22/06/2026
উত্তরপ্রদেশের লখনউয়ের আলিগঞ্জ এলাকায় সোমবার দুপুরে একটি তিনতলা বাণিজ্যিক ভবনে ভয়াবহ আগুন লেগে কমপক্ষে ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন আরও সাতজন। উষা মেহতা মার্গের ওই ভবনে একটি অ্যানিমেশন ও কোচিং সেন্টার চলত, যেখানে মূলত ১৬ থেকে ১৭ বছর বয়সী ছাত্রছাত্রীরা পড়তে আসত।
বিকেল তিনটে নাগাদ আগুন লাগে। মুহূর্তের মধ্যে ধোঁয়ায় ভবন ভরে যায়। বেরোনোর পথ না পেয়ে সাত-আটজন ছাত্র উপর থেকে লাফ দিতে বাধ্য হয়। মৃতদের বেশিরভাগ ধোঁয়ায় শ্বাসরোধ হয়ে মারা গেছেন বলে জানা গেছে। ১৪টি দমকল গাড়ি ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধারকাজ চালায়। আহতদের কিং জর্জ মেডিকেল ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি করা হয়েছে।
খবর বেরোতেই রাষ্ট্রযন্ত্র সচল হয়ে উঠেছে। মুখ্যমন্ত্রী যোগী আলিগড়ের কর্মসূচি ফেলে ছুটলেন লখনউ। প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করলেন প্রতি মৃতের পরিবার পাবেন দুই লক্ষ টাকা। উপমুখ্যমন্ত্রী ঘটনাস্থলে গিয়ে X-এ ছবি পোস্ট করলেন। প্রতিরক্ষামন্ত্রী রওনা দিলেন। রাষ্ট্রপতি বললেন "অত্যন্ত হৃদয়বিদারক।" রাহুল গান্ধী সমবেদনা জানালেন।
এত মানুষ। এত ব্যথা। এত উদ্বেগ।
শুধু আগুন লাগার আগে কেউ একবার ভবনটায় উঁকি মারেননি।
ভারতে এই দৃশ্যটা আসলে খুব পরিচিত। এতটাই পরিচিত যে দেখতে দেখতে চোখ সয়ে গেছে। আগুন লাগবে, মানুষ মরবে, নেতারা আসবেন, তদন্ত কমিটি বসবে, কিছুদিন পর রিপোর্ট ফাইলে ঢুকবে, তারপর পরের আগুনের জন্য অপেক্ষা।
২০১৯ সালে সুরাটে একটা কোচিং সেন্টারে আগুন লেগেছিল। বাইশটি বাচ্চা মারা গিয়েছিল। টেরেসে ক্লাস হত, নিচে শর্ট সার্কিট হতেই কাঠের সিঁড়ি পুড়ে গেল — বেরোনোর আর পথ রইল না। তখনও একই কান্না, একই প্রতিশ্রুতি।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে দিল্লির রাজেন্দ্র নগরে রাউজ আইএএস কোচিং সেন্টারের বেসমেন্টে জল ঢুকে তিনজন আইএএস পরীক্ষার্থী ডুবে মারা গেলেন। বেসমেন্টে লাইব্রেরি চলত বেআইনিভাবে। তদন্তে বেরোল, MCD আগে থেকেই জানত। তবু কিছু করেনি। সেই ঘটনার পরেই দিল্লির একটি বিখ্যাত কোচিং প্রতিষ্ঠানের মালিক অকপটে বলে দিলেন যে দিল্লিতে একটিও কোচিং সেন্টারের ফায়ার NOC নেই — শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে একটিও না। কেউ চমকাল না। কারণ সবাই জানে।
রাজকোটে গেমিং জোনে আগুনের পর গুজরাট সরকার রাজ্যের প্রায় দশ হাজার ভবনে ফায়ার অডিট করেছিল। দেখা গেল প্রায় কেউই নিয়মের ধার ধারে না। মানে তালিকা ছিল, জানাও ছিল — শুধু করার ইচ্ছেটুকু ছিল না।
আসলে কোচিং সেন্টারগুলো বেআইনি তলায় চলে কারণ ভাড়া কম পড়ে। ভাড়া কম হলে, মুনাফা বাড়ে। আর সেই বেআইনি চলাটা চলতে দেওয়া হয় — কেন, সেটা আর বলতে হবে না, সবাই বোঝেন।
আইনে আছে, নিয়ম ভাঙলে জরিমানা সর্বোচ্চ পঞ্চাশ হাজার টাকা। আর অবহেলায় কেউ মারা গেলে সর্বোচ্চ ছ'মাসের জেল। এই ভয়ে কেউ ঘুম হারায় না। ঘুম হারানোর কথাও নয়।
লখনউয়ের ঘটনার পরে উত্তরপ্রদেশ সরকার বলেছে একই ধরনের ভবনগুলো খতিয়ে দেখা হবে। এই কথাটা সুরাটের পরেও বলা হয়েছিল। দিল্লির পরেও। রাজকোটের পরেও। প্রতিবারই বলা হয়, প্রতিবারই ভুলে যাওয়া হয়।
আজ পনেরোটি পরিবার কাঁদছে। মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন দোষীরা ছাড় পাবে না। প্রধানমন্ত্রী দুই লক্ষ টাকা দেবেন। রাষ্ট্রপতির বুক ভেঙে গেছে।
পরের আগুনে ঠিক এই কথাগুলোই আবার বলা হবে, হয়তো একটু অদলবদল করে।
ভবন পরিদর্শনের কথাটা কেউ বলবেন না — কারণ সেটা বললে পরের আগুনটা লাগত না, আর তাহলে শোক প্রকাশ করার সুযোগও আর থাকত না।