17/08/2026
একটা সময় ছিল, যখন পাড়ার কাকিমা, মাসিমা, পিসিমারা ঠিক বিকেল বেলা এপাড়া থেকে ওপাড়ায় হেঁটে যেতেন একবাটি লাউশাকের চচ্চড়ি বা মোচার ঘন্ট হাতে নিয়ে। মুখে মিষ্টি হাসি, গলায় আন্তরিকতা — “দিদি গো, বানিয়েছিলাম। খেয়ে দেখো না!”
না, আজ আর তারা নেই। না মানে বলতে চাইছি, অনেকে আছেন শারীরিকভাবে। কিন্তু নেই সেই আন্তরিকতা, নেই সেই সম্পর্কের নিবিড় সেতুবন্ধন। এখন যদি কেউ ভুল করে দরজায় কড়া নাড়ে, সন্তান মা-বাবাকে সাবধান করে — “আঃ! আগে ভালো করে দেখে নিও, ফলিডল টলিডল মিশিয়ে কিছু এনেছে কিনা!”
একটা সময় ছিল, কোনও বৃদ্ধ মানুষকে বাজারভর্তি ব্যাগ নিয়ে হাঁটতে দেখলে একদল তরুণ হেসে হেসে তার হাত থেকে ব্যাগটা নিয়ে তাঁর দাওয়ায় তুলে দিয়ে আসছেন, গল্প করতে করতে।
আজও সেই বৃদ্ধ মানুষটিও আছেন। হাতে রয়েছে বাজার ঠাসা ব্যাগও। কিন্তু এখন চারপাশে তরুণ ঘুরে বেড়ায় মোটরবাইকে চড়ে, কানে ইয়ারফোন গোঁজা — আর তাদের মুখ থেকে শোনা যায়, “দাদু ঘাটে যাবার শখ হয়েছে নাকি? সরতে কি হয়? কানে কী হয়েছে? ন্যাবা?”
এ কেবল ভদ্রতার অবলুপ্তি নয়, এটা এক সামাজিক অবক্ষয়ের নিদর্শন।
একটা দিন ছিল, যখন গোটা পাড়া কাঁপত কিশোর-তরুণদের হইহুল্লোড়ে। গাছের আম ধ্বংস করা, রোদেলা দুপুরে পুকুর তোলপাড় করা, মাচায় আড্ডা দিতে দিতে গার্লস স্কুলের মেয়েদের ঝাড়ি মারা। আর হঠাৎ পাশের পাড়ার কেউ মারা গেলে সেই কিশোরদেরই কেউ বলত না, কিন্তু তারাই নিজেরাই যেচে স্বেচ্ছায় শববাহক হয়ে উঠত।
আজকের দিনে, সেই কিশোররাও আছে। তবে হাতে রয়েছে স্মার্টফোন। তাদের কাছে ভালোবাসা, দায়িত্ব, সামাজিকতা এখন “অ্যাপে বুকিং” করা এক যান্ত্রিক বিষয়। পাশের পাড়া তো দূর, পাশের বাড়ি বা নিজের বাড়ির কেউ মারা গেলেও তারা তাদের দামী ফোন থেকে "শববাহীযান" বুক করে দেয় - কোমরে গামছা বাঁধে না।
আগেকার নেতারা Car নয়, ভুট ভুট করা বুলেট নয়, স্রেফ সাইকেল - নাহলে পায়ে হেঁটে ঘামে ভেজা পাঞ্জাবী আর ব্যাগ কাঁধে - ভোট ফোটের সময় না, এমনিই মাঝে মাঝে নরম বিকেলে দুয়ারে দুয়ারে এসে জানতে চাইতেন - "মেজো মেয়েটার জ্বর কমেছে তো? ডাক্তার কী বলছে? সবজি চাষে মাজরা পোকা কতটা ক্ষতি করছে? বড়ো ছেলেটা ডিভিশনে খেলতে যাচ্ছে তো? ঢকঢক করে কাচের গ্লাসে জল খেতেন। সঙ্গে দুটো বাতাসা। তৃপ্তি করে। এই প্রশ্নগুলো ছিল আন্তরিকতা আর দায়িত্ববোধের পরিচয়।
আজও নেতা আছেন। তবে তিনি দূরে। তার চারপাশে পিএ, পিএ-র পিএ, দাদা, দাদার বড়দা – এক জটিল প্রটোকলের দেয়াল। পৌঁছাতে গেলে আগে দলের পতাকা ধরতে হয়, তারপর তো দেখা।
আমাদের এক্কাদোক্কা, চু-কিত-কিত, রামলীলা, ঠাকুরমার ঝুলির গল্পের সেই শৈশব — সবই আজ নিরুদ্দেশ।
আমার সেই মাস্টারমশাই নেই, যিনি বলতেন — "তোর সার্টিফিকেট দেখে যদি বুঝতে হয় তুই শিক্ষিত - সেই সার্টিফিকেটের মাথায় মারি ঝাঁটার বাড়ি"।
আজকের শিক্ষা কেবল নম্বর, কেবল গ্রেড, কেবলমাত্র একটা রেজাল্ট।
হারিয়ে যাচ্ছে পাড়ার মাচায় সন্ধ্যার আড্ডা, যেখানে পিকাসো থেকে রবীন্দ্রনাথ, নন্দীগ্রাম থেকে কালীঘাট নিয়ে তরতাজা আলোচনা — সেও নেই।
এখনকার মাচা মানে ফাঁকা জায়গা, অথবা সেটিও নেই — সেখানে এখন পার্কিং কিংবা ফ্রী ফায়ার বা পাব-জীর আসর।
হারিয়ে যাচ্ছে সেই কলতলা, যেখানে একবালতি জল ফেলতে ফেলতে চলত জীবনের নানা গল্প, কিংবা লাইব্রেরির পাতার ফাঁকে গোঁজা চিঠির প্রেম — সব আজ ডিলিট বাটনের নিচে চাপা পড়ে গেছে।
ভোরের আজান আর শুকসারির গানের সুর একসাথে মিশে যে বাতাসে আমাদের মন ছুঁয়ে যেত — সেই বাতাসে এখন কেবল গন্ধবিহীন এয়ারফ্রেশনার।
আমাদের 'আমি'র নিরুদ্দেশ যাত্রা...
নিরুদ্দেশ হচ্ছে কেবল আমাদের চারপাশ নয় — নিরুদ্দেশ হচ্ছে আমাদের নিজস্ব 'আমি'।
নিরুদ্দেশ হচ্ছে সেই পরিবার, যেখানে একসাথে খাওয়া, গল্প বলা, মন খারাপ করা — সবই হতো ভাগ করে।
নিরুদ্দেশ হচ্ছে সেই পাড়া, যেখানে একসাথে উৎসব, একসাথে শোক, একসাথে বেঁচে থাকা ছিল।
নিরুদ্দেশ হচ্ছে সেই গ্রাম, সেই শহর, সেই স্বদেশ — যেখানে মানুষ ছিল মানুষের পাশে।
এই নিরুদ্দেশতা শুধুই পুরনো সময়ের স্মৃতি নয় — এ এক সামাজিক সঙ্কটের প্রতিচ্ছবি। আমরা কি পারি না আবার খুঁজে পেতে, সেই মানুষগুলোকে, সেই সম্পর্কগুলোকে, সেই শিকড়গুলোকে?
হয়তো সময় বদলাবে, মানুষ বদলাবে — কিন্তু সম্পর্ক, সংস্কৃতি, সহানুভূতি, ভদ্রতা — এসব যে মানবসমাজের মেরুদণ্ড, তা ভুললে চলবে না।
নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়া জিনিসগুলোকে আমরা হয়তো ফিরে আনতে পারব না ঠিক আগের মতো করে। কিন্তু কিছুটা হলেও যদি চেষ্টা করি, তবে আবার তৈরি হতে পারে এক নতুন পাড়া, এক নতুন পরিবার, এক নতুন আমি।
✍️ An Animesh An Animesh