13/01/2025
একটা মেয়ে যখন পড়াশোনা শিখে বড় হয়ে সংসার জীবনের গণ্ডিতে প্রবেশ করে তখন তার সাধারন কথাগুলো বিয়ের পরে অন্য পরিবেশে অচেনা-অজানা মানুষের বিচার্য বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। তারা তখন সেই মেয়েটিকে কাঠগোড়ায় দাঁড় করাতে বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ করে না। যে মানুষটাকে আঁকড়ে ধরে সংসার জীবন শুরু করে প্রতি পদক্ষেপে তাকেও সব সময়, সেই মেয়েটির পক্ষে বোঝা সম্ভব হয় না।
ঠিক এইরকম-ই সবিতা যখন প্রথম সংসার জীবনে প্রবেশ করলো তখন একরাশ রঙিন স্বপ্ন ছিল তার দুই চোখে। নিজের সংসার সুন্দর করে সাজাবে, ছেলে মেয়েকে মনের মত করে মানুষ করবে ,স্বামীর সাথে ঘুরবে, বেড়াবে ,আনন্দ করবে এই ছিল সবিতার মনে। কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতেই সংসারের নানা যাঁতাকলে সবিতা পৃষ্ট হতে থাকে। শাশুড়ি মা তো ভুল ধরতে পারলেই বেঁচে যান। তারপর দেখতে দেখতে প্রকৃতির নিয়মে সবিতা যমজ সন্তান ফুট ফুটে কন্যা ও পুত্রসন্তানের জন্ম দেয়। ধীরে ধীরে মায়ের সাহচর্যে তারা বড় হতে থাকে। সবার জন্য সবকিছু করার পরও সবিতাকে বোঝার মত কেউ ছিল না পাশে। অনেক দূর বাপের বাড়ি হওয়ার জন্য বছরে একবারই ছেলে-মেয়ে সব সবিতা বাপের বাড়িতে ৮-১০ দিন কাটিয়ে আসতো। সেই সময়টা তার কাছে ছিল অতীব মূল্যবান। বাপের বাড়ি প্রত্যেকে তাকে প্রচন্ড ভালোবাসতো এবং যে কয়দিন থাকতো মা, বাবা ,ভাই, ভাই বৌ প্রত্যেকে তাকে নিয়ে শশব্যস্ত থাকতো। এভাবে গতানুগতিক নিয়মে সবিতার জীবন অতিবাহিত হতে থাকে ।ছেলে ,মেয়ে বড় করা ,স্বামীর সমস্ত রকম কাজে সহযোগিতা এবং শ্বশুর শাশুড়ির পরিচর্যা সবকিছুর মাধ্যমে।
কিন্তু সবিতার মনে শান্তি ছিল না একেবারেই। সাংসারিক নানা কাজের পর সবিতা নিজেকে খোঁজার চেষ্টা করতো। আমি কে? আমার মূল্য এ বাড়িতে কতখানি ?আমি প্রত্যেকের জন্য করে কি পেলাম? আমি এত পড়াশোনা শিখে যে সার্টিফিকেট সংগ্রহ করলাম জীবনের অমূল্য ২২ টা বছর দিয়ে, তার প্রেক্ষিতে সার্টিফিকেটগুলো কি কাজে এলো? এই সমস্ত নানা প্রশ্ন সবিতাকে ক্ষতবিক্ষত করতে থাকে সারাক্ষণ।
কিন্তু নীরবে নিজের সমস্ত দায়-দায়িত্ব পালন করে যেত সবিতা। সকালবেলা থেকেই শুরু হত নানা কাজ। কিন্তু মনের মধ্যে নানা রকম দ্বন্দ্বে নিজেই দুঃখিত হতো। ছেলে ও মেয়ে যখন ক্লাস সিক্সে উঠে তখন থেকে সবিতা ডিপ্রেশনে চলে যায়। এই ডিপ্রেশন এমন আকার ধারণ করে একদিন সবিতা সামান্য কিছু গয়না নিজের কাছে রেখে ,বাকি গয়না কোনগুলো মেয়ের বিয়েতে দেওয়া হবে ,কোনগুলো ছেলের বউকে দেওয়া হবে সমস্ত কিছু লিখে রেখে বেড়িয়ে পরে দরজা খুলে ভোরবেলা। তখন সবাই ঘুমে আচ্ছন্ন। সবিতা ছেলে ও মেয়েকে আদর করে তাদের দুইজনের কপালে স্নেহ চুম্বন দিয়ে পেছন ফিরে আবার তাদের পানে চেয়ে ঘর ছাড়ে।
সকালবেলায় যথারীতি মেয়ে চিৎকার করে ডাকতে থাকে মা ,মা করে। কিন্তু মা-এর কোন সাড়া পাওয়া যায় না। অপরদিকে ছেলেও ডাকতে থাকে মা একটু এসো আমাকে জল দিয়ে যাও। সবিতার স্বামী মিহির চা দেওয়ার জন্য তাড়া দিতে থাকে। শাশুড়ি মা চিৎকার করে ডাকতে থাকেন থাইরয়েডের ওষুধের জন্য। বেশ খানিকক্ষণ বাদে মেয়ে দেখে মা কোথাও নেই, তখন সবাইকে জিজ্ঞাসা করে আমার মা কোথায়? প্রত্যেকেই সব ঘর দেখতে থাকে কিন্তু কোথাও সবিতা কে খুঁজে পাওয়া যায় না, দেখে মিহির খানিকটা চিন্তা গ্রস্ত হয়ে ছাদে ঘুরে আসে। কিন্তু সেখানে ও দেখতে না পেয়ে মেইন দরজা খোলা দেখে ভাবে সামনে কোথাও হাঁটতে গেছে। সমস্ত কাজ ফেলে হাঁটা শুরু করেছে তাও আবার আমাকে না জানিয়ে মিহির রাগান্বিত হয়। কিন্তু অনেকক্ষণ হয়ে যাওয়ার পরও সকাল আটটা, নটা, দশটা কিন্তু সবিতার দেখা পাওয়া যায় না। তখন মিহির খুব চিন্তিত হয় এবং চারিদিকে খোঁজখবর শুরু করে।
কিন্তু কোথাও সবিতার দেখা না পেয়ে থানায় ডায়রি করতে বাধ্য হয় মিহির। এভাবে একদিন, দুইদিন, এক মাস, দু মাস কেটে যায় কিন্তু সবিতার কোন খোঁজ পাওয়া যায় না। সবিতা ছাড়া প্রত্যেকের জীবন যেন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে ।বুঝতে পারে যে সবিতা সংসারের জন্য কি কি করতো। বিশেষ করে মিহির এবং মিহিরের মা-বাবা জব্দ হন ভালো মতো। ছেলে ও মেয়ে মায়ের অভাব প্রতি পদক্ষেপে অনুভব করতে থাকে এবং তারা অত্যন্ত জেদি হয়ে উঠতে থাকে। সুমি (মেয়ে)ও রনি (ছেলে )এই দুইজনকে সামলাতে হিমশিম খেতে হয় মিহিরকে ।একদিকে অফিস অন্যদিকে সংসার সামঞ্জস্য বজায় রেখে চলা অসম্ভব হয়ে উঠতে থাকে মিহিরের কাছে। মিহির বাড়িতে ২৪ ঘন্টার লোক রাখতে বাধ্য হয়। টাকা পয়সা দিয়ে লোক রাখলেও সবিতার মতো দায়িত্ব সহকারে কাজ করতে পারে না আয়া দিদি সন্ধ্যা। এদিকে মিহিরের মা কোন কথা বললে দু কথা শুনিয়ে দিতেও ছাড়ে না সন্ধ্যা।
কালের নিয়মে মিহিরের মা বাবা একে একে মারা যান। ছেলে, মেয়ে বড় হয়। মিহির বাবু চাকরি থাকতে থাকতে মেয়ের বিয়ে ঠিক করেন। মেয়ে তখন চাকুরীরতা। যথা সময় স্ত্রীর অবর্তমানে মেয়ের বিয়ে দেন ও ছেলেও চাকরি নিয়ে বিদেশে পাড়ি দেয়।
এরপর একদিন মিহির বাবু এক কলিগের কাছে জানতে পারেন ওনার স্ত্রী পন্ডিচেরিতে ঋষি অরবিন্দ আশ্রমে রয়েছেন। পন্ডিচেরি ঘুরতে গিয়ে ওনার মুখোমুখি হন মিহিরের কলিগ মিস্টার ঘোষাল।
সাথে সাথে মিহির বাবু টিকিট কেটে পন্ডিচেরির উদ্দেশ্যে রওনা দেন মেয়ে সুমিকে নিয়ে। যতক্ষণ না পর্যন্ত পন্ডিচেরিতে পৌঁছাচ্ছেন, ততক্ষণ মিহির বাবু ও কন্যা সুমির মন উথাল পাথাল করতে থাকে। সত্যি গিয়ে উনি উনার সবিতা এবং সুমি তার মা কে দেখতে পাবে কিনা। পন্ডিচেরিতে ঋষি অরবিন্দ আশ্রমে প্রবেশ করে মিহির বাবু ও সুমি দেখতে পায় বহু মানুষ মেডিটেশন রত। দুইজনে খুঁজতে খুঁজতে অবশেষে সবিতার দেখা পান। কিন্তু সবিতা তখন ধ্যানমগ্ন। আধঘন্টা পর সবিতা চোখ মেলে প্রথমেই মিহির ও সুমিকে দেখতে পান। কিন্তু কোনরকম প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে উঠে যেতে চাইলে মিহির সবিতার হাত চেপে ধরেন এবং বলতে থাকেন সবিতা তুমি আমাকে ক্ষমা করে দিও ।এই তোমার মেয়ে সুমি তোমার অবর্তমানে আমি সুমি ও রনিকে মানুষ করে উপযুক্ত করে তুলেছি। তুমি আর মুখ ফিরিয়ে থেকো না। সেই দিন তোমাকে একটু বোঝার চেষ্টা করলে আজকের এই দিন আমাকে দেখতে হতো না।
সুমি মাকে জড়িয়ে ধরে। তখন সবিতা সুমিকে বলে তুমি বিবাহিত জীবনে সুখী হও ,নিজের কর্মস্থলে ভালো মতো কাজ করে সুনাম অর্জন করো ।সাথে সাথে নিজের পিতা ও প্রত্যেকের প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন কোর। এরপর সবিতা মিহির কে নিজের প্রতি খেয়াল রাখতে বলে এবং অনুমতি চায় আশ্রমের ভিতরে প্রবেশ করবার। মিহির কিছুতেই সবিতা কে ছাড়তে রাজি হয় না। কিন্তু সবিতা বলে আমার পথ সংসার জীবন থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। আমি আধ্যাত্মিক চিন্তাধারায় নিজেকে নিয়োজিত করেছি। সংসারের কোন বন্ধন আমাকে আর আটকে রাখতে পারবে না। তোমরা ভালো থাকো এবং আমাকে আর দুর্বল করার কোনরকম চেষ্টা করো না। এই কথা বলে সুমিমাকে আদর করে সবিতা আশ্রমের ভেতরে চলে যায়। মিহির ও সুমি এক দৃষ্টিতে সেই দিকে চেয়ে থাকে আর চোখ বেয়ে অনবরত জল গড়িয়ে পড়তে থাকে।
এরপর সুমি ফিরে যায় নিজের জায়গায়। আর মিহির বাবু চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার এক বছরের মধ্যে রনির বিয়ে ঠিক করে সেই দায়িত্ব সম্পন্ন করে চলে যান পন্ডিচেরিতে যেখানে সবিতা তার জন্য অপেক্ষা করছে।
✍️ মন্দিরা সিনহা
আমি প্রায় ৩০ বছর আগে একজন মহিলার মনের অবস্থা কেমন হয়েছিল, পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি তাকে কিভাবে বাধ্য করেছিল আধ্যাত্মিক জগতে প্রবেশ করতে তারই ব্যাখ্যা দিয়েছি এখানে। তবে তখনো সব মেয়ের পক্ষে এত কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব ছিল না ।কারণ অধিকাংশ মেয়েরা পড়াশোনা জানলেও স্বাবলম্বী না থাকার জন্য এবং ছেলে মেয়ের মুখের দিকে চেয়ে সবকিছুই সহ্য করতো নীরবে।