Jagadish Roy

Jagadish Roy Social movement. personal view of some subject. I want to spread humanity. I want to show down trader's speechless talk.

03/05/2026

হরিচাঁদ ঠাকুর ও গুরুচাঁদ ঠাকুরের বাণী ও কর্ম: শুধুই নমঃশূদ্রদের জন্য, নাকি সমগ্র মানবজাতির প্রগতির লক্ষ্যে?
লেখক: জগদীশচন্দ্র রায়
হরিচাঁদ ঠাকুরের বাণী: সার্বজনীন মানবধর্মের আহ্বান
তারক সরকারের রচিত শ্রীশ্রী হরিলীলামৃত গ্রন্থে হরিচাঁদ ঠাকুরের বাণী স্পষ্টভাবে মানবতাবাদী চেতনার প্রতিফলন ঘটায়—
“জীবে দয়া, নামে রুচি, মানুষেতে নিষ্ঠা।
ইহা ছাড়া আর যত সব ক্রিয়া ভ্রষ্টা।।”
হাতে কাম, মুখে নাম।”
গুরুচাঁদ ঠাকুর: শিক্ষাই মুক্তির পথ
গুরুচাঁদ ঠাকুর শিক্ষাকে জীবনের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে ঘোষণা করেন—
“খাও বা না খাও, তাতে দুঃখ নাই,
ছেলে-পিলে শিক্ষা দাও—এই আমি চাই।”
সার্বজনীনতা ও সমতার শিক্ষা
গুরুচাঁদ ঠাকুর স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেন—
“আমি নাহি নমঃর একার—
দলিত, পীড়িত, বঞ্চিত যারা—তাদেরই আমি।
#মতুয়া
#গুরুচাঁদ

#হরিচাঁদ

02/05/2026

**গুরুচাঁদ দর্শনে মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ**
• লেখক- প্রদীপ কুমার বিশ্বাস
(সম্পূর্ণ লেখার লিঙ্ক ও AI এর মাধ্যমে Audio করে Video -এর You Tube লিঙ্ক কমেন্টে দেওয়া হয়েছে)
• আলোচ্য বিষয়ঃ-
• গুরুচাঁদ ঠাকুরের দর্শনের রূপকার: যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল কীভাবে গুরুচাঁদ ঠাকুরের শিক্ষা ও রাজনৈতিক দর্শনের অন্যতম প্রধান কারিগর ছিলেন।
• ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও ভেগাই হালদার: ১৯২৬ সালের আগৈলঝাড়া রায়ত কনফারেন্সে তাঁর ভূমিকা এবং মতুয়া সাধু ভেগাই হালদারের সাথে তাঁর গভীর সম্পর্কের বিষয়।
• শিক্ষা ও রাজনৈতিক লড়াই: ' আগৈলঝাড়া ভেগাই হালদার পাবলিক একাডেমি' প্রতিষ্ঠা, বিধানসভায় অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষার দাবি এবং তাঁকে দেওয়া 'বাংলার মেগাস্থিনিস' উপাধির ইতিহাস।
• নেতাজী ও 'মহামানব' উপাধি: ১৯৩৮ সালে নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর মাধ্যমে গুরুচাঁদ ঠাকুরকে 'মহামানব' হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার নেপথ্যে যোগেন্দ্রনাথের যে অবদান।
#গুরুচাঁদ
#মহাপ্রাণ
#যোগেন্দ্রনাথ
#মতুয়া

গুরুচাঁদ ঠাকুরের আলোয় মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল: শিক্ষা ও সমাজ সংস্কারের আন্দোলন.লেখক – জগদীশচন্দ্র রায়(লেখাটি AI দিয়ে...
26/04/2026

গুরুচাঁদ ঠাকুরের আলোয় মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল:
শিক্ষা ও সমাজ সংস্কারের আন্দোলন.
লেখক – জগদীশচন্দ্র রায়
(লেখাটি AI দিয়ে সংক্ষিপ্ত করা হয়েছে। সম্পূর্ণ লেখার লিঙ্ক ও AI দ্বারা Audio করে Video link কমেন্টে দেওয়া হয়েছে?)
আদর্শের মিলন: বার্ধক্যের অভিজ্ঞতা ও যৌবনের তেজ
সময়টা ১৯২৬ সাল। শ্রীশ্রী গুরুচাঁদ ঠাকুরের বয়স তখন সত্তর—জীবনের পড়ন্ত বিকেল। অন্যদিকে, তাঁরই ভাবশিষ্য যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলের বয়স মাত্র বাইশ; যার রক্তে তখন সমাজ পরিবর্তনের উত্তাল জোয়ার। সেই সময়ে একদিকে চলছিল জমিদারি অত্যাচার, অন্যদিকে ব্রাহ্মণ্যবাদের ধর্মীয় ও সামাজিক শোষণ। এই দ্বিমুখী শোষণে সাধারণ মানুষের জীবন ছিল চরম দারিদ্র্য আর অশিক্ষার অন্ধকারে নিমজ্জিত। এই অন্ধকারের বিরুদ্ধে যার মনে দ্রোহের আগুন জ্বলছিল, সেই তরুণ যোগেন্দ্রনাথের কণ্ঠে ধ্বনিত হলো বৃদ্ধ গুরুচাঁদ ঠাকুরের কালজয়ী বাণী।
গুরুচাঁদ ঠাকুরের শিক্ষা-দর্শন:
শিক্ষাই যে মুক্তির একমাত্র চাবিকাঠি, তা গুরুচাঁদ ঠাকুর উপলব্ধি করেছিলেন গভীরভাবে। তিনি আর্তনাদ করে বলেছিলেন:
"খাও বা না খাও তাতে দুঃখ নেই।
ছেলেমেয়ে শিক্ষে দাও এই আমি চাই।।" (গুরুচাঁদ চরিত, পৃ. ১৪৪)
তিনি আরও বলতেন, সন্তানদের শিক্ষিত করতে প্রয়োজনে ভিক্ষা করতেও দ্বিধা করা উচিত নয়। অশিক্ষাকে তিনি 'মারণ ব্যাধি' হিসেবে চিহ্নিত করে লিখেছিলেন:
"অজ্ঞান ব্যাধিতে ভরা আছে এই দেশ।
জ্ঞানের আলোকে ব্যাধি তুমি কর শেষ।।" (গুরুচাঁদ চরিত, পৃ. ১৩৭)
গুরুচাঁদ ঠাকুরের স্পষ্ট বার্তা ছিল—অজ্ঞানতার ব্যাধি থেকে মুক্তি পেতে হলে জ্ঞানের আলো অর্জন করা বাধ্যতামূলক। তাঁর ভাষায়:
"তাই বলি ভাই মুক্তি যদি চাই,
বিদ্যান হইতে হবে।
পেলে বিদ্যাধন দুঃখ নিবারণ,
চির সুখী হবে ভবে।" (গুরুচাঁদ চরিত, পৃ. ১৩০)
যোগেন্দ্রনাথের বজ্রশপথ: অধিকার অর্জনের সংগ্রাম
গুরুর এই দর্শনে দীক্ষিত হয়ে উদীয়মান যুবক যোগেন্দ্রনাথ ঘোষণা করলেন, জমিদারদের কাছে আবেদন-নিবেদন করে কোনো লাভ হবে না। নিজেদের ভাগ্য নিজেদেরই পরিবর্তন করতে হবে। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন:
• স্বার্থত্যাগ ছাড়া সমাজের কাজ হয় না।
• শিক্ষাই হলো সমাজ উন্নয়নের প্রধান চাবিকাঠি।
• অশিক্ষিত সমাজকে কেউ মর্যাদা দেয় না; মর্যাদা নিজেদের চেষ্টায় অর্জন করতে হয়।
• শিক্ষা মানুষকে সচেতন ও সংঘবদ্ধ করে, আর সংঘবদ্ধ মানুষকে কেউ শোষণ করতে পারে না।
সংসদীয় রাজনীতি ও শিক্ষা বিস্তারঃ
১৯৩৭ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি বাখরগঞ্জ উত্তর-পূর্ব নির্বাচন কেন্দ্র থেকে যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল এক ঐতিহাসিক বিজয় অর্জন করেন। তিনি প্রভাবশালী কংগ্রেস প্রার্থী সরল দত্তকে ১৮১৬ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেন। বিজয়ী হওয়ার পর তিনি 'আগৈলঝাড়া ভেগাই হালদার পাবলিক একাডেমী'কে হাইস্কুলে রূপান্তরিত করেন এবং নিজেই তার সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
সামাজিক সংস্কার ও অধিকার আদায়ের মাইলফলকঃ
মন্ত্রী থাকাকালীন এবং আইনসভার সদস্য হিসেবে যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলের উল্লেখযোগ্য কিছু অবদান:
• পুলিশ বিভাগে সংস্কার: তপশিলি পুলিশদের জন্য আলাদা কোয়ার্টারের ব্যবস্থা করেন, কারণ তৎকালে সাধারণ ব্যারাকে তাঁদের বসতে দেওয়া হতো না।
• অবকাঠামো উন্নয়ন: তাঁর প্রচেষ্টায় গ্রামীণ অঞ্চলে অসংখ্য বাঁধ, খাল এবং রাস্তা নির্মিত হয়, যা কৃষকদের অর্থনৈতিক মুক্তি এনে দেয়।
• ছাত্রাবাস নির্মাণ: তপশিলি ও মুসলিম ছাত্রদের জন্য কলকাতা শহরে দুটি করে ছাত্রাবাস নির্মাণের দাবি আদায় করেন। তাঁরই উদ্যোগে 'উদয়ন ছাত্রাবাস' ও 'ভারতী ভবন' প্রতিষ্ঠিত হয়।
• বৃত্তি ও আসন সংরক্ষণ: তৎকালীন অর্থমন্ত্রী নলিনী রঞ্জন সরকারের কাছে দাবি জানিয়ে তিনি সপ্তম শ্রেণির পরিবর্তে চতুর্থ শ্রেণি থেকেই বৃত্তি প্রদানের ব্যবস্থা করেন। এছাড়া কলেজ হোস্টেলগুলোতে আসন সংরক্ষণ ও দরিদ্র ছাত্রদের জন্য মাসিক ১৫ টাকা অনুদানের ব্যবস্থা নিশ্চিত করেন।
• চাকরিতে সংরক্ষণ: ১৯৪৩ সালে নাজিমুদ্দিন মন্ত্রিসভায় যোগদানের শর্ত হিসেবে তিনি তপশিলিদের জন্য গেজেটেড পোস্টসহ সকল সরকারি চাকরিতে সাম্প্রদায়িক অনুপাত অনুযায়ী সংরক্ষণের নীতি কার্যকর করেন।
আপসহীন নেতৃত্বঃ
একবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে তপশিলিদের কোটা পূরণ নিয়ে বিতর্ক উঠলে যোগেন্দ্রনাথ গর্জে উঠেছিলেন। হামিদুল হক চৌধুরীর মতো প্রভাবশালী সদস্যদের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে তিনি বলেছিলেন:
“লাল চোখ দেখাবেন না, লাল চক্ষু আমাদেরও আছে। আমি মন্ত্রিত্ব করি, চাকরি নয়। এই মন্ত্রিত্ব কারো দেওয়া দান নয়। যে সুখের ঘর বেঁধে দিয়েছি, প্রয়োজন হলে চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে সেটা ভেঙে দিতে পারি।”
নারী শিক্ষার প্রসারে অবদানঃ
গুরুচাঁদ ঠাকুর নারী-পুরুষের সমাধিকারে বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি লিখেছিলেন:
"শুনেছি পিতার কাছে আমি বহুবার।
নারী ও পুরুষ পাবে সম অধিকার।।"
তাঁর এই আদর্শকে বাস্তবে রূপ দিতে যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল ১৯৪৪ সালে নারী শিক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেছিলেন, “মায়েরাই শিশুদের প্রথম শিক্ষয়িত্রী; তাই সমাজকে শিক্ষিত করতে হলে নারী সমাজকে আগে শিক্ষিত করা প্রয়োজন।” তাঁর প্রচেষ্টায়:
• বিধান পরিষদে অবৈতনিক প্রাথমিক বালিকা বিদ্যালয় স্থাপনের বিল পাশ হয়।
• তপশিলি ছাত্রীদের জন্য চতুর্থ শ্রেণি থেকে বৃত্তির ব্যবস্থা করা হয়।
• বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রাথমিক শিক্ষা দেওয়ার জন্য ছাত্র সমাজকে উৎসাহিত করা হয়।
উপসংহার
গুরুচাঁদ ঠাকুরের আধ্যাত্মিক ও সামাজিক দর্শনকে রাজনীতির ময়দানে এবং সরকারি নীতিতে রূপান্তর করেছিলেন মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল। আজ তপশিলি ও পিছিয়ে পড়া শ্রেণির মানুষ যে শিক্ষার আলো ও সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছে, তার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল এই দুই মহামানবের হাত ধরেই।
#যোগেন্দ্রনাথ_মণ্ডল
#গুরুচাঁদ_ঠাকুর
#সমাজ_সংস্কার
#শিক্ষা_আন্দোলন
#অধিকার_অর্জন
#সংগ্রাম
#সামাজিক_আন্দোলন
#আন্দোলন

একটা প্রবাদ আছে, পোনা দেখে নাফাচ্ছ ভূঁইখান(জমি) কার?মতুয়াদের অবস্থাও এরকম। ভূঁইখান কার একটু ভেবে দেখুন।এটাও সবাই জানেন ক...
22/04/2026

একটা প্রবাদ আছে, পোনা দেখে নাফাচ্ছ ভূঁইখান(জমি) কার?
মতুয়াদের অবস্থাও এরকম। ভূঁইখান কার একটু ভেবে দেখুন।

এটাও সবাই জানেন কুঠারের হাতলটা দেখে জঙ্গলের সব গাছ কুঠারের পক্ষে হয়ে যায়। কারণ সেখানে জাত ভাই আছে।
পরিণাম, একসময় জঙ্গলই পরিস্কার হয়ে যায়।
অবস্থাটা এরকমই হচ্ছে এবং হতে থাকবে।

*শিক্ষাই সবকিছুর মূল চাবি*(ফটো কাল্পনিক। কিন্তু শিক্ষা সম্পর্কে তিন জনের উদ্দেশ্য একই)শিক্ষা সম্পর্কে মহাপুরুষদের কালজয়ী...
14/04/2026

*শিক্ষাই সবকিছুর মূল চাবি*
(ফটো কাল্পনিক। কিন্তু শিক্ষা সম্পর্কে তিন জনের উদ্দেশ্য একই)
শিক্ষা সম্পর্কে মহাপুরুষদের কালজয়ী কিছু বাণী:
১. বাবাসাহেব ডঃ বি. আর. আম্বেদকর
"একটি ভালো বই আপনার পুরো জীবন বদলে দিতে পারে। আমি মূর্তিতে নেই, আমি বেঁচে আছি বইয়ের পাতায়। তাই আমার পূজা না করে বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলো। উপাসনালয় বা ধর্মালয়ের দিকে নয়, বরং বিদ্যালয়ের দিকে পা বাড়াও।"
২. মহাত্মা জ্যোতিরাও ফুলে
"শিক্ষা ছাড়া প্রজ্ঞা বিলুপ্ত হয়; প্রজ্ঞা ছাড়া নৈতিকতা বিলুপ্ত হয়; নৈতিকতা ছাড়া অগ্রগতি বিলুপ্ত হয়; আর অগ্রগতি ছাড়া সম্পদ বিলুপ্ত হয়। সম্পদের অভাবে সাধারণ মানুষ (শূদ্ররা) হতাশ ও নিঃস্ব হয়ে পড়ে। মনে রেখো, এই সমস্ত দুর্ভাগ্যের মূলে রয়েছে কেবল অজ্ঞতা।"
৩. শ্রী শ্রী গুরুচাঁদ ঠাকুর
তাই বলি ভাই মুক্তি যদি চাই
বিদ্বান হইতে হবে।
পেলে বিদ্যাধন দুঃখ নিবারণ
চির সুখী হবে ভবে।। (উৎস: শ্রীশ্রীগুরুচাঁদ চরিত, পৃষ্ঠা-১৩০)
________________________________________
সারকথা: অন্ধকার থেকে আলোর পথে ফেরার একমাত্র মাধ্যম হলো শিক্ষা। সমাজকে বদলাতে হলে এবং নিজের অধিকার বুঝে নিতে হলে জ্ঞান অর্জনের কোনো বিকল্প নেই।
আসুন, আমরা বই পড়ি এবং শিক্ষিত সমাজ গড়ে তুলি।
#বাবাসাহেব
#আম্বেদকর
#শিক্ষা
#গুরুচাঁদ
#জ্যোতিরাওফুলে

13/04/2026

বাবাসাহেব আম্বেদকরের জন্মদিন উপলক্ষে আন্তরিক শ্রদ্ধাঞ্জলি জানাই।
কবিতা- জ্ঞানের সাগর ও জাতিবাদের পাহাড়।
রচনা- জগদীশ রায়।
আবৃত্তি- Pabitra Biswas
#বাবাসাহেব
#আম্বেদকর

*স্বাধীনতা আন্দোলন ও বাবাসাহেব আম্বেদকর*কেন বাবাসাহেব উচ্চবর্ণীয়দের আন্দোলনে যোগ দেননি?লেখক: জগদীশচন্দ্র রায় (এই তথ্যসম...
12/04/2026

*স্বাধীনতা আন্দোলন ও বাবাসাহেব আম্বেদকর*
কেন বাবাসাহেব উচ্চবর্ণীয়দের আন্দোলনে যোগ দেননি?
লেখক: জগদীশচন্দ্র রায়
(এই তথ্যসমৃদ্ধ লেখাটির লেখক হিসেবে আমার নাম থাকলেও মূলত আমি দুটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থের অনুবাদক—
১. “পুনাচুক্তির দুষ্পরিণাম” — লেখক: বামন মেশ্রাম
২. “স্বাধীনতার দুই আন্দোলন” — লেখক: ডি. আর. ওহোল
এই দুটি গ্রন্থ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে একটি সামগ্রিক বিষয় হিসেবে এখানে উপস্থাপন করা হয়েছে।)
(১২ পৃষ্ঠার মূল লেখাটি Gemini –এর মাধ্যমে তিন পৃষ্ঠায় করা হয়েছে। সম্পূর্ণ লেখার লিঙ্ক কমেন্টে দেওয়া আছে)
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের কথা উঠলেই আমাদের মানসপটে মহাত্মা গান্ধী, বিনয়-বাদল-দীনেশ, ক্ষুদিরাম বসু কিংবা সূর্য সেনের নাম ভেসে ওঠে। বিপ্লবীরা নিঃস্বার্থভাবে দেশের মুক্তির জন্য লড়েছিলেন, কিন্তু তৎকালীন মূলধারার অনেক নেতার আন্দোলনের লক্ষ্য কি প্রকৃত অর্থেই আপামর ভারতবাসীর মুক্তি ছিল? ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে এর ভিন্ন চিত্র পাওয়া যায়।
স্বাধীনতার সংজ্ঞায় দ্বিচারিতা
গান্ধীজি একবার বলেছিলেন,
“ইংরেজরা যদি স্বাধীনতার বিনিময়ে অচ্ছুৎদের (তপশিলি) অধিকার দেয়, তবে আমি সেই স্বাধীনতা চাই না।”
এই উক্তিটি প্রমাণ করে যে, উচ্চবর্ণের নেতৃত্বের কাছে স্বাধীনতার অর্থ সবার সমানাধিকার ছিল না। ১৯৩২ সালে ইংল্যান্ডের গোল টেবিল বৈঠকে বাবাসাহেব যখন বঞ্চিতদের জন্য রাজনৈতিক অধিকার অর্জন করলেন, তখন গান্ধীজি তার প্রতিবাদে ২৪ সেপ্টেম্বর ১৯৩২-এ পুনের ইয়েরভেদা জেলে অনশন শুরু করেন। আম্বেদকর গান্ধীজির প্রাণ বাঁচাতে সচেষ্ট হলেও অধিকার ছাড়তে রাজি ছিলেন না। তৎকালীন সংবাদপত্রগুলো আম্বেদকরের বিরুদ্ধে কুৎসা রটায়, এমনকি তাঁকে প্রাণনাশের হুমকিও দেওয়া হয়। সরদার প্যাটেল যখন গান্ধীজিকে অনশন ত্যাগের অনুরোধ করেন, তখন গান্ধীজির উত্তর ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁর আপ্তসহায়ক মহাদেব দেশাইয়ের ডায়েরিতে লেখা সেই কথোপকথন অনুযায়ী, গান্ধীজি মনে করেছিলেন অস্পৃশ্য ও মুসলমানরা যদি পৃথক নির্বাচনের মাধ্যমে নিজেদের প্রকৃত প্রতিনিধি বেছে নেয়, তবে তারা বিধানসভা ও লোকসভায় কংগ্রেসকে একাধিপত্য বিস্তার করতে দেবে না। আমেরিকার গবেষক এলিনর জেলিয়ট এই ডায়েরি থেকেই তথ্যের সত্যতা উন্মোচন করেছেন। (সূত্র: আত্মনিরীক্ষণ, ২০০৬; বাংলা ভাগ কেন হল, নিকুঞ্জবিহারী হাওলাদার)।
তিলকের 'স্বরাজ' ও বর্ণাশ্রম
বাল গঙ্গাধর তিলক বলেছিলেন, "স্বরাজ আমার জন্মগত অধিকার।" কিন্তু সেই স্বরাজের প্রকৃত রূপ কী ছিল? মহারাষ্ট্রের বিভিন্ন জনসভায় তিলক বলেছিলেন যে, ইংরেজদের তাড়ানোই তাঁদের একমাত্র লক্ষ্য নয়; বরং শাসনে 'বুদ্ধিমান' লোকেদের (মনুস্মৃতি অনুযায়ী ব্রাহ্মণদের) প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করাই ছিল তাঁর আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য। অর্থাৎ, এই 'স্বরাজ' ছিল মূলত উচ্চবর্ণের শাসন ক্ষমতা ফিরে পাওয়ার আন্দোলন, যা আপামর জনগণের স্বাধীনতা ছিল না।
ভারতে স্বাধীনতার দুটি সমান্তরাল ধারা
বাস্তবে ভারতে দুটি ভিন্ন লক্ষ্য নিয়ে আন্দোলন চলছিল:
১. উচ্চবর্ণের আন্দোলন: ইংরেজদের অধীনতা থেকে মুক্ত হয়ে নিজেদের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করা।
২. মূলনিবাসীদের আন্দোলন: উচ্চবর্ণের সামাজিক ও মানসিক গোলামি থেকে মুক্তি পাওয়া।
এই দ্বিতীয় ধারার নায়ক ছিলেন জ্যোতিরাও ফুলে, শাহু মহারাজ, পেরিয়ার, গুরুচাঁদ ঠাকুর এবং বাবাসাহেব আম্বেদকর। আম্বেদকর চেয়েছিলেন আব্রাহাম লিঙ্কনের সংজ্ঞায় "জনগণের দ্বারা, জনগণের জন্য এবং জনগণের শাসন।"
রাজনৈতিক অধিকারের লড়াই ও সাইমন কমিশন
১৯১৬ সাল থেকেই আম্বেদকর অস্পৃশ্যদের অধিকারের দাবিতে সরব হন। ১৯১৯ সালের 'সাউথ বরো কমিশন'-এ তিনি পৃথক রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের দাবি জানান। ১৯২৮ সালে যখন 'সাইমন কমিশন' ভারতে এল, তখন কংগ্রেস ও গান্ধীজি তার তীব্র বিরোধিতা করেন। বিরোধিতার আনুষ্ঠানিক কারণ হিসেবে ভারতীয় প্রতিনিধি না থাকার কথা বলা হলেও, প্রকৃত কারণ ছিল কমিশন যদি পিছিয়ে পড়া বর্গের অধিকার মেনে নেয়, তবে উচ্চবর্ণের একচেটিয়া আধিপত্য নষ্ট হবে। আম্বেদকর এই কমিশনকে স্বাগত জানালে তাঁকে ‘দেশদ্রোহী’ হিসেবে তকমা দেওয়া হয়।
গোল টেবিল বৈঠক ও পুনা চুক্তির ট্র্যাজেডি
১৯৩০-৩২ সালের গোল টেবিল বৈঠকে আম্বেদকর চারটি মৌলিক দাবি উত্থাপন করেন:
• পৃথক নির্বাচন ক্ষেত্র (Separate Electorates)
• দ্বৈত ভোটাধিকার (Double Voting)
• সর্বজনীন প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকার
• জনসংখ্যার অনুপাতে পর্যাপ্ত প্রতিনিধিত্ব
ব্রিটিশ সরকার এসব দাবি মেনে নিয়ে ১৯৩২ সালের ১৭ আগস্ট 'সাম্প্রদায়িক বাটোয়ারা' (Communal Award) ঘোষণা করলে গান্ধীজি অনশন শুরু করেন। শেষ পর্যন্ত গান্ধীজির প্রাণ রক্ষার্থে আম্বেদকর যে চুক্তিতে সই করতে বাধ্য হন, তাই ইতিহাসে 'পুনা চুক্তি' নামে পরিচিত।
পুনা চুক্তির ফলাফল: আম্বেদকরের ভাষায়, এই চুক্তিতে সিট সংখ্যা বাড়লেও অস্পৃশ্যরা তাদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র 'পৃথক নির্বাচন' ও 'দ্বৈত ভোটাধিকার' হারাল। দ্বৈত ভোটাধিকার থাকলে উচ্চবর্ণের প্রার্থীদেরও অস্পৃশ্যদের ভোটের ওপর নির্ভর করতে হতো, ফলে তারা দলিতদের অবহেলা করতে পারত না। পুনা চুক্তির ফলে অস্পৃশ্য প্রতিনিধিরা কার্যত বড় দলগুলোর (যেমন কংগ্রেস বা বিজেপি) হাতের পুতুলে বা 'গোলামে' পরিণত হলেন। বর্তমানে দলিত প্রার্থীরা জনগণের দ্বারা নয়, বরং পার্টির 'হাইকমাণ্ড' দ্বারা মনোনীত হন, যা আম্বেদকরের মূল ভাবনার পরিপন্থী।
ক্ষমতা হস্তান্তর বনাম প্রকৃত স্বাধীনতা
১৫ আগস্ট ১৯৪৭-এ যা ঘটেছিল, তা ছিল মূলত ব্রিটিশদের কাছ থেকে উচ্চবর্ণের হাতে ক্ষমতার হস্তান্তর (Transfer of Power)। বাবাসাহেব গোল টেবিল বৈঠকে স্পষ্ট বলেছিলেন, ইংরেজ শাসনের দেড়শ বছরেও অস্পৃশ্যদের ক্ষত কমেনি; তারা না মন্দিরে যেতে পারে, না পুলিশ-বাহিনীতে যোগ দিতে পারে। তাই রাজনৈতিক ক্ষমতাই ছিল তাঁর একমাত্র লক্ষ্য।
অরুণ শৌরীর মতো লেখকরা 'Worshipping False Gods' বইতে দাবি করেছেন আম্বেদকর স্বাধীনতা আন্দোলনে ছিলেন না। সত্য হলো, তিনি 'ব্রাহ্মণ্যবাদী' স্বাধীনতা আন্দোলনে ছিলেন না, তিনি ছিলেন সাধারণ মানুষের শৃঙ্খল মুক্তির আন্দোলনে।
উপসংহার
আজ আমরা যেটুকু অধিকার ভোগ করছি, তা কোনো নেতার দানে নয়, বরং হরিচাঁদ-গুরুচাঁদ ঠাকুরের আদর্শে মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলের সহযোগিতায় বাবাসাহেবের দেওয়া সাংবিধানিক অধিকারের ফল। কিন্তু আজও আমরা মানসিকভাবে স্বাধীন হতে পারিনি। প্রকৃত স্বাধীনতা পেতে হলে উচ্চবর্ণের নিয়ন্ত্রিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার বাইরে এসে নিজেদের বিচারধারা ও রাজনৈতিক শক্তিকে জাগ্রত করতে হবে। মনে রাখতে হবে—ইতিহাস যদি তারা গোপন করে, তবে আমাদেরই তা সবার সামনে তুলে ধরতে হবে। “If they hide it, we must highlight.”

________________________________________
তথ্যসূত্র: ১. পুনাচুক্তির দুষ্পরিণাম – লেখক: বামন মেশ্রাম (অনুবাদক: জগদীশচন্দ্র রায়)।
২. স্বাধীনতার দুই আন্দোলন – লেখক: ডি. আর. ওহোল (অনুবাদক: জগদীশচন্দ্র রায়)।
#বাবাসাহেব
#আম্বেদকর
#স্বাধীনতা
#আন্দোলন
#পুনাপ্যাক্ট
#গান্ধিজি

04/04/2026

লীলামৃত: মানব জীবনে উত্তোরণের সোপান
লেখক- জগদীশচন্দ্র রায়
(মূল লেখাটি এখানে দিলাম। Audio টি AI দিয়ে তৈরি করে ভিডিও বানানো হয়েছে। আশাকরি ভিডিওর আলোচনা আপনাদের ভালো লাগবে।)
যে যে মহামানব আমাদের পতিত পিড়িত নিষ্পেষিত সমাজের মানুষকে সামাজিক, সাংস্কৃতিক, আর্থিক ও ধর্মীয় শৃঙ্খল থেকে মুক্তি দেওয়ার জন্য জীবনকে বাজি রেখে প্রতিকূল সমাজ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কঠোর সংগ্রাম করে আমাদের পশু থেকে মানুষের পর্যায়ে উন্নিত করেছেন সেই মহামানব পতিত পাবন হরিচাঁদ ঠাকুর, গুরুচাঁদ ঠাকুর, মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ মন্ডল, বাবা সাহেব আম্বেদকর এবং সর্বোপরি মহান দার্শনিক গৌতম বুদ্ধকে শ্রদ্ধা জানাই। আমি কখনো পাঠকগণকে শ্রোতাদের মতো দেখতে চাইনা। কারণ, শ্রোতা আর বুদ্ধিজীবি (অর্থাৎ বিচারধারায় প্রভাবিত) মানুষের মধ্যে পার্থক্য আছে। রাজহাসকে দুধ আর জল মিশিয়ে দিলে সে দুধটাকে চুষে খায়। আর জল পড়ে থাকে। এই প্রবাদ যদি সত্যি হয় বা না হয়, এর থেকে শিক্ষনীয় বিষয় হচ্ছে, দুধ আর জলকে আলাদা করে বোঝার ক্ষমতাবানদের আমি এখানে বুদ্ধিজীবি বলছি। অর্থাৎ এখানে বৈদিকতায় মিশ্রিত জল থেকে যুক্তিসংগত দুধকে আলাদা করে নিয়ে সমাজ ও দেশের কাজে লাগাতে পারেন আর বৈদিকবাদকে হাসের ডানা ঝাপ্টার মতো নিমেশে দূর করতে পারেন তাঁরাই বুদ্ধিজীবী। তাই মহাকবি তারক সরকার লীলামৃত লিখতে গিয়ে বলেছেন-
শ্রোতাগণ হংসবৎ দোষ ছাড়ি গুণ যত
দুগ্ধবৎ করুন গ্রহণ।
(-শ্রীশ্রীহরিলীলামৃত ১ম সংস্করণ, পৃ.৩৯)
লীলামৃত এমনই একটা গ্রন্থ যেটার মূল্য কিন্তু পয়সার মাধ্যমে নির্ণয় করা যায় না। কারণ এর মূল্য হচ্ছে অমূল্য। অর্থাৎ যার গুরুত্ব অপরিসীম। আজ থেকে ১০০ বছরেরও অধিক পূর্বে এই গ্রন্থটি কবি তারক সরকার রচনা করেছিলেন বলেই একটা জাতির ইতিহাস, তার সামাজিক, সাংস্কৃতিক, সর্বোপরি ধর্মীয় অবস্থাকে সকলে জানতে পারছি। আর হরিচাঁদ ঠাকুরের মতুয়াধর্ম ও দর্শনকে জানতে ও বুঝত পারছি। তাই এই গ্রন্থ মতুয়াদের কাছে অমূল্য রতন স্বরূপ। মূল আলোচনায় প্রবেশের পূর্বে লীলামৃত সম্পর্কে আমার একটি কবিতা তুলে ধরছি।
*শতবর্ষে লীলামৃত*
লীলামৃত; একটি যুগান্তকারী প্রতিবাদের প্রজ্জ্বলমান শব্দ।
আজ তোমার সৃষ্টির শতবর্ষে, তোমায় স্বাগত।
স্বাগত জানাই তোমার স্রষ্টা, মহামতি তারক সরকারকেও।
তুমি তো নও শুধু একটা কাব্য,
তুমি একটা বিপ্লব, একটা প্রচণ্ড প্রতিবাদ।
তুমি নির্বাকের ভাষা, অত্যাচারীর দুঃস্বপ্ন।
তোমার অভ্যন্তরে নিহীত আছে যে মহার্ঘ মণি-মুক্তা,
তাকে খুঁজতে হবে দুঃসাহসী ডুবুরীর মতো।
রাজ হংসের মতো আবর্জনা নিংড়ে শুষে নিতে হবে শুধুই দুধটাকে।
তাই পাঠককে হতে হবে বিচক্ষণ, বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী।
তবেই উপলব্ধ হতে পারে তোমার প্রকৃত আকুতি।
লীলামৃত, তুমি হরিচাঁদ নামক প্রখর নক্ষত্রের জীবনালেখ্য।
তুমি তো একটা উজ্জ্বল জ্যোতিষ্কের তীব্র আলো।
তোমার আলোর দ্যুতিতে দূরীভূত হবে অত্যাচারের কুটিলতা।
জেগে উঠবে নিপীড়িত সমাজ, সঠিক ‘মতুয়া দর্শন’ এর নামান্তরে।
সেই আলো ছড়িয়ে যাবে দিক হতে দিগন্তে।
তোমার অভ্যন্তরে নিহীত দ্বাদশ আজ্ঞা ও সপ্ত নিষেধাজ্ঞা
বহু কালের নিদ্রিত জাতির বিনিদ্র প্রহরী।
তোমাতে লিখিত শিক্ষার বাণী, নিয়ে আসবে আলোর বন্যা।
আজ এই চরম বিচ্ছিন্নতার দিনে তোমাকে আরো বেশি করে কাছে পেতে চাই।
তুমিই হবে বঞ্চিতের একমাত্র মুক্তিদাতা।
তোমাকে অনুসরণ করলে ধুয়ে মুছে যাবে সকল বৈদিকতার শৃঙ্খল।
সেদিন তুমি শুধু জীবনী, ধর্ম, বিপ্লব, সাহিত্য গ্রন্থ বলেই শুধু নয়,
তুমি প্রতিষ্ঠিত হবে, মানব ধর্মের সোপান বলে।
তখন মুছে যাবে সমস্ত জাতি ব্যবস্থা
অজ্ঞানতার অন্ধকার পেরিয়ে শুরু হবে নব বুদ্ধের যুগ।
আর সেদিন তুমি শুধু হরিলীলামৃত রইবে না,
তুমি হবে মানব ধর্মের প্রতীক।
---
লিলামৃত যেমন পিছিয়ে রাখা সমাজের দর্পণ, তেমনি ব্যবস্থা চালানো বর্ণবাদীদের কাছে মৃত্যু বাণ স্বরুপ। যে মহামানবকে নিয়ে এই গ্রন্থ রচিত হয়েছে, তিনিও একদিকে যেমন বর্ণবাদীদের কাছে ব্রাত্য অন্যদিকে তাঁর এই সংগ্রামকে একটা জাতির মধ্যে সীমাবদ্ধ করে রাখা হয়েছে। তবে গ্রন্থকার মহাকবি তারক সরকার গ্রন্থের মধ্যে তাঁর সুকৌশলী লেখনির মাধ্যমে হরিচাঁদ ঠাকুরের ধর্ম- দর্শন ও সমাজ-দর্শনকে গড়ে তুলেছেন বিশ্বজনীনতার পর্যায়ে। আমাদেরকে তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থার প্রেক্ষাপট ও কবির দৈনন্দিন জীবনকে সামনে রেখে অগ্রসর হওয়া দরকার। কারণ, কোনো লেখক বা কবি তার ব্যক্তিগত জীবন ও ভাবনার ঊর্ধে নন। কিন্তু এই গ্রন্থে তিনি সেটাকেও অনেক ক্ষেত্রে অতিক্রম করতে পেরেছেন। যদিও সেটা বুঝতে হলে বা অনুধাবন করতে হলে পাঠককে অনেক গভীরে প্রবেশ করতে হবে। লেখনীর মধ্যে যে সব অসামঞ্জস্যপূর্ণতা চোখে পড়ছে সেটাকে দূরে সরিয়ে দিয়ে জাতি ও সমাজ জাগরণের উপাদানগুলোকে দুধের মতো তুলে নিতে হবে। তাহলে আর কোনো সমস্যা থাকবে না। লীলামৃতের BETWEEN THE LINE AND BEHIND THE LINE কে বুঝতে চেষ্ঠা করতে হবে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে আমরা নিজেরাই পংকিলতা থেকে মুক্ত হতে পারিনি। তাই দুধকে কিভাবে চুষে নিতে হবে সেটা বুঝিনা। কারণ, আমরা বৈদিকতার পংকিলতার নেশায় ডুবে এখনো বুদ হয়ে আছি। এর থেকে আমাদের মুক্তি পেতে হলে নিজেকেই চেষ্টা করতে হবে। তা না হলে ঘোলা জলে হাবু ডুবু খেতে থাকতে হবে। আর নিজের দোষ অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে পরিত্রাণের উপায় খুঁজতে হবে। তখন ঘোলা জলে মাছই ধরাই সার হবে। মনি-মুক্তা খুঁজে পাওয়া যাবে না।
লীলামৃতের মহাকবির প্রখর ও সুকৌশলী বুদ্ধিমত্তা সম্পর্কে একটি কথা বলব। তারপরে যে মহান পতিত উদ্ধার কর্তার জীবন, কর্ম ও তাঁর ধর্ম দর্শনকে কবি কিভাবে উদ্ভাসিত করে তুলেছেন তার কিছু আলোকপাত করব।
বন্দনাঃ লীলামৃত শুরু হয়েছে বন্দনা দিয়ে। এই বন্দনা কী? কেন করা হয়? কার বন্দনা? অন্যান্য তথাকথিত ধর্মগ্রন্থের শুরুতে বিভিন্ন দেবদেবীর স্তুতি করা হয়েছে। সেইসব দেবদেবীর কাছে চাওয়া পাওয়ার বিভিন্ন আকুতি থাকে। আর লীলামৃতের বন্দনায় কোনো দেবদেবীর উল্লেখ বা চাওয়া পাওয়ার আকুতি তো দূরের কথা, প্রথাগত নত মস্তকে প্রণামও করা হয়নি। এখানে মানবের বন্দনা করা হয়েছে। মানবের জয় গান করা হয়েছে। আর এই মানব কিন্তু একজন নয়। এখানে সমষ্টি বা গোষ্ঠী শক্তির জয়গান করা হয়েছে।
একটা জিনিস লক্ষ্য করুন, এখানে পূজা বা প্রার্থনা বলা হয়নি। বন্দনা বলা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে আমরা যদি এই বন্দনার ব্যাখ্যা এরকম মনে করি তাহলে কেমন হয়-
ধরুন, আমরা যদি এই বন্দনা স্থলে কোনো মূর্তি বা ফটো রেখে আগরবাতি জ্বালিয়ে ও ফুল দিয়ে সাজাই, মোমবাতিও জ্বালাই তার অর্থ কি আমরা এই ভাবে করতে পারি-
আমরা হাত জোড় করে মহামানবদের প্রতি কোনো প্রার্থনা করছি না। এটাকে আমরা “বন্ধনা” বলছি। প্রার্থনার অর্থ কিছু চাওয়া (request), আর বন্দনার অর্থ, অভিবাদন করা। বন্দনা করে আমরা প্রতিজ্ঞা গ্রহণ করি। তাঁরা যেটা করেছেন ও বলেছেন, সেই বিষয়কে উপলব্ধি করার জন্য চিন্তন-মনন করি। বারবার সেই কথাগুলো উচ্চারণ করি, যাতে তাদের আদর্শ থেকে পথ ভ্রষ্ট না হই।
আবার আমরা যদি আগরবাতি জ্বালাই সেটা কিন্তু কোনো দেবতাকে প্রশন্ন করার জন্য নয়। আগরবাতি যেমন নিজে জ্বলে এবং সুগন্ধ বিতরণ করে; সেই রকম আমাদেরও কাজ হবে মানবিকতার সুগন্ধ বিতরণ করা। এই ভাবনার প্রতীক হচ্ছে আগরবাতি।
মোমবাতি কিন্তু প্রদ্বীপ নয়, প্রদ্বীপে তেল ও সল্‌তে দেওয়া হয়। আমরা মোমবাতি এই জন্য জ্বালাই যে, সেটা যেমন নিঃস্বার্থভাবে নিজে জ্বলে এবং আলো দেয়, বিশেষ কোন প্রকার ক্ষতি করে না; তেমনি আমাদের জীবন যেন অন্য মানুষকে জাগাতে সাহায্য করে, আমাদের দ্বারা অন্যের জ্ঞানের আলোর প্রকাশ ঘটে। এই উদ্দেশ্যে আমরা মোমবাতি প্রজ্বলন করি।
আমরা দেবতাকে প্রশন্ন করার জন্য ফুল অর্পণ করি না। তবে ফুল যেমন তার সল্পায়ুতে মানুষের মনকে প্রফুল্লিত করে তোলে, সুগন্ধ বিতরণ করে, আনন্দ প্রদান করে। আর সময়ের অন্তরালে নষ্ট হয়ে যায়; তেমনি আমাদের এই মানব জীবনও মানুষের উপকারের জন্য সমর্পিত হোক এই আশা করে আমরা ফুল দেই।
আমরা তাঁদেরকে পূজা নয়, তাঁদের অসীম উপকারকে শ্রদ্ধা জানাই। এঁরা আমাদের কাছে মহামানব। আমাদের দেবতা নয়। আমরা তাঁদের বন্দনা করি, পূজা বা প্রার্থনা করি না।
আমরা যে বন্দনা করি, সেই বন্দনার অর্থ হচ্ছে- মহামানবদের উপকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বীকার করা। এখানে কোন মানত করা হয় না কিছু পাওয়ার আশায়। তাঁদের কাছে কিছু চাওয়া হয় না কোন সংকট থেকে মুক্তি লাভের আশায়। এখানে কোন যজ্ঞ করা হয় না। আর কোন জীবকে ক্রুরভাবে বলি দেওয়া হয় না কোন দেবতাকে প্রশন্ন করার জন্য। আমরা আমাদের মহামানবদের বন্দনা করি তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রদান করার জন্য। তাদের উপকার যেন ভুলে না যাই সেজন্য এবং তাদের আদর্শ অনুসরণ করে মানব কল্যানে যাতে নিজেকে নিয়োজিত রাখতে পারি সে জন্য।
সূক্ষ্ম সনাতন-
সর্ব্ব ধর্ম্ম লঙ্ঘি এবে করিলেন স্থুল।
শুদ্ধ মানুষেতে আর্ত্তি এই হয় মূল।।
জীবে দয়া নামে রুচি মানুষেতে নিষ্ঠা।
ইহা ছাড়া আর যত সব ক্রিয়া ভ্রষ্টা।।
এই সূক্ষ্ম সনাতন ধর্ম্ম জানাইতে।
জনম লভিলা যশোমন্তের গৃহেতে।। -লীলামৃত পৃ. ১১
এখানে হরিচাঁদ ঠাকুর কী বোঝাতে চেয়েছেন? সমস্ত ধর্মকে লঙ্ঘন করে এসে তিনি নির্ণয় গ্রহণ করলেন যে, মানুষের প্রতি ভালবাসা হচ্ছে মূল। সব ধর্মের ঊর্ধে হচ্ছে মানব ধর্ম। সেটাই সবার সেরা ধর্ম। বৈষ্ণব ধর্মগ্রন্থে আছে-
জীবে দয়া, নামে রুচি, বৈষ্ণব সেবন।
ইহা ছাড়া আর সব ভ্রষ্ট জানো সনাতন।। (বৈষ্ণব গ্রন্থ)
এখানে গভীরভাবে লক্ষ করুন, শুধুমাত্র বিশেষ গোষ্ঠির সেবা করার কথা বলা হয়েছে। আর মহাকবি তারক সরকার লীলামৃতে বিশ্বের সমস্ত মানুষের প্রতি নিষ্ঠা রাখার কথা বলেছেন। আর এই জীবে দয়া, নামে রুচি ও মানুষেতে নিষ্ঠাকে সমস্ত ক্রিয়ার ঊর্ধে স্থান দিয়ে বাকি সব ক্রিয়া কর্মকে ভ্রষ্ট বলে উল্লেখ করেছেন। এবিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করছি-
এক-জীবে দয়াঃ- অর্থাৎ সমস্ত প্রাণী ও উদ্ভিদ জগতের প্রতি দয়াশীল হতে হবে। একটা গাছ লাগালে তাকে প্রত্যেক দিন জল দিতে হবে, তাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য। অর্থাৎ তাকে লালন পালন করতে হবে। প্রাণী জগতের দিন দুঃখীর প্রতি যত্নবান হতে হবে। তাদের দুঃখ মোচনের কাজে নিজেকে নিবৃত থাকতে হবে।
দ্বিতীয়- নামে রুচিঃ- এই নাম শব্দটি একটি বিশেষ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। ‘নাম’ মানে এখানে হরিনাম বা কৃষ্ণনাম নয়। এখানে নাম শব্দটির অর্থ হচ্ছে-বিজ্ঞান। মানে বিশেষ জ্ঞান। আর রুচি-মানে অনুরাগ। অর্থাৎ একত্রে নামে রুচি কথাটির অর্থ হচ্ছে- বিজ্ঞানের প্রতি অনুরক্ত হওয়া। যে বিশেষ জ্ঞানকে ধারণ করে মানুষ অতি প্রাচীনকাল থেকে বর্তমান কালেও যাকিছু সহজ সুন্দর সেটাকে উপভোগ করতে পারছে। হরিচাঁদ ঠাকুর সেই জীবের প্রতি ভালবাসা, বিজ্ঞানের প্রতি অনুরাগী হতে বলেছেন।
আর তৃতীয়- মানুষেতে নিষ্ঠা- অর্থাৎ মানুষের প্রতি ভালবাসা, বিশ্বাস রাখা। তাকে আপন করে নেওয়া। তার সঙ্গে কোন জাতি, ধর্ম বা অন্য কোনো প্রকারের ভেদাভেদ না করা।
আর এই তিনটি অমোঘ বাণী ব্যাতিরেকে সব কিছুকে তিনি ভ্রষ্ঠ বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর এই ভাবনার মধ্যে কোন বিশেষ জাতির প্রতি নির্দেশ আছে কি? নাকি তিনি সমগ্র মানব জাতির প্রতি এই অমোঘবাণী তুলে ধরেছেন? এখানেই লীলামৃত অন্যান্য ধর্মগ্রন্থ থেকে পৃথক ও শ্রেষ্ঠতার স্থান গ্রহণ করেছে। আর মহাকবি তারক সরকারও শুধু হরিচাঁদ দর্শন বা লীলামৃতের শ্রেষ্ঠ স্থানে তুলে ধরেননি, তিনি নিজেও কুশলতার পরিচয় রেখেছেন। এই মানব কল্যাণতাকেই সূক্ষ্ম সনতানরূপে তুলে ধরেছেন। কবি সূক্ষ্ম শব্দের ব্যবহার করে হরিচাঁদ ঠাকুরের সঠিক দর্শনের প্রকাশ করে বৈদিকতা থেকে পৃথক করেছেন। যদিও বর্তমানে বৈদিক ধর্মকেই সনাতন ধর্ম হিসাবে প্রচার করা হচ্ছে। যদিও এই সনাতন ধর্ম বলে জনগণের কাছে এসে যেটা প্রচার করা হচ্ছে, সেটা বাস্তবে বৈদিক ধর্ম বা ব্রাহ্মণ্য ধর্ম। এ বিষয়ে দেখতে পাই –SANATANA DHARMA means the Eternal Religion, the Ancient law, and it is based on the Vedas, ----This Religion has also been called the A***n Religion, --- (তথ্য – SANATANA DHARMA an elementary text-book of HINDU RELIGION AND ETHICS. page No. 1, published 1916)
আর এই বেদ সম্পর্কে লীলামৃতে আমরা দেখতে পাই-
কুকুরের উচ্ছিষ্ট প্রসাদ পেলে খাই।
বেদ বিধি শৌচাচার নাহি মানি তাই।।
(লীলামৃত, ১ম সংস্করণ, পৃষ্ঠা নং-১০৪)
অর্থাৎ আমি কুকুরের উচ্ছিষ্ঠ বা এটো খাবার খেতেও রাজি আছি; কিন্তু বেদ এবং তার বিধানকে (নিয়ম-নীতি) মানতে রাজি নই। তিনি বেদকে কুকুরের এটো খাবারের থেকেও নিকৃষ্ট মনে করেছেন। সে জন্যই তিনি আধুনিক ভারতের সামাজিক ক্রান্তিকারী ও নবজাগরণের পথিকৃত।
আর একটা কথা ঠাকুর হরিচাঁদের এই অমোঘ বাণীর প্রায় ৭০ বছর পরে বিবেকানন্দ বলেছেন-
জীবে প্রেম করে যে জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর।
স্বামী বিবেকানন্দের কথা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে গেলেও হরিচাঁদের বাণীকে কেন বদ্ধ করে রাখা হয়েছে? কেন সে বাণী প্রচার পায়নি? এর গভিরে গিয়ে আমাদের ভাবতে হবে।
ধর্মশক্তিঃ-
হরি-গুরুচাঁদ ধর্মহীন পতীতদের নতুন ধর্ম দিয়ে ছিলেন সংঘবদ্ধ হওয়ার জন্য। সেটা আন্দোলনের জন্য একটা সোপান বা হাতিয়ার মাত্র। তাঁরা ধর্ম বিশ্বাসের উপর দাঁড়াননি। মানুষকে জাগ্রত করার জন্য, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সাথে সাথে সামাজিক শিক্ষা দিয়ে মূল্যবোধ জাগানোর জন্য। সামাজিক বৈষম্য দূর করার জন্য তাঁরা ধর্মকে এক ধরনের ভাষা বা প্রকাশের মাধ্যম হিসাবে গ্রহণ করেছিলেন। তাই আমরা দেখতে পাই,
ধর্ম্ম শক্তি বিনা জাতি জাগেনা কখন।।” গুরুচাঁদ চতির পৃঃ ৫২৯
কিন্তু অতি দুঃখের বিষয় হচ্ছে বেশিরভাগ মতুয়া ধর্ম-দর্শনের অনুরাগীরা ধর্মটাকে বৈদিক ঘরানায় আকড়ে ধরে আছে। তার থেকে এরা বাইরে আসারও চেষ্টা করছে না। যারফলে যাকিছু দেখা যাচ্ছে সেটা শুধু বাহ্যিকতা। অন্তর্নিহিত ভাবনার প্রকাশ বা প্রসার যৎ সামান্য।
এর পর তিনি বলেছেন-
নীচ হয়ে করিব যে নীচের উদ্ধার।
অতি নিম্নে না নামিলে কিসের অবতার।।-শ্রীশ্রী হরিলীলামৃত পৃঃ ১৫
যে ব্রাহ্মণ্যবাদী বিষমতার ব্যবস্থা মানুষকে জন্মগত কারণে উচ্‌ নীচ্‌ বানিয়েছে। যে নীচ্‌ মানুষদের সমস্ত মানবিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করে পশুর পর্যায়ে নামিয়ে রেখেছে; সেই নিপীড়িত মানুষদের উদ্ধার করার জন্য তো আমাকে নিচে নেমেই তাদের উদ্ধার করতে হবে। সেটা যদি করতে না পারা যায়, তাহলে আর কিসের মানবতা? এখানে এই নিপীড়িতদের উদ্ধারের যে আর্তি সেটা কি শুধুমাত্র জাতি বিশেষের জন্য? নাকি তিনি বিশ্বের সমগ্র বঞ্চিতদের নিপীড়িতদের উদ্ধারের জন্য আহবান জানিয়েছেন?
গৃহস্থ ধর্মঃ
সমস্ত মানুষের জীবন জীবিকা তার পরিবারকে কেন্দ্র করে। তাই ঠাকুর হরিচাঁদ পারিবারিক জীবনে সুখে থাকার জন্য বলেছেন-
করিবে গৃহস্থধর্ম্ম লয়ে নিজ নারী। -শ্রীশ্রী হরিলীলামৃত পৃঃ নং ৮
অর্থাৎ সংসার জীবনে সুখে থাকার জন্য নিজের স্ত্রীকে নিয়েই গৃহধর্ম পালন করতে বলেছেন। আর তিনি বলেছেন- পরনারী মাতৃতুল্য মিথ্যা নাহি কবে।
পর দুঃখে দুঃখী সচ্চরিত্র সদা র’বে।। -শ্রীশ্রী হরিলীলামৃত পৃঃ নং ৮
অর্থাৎ একদিকে তিনি যেমন বলেছেন- নিজের জীবন সঙ্গীনীকে নিয়ে সুখে সংসার করতে। আবার অন্যদিকে সতর্ক করে দিয়েছেন যে, অন্য নারীদেরকে মাতৃ জ্ঞানে শ্রদ্ধা করতে এবং সর্বদা সত্য কথা বলতে। এরপর তিনি আরো বলেছেন- নিজে যেমন মিথ্যা কথা বলবেনা, তেমনি চরিত্রের স্বচ্ছতা বজায় রাখতে হবে। অর্থাৎ চরিত্রবান হতে হবে। আর অন্যের দুঃখকে নিজের দুঃখ মনে করে সেই দুঃখীর প্রতি উদার হয়ে ভালবাসা দিয়ে তার দুঃখ মোচনের জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করতে হবে।
বলুনতো এখানে এসব কথা কি কোন জাতি বিশেষের জন্য বলা হয়েছে? নাকি সকলের মঙ্গলের জন্য এসব কথা বলা হয়েছে? তাহলে মতুয়া ধর্মকে কেন শুধুমাত্র বিশেষ একটি জাতি বা গোষ্ঠির মধ্যে সীমাবদ্ধ করে রাখার চেষ্টা হচ্ছে?
কর্মই ধর্মঃ-
হরিচাঁদ ঠাকুরের একটা বিখ্যাত বাণী হচ্ছে-
“হাতে কাম, মুখে নাম।” -শ্রীশ্রী হরিলীলামৃত পৃঃ নং ৮
এখানে হরিচাঁদ ঠাকুর কর্মহীন অসলসতাকে দূর করে কাজ করার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। আর এই কাজ হতে হবে বাস্তব বা বিজ্ঞান সম্মত। আমি আগেই বলেছি ‘নাম’ অর্থ বিজ্ঞান হিসাবে দেখানো হয়েছে। তাই কাজ করতে হবে। আর সেই কাজ হবে বিজ্ঞান ভিত্তিক। কোন অলীক, অযৌক্তিকতা নয়। সম্পূর্ণ বিজ্ঞান সম্মত হতে হবে।
হরিচাঁদ ঠাকুর একজন মানুষকে প্রকৃত মানুষ হিসাবে গড়ে ওঠার জন্য বিভিন্ন বাণী দিয়ে গেছেন। তিনি সংসার জীবনকে সব থেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছেন। আর মানুষের চারিত্রিক বৈশিষ্টতাকে প্রাধান্য দিয়েছেন। তাই তিনি বলেছেন-
যত যত তীর্থ আছে অবনী ভিতরে।
সত্যবাক্য সম কক্ষ হইতে না পারে।। -শ্রীশ্রী হরিলীলামৃত পৃঃ নং ৩২
আবার দখুন, তিনি সত্য কথার উপর কতটা গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি কী বলেছেন, সারা বিশ্বে যত তীর্থস্থান বা ধর্ম স্থান আছে, সেই তীর্থ স্থানের পবিত্রতা থেকে একজন সত্যবাদী অধিক উচ্চস্থানের অধিকারী।
আবার তিনি এই চরিত্র সম্পর্কে বলেছেন-
দেহের ইন্দ্রিয় বশ করেছে যে জন।
তার দরশনে সব তীর্থ দরশন।। -শ্রীশ্রী হরিলীলামৃত পৃঃ নং ৩২
অর্থাৎ আপনাকে সৎ, পবিত্র হওয়ার জন্য মনের কালিমা দূর করার জন্য তীর্থ ভ্রমনের দরকার নেই। তার থেকে যিনি ইন্দ্রিয় সংজমী, সৎ ব্যক্তি; তার সান্বিধ্য পেলে আরো বেশি উপকৃত হবেন।
ঈশ্বর বা ভগবানের ব্যাখ্যা-
আমরা জীবনের উদ্ধার কর্থা সম্পর্কে লীলামৃতে দেখতে পাই-
“যে যাহারে ভক্তি করে সে তার ঈশ্বর।” -শ্রীশ্রী হরিলীলামৃত পৃঃ নং ১
আর শ্রীশ্রীগুরুচাঁদ চরিত-এ দেখতে পাই-
“বিশ্ব ভরে’ এই নীতি দেখি পরস্পর।
যে যা’রে উদ্ধার করে সে তার ঈশ্বর।।” শ্রীশ্রী গুরুচাঁদ চরিত- পৃঃ ৫৭২
এখানে ঈশ্বরের ব্যাখ্যাটাকে কিন্তু গতানুগতিকতার ঊর্ধে গিয়ে বাস্তবতাকে তুলে ধরে বলা হয়েছে যে, ‘যে যা’রে উদ্ধার করে সে তার ঈশ্বর।’ অর্থাৎ ঈশ্বর এখানে কোন অলীক কেউ নন। ঈশ্বর হচ্ছেন উদ্ধার কর্তা। আর এই উদ্ধার কর্তাকেই লোকে ভক্তি শ্রদ্ধা করেন।
তো এই নিপীড়িত বঞ্চিতদের উদ্ধার কর্তার কথা যদি বলতে হয়, তাহলে আমরা দেখতে পাই- মহামানব গৌতম বুদ্ধ, হরিচাঁদ ঠাকুর, গুরুচাঁদ ঠাকুর, মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ মন্ডল, বাবা সাহেব ড. ভীম রাও আম্বেদকর, পেরিয়ার, গুরু নানক, গুরু রবিদাস, মাতা সাবিত্রিবাই ফুলে, মহাত্মা জ্যোতিরাও ফুলে ইত্যাদি। আবার বিশ্বের অন্যান্য দেশেও এরকম দেখতে পাই- যেমন- মার্টিন লুথার, জন আব্রাহাম লিঙ্কন, নেলসন মেন্ডেলা ইত্যাদি।
এই মহামানবেরা নিপীড়িত বঞ্চিত মানুষদের অধিকার আদায়ের জন্য সংগ্রাম করেছেন। তাই এই মহামানবেরা এই অর্থে ঈশ্বর বা উদ্ধার কর্থা।
হরিচাঁদ ঠাকুরের কাছে শ্রেষ্ঠ ধর্ম কী? তার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি বলেছেন যে,
“ঠাকুর কহেন বাছা ধর্ম্ম কর্ম্ম সার।
সর্ব্ব ধর্ম্ম হ’তে শ্রেষ্ঠ পর উপকার।।” -শ্রীশ্রী হরিলীলামৃত পৃঃ নং ১৫০
দেখুন, কতবড় গভীর ভাবনা। পর উপকার করা হচ্ছে শ্রেষ্ঠ ধর্ম। আর বাকী সব ধর্ম-কর্ম হচ্ছে তুচ্ছ, অসার।
এরকম অসংখ্য বাণীকে আমরা দেখতে পাই লীলামৃতের মধ্যে। এবার আমরা আরো একটা বাস্তব কথাকে তুলে ধরছি।
“অঙ্গ ধৌত বস্ত্র ধৌত ছাপা জপমালা।
বহিরঙ্গে বাহ্য ক্রিয়া সব ধুলা খেলা।।
যত দিন নাহি ঘুচে চিত্ত অন্ধকার।
তত দিন শৌচাচার ডুবাডুবি সার।।” -শ্রীশ্রী হরিলীলামৃত পৃঃ নং ১০৬
ধর্মপ্রাণ মানুষেরা বহিরঙ্গের শুভ্রতার নিয়ে ক্রিয়া কর্ম করে। সব সময় কোনো আরাধ্যের নাম করে। কিন্তু হরিচাঁদ ঠাকুর কী বলেছেন? যতদিন চিত্ত বা মনের অন্ধকার বা গ্লানী দূর না হবে ততদিন যতই শৌচাচার পালন করুক না কেন সে সবে কোন কাজ হবে না।
অর্থাৎ যতদিন সঠিক জ্ঞানের আলো ভিতরের অজ্ঞানতার অন্ধকারকে দূর করতে না পারবে ততদিন কোন কাজ হবে না। কাজ করতে হলে সৎ, সত্যবাদী, ইন্দ্রিয় সংজমী ও পরোপকারী না হতে পারলে চিত্তের অন্ধকার দূর হবেনা।
হরিচাঁদ ঠাকুর তাঁর কর্ম ধারায় নারীকেও সমান অধিকার দিয়েছেন। কোন ভেদাভেদ না রেখে সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যাবার কাজ করেছেন। যার জন্য আমরা দেখতে পাই নারী-পুরুষ উভয়ে মিলেমিশে এক সঙ্গে হরিচাঁদ ঠাকুরের বন্দনা করে।
তিনি কর্ম বিমুখতাকে মোটেই পছন্দ করেন না। তিনি সকলকে কাজ করার জন্য অনুপ্রাণিত করতেন। এইভাবে বহু বাণী ও কর্ম আমরা দেখতে পাই। যেখানে কোন বিশেষ জাতি নয়, ধর্ম নয়, সমাজ নয়; তিনি সমগ্র বিশ্বের মানব জাতির কল্যাণের জন্য কাজ করে গেছেন।
তিনি আবার ঘোষণা করেন-
কোথায় ব্রাহ্মণ দেখ কোথায় বৈষ্ণব।
স্বার্থবশে অর্থলোভী যত ভণ্ড সব।।
(লীলামৃত, ঠাকুরনগর, ১০ম সংস্করণ পৃ. ৯৪)
এখানে প্রকৃত ব্রাহ্মণ বা বৈষ্ণবদের খুঁজতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে, সংখ্যাটা নগণ্য। বাকী যাদের পাওয়া যাচ্ছে তারা প্রায় সবাই স্বার্থবশে অর্থলোভী ও ভণ্ড। প্রকৃত স্বার্থহীন, পরপোপকারী ব্রাহ্মণ ও বৈষ্ণবদের উদ্দেশ্যে কিন্তু এই কথা বলা হয়নি। কিন্তু এই সব গুণ ব্যাতীত যাদের দেখা যায়, তারা প্রায় সকলেই স্বার্থের জন্য অর্থলোভী। তাই এই ধরণের ব্রাহ্মণ ও বৈষ্ণবদেরকে হরিচাঁদ ঠাকুর ভণ্ড বলে উল্লেখ করেছেন।
আত্মা সম্পর্কে লীলামৃতের ব্যাখ্যা-
বৈদিক গ্রন্থে আমরা দেখতে পাই, আত্মা সম্পর্কে বলা হয়েছে- মৃত্যুর পরেও আত্মার অস্তিত্ব থেকে যায়। আত্মাকে কোনোভাবেই নষ্ট করা যায় না। আত্মা আবার পূণর্জন্ম গ্রহণ করে। ইত্যাদি ইত্যাদি। আর লীলামৃতের ৭৩ পৃষ্ঠায় (ঠাকুর নগর প্রকাশ ২০০৯) দেখতে পাই-
“তুমি-স্থুল আমি-সূক্ষ্ম উভয়ে অভিন্ন।
দেহ আত্মা মোরা দোঁহে মূলে নহি ভিন্ন।।”
এখানে “তুমি” কে? তুমি হচ্ছে আমার এই শরীর বা দেহ। আর “আমি” হচ্ছে- আমার এই দেহের ভিতরের চেতনা শক্তি। যাকে আত্মা বলা হয়েছে। দেহের আকার স্থুল বা বড় কিন্তু এর অভ্যন্তরের আত্মা হচ্ছে সূক্ষ্ম, তবে এই দুটো সত্ত্বা একত্রিত। একটা ভিন্ন অন্যের অবস্থান অসম্ভব। তাই-‘দেহ আত্মা মোরা দোঁহে মূলে নহি ভিন্ন।’ শরীরের বা দেহের মৃত্যুর পরে আত্মার ও বিনাশ ঘটে। দেহের বাইরে আত্মার অস্থিত্ব বলে কিছু নেই।
লীলামৃতের অভ্যন্তরে জাতি ধর্ম নির্বিশেষে আমরা সমাজ জাগরণের জন্য মানব কল্যাণের জন্য অনেক অমূল্য রতন খুঁজে পাই। তবে এর সঙ্গে অনেক কাকড়ও আছে। কিন্তু কবি তো প্রথমেই সে কথা স্বীকার করে দুধটাকেই গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন। তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থার উপর দাঁড়িয়ে হরিচাঁদ ঠাকুরের এই সংগ্রামী চেতনা জাগরণের সোপানকে কি আমরা তাঁর চিন্তা-চেতনায় প্রভাবিত হয়ে মানব কল্যাণের জন্য অগ্রসর হতে পারি না? না কি আমরা মহাপণ্ডিত সেজে এই গ্রন্থকে ‘নিকৃষ্ট ও বিকৃত’ বলে তুলে ধরব? আসলে ওটা লীলামৃতে নয়, আমাদের অতিপাণ্ডিত্যই ‘নিকৃষ্ট ও বিকৃত’ করে তুলেছে।
----------------------
#শ্রীশ্রীহরিলীলামৃত
#মতুয়াধর্ম
#গুরুচাঁদ
#হরিচাঁদ

Address

Puna Link Road
Kalyan
410306

Telephone

+919969368536

Website

https://www.youtube.com/channel/UCBNY7bkgoRIhWYFN

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Jagadish Roy posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Contact The Organization

Send a message to Jagadish Roy:

Share