26/05/2026
আমরা যারা নিয়মিত এই রুটে যাতায়াত করি একমাত্র তারাই জানি ডুমুরদহ একটি পূর্ণাঙ্গ রেল স্টেশন। নয়তো বাইরের কেউ ট্রেন থেকে এক ঝলক দেখলে ভাববে এটা কোনো অজ পাড়ার গায়ের হল্ট স্টেশন।
তবে জানেন কি??
হুগলি জেলার বলাগড় ব্লকের গঙ্গা তীরবর্তী প্রাচীন জনপদ হলো ডুমুরদহ।
পূর্বে গঙ্গার গতিপথ পরিবর্তন ও বিশাল 'দহ' (জলাশয়) সৃষ্টির কারণে এর নামকরণ হয়।
এটি আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য, প্রাচীন মন্দির এবং লোক সংস্কৃতির জন্য বিখ্যাত।
এই প্রাচীন জনপদ ধাম হিসাবেও পরিচিতি লাভ করেছে।
চলুন আজ এই প্রাচীন জনপদ একটু ঘুরে আসি।
বুনো কালি মাতা:-
এই অঞ্চলে রয়েছে অতি প্রাচীন এক কালী মন্দির। যার বিগ্রহকে ভক্তরা ডাকেন বুনো কালী নামে। অতি সাদামাটা এক মন্দির। দেখতে পিরামিডের মত একতলা, তবে চারচালা। এই মন্দির বারবার সংস্কার হয়েছে। তাই স্থাপত্যেও রয়েছে আধুনিকতার ছাপ। কিন্তু, ইতিহাস নিয়ে যাঁরা চর্চা করেন, তাঁদের কাছে এই মন্দির অতি প্রাচীন।
একটা সময় এই মন্দিরের খুব খ্যাতি ছিল। আর, তা বিশে ডাকাতের জন্য। উনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে এই বিশে ডাকাতকে সামলাতে হিমশিম খেতেন ইংরেজ শাসকরা। সেই সময় বিশে ছিল ইংরেজ শাসকদের কাছে এক ত্রাস। কথিত আছে, বিশে ডাকাতের দলবল নৌকোয় চেপে যশোহরে গিয়ে পর্যন্ত ডাকাতি করত। আর, এই মন্দিরে পুজো দিয়েই তারা যেত ডাকাতি করত। তবে, সাধারণ মানুষ থেকে পুলিশ জানত না যে এই বিশে ডাকাত আর কেউ নয়। সে আসলে খোদ ডুমুরদহেরই জমিদার বিশ্বনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়।
এই মন্দিরের বিশেষত্ব হল, অতীতে এখানে শাক্তমতে পুজো-আরাধনা হত। পরবর্তী সময়ে শুরু হয় বৈষ্ণব মতে পুজোপাঠ। তবে, আজও এখানে মানত পূরণ করতে ছাগল বলি দেওয়ার রীতি রয়েছে। ভক্তদের দাবি, দেবী অত্যন্ত জাগ্রত। মানত করলে, তা পূরণ হয়। শুধু তাই নয়, এই মন্দিরের পাশেই রয়েছে চারচালা ভৈরব মন্দির।
দেবীর ভৈরবও অত্যন্ত জাগ্রত। অবশ্য ভৈরব মন্দিরের অবস্থা ততটা ভালো নয়। কিন্তু, তার টেরাকোটার কাজ মনে করিয়ে দেয় যে ওই মন্দিরও অতি প্রাচীন। ভক্তরা অনেকে এই ভৈরবের মন্দিরেও মানত করে থাকেন। একটা সময় এই অঞ্চলটা ছিল জঙ্গলে ভরা। সেই থেকেই দেবীর নাম বুনোকালী বলে দাবি ইতিহাসবিদদের।
উত্তম আশ্রম :-
উত্তমাশ্রম প্রতিষ্ঠিত হয় 1318 বঙ্গাব্দের 3 রা কার্তিক ।প্রতিষ্ঠাতা 108 শ্রী শ্রী ঠাকুর উত্তমানন্দ দেব ব্রহ্মচারী। গঙ্গা তীরে বন জঙ্গল ঘেরা এক নির্জন স্থান ডুমুরদহ। হিংস্র বন্য পশু পাখির মৃগয়া ক্ষেত্র। এখানে তিনি বিশাল বট গাছের তলায় যজ্ঞ কুন্ড জ্বালিয়ে কঠোর সাধনায় মগ্ন হন। শোনা যায় ,একটি বাঘ তার কাছে বসে রাত দিন পাহারা দিতো ,যাতে কেউ তার সাধনায় বিঘ্ন ঘটাতে না পারে। এখানেই তিনি সিদ্ধি লাভ করেন।
উচুঁ প্রাচির দিয়ে ঘেরা বিশাল পরিধি নিয়ে গড়ে উঠেছে এই আশ্রম। বিশাল তোরন দ্বার দিয়ে প্রবেশ করে ঢালাই রাস্তা ধরে বেশ কিছুটা পথ পেরিয়ে গেলে নানা রকম গাছ গাছালীতে ঘেরা এই আশ্রম।পথের দুধারে চাষের জমি। সেখানে নানারকম সব্জীর চাষ। আশ্রমে ঢুকতেই গোলাকার বেদী বাধানো প্রাচীন বট গাছ। তার উপর লম্বা বাঁশে বাধাঁ লাল হলুদ নিশান পত্পত্ করে উড়ছে।
আশ্রমে অনেক গুলো দালান ঘর । মূল মন্দিরে গুরু মহারাজদের চিত্র পট। সবার উপরে আদি গুরু শঙ্করাচার্যের ফটো। পাশের বিরাট হল ঘরটিতে উপাসনা হয়। উঠান ভর্তি নানাবিধ ফুল ফলের বাগান ।ওপাশে শিব মন্দির ।বড়ো কালো পাথরের শিবলিঙ্গ। তারপর গুরু মহারাজের সমাধি মন্দির।আরো একটি সমাধি মন্দিরে অনেকের সমাধি।ফুলের মালায় সজ্জিত।
মূল মন্দিরের পেছনে একটি দোতলা মন্দির।এর নাম উত্তমানন্দ স্মৃতি মন্দির। একতলায় শিব লিঙ্গ।দোতলায় অনেক গুলো রাধা কৃষ্ণের যুগল বিগ্রহ এবং গোপাল ।সিংহাসনে খুব সুন্দর করে সাজানো আছে।সব মন্দিরে নিয়মিত পূজো আর্চা হচ্ছে। এই মন্দিরের একটি ছোট্ট ইতিহাস আছে।
গঙ্গা তীরে এক হিন্দুস্থানী সাধু টহলদাস বাবাজীর আখড়া ছিলো। এই আখড়া গোপাল জীউর আখড়া নামে পরিচিত ছিল।তার মৃত্যুর পর তার শিষ্য হরিদাস বাবাজী গোপালের সেবা পূজো করতেন।তিনি দেহ অবসানের আগে গোপাল ও রাধা কৃষ্ণের বিগ্রহ উত্তমাশ্রমের তৎকালীন আচার্য ধ্রুবানন্দ গিরিকে দিয়ে যান । শুধু তাই নয়, তার আখড়ার স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি উত্তমাশ্রমকে অর্পন নামা করে দিয়ে যান। সেই থেকে গোপাল ও রাধা কৃষ্ণ উত্তমাশ্রমে সেবা পূজো পেয়ে আসছে। এই কারনে দোতলা মন্দিরে অতোগুলো রাধা কৃষ্ণ দেখেছি।
স্বামী উত্তমানন্দের সাধন কক্ষটি এতটাই জীর্ণ হয়ে পড়েছিলো যে, সেটি ভেঙ্গে প্রায় 50 বছর আগে নতুন এই স্মৃতি মন্দিরটি নির্মান করা হয়।
এখানে সপ্তাহে তিনদিন দীক্ষা দেওয়া হয়। দুপুরে রোজ অন্ন ভোগের ব্যবস্থা আছে।এজন্য কোন মূল্য
ধার্য নেই। যে যা সাধ্যমত দান করবেন ,তাই গ্রহন করা হয়। তবে বেশী লোক প্রসাদ নিতে চাইলে, বা দীক্ষা নিতে হলে দু তিন দিন আগে ফোন করে জানাতে হবে।
এখানে গোশালায় অনেক গুলো গরু আছে। একটি ঘরে রথ রাখা আছে। রথ যাত্রায় খুব ভীড় হয়। আশ্রমের গা ঘেসে একসময় গঙ্গা বয়ে যেত।নীচের দিকে ঘাটের সিড়ি গুলো নেমে গেছে। এখন চর পড়ে গঙ্গা অনেক দূরে সরে গেছে।
শ্রীরামাশ্রম:-
ওঙ্কার নাথের নাম শোনেননি ,এমন বাঙালী কজন আছে জানা নেই। যদি কেউ থাকেন, তাদের অবশ্যই এই লেখাটি পড়া দরকার বলে মনে করি।
ওঙ্কারনাথ, যার পূর্বাশ্রমের নাম ছিলো প্রবোধ চন্দ্র চট্টোপাধ্যায় হুগলী জেলার কেওটা গ্রামে 17 ই ফেব্রুয়ারী 1892 তারিখে জন্ম গ্রহন করেন। তাদের পৈতৃক বাসস্থান ছিলো ডুমুরদহ গ্রামে। তার দীক্ষা গুরু ছিলেন মগরা দিগসুই গ্রামের দাশরথী দেব যোগেশ্বর ।
তাদের পৈতৃক বাড়ীর অদূরে গঙ্গার তীরে পঞ্চবটীর নিচে মাটির এক গুহায় নির্জনে বসে প্রবোধ চন্দ্র ঈশ্বরের আরাধনায় মগ্ন হন। তখন পঞ্চবটীর পাশ দিয়ে গঙ্গা বয়ে যেত। এখন চড়া পড়ে অনেকটা দূরে সরে গেছে। গুহার ভিতরে ধ্যানরত অবস্থায় তার অন্তরের অন্তস্থল থেকে হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্র দিবারাত্রি অনাহত প্রণব নাদ রূপে ধ্বনিত হয়। অন্তরে ঝঙ্কার ওঠে ,ঋষি তুমি ঝাঁপিয়ে পড়ো। মহাপ্রভু ও বলেছিলেন হরের্নামৈব হরের্নামৈব হরের্নামৈব কেবলম। তিনি গুরুর আদেশ পেলেন। সৃষ্টি করলেন অখিল ভারত জয় গুরু সম্প্রদায় । দিকে দিকে হরিনাম প্রচারে বেরিয়ে পড়লেন। তার গুরুদেব দাশরথী যোগেশ্বর এবং ডুমুরদহ উত্তমাশ্রমের অধ্যক্ষ স্বামী উত্তমানন্দ গিরি প্রবোধ চন্দ্রের নতুন নামকরণ করলেন সীতারাম দাস ওঙ্কারনাথ। পরবর্তী কালে ভারত বর্ষের বিভিন্ন স্থানে গড়ে উঠেছে ওঙ্কার মঠ ও মিশন।
1334 বঙ্গাব্দের 16ই চৈত্র এই আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন গুরুদেব দাশরথী যোগেশ্বর। মূল মন্দিরের দুটো ভাগ। প্রথম ভাগে গর্ভ গৃহে রাম সীতা ও লক্ষণের বিগ্রহ। সামনের নাট মন্দিরে তুলসী মঞ্চ ।তাকে ঘিরে কয়েকজন গুরু মহারাজের চিত্রপট। দ্বিতীয় ভাগে ওঙ্কারনাথের সমাধি মন্দির। গর্ভ গৃহে ওঙ্কারনাথের মর্মর মুর্তি,যেন একদম জীবন্ত। তার চারদিকের বারান্দার দেয়ালে ঠাকুর ওঙ্কারনাথের জীবনের ঘটনা ও বাণী লিপিবদ্ধ ।প্রসঙ্গত জানাই 6ই ডিসেম্বর 1982 তারিখে 90 বছর বয়সে ঠাকুর ওঙ্কার নাথের জীবনাবসান ঘটে এবং ডুমুরদহে এনে তার নশ্বর দেহ সমাহিত করা হয়।
গুহার কথা আগেই বলেছি। এই গুহাটিকে অক্ষত রেখে 2015 খ্রীষ্টাব্দে একটি মন্দির নির্মাণ করা হয়,যার নাম গুহা মন্দির। ওঙ্কার নাথের গৃহ দেবতা ব্রজনাথ রাধারানী , তৎসহ শিব অন্নপূর্ণা,নৃসিংহদেব ও গুরুদেব দাশরথী যোগেশ্বর এবং ওঙ্কার নাথের মর্মর মুর্তি গুহা মন্দিরে প্রতিষ্ঠিত করা হয়। পঞ্চবটীর বাধাঁনো বেদীর উপর থেকে অপসারিত গঙ্গা ,সবুজ মাঠ,গাছগাছালীর দৃশ্য অতি মনোরম। তবে দেখাশুনা করার লোকের অভাবে কিছুটা অপরিচ্ছন্ন, অনাদরে ধুলো মলীন হয়ে আছে।
রামাশ্রম থেকে তিন মিনিট হাঁটা পথে ঠাকুর সীতারাম দাস ওঙ্কার নাথের পৈতৃক বসত বাটি। এর নাম শ্রীব্রজ নাথ নিকেতন। গোলাপী রঙের দোতলা বাড়ী।এই বাড়ীর নিচের বারান্দা ঘরে ওঙ্কারনাথ জীবনের 22 টি বছর কাটিয়েছেন। তাঁর ব্যাবহৃত পাদুকা জোড়া (খড়ম) এবং অন্যান্য কয়েকটি জিনিস সংরক্ষিত আছে।
ওঙ্কার নাথের নাতি শ্রী দীনবন্ধু চট্টোপাধ্যায় ওরফে বিজ্ঞানানন্দ এসবের দায়িত্বে আছেন। তিনি দীক্ষার মাধ্যমে ঠাকুরের নির্দেশিত পথ ও আদর্শ ভক্ত শিষ্যদের মধ্যে ছড়িয়ে দিচ্ছেন। শান্ত স্নিগ্ধ সুভাষিত কন্ঠে ভক্তদের যাবতীয় প্রশ্নের উত্তর তিনি দেন।তার কথা শুনে আমাদের মন প্রাণ জুড়িয়ে গেলো। সমাগত ভক্ত শিষ্যদের এখানে দুপুরে অন্নভোগ প্রসাদের ব্যবস্থা আছে। তার জন্য কোন নির্দিষ্ট মূল্য নেই। সাধ্যমত যে যা ঠাকুরের উদ্দেশ্যে দিতে পারে ,তাই গ্রহন করা হয়।
এরকম আরও ইতিহাস বিজড়িত মন্দির রয়েছে এই ডুমুরদহে।
আশাকরি এবার বুঝতে পারছেন এই ভগ্নপ্রায় স্টেশনের ইতিহাস, কেন এই জনপদ ধাম হিসাবেও পরিচিত।
আশারাখছি এই জনপদের ঐতির্য্য ও ঐতিহাসিক গুরুত্বকে প্রাধান্য দিয়ে এই স্টেশনের রূপ খুব শীঘ্রই বদল হবে।
(তথ্য সংগৃহীত বাকিটা ব্যক্তিগত )