পাঞ্জাব, ইয়ারবাদা জেল পুনা, এবং হিজলি ডিটেনশন ক্যাম্প*। জেলে থেকেও তিনি রাজবন্দিদের মনোবল অটুট রাখতে নেতৃত্ব দেন।
নেতাজীর সহচর ও দ্বিতীয়বার কারাবাস
১৯৩৮ সালে মুক্তি পেয়ে আবার সুভাষচন্দ্রের সঙ্গে কংগ্রেস ও ফরওয়ার্ড ব্লকের কাজে যুক্ত হন। *১৯৪১ সালের ১৬ই জানুয়ারি নেতাজীর মহানিষ্ক্রমণের* পর ব্রিটিশ সরকার আবারও তাঁকে গ্রেপ্তার করে। এবার তিনি বন্দি থাকেন *১৯৪১ থেকে ১৯৪৬* সাল পর্যন্ত। এই সময়েই তিনি নেতাজীর আজাদ হিন্দ ফৌজের খবর পেয়ে আরও উদ্দীপ্ত হন।
স্বাধীনতার পর: বাগুর সমাজসেবী
১৯৪৭ সালে দেশ স্বাধীন হলেও, মেজর সত্য গুপ্ত রাজনীতির মসনদ চাননি। তিনি বেছে নিলেন গ্রামের পথ। *উত্তর ২৪ পরগনার বাগু-সপ্তগ্রাম* অঞ্চলে এসে শুরু করলেন পল্লী উন্নয়নের কাজ।
তাঁর উদ্যোগে গড়ে ওঠে "বাগু সপ্তগ্রাম পল্লী নিকেতন"। এই প্রতিষ্ঠানের সভাপতি ছিলেন তিনি, আর সম্পাদক ছিলেন আরেক বিপ্লবী *নিকুঞ্জ সেন*। এখানে স্কুল, পাঠাগার, কৃষি ও সমবায়ের মাধ্যমে গ্রামের মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নতির কাজ হতো। তাঁর বিশ্বাস ছিল - "রাজনৈতিক স্বাধীনতার সাথে অর্থনৈতিক মুক্তিও চাই"।
*শেষ দিন*
দীর্ঘ সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের পর, স্বাধীন ভারতের ১৯ বছর কাটিয়ে ১৯৬৬ সালের ১৯শে জানুয়ারি বাগুতেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই নির্ভীক বিপ্লবী।
---
মেজর সত্য গুপ্ত আমাদের কী শেখান?
তিনি ছিলেন *ছাত্র থেকে সৈনিক, সৈনিক থেকে সমাজসেবী*। বন্দুকও ধরেছেন, লাঙলও ধরেছেন। তাঁর জীবন বলে - দেশের জন্য লড়াই শুধু রাজপথে নয়, গ্রামের মাটিতেও করতে হয়।
"তোমরা আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেব"* - নেতাজীর এই ডাকে সাড়া দেওয়া অন্যতম সৈনিক ছিলেন মেজর সত্য গুপ্ত।
জয় হিন্দ! জয়তু মেজর সত্য গুপ্ত!
নেতাজী সুভাষ ব্রিগেড - এক সংগ্রাম
#নেতাজীসুভাষব্রিগেডএকসংগ্রাম