Jagadish Roy

Jagadish Roy Social movement. personal view of some subject. I want to spread humanity. I want to show down trader's speechless talk.

মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলের অবদানকে অস্বীকার করে তাঁকে বদনাম করার কারণ কী? তাঁর বিরুদ্ধে প্রচারিত অপপ্রচারের জবাবেই এই...
16/08/2026

মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলের অবদানকে অস্বীকার করে তাঁকে বদনাম করার কারণ কী? তাঁর বিরুদ্ধে প্রচারিত অপপ্রচারের জবাবেই এই প্রতিবেদন।
লেখক — জগদীশচন্দ্র রায়
যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলের নাম শুনলেই এক শ্রেণির লোকেরা তাঁকে গালি দিতে শুরু করে। তাদের কথায়, যোগেন মণ্ডল বাংলাভাগ করেছে। তারজন্য পূর্ববাংলার হিন্দুদের চরম সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে। যোগেন মণ্ডল নিজের স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য মন্ত্রীত্বের লোভে পাকিস্তানের মন্ত্রী হন। তিনি কেন মুসলিম লীগের মন্ত্রীসভায় যোগদান করেছিলেন? পাকিস্তান থেকে তিনি কেন পালিয়ে এসেছিলেন?
-এরকম হাজারো প্রশ্ন আছে? আমরা এই সব প্রশ্নকে মাথায় রেখে তথ্যসহ জবাব দেবার চেষ্টা করেছি “ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ” বইতে। যদিও কারো বাঁকা লেজে যতোই তেল মাখানো হোক না কেন সেটা সোজা হবে না। কিন্তু যাঁদের সামান্য ভাবনা চিন্তার অবকাশ আছে তাঁরা হয়তো কিছু ভাবতে পারবেন।
যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল বাংলার ‘আম্বেদকর’। তিনি পিছিয়ে রাখা শ্রেণির লোকদের ‘মহাপ্রাণ। তাঁর নেতৃত্বে বাবাসাহেবকে সংবিধান সভায় প্রেরণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। সাংবিধানিক সুবিধার জন্য পিছিয়ে রাখা শ্রেণির অনেকটা উত্তোরণ ঘটেছে। সে জন্য বর্ণবাদীদের যতো জ্বালা। তাই তারা সংরক্ষণ নির্মূল করণের খেলায় মেতেছে। এই কাজে কিছু মিরজাফরও জুটেছে।
মহাপ্রাণ সম্পর্কে তাঁর সুযোগ্য পুত্র জগদীশচন্দ্র মণ্ডল “মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ” নামে সাতটি খণ্ডে বই প্রকাশ করেছেন তথ্য দিয়ে। তাই তিনি লেখক হিসাবে দাবি করেন নি। কারণ, তিনি তৎকালীন পত্র-পত্রিকা ও অন্যান্য থেকে তথ্য সংগ্রহ করেই বই প্রকাশ করেছেন।
“মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ”-এর দ্বিতীয় খণ্ডের ‘ঐতিহাসিক মূল্যায়ন’-এ কিরণ চন্দ্র ব্রহ্ম জানিয়েছেন, “ভারত স্বাধীন হওয়ার পরেই চারিদিক হতে একটা চিৎকার প্রতিধ্বনিত হল যে যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল দেশভাগ করেছে, তাঁর মত সর্বনাশা লোক ভারতে আর কেউ নেই। এই মিথ্যা দোষারোপকারীরা অশ্লীল ভাষায় তাঁকে অজস্র গাল দিয়েছে। প্রকৃত পক্ষে ভারত ভাগে তাঁর কোন ভূমিকাই ছিল না। তবে এই কুৎসা রটনাকারীদের উদ্দেশ্য কি তাও প্রনিধান করা দরকার। যারা এই মিথ্যা রটিয়েছে তারাও জানে ভারত ভাগে যোগেন্দ্রনাথের কোনো ভূমিকাই ছিল না এবং তিনি দেশ ভাগের একান্ত বিরোধী ছিলেন। এই কুৎসা রটনার কারণ আমাদের কাছে মোটেই দুর্বোধ্য নয়। কারণ, এই দেশের নিপীড়িত মানুষের অন্তরে মহাপ্রাণ যে শ্রদ্ধা অর্জন করেছেন সেটাকে নষ্ট করে দিয়ে সাধারণ মানুষের অন্তর থেকে তাঁকে চিরতরে মুছে দিতে পারলে তাঁর আজীবন সংগ্রামকে ব্যর্থ করে দেওয়া সম্ভব হবে এবং চির বঞ্চিতদের শোষণ, শাসন চিরস্থায়ীভাবে কায়েম করে রাখা যায়। এই ছিল কুৎসা রটনাকারীদের মূল উদ্দেশ্য।”
নাগপুর উনিভার্সিটির অধ্যাপক প্রদীপ আগ্‌লাবে বলেছেন, “বাবাসাহেব যদি সংবিধান সভায় যেতে না পারতেন তাহলে এই দেশের সংবিধান ব্রাহ্মণদের পক্ষেই লেখা হতো। তাই যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল আম্বেদকরী আন্দোলনে যে সহযোগিতা করেছেন এবং মূলনিবাসীদের উদ্ধারের জন্য যে কাজ করেছেন সেটা অসাধারণ কাজ। (তথ্য- সাংবিধানিক ভারত নির্মাতা বাবাসাহেব ড. আম্বেদকর আউর মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল, লেখক- ড. সঞ্জয় গজভিয়ে, পৃ. ১১)
জাপানী গবেষিকা মাসায়ুকি উসুদা যোগেন্দ্রনাথের কর্মজীবনকে ডঃ আম্বেদকরের কর্মজীবনের সঙ্গে তুলনা করে ভারত-ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ যুগ-সন্ধিক্ষণের এই বিশেষ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বটি যেভাবে উপেক্ষিত হয়েছেন তাতে দুঃখ করেছেন।৫৬ (তথ্য- মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ বঙ্গভঙ্গ ও অন্যান্য প্রসঙ্গ, লেখক- সদানন্দ বিশ্বাস, পৃষ্ঠা ২৩৪ ) (৫৬ Pushed Towards the Partition Jogendranath Mandal and the Constrained Namasudra Movement-Masayuki Usuda/Caste system, Untouchability and the Depressed-H. Katani (еdt), Р.Р.-221
বাংলায় তো মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলের প্রতি বদনামের পাহাড় চলছে, হিন্দি বলয়েও এই বদনাম ও তাঁর কৃতিত্ত্বের শ্রেয় অন্যকে দেওয়ার কাজ চলছে বই লিখে ও বক্তব্য প্রদানের মাধ্যমে। যেগুলো স্বেচ্ছায় হতে পারে অথবা তাঁদের সঠিক তথ্যের জানকারির অভাবেও হতে পারে। আসুন সে বিষয়ে আলোচনা করা যাক- এটা বলা হয়ে যে,
১) যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলের নেতৃত্বে বাবাসাহেবকে পূর্ব বঙ্গ(বাংগাল) থেকে সংবিধান সভার জন্য নির্বাচিত করে পাঠিয়েছিলেন।
২) বাংলার নমঃশূদ্র লোকেরা বাবাসাহেবকে সংবিধান সভায় নির্বাচিত করে পাঠিয়ে ছিলেন।
৩)এক বড় সংগঠনের প্রেসিডেণ্ট বলেছেন- যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলকে পাকিস্তান যেতে মানা করেছিলেন।
৪) লেখক শংকরানন্দ শাস্ত্রী তাঁর বইতে লিখেছেন- ভারত ভাগ হওয়ার পর, করাচি যাওয়ার আগে যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল বাবাসাহেবকে একটা ‘তার” টেলিগ্রাম পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু বাবাসাহেব বাবাসাহেব সাহেব মন্ডলের টেলিগ্রামে সাড়া দেননি।
৫) (DR. AMBEDKAR: LIFE AND MISSION. DHANANJAY KEER. Page No. 382) তে লিখেছেন- There with the backing of Muslim League, he was elected to the Constituent Assembly.
আসুন এক এক করে এই মিথ্যা অভিযোগগুলোর জবাব তুলে ধরা যাক-
১) যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলের নেতৃত্বে বাবাসাহেবকে পূর্ব বঙ্গ(বাংগাল) থেকে সংবিধান সভার জন্য নির্বাচিত করে পাঠিয়েছিলেন।
আমাদের একটু শেখা উচিত। যে স্থানকে পূর্ববঙ্গ (বাঙ্গাল) বলা হচ্ছে, ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত সেটা ভারতেরই অংশ ছিল, আর আজকের দিনে সেটাই বাংলাদেশ। ১৯৭১ সাল পর্যন্ত সেটা ছিল পূর্ব পাকিস্তান। আমরা যদি বলতে চাই, তাহলে ‘পূর্ববঙ্গ’ বলতে পারি। কারণ, যেখান থেকে—যশোর, খুলনা, বরিশাল এবং ফরিদপুর—এর মানুষেরা বাবাসাহেবকে নির্বাচিত করে দিয়ে ছিলেন, সেটা পশ্চিমবঙ্গ ছিল না; সেই সময় সেটা ছিল পূর্ববঙ্গ বা ভারতেরই অংশ।
ছোট্ট একটি বিষয়ের মধ্যেও অনেক পার্থক্য রয়েছে। আমি কাউকে সমালোচনা করার জন্য এটা বলছি না। আমি মনে করি, আপনাদের এটা সংশোধন করা উচিত। কারণ, আমরা যদি সঠিক কথা না বলি, তাহলে আগামী দিনে আমাদের সমস্যাই আরও বাড়বে।
অভিযোগ - ২) বাংলার নমঃশূদ্র লোকেরা বাবাসাহেবকে সংবিধান সভায় নির্বাচিত করে পাঠিয়ে ছিলেন।
“বাংলার নমঃশূদ্র লোকেরা বাবাসাহেবকে সংবিধান সভায় পাঠিয়েছিল”—এই কথাতেও একটু ভুল আছে। বাবাসাহেব আম্বেদকর যে সাতটি ভোট পেয়েছিলেন, তার মধ্যে শুধু নমঃশূদ্র ছিলেন না; রাজবংশী মানুষও ছিলেন। এছাড়াও একজন আদিবাসী/মূলনিবাসী প্রতিনিধিও ছিলেন।
যাঁরা সংগ্রাম করেছিলেন, তাঁরা তফসিলি জাতি (SC) ও তফসিলি উপজাতি (ST) সম্প্রদায়ের মানুষ ছিলেন। কিন্তু আপনি যদি শুধু নমঃশূদ্র মানুষ বলে উল্লেখ করেন, তাহলে অন্যদের প্রতি ন্যায়বিচার হবে না।
আপনি বলতে পারেন যে, SC ও ST সম্প্রদায়ের মানুষ বাবাসাহেবকে নির্বাচিত করে সংবিধান সভায় পাঠিয়েছিলেন। আমি শুধু কথাটি সংশোধন করার জন্যই এটা বলছি।
অভিযোগ- ৩) এক বড় সংগঠনের প্রেসিডেণ্ট বলেছেন- যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলকে পাকিস্তান যেতে মানা করেছিলেন।
আমাদেরই একটা বড় সংগঠনের প্রেসিডেন্ট আছেন। তিনি একটি ভিডিওতে কী বলেছেন? তিনি বলেছেন—“না, বাবাসাহেব আম্বেদকর যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলকে পাকিস্তানে যেতে নিষেধ করেছিলেন। কিন্তু তিনি বাবাসাহেবের কথা শোনেননি।”
আসুন এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্যসহ আলোচনা করা যাক- কিন্তু আপনাদের একটি তথ্য জানাই।
বাবাসাহেব আম্বেদকরকে ৩০ মে ১৯৪৭ তারিখে যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল একটি চিঠি লিখেছিলেন—“এই পরিস্থিতিতে আমি কী করব?” কারণ, খুব তাড়াতাড়ি দেশভাগ ও বাংলাভাগ হতে পারে। তিনি বাবাসাহেবকে তাঁর রাজনৈতিক গুরু হিসাবে মানতেন। তাই এই কঠিন পরিস্তিতিতে ‘গুরুর’ কাছে সমস্যার সমাধান চেয়ে চিঠি লেখেন।
এই ‘গুরু’ আজকের দিনের অর্থে গুরু নয়; এখানে ‘গুরু’ বলতে শ্রদ্ধেয় বা সম্মানিত ব্যক্তি বোঝানো হয়েছে।
যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলের সেই চিঠি পাওয়ার পর ২ জুন ১৯৪৭ তারিখে বাবাসাহেব যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলকে একটি চিঠি পাঠিয়েছিলেন। সেই চিঠিতে যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলের কী করা উচিত, সে বিষয়ে তিনি পরামর্শ দিয়েছিলেন।
আমি সেই চিঠি থেকে কয়েকটি লাইন আপনাদের সামনে তুলে ধরছি। সম্পূর্ণ চিঠি বইয়ের পরিশিষ্টে দেওয়া আছে।
***The Scheduled Castes were incapable of doing anything precisely with regard to the question of partition. They could neithr force partition nor could they prevent partition if it was coming. The only course left to the Scheduled Castes is to fight for safeguards either in United Bengal or a devided Bengal.
---I have of course told the Hindus that in case here is partition they shall have to agree to reserve some land in Western Bengal for the Scheduled Castes of Eastern Bengal.
--- I agree that you should work in alliance with the League and secure adequate safeguards for them,
-- The Muslim League however, will be ready to give to the Scheduled Castes separate electorates more probably because they themselves want separate electorates for their own community.
-- In my view that Memorandum contains all that we need for our protection, not only in Eastern Bengal but in every province in India. I think you should make this memorandum the best use in your negotiations with Muslim League. Of course, you are free to add to it any new safeguards for our people in Eastern Bengal which you think there are some special circumstances which call for such safeguards. -
বাংলা অনুবাদ:
“দেশভাগের প্রশ্নে তফসিলি জাতির পক্ষে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু করার ক্ষমতা ছিল না। তারা যেমন দেশভাগ ঘটাতে বাধ্য করতে পারত না, তেমনই দেশভাগ যদি অনিবার্য হয়ে আসে, তাহলে তা প্রতিরোধ করতেও পারত না। তফসিলি জাতির সামনে একমাত্র পথ ছিল—অখণ্ড বাংলা হোক বা বিভক্ত বাংলা, উভয় ক্ষেত্রেই নিজেদের অধিকার ও নিরাপত্তার জন্য সুরক্ষা-ব্যবস্থার দাবিতে সংগ্রাম করা।”
“আমি অবশ্য হিন্দুদের বলে দিয়েছি যে, যদি দেশভাগ হয়, তাহলে তাদের পূর্ববঙ্গের তফসিলি জাতির মানুষের জন্য পশ্চিমবঙ্গে কিছু জমি সংরক্ষণ করতে সম্মত হতে হবে।”
“আমি একমত যে, আপনার উচিত মুসলিম লীগের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে কাজ করা এবং তাঁদের জন্য পর্যাপ্ত সুরক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।”
“তবে মুসলিম লীগ তফসিলি জাতির জন্য পৃথক নির্বাচকমণ্ডলী (Separate Electorates) দিতে প্রস্তুত থাকবে—সম্ভবত এই কারণেই যে, তারাও নিজেদের সম্প্রদায়ের জন্য পৃথক নির্বাচকমণ্ডলী চায়।”
“আমার মতে, ওই স্মারকলিপিতে আমাদের সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত বিষয়ই রয়েছে—শুধু পূর্ববঙ্গের জন্য নয়, ভারতের প্রতিটি প্রদেশের জন্যই। মুসলিম লীগের সঙ্গে আপনার আলোচনায় এই স্মারকলিপিটিকে সর্বোত্তমভাবে কাজে লাগানো উচিত বলে আমি মনে করি। অবশ্য, পূর্ববঙ্গের আমাদের মানুষের জন্য যদি এমন কোনো নতুন সুরক্ষা-ব্যবস্থার প্রয়োজন আছে বলে আপনি মনে করেন, যা বিশেষ পরিস্থিতির কারণে জরুরি, তাহলে আপনি তাতে সেগুলিও যুক্ত করতে পারেন।”
বাবাসাহেব যেভাবে বলছেন, আর আমাদের কিছু মানুষ যেভাবে বলছেন—“বাবাসাহেব তাঁকে পাকিস্তানে যেতে নিষেধ করেছিলেন, কিন্তু তিনি পরে পাকিস্তানে চলে গিয়েছিলেন।”
এবার আসি সবচেয়ে মারাত্মক প্রশ্নের জবাবে –
৪) লেখক শংকরানন্দ শাস্ত্রী তাঁর বইতে লিখেছেন- ভারত ভাগ হওয়ার পর, করাচি যাওয়ার আগে যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল বাবাসাহেবকে একটা ‘তার” টেলিগ্রাম পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু বাবাসাহেব বাবাসাহেব সাহেব মন্ডলের টেলিগ্রামে সাড়া দেননি।
শংকরানন্দ শাস্ত্রী তাঁর “ড. ভীমরাও আম্বেদকর জীবন সংঘর্ষ এবং রাষ্ট্র সেবায়ে” বইয়ের ২৯২ থেকে ২৯৪ নম্বর পৃষ্ঠায় লিখেছেন—
(৪২) যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল ভুলভুলাইয়ায়: (গোলকধাঁধায় যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল)
“দেশভাগ হয়ে যাওয়ার পর, করাচি যাওয়ার আগে যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল বাবাসাহেবকে একটি ‘তার’ পাঠিয়েছিলেন। তাতে তিনি বাবাসাহেবের কাছে জানতে চেয়েছিলেন যে, তিনি পাকিস্তানে মুসলিম লীগের মন্ত্রিসভায় থাকবেন কি না।”
বাস্তবে দেশভাগের পর যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলের কী করা উচিত—সে বিষয়ে তিনি বাবাসাহেবের কাছে পরামর্শ চেয়েছিলেন। যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল বাবাসাহেবকে যে চিঠিটি পাঠিয়েছিলেন, সেটি ছিল ৩০ মে ১৯৪৭ তারিখের। অথচ লেখক শংকরানন্দ শাস্ত্রী বলেছেন—‘বিভাজন হয়ে যাওয়ার পর, করাচি যাওয়ার আগে যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল বাবাসাহেবকে একটি তার পাঠিয়েছিলেন।’
আসলে সেটি ‘তার’ (Telegram) নয়, ‘গোপন চিঠি’ (Confidential Letter) ছিল।
আর সেটি দেশভাগ হয়ে যাওয়ার পর পাঠানো হয়নি; চিঠিটি ৩০ মে ১৯৪৭ তারিখে পাঠানো হয়েছিল।
এরপর শংকরানন্দ শাস্ত্রী লিখেছেন—
“বাবাসাহেব শ্রী মণ্ডলের তারের কোনো উত্তর দেননি। তিনি নীরব ছিলেন। সেই সময় লেখক তিলক মার্গ, নয়াদিল্লিতে বাবাসাহেবের সঙ্গেই অবস্থান করছিলেন। সেই সময় বাবাসাহেব তাঁর প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেছিলেন—
‘শ্রী মণ্ডলের মুসলিম লীগের মন্ত্রিসভায় যোগ দেওয়া উচিত হয়নি। মুসলিম রাজনীতি এমনই যে, তারা কখনোই অন্য কারও সঙ্গে মিলিত হয়ে কোনো অত্যাচারের মোকাবিলা করতে পারে না।’”
লেখক কী বলেছেন—“বাবাসাহেব শ্রী মণ্ডলের তারের কোনো উত্তর দেননি।”
কিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি—বাবাসাহেব যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলের ৩০ মে ১৯৪৭ তারিখের চিঠির উত্তর ২ জুন ১৯৪৭ তারিখে দিয়েছিলেন। আর সেই চিঠিতে কী লেখা ছিল, তার সামান্য অংশ আমি উপরে দিয়েছি।
এরপর শংকরানন্দ শাস্ত্রী লিখেছেন—
“শ্রী মণ্ডলের কী পরিণতি হবে? এখনই কিছু বলা সম্ভব নয়। তবুও, তিনি কি পাকিস্তানে আমাদের মানুষদের মুসলমান হওয়া থেকে বিরত রাখতে পারবেন? পাকিস্তানে যে অস্পৃশ্যরা থাকবেন, তাঁরা কি অস্পৃশ্য হিসেবে মানবিক অধিকার লাভ করতে পারবেন? তাঁরা কি পাকিস্তানে টিকে থাকতে পারবেন?—এগুলো এমন কিছু প্রশ্ন, যার উত্তর সময়ই দেবে।”
যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলের এই পরিস্থিতিতে কী করা উচিত, সে বিষয়ে বাবাসাহেব তাঁর চিঠিতে বিস্তারিতভাবে লিখেছিলেন। তা সত্ত্বেও যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলকে নিয়ে কেন এমন ভুল প্রচার করা হচ্ছে?
এবার আসি সবচেয়ে অসম্মানজনক মন্তব্যে - ৫) (DR. AMBEDKAR: LIFE AND MISSION. DHANANJAY KEER. Page No. 382) তে লিখেছেন- There with the backing of Muslim League, he was elected to the Constituent Assembly.
বাবাসাহেবের জীবনীকার ধনঞ্জয় কীর তাঁর লেখা গ্রন্থ ‘ডঃ আম্বেদকর: জীবন ও কর্ম। পৃষ্ঠা নং ৩৮২)-তে উল্লেখ করেছেন- Ambedkar had no men in the Bombay Agembly to support his candidature, and so his name' was put up through the Scheduled Castes representatives in the Bengal Assembly. There with the backing of Muslim League, he was elected to the Constituent Assembly. অর্থাৎ আম্বেদকরের প্রার্থিতাকে সমর্থন করার জন্য বোম্বে অ্যাসেম্বলিতে তাঁর কোনো লোক/প্রতিনিধি ছিল না। তাই বাংলার অ্যাসেম্বলিতে থাকা তফসিলি জাতির প্রতিনিধিদের মাধ্যমে তাঁর নাম প্রস্তাব করা হয়। সেখানে মুসলিম লীগের সমর্থনে তিনি গণপরিষদে (Constituent Assembly) নির্বাচিত হন।
আপনারা কি জানেন, এর আসল কারণ কী ছিল?
সেই সময় যে নির্বাচন হয়েছিল, তাতে হিন্দুরা শুধু হিন্দুদেরই ভোট দিতে পারতেন। আর মুসলমানরা মুসলমানদের ভোট দিতে পারতেন। অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানরা যেকোনো প্রার্থীকে ভোট দিতে পারতেন। কিন্তু সেই নির্বাচনে অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানরা অংশগ্রহণ করেননি। বাবাসাহেব আশা করেছিলেন যে, তাঁরা হয়তো তাঁকে ভোট দেবেন; কিন্তু তা আর হয়নি।
তাই বাবাসাহেবকে সংবিধান সভায় পাঠানোর জন্য যে ন্যূনতম পাঁচটি ভোটের প্রয়োজন ছিল, তিনি সেখানে সাতটি ভোট পেয়েছিলেন। এর পেছনে একটি দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। আমি সেই বিষয়ে এখন বেশি বিস্তারিত বলছি না।
সেই সময় সেখানে মুসলিম লীগের মন্ত্রিসভা ছিল এবং সেই মন্ত্রিসভায় যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলও মন্ত্রী ছিলেন। সেখানে যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল মুসলিম লীগের সঙ্গে মিলেমিশে কাজ করছিলেন।
কিন্তু ভোট দেওয়ার সময় মুসলমানদের বাবাসাহেবকে ভোট দেওয়ার অধিকার ছিল না। তাঁরা তাঁকে নৈতিক সমর্থন দিয়েছিলেন। কীভাবে মুসলমানরা বাবাসাহেবকে পরোক্ষভাবে তাঁদের সাধ্যমতো সাপোর্ট করেছিলেন, তার কয়েকটি উদাহরন তুলে ধরছি-
১) টাঙ্গাইলের এম.এল.এ. গয়ানাথ বিশ্বাসের ড. আম্বেদকরের প্রতি গভীর ঝোঁক ছিল। তিনি যে ড. আম্বেদকরকে ভোট দিতে পারেন—এ কথা জানতে পেরে তাঁর কংগ্রেসি ‘অভিভাবকেরা’ তাঁকে একটি গোপন স্থানে লুকিয়ে রেখেছিলেন, যাতে তিনি সময়মতো ভোট দেওয়ার জন্য সেখানে যেতে না পারেন।
কিন্তু নিপীড়িত মানুষের মুক্তিদাতা ড. আম্বেদকরের প্রতি তাঁর আকর্ষণ এতটাই গভীর ছিল যে, তিনি সেই গোপন স্থান থেকে তাঁর ভাতিজার মাধ্যমে ভোটের এক দিন আগে গভীর রাতে যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলের কাছে বার্তা পাঠিয়েছিলেন—'তাঁকে যদি অ্যাসেম্বলি হাউসে নিয়ে যাওয়া হয়, তাহলে তিনি নিশ্চিতভাবেই ড. আম্বেদকরকে ভোট দেবেন।’
এই সময় যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলের অনুরোধে মুসলিম সমাজ ও প্রশাসন দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে ওই সদস্যকে সেখান থেকে উদ্ধার করে ফিরিয়ে নিয়ে আসেন। আর তিনি বাবাসাহেবকে ভোট দেন।
২) এদিকে মুকুন্দ বিহারী মল্লিকও সংবিধান সভার নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছিলেন। কিন্তু যাঁদের কাছ থেকে তিনি ভোট পাওয়ার আশা করেছিলেন, তাঁরা ড. বাবাসাহেব আম্বেদকরকে ভোট দেবেন সেটা তিনি বুঝতে পারলেন। অর্থাৎ তিনি নির্বাচিত হওয়ার মতো ভোট পাবেন না।
তখন ভোটগ্রহণ শুরু হওয়ার আগের রাতে খাজা স্যার নাজিমুদ্দিনের ভাই খাজা সাহাবুদ্দিন টেলিফোনে যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলকে জানিয়েছিলেন—
“মিস্টার মণ্ডল, আপনার অনুমানই ঠিক; এইমাত্র মিস্টার এম. বি. মল্লিক (মুকুন্দ বিহারী মল্লিক) আমাকে টেলিফোন করে জানিয়েছেন যে, তিনি ড. আম্বেদকরকে ভোট দেবেন।”
এইভাবে মুসলমানরা তথা মুসলিম সরকার পরোক্ষভাবে বাবাসাহেবকে সমর্থন করেছিলেন। আমি আবারও বলছি, তাঁদের হিন্দু প্রার্থীদের ভোট দেওয়ার অধিকার ছিল না। তাই যারা বলে যে, মুসলমানরা বাংলার থেকে বাবাসাহেবকে ভোট দিয়ে সংবিধান সভায় পাঠিয়েছিলেন—এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা। মুসলমানরা তাঁকে নৈতিক সমর্থন দিয়েছিল।
—এইভাবে লিখে বা নিজের বক্তব্যের মাধ্যমে ‘মুসলমানরা বাবাসাহেবকে সংবিধান সভায় পাঠিয়েছিল’—এমন প্রচার করার ফলে মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল তথা শিডিউল্ড কাস্ট ফেডারেশনের জীবন-মরণ সংগ্রামকে অপমান করা হয়।
সঠিক ইতিহাস সম্পর্কে আমাদের জানা উচিত। শুধু বই লিখলেই বা বড় বড় কথা বললেই কেউ বড় হয়ে যায় না। আসল ইতিহাস জানতে হবে এবং সত্য ইতিহাসকে সঠিকভাবে তুলে ধরতে হবে। মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল বাংলার ‘আম্বেদকর’। তাঁকে যতোই ছোট করা হোক, তাঁর কৃতিত্ত্বকে স্বীকার না করে অন্যদের দেওয়া হোক, তাঁকে যতোই গালি দেওয়া হোকনা কেন আজ পিছিয়ে রাখা মানুষেরা সাংবিধানিকভাবে সেসব সুবিধা পাচ্ছেন, সেখানে মহাপ্রাণেরও অবদান আছে। সে জন্যই তাঁকে ‘মহাপ্রাণ’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছে।
___________________
#যোগেন্দ্রনাথ_মণ্ডল
#বদনাম
#বদনামের_জবাব
#বাবাসাহেব_আবেদকর

স্বাধীনতা আন্দোলন ও বাবাসাহেব আম্বেদকর। তিনি কোন স্বাধীনতার আন্দোলন করেছিলেন?লেখক -জগদীশ রায়        ভারতের স্বাধীনতার না...
11/08/2026

স্বাধীনতা আন্দোলন ও বাবাসাহেব আম্বেদকর। তিনি কোন স্বাধীনতার আন্দোলন করেছিলেন?
লেখক -জগদীশ রায়
ভারতের স্বাধীনতার নাম শুনলেই ভেসে ওঠে গান্ধী, বিনয়-বাদল-দীনেশ, খুদীরাম, সূর্যসেন ইত্যাদি নাম। বিপ্লবীরা অবশ্যই দেশের জন্য স্বাধীনতার আন্দোলন করেছিলেন। দেশের নেতারা কিন্তু সমগ্র ভারতবাসীর স্বাধীনতা জন্য আন্দোলন করেন নি। তার একটা প্রমাণ-
গান্ধিজি বলেছিলেন,“যদি ইংরেজরা ভারতের স্বাধীনতা দেয়, তার বদলে অর্থাৎ ভারতের স্বাধীনতার বদলে যদি অচ্ছুৎদের (বর্তমান তপশিলি) অধিকার দেয় তাহলে এই ধরনের স্বাধীনতা আমি চাই না।”
ইংলণ্ডের গোল টেবিল বৈঠকে বাবা সাহেব ইংরেজদের সঙ্গে দেশের বঞ্চিতদের জন্য যেসব অধিকার অর্জন করেছিলেন, সেই অধিকার যাতে বঞ্চিতরা না পায় তার জন্য গান্ধিজি ২৪ অক্টোবর ১৯৩২ পুনার যারবেদা জেলে অনশন করেন। আম্বেদকর এক বিবৃরতিতে বললেন গান্ধিজির প্রাণ বাঁচানোর জন্য সব রকমের সম্ভাব্য প্রয়াস চালানো উচিত। কিন্তু যে অধিকার আমরা অর্জন করেছি তা ছাড়তে রাজি নই। সংবাদ পত্রগুলি আম্বেদকরের বিরুদ্ধে প্রচার চালানো শুরু করল। তাঁর কাছে রক্ত দিয়ে লেখা চিঠি আসতে শুরু করল ‘তোমাকে আমরা মেরে ফেলব।’ সরদার বল্লভ ভাই প্যাটেল জেলের মধ্যে এসে গান্ধিজির সঙ্গে দেখা করে বললেনঃ- “বর্ণহিন্দু এবং অস্পৃশ্যদের মাঝখানে কেন আপনি নিজেকে স্যান্ডউইচ বানাচ্ছেন? আপনার বেঁচে থাকা জরুরি। আপনি অনশন ত্যাগ করুন।”
গান্ধীর আপ্তসহায়ক মহাদেব ভাই দেশাই কাছেই বসে ছিলেন। তিনি এঁদের দুজনের কথাবার্তা তাঁর ডাইরিতে লিখে রেখেছিলেন।
গান্ধিজি প্যাটেলকে বোঝালেন- “অস্পৃশ্য এবং মুসলমানরা যদি পৃথক নির্বাচনের মাধ্যমে জনতার মধ্য থেকে ইমানদার এবং সঠিক প্রতিনিধি নির্বাচন করে, তাহলে তাঁরা বিধানসভা ও লোকসভা কংগ্রেসকে স্বাধীনভাবে সরকার চালাতে দেবেনা। স্বাধীনদেশে তাঁরাই নির্ণায়ক শক্তিতে পরিণত হবেন। তোমাদের স্বার্থেই আমার এই অনশন।”
এই কথোপকথন লেখাছিল মহাদেব দেশাইয়ের ডাইরিতে। আমেরিকার এলিনার জুলিয়েট একজন গবেষক ছাত্রী। গবেষণার কাজে ভারতে এসে এই ডাইরি খুঁজে বের করেছেন এবং বই লিখেছন। (তথ্যসূত্রঃ আত্ম নিরীক্ষণ; 6 জুলাই 2006, বাংলা ভাগ কেন হল; নিকুঞ্জবিহারী হাওলাদার, পৃষ্ঠা 105)

আবার আমরা জানি তিলক বলে ছিলেন স্বরাজ আমার জন্মগত স্বাধীনতা। কিন্তু সেই স্বরাজের অর্থ কী? আসুন সে সম্পর্কে দেখে নেওয়া যাক।
তিলক মহারাষ্ট্রের আকোলা, ইভাৎমাল ও ভুষাওয়ালের খোলা ময়দানে ভাষণ দেন। এই ভাষণ ‘কেশরী’ নামক পত্রিকায় ছাপা হয়। তিলক বলেন–“আমাদের স্বরাজের অর্থ এটা নয় যে, ইংরেজদের ভারত থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হোক। ইংরেজরা চাইলে ভারতে থাকতে পারবে। কিন্তু শাসন প্রসাশনে আমাদের প্রতিনিধিত্ব দিতে হবে।’’ এর জন্য তিলক মনুস্মৃতির উদাহরণ দেন। তিনি বলেন, “মনুস্মৃতি অনুসারে যে কোন রাজা তার রাজ কাজ চালাতে চাইলে বুদ্ধিমান লোকদের সঙ্গে নিয়ে শাসন প্রশাসন চালানো উচিত।” বুদ্ধিমান অর্থাৎ লেখাপড়া শেখা পণ্ডিত। অর্থাৎ ব্রাহ্মণ। এর অর্থ তিলকের আন্দোলন শুধুমাত্র উচ্চবর্ণীয়দেরকে ইংরেজদের শাসন প্রশাসনে প্রতিনিধিত্ব দেওয়ার আন্দোলন ছিল। যাকে স্বরাজ বা হোমরুল আন্দোলন বলা হয়। এটা কোন প্রকারে স্বাধীনতার জন্য আন্দোলন ছিল না। যদিও এটাকে স্বাধীনতার আন্দোলন বলেই প্রচার করা হয়। স্বরাজ এবং স্বাধীনতার মধ্যে অনেক পার্থক্য আছে।
ভারতে আমরা যে স্বাধীনতার আন্দোলন দেখতে পাই, বাস্তবে ভারতে স্বাধীনতার জন্য দুই ধরনের আন্দোলন চলছিল। এক- ইংরেজদের অধীনতা থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য উচ্চবরণীয়দের স্বাধীনতার আন্দোলন। দুই- উচ্চবর্ণীয়দের অধীনতা বা গোলামি থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য স্বাধীনতার আন্দোলন। দ্বিতীয় স্বাধীনতার আন্দোলন সম্পর্কে আমরা প্রায় জানিই না। এই দ্বিতীয় স্বাধীনতার আন্দোন করেছিলেন জ্যতিরাও ফুলে, শাহু মহারাজ, বাবাসাহবে আম্বেদকর, পেরিয়ার, গুরুচাঁদ ঠাকুর ও অন্যান্য মূলনিবাসী মহামানবেরা। (বিস্তারিত তথ্য জানা যাবে ‘স্বাধীনতার দুই আন্দোলন’ বইতে)।
বাবাসাহেব যে স্বাধীনতার আন্দোলন করেছিলেন সেটা ছিল যেমন উচ্চবর্ণীয়দের গোলামি থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য স্বাধীনতার আন্দোলন তেমনি ভারতের সর্বসাধারণের সার্বিক স্বাধীনতার আন্দোলন। যার প্রমাণ আমরা পাই, তিনি গোল টেবিল বৈঠকে ইংরেজদের সামনেই বলছেন- ভারতে তাদের শাসন তুলে নিয়ে জনগণের দ্বারা, জনগণের জন্য ও জনগণের শাসন চাই। যে কথা আব্রাহাম লিঙ্কন বলেছিলনে By the people, for the people of the people. সেই কথার প্রতিধ্বনি শুনতে পাই।
স্বাধীনতাকে গোলামিতে রূপান্তর
১৭ আগস্ট ১৯৩২ সালে ড. আম্বেদকরের চারটি দাবি স্বীকৃত হয়। এরফলে মূলনিবাসীরা স্বাধীন হয়ে যায়। গান্ধিজি ১৫ আগস্ট ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা লাভ করেন। আর মূলনিবাসীদের ১৭ আগস্ট ১৯৩২ সালে স্বাধীনতা অর্জিত হয়। ড. আম্বেদকরের যে চারটি দাবি স্বীকৃত হয়েছিল সেটাকে স্বাধীনতার যে অর্থে বলা যায় সেটা হচ্ছে DOMENION STATUS এর স্বাধীনতা। ইংরেজরা ভারতেই থাকবে কিন্তু সাংবিধানিক অধিকারের প্রয়োগ করার জন্য মূলনিবাসীদের স্বতন্ত্র অধিকার রাখা হয়েছে। ইংরেজরা কেন্দ্রীয় শাসন কাজ চালাবে, তাদের শাসন ব্যবস্থা চলবে কিন্তু সব ধরনের সাংবিধানিক অধিকার আমাদের থাকবে। একে বলা হয় DOMENION STATUS এর স্বাধীনতা।
বাবসাহবে ড. আম্বেদকর ইংরেজদের বোঝান যে উচ্চবর্ণদের স্বাধীন করার আগে আমাদের স্বাধীন করতে হবে। তারা ইংরেজদের গোলাম আর আমারা উচ্চবর্ণের গোলাম। উচ্চবর্ণীয়দের স্বাধীন করে দিলে তারা মূলনিবাসীদের কোনো দিন স্বাধীনতা দেবেনা। তাই উচ্চবর্ণীয়দের নয়, আগে মূলনিবাসীদের স্বাধীন করতে হবে। ১৭ আগস্ট ১৯৩২ সালে যে সাম্প্রদায়িক বাঁটোয়ারা (COMMUNAL AWARD) ঘোষিত হয়েছিল সেটা DOMENION STATUS এর স্বাধীনতা ছিল। এই স্বাধীনতাকে গান্ধিজি পুনাচুক্তির মাধ্যমে গোলামিতে রূপান্তরিত করেন। কারণ তাঁর দ্বারা চালানো স্বাধীনতার আন্দোলন সকলের জন্য স্বাধীনতার আন্দোলন ছিলনা। শুধুমাত্র শাসক জাতির (উচ্চবর্ণীয়) দ্বারা চালানো তাদের স্বাধীনতার আন্দোলন ছিল।
বাবাসাহেব কেন উচ্চবর্ণীয়দের স্বাধীনতার আন্দোলনে সহভাগী হননিঃ-
এবার আমরা দেখি বাবাসাহেব ড. আম্বেদকরের আন্দোলন। বাবাসাহেব আমেরিকায় শিক্ষার জন্য গিয়েছিলেন। সেখানে লালা লাজপত রায় গিয়ে বাবাসাহেবকে বলেন, “আপনি অনেক বিদ্বান ও বুদ্ধিমান ব্যক্তি। আপনার মধ্যে সমাজের জন্য কাজ করার চেতনা আছে। তাই আপনি কংগ্রেসের সঙ্গে ইংরেজদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার আন্দোলনে অংশ গ্রহণ করুন।” বাবাসাহেব তাঁকে বলেন, “আমি এখানে পড়াশুনা করার জন্য এসেছি। আমাকে প্রথমে শিক্ষা গ্রহণ করতে দিন। ভারতে গিয়ে পরে আমি এসব দেখবো।” পরবর্তিতে বাবাসাহেব ভারতে এসে ‘বহিষ্কৃত ভারত’ পত্রিকায় নিজের প্রতিক্রিয়া দিতে গিয়ে লেখেন, “পরতন্ত্রে ( পরের অধীন) যাদের কথা আমরা সহ্য করতে পারছিনা, স্বাধীনতার পরে আমাদেরকে তাদের লাথি খেতে হবে।” পরতন্ত্র অর্থাৎ ইংরেজদের শাসনকালে আমরা যাদের কথা অর্থাৎ উচ্চবর্ণীয়দের কথা এখনই সহ্য করতে পারছি না। আর এই উচ্চবর্ণীয়রা যদি স্বাধীন হয় তাহলে তো তারা আমাদের লাথি মারবে। বাবাসাহেবের ভবিষ্যৎবাণী বর্তমানে অক্ষরে অক্ষরে মিলে গেছে। বর্তমানে আমাদের সমাজের লোকদেরকে উচ্চবর্ণীয়দের কাছে গিয়ে টিকিট চাইতে হয়। টিকিট যদিও পাওয়া যায় নির্বাচিত হয়ে আসার জন্যও তাদের সাহায্য নিতে হয়।
লালা লাজপত রায় ও কংগ্রেস ইংরেজদের গোলামি থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য স্বাধীনতার আন্দোলন চালিয়ে ছিলেন। বাবাসাহেব ড. আম্বেদকর উচ্চবর্ণীয়দের গোলামি থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য স্বাধীনতার আন্দোলন চালিয়ে ছিলেন।
তিলক ওবিসিদের আইন সভায় যেতে না দেওয়ার জন্য গালি দিয়েছেন। গান্ধিজি অস্পৃশ্যদের স্বাধীনতায় রাজি নন। তাহলে এটা প্রমাণ হয় যে, তিলক, গান্ধিজি, গোখলে, রানাডে এবং এদের কংগ্রেসের স্বাধীনতার আন্দোলন সকলের জন্য স্বাধীনতার আন্দোলন ছিল না। তাঁরা শুধুমাত্র ইংরেজদের গোলামি থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য আন্দোলন চালিয়েছিলেন। আর সেটাকে সকলের স্বাধীনতার আন্দোলন বলে প্রচার করেছেন। মূলনিবাসী মহামানবরা ব্রাহ্মণদের গোলামি থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য যে আন্দোলন ১৮৪৮ সালে শুরু করেছিলেন সে আন্দোলন এখনও চলছে। মূলনিবাসীরা এখনও স্বাধীন হয়নি। তারা এখনও উচ্চবর্ণীয়দের গোলাম হয়ে আছে।
বাবাসাহেবের কথায় আবার ফিরে আসি-
বাবাসাহেব আম্বেদকর ইংরেজদেরকে একটা প্রশ্ন করেন। সেটা হচ্ছে- আপনারা ভারতকে যে স্বাধীনতা দিতে যাচ্ছেন সেটা দেশের স্বাধীনতা নাকি দেশের জনগণের স্বাধীনতা? দেশের স্বাধীনতা হচ্ছে Freedom of the country আর দেশের জনগণের স্বাধীনতা হচ্ছে Freedom of the people of the country. এর পরেও ইংরেজরা দেশকেই স্বাধীন করেছে। দেশের জনগণকে স্বাধীণ করতে দেননি গান্ধিজি আর কংগ্রেস।
বাবাসাহেব যে উচ্চবর্ণীয়দের স্বাধীনতার আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেননি তার প্রমাণ খোদ পাঞ্জাবী গোরা ব্রাহ্মণ অরুণ শৌরি তাঁর বই Worshipping False Gods. অর্থাৎ ‘মিথ্যা দেবতার পুজা’ নামক বইতে জানিয়েছেন।
এই বই-এ তিনি লিখেছেন, ড. আম্বেদকর স্বাধীনতার আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেননি। কিন্তু নিজেকে আম্বেদকরবাদী বলে প্রচার করা আম্বেদকরের ভক্তরা বই লিখে জানিয়েছেন যে বাবাসাহেব স্বাধীনতার আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। বাস্তবে অরুণ শৌরী এবং আম্বেদকরবাদীরা দুজনেই মিথ্যা কথা প্রচার করেছেন।
অরুণ শৌরী লিখেছেন ড. আম্বেদকর স্বাধীনতার আন্দোলনে যোগ দেননি। আসলে তাঁর লেখা দরকার ছিল ড. আম্বেদকর উচ্চবর্ণীয়দের স্বাধীনতার আন্দোলনে যোগ দেননি। আর যে আম্বেদকরবাদীরা লিখেছেন বাবাসাহেব স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিলেন। এটাও মিথ্যা কথা। একই ব্যক্তি পরস্পর বিরোধী দুটো আন্দোলনে কিভাবে যোগদান করতে পারেন? বাবাসাহেব নিজে মূলনিবাসী বহুজনদের জন্য স্বাধীনতার আন্দোলন চালিয়েছিলেন। উচ্চবর্ণীয়দের গোলামি থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য। তাই তিনি ব্রাহ্মণদের স্বাধীনতার আন্দোলনে সহভাগী হননি। প্রশ্ন হচ্ছে তাহলে অরুণ শৌরী বাবাসাহেবের বিরুদ্ধে কেন একথা লিখেছেন? আর সেটা ২০০০ সালেই বা কেন? কারণ ২০০০ সালে ভারতীয় সংবিধানের স্বর্ণ জয়ন্তীর বছর ছিল। স্বর্ণ জয়ন্তীতে লোক সংবিধার চর্চা করবে এটাই স্বাভাবিক। বিশেষ করে আম্বেদকরবাদী লোকেরা সংবিধানের বেশি চর্চা করেন। ৫০ বছরের পরে সংবিধান কতটা মহত্ত্বপূর্ণ থাকবে ইত্যাদি প্রশ্নের চর্চা আম্বেদকরবাদীরা করতে পারেন। এই ধরণের চর্চা যাতে না হয় বা কোন প্রশ্ন যাতে আম্বেদকরবাদীরা না করেন তার জন্য অরুণ শৌরী আগেভাগে বই লিখে জানালেন যে, আপনাদের বাবাসাহেব ড. আম্বেদকর স্বাধীনতার আন্দোলনে সহভাগী ছিলেন না। কারণ, আম্বেদকরবাদীরা প্রতিক্রিয়া দিতে ওস্তাদ। তখন তাঁরা লিখে জানাতে শুরু করলেন, না না বাবাসাহেব স্বাধীনতার আন্দোলনে সহভাগী ছিলেন।
ভারতে যে স্বাধীনতার দুটো আন্দোলন চলেছে; তার একটা হচ্ছে- উচ্চবর্ণীয়দের স্বাধীনতার আন্দোলন। এই আন্দোলন ইংরেজদের গোলাম থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য। দ্বিতীয়টা হচ্ছে- মূলনিবাসী মহামানবদের স্বাধীনতার আন্দোলন। এই আন্দোলন উচ্চবর্ণীয়দের গোলামি থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য।
বর্ণব্যবস্থা, জাতিব্যবস্থা আর অস্পৃশ্যতা থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য আমাদের মূলনিবাসী মহামণীষীরা স্বাধীনতার আন্দোলন করেছিলেন। উচ্চবর্ণীয়দের মিথ্যা ও বিকৃত ইতিহাস লিখে শুধুমাত্র তাদের স্বাধীনতার আন্দোলনের কথা তুলে ধরেছে। এটা তাদের দ্বারা বিকৃত ইতিহাসের সঙ্গে চালাকী ছিল। তাদের লেখা ইতিহাস দেখলে বোঝা যাবে যে, তারা সবসময় তাদের সুবিধার কথাই লিখেছে আর যাতে তাদের ক্ষতি হবে যে কথার কোন উল্লেখই করেনি। কারণ এতে তাদেরই লাভ হয়েছে। কিন্তু মূলনিবাসী বহুজনদের এতে লাভ তো দূরের কথা বদনাম আর ক্ষতি হয়েছে। তাই আমাদের ইতিহাস আমাদেরকেই লিখতে হবে। উচ্চবর্ণীয়দের যেটাকে লুকিয়ে রেখেছে, আমরা সেটাকে সবার সামনে তুলে ধরব। অর্থাৎ If They hide it, We must highlight.
এতোকিছু জানার পরেও কেউ যদি প্রশ্ন করেন যে, ‘আমরা কি স্বাধীন নই? তার উত্তর – আমরা যেটুকু অধিকার আজ ভোগ করছি সেটা হরিচাঁদ ঠাকুর ও গুরুচাঁদ ঠাকুরের আন্দোলনের ফসল মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলের নেতৃত্বে বাংলা থেকে বাবাসাহেব ড. আম্বেদকরকে সংবিধান সভায় পাঠানোর জন্য। বাবাসাহেব সংবিধানে মূলনিবাসীদের জন্য অর্থাৎ তপশিলি জাতি, তপশিলি উপজাতি ও অন্যান্য পিছিয়ে পড়া শ্রেণি আর ধর্ম পরিবর্তিত লোকদের জন্য সাংবিধানিক অধিকার দিয়েছেন। সেই অধিকার ভোগ করে তারা নিজেদের স্বাধীন মনে করছেন। প্রকৃতপক্ষে মূলনিবাসীরা এখনো উচ্চবর্ণীয়দের গোলাম হয়ে আছে। মানসিক গোলাম। এই গোলামি থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য মূলনিবাসী বহুজন মহামানবদের বিচারধারাকে সঙ্গে নিয়ে প্রকৃত স্বাধীনতার আন্দোলনের বিউগল বাজাতে হবে। তার জন্য প্রত্যেক মূলনিবাসী বহুজনকে তন মন ধন দিয়ে সহযোগীতা করতে হবে।
(তথ্য- ১. পুনাচুক্তির দুষ্পরিণাম- লেখক- বামন মেশ্রাম। অনুবাদক- জগদীশচন্দ্র রায়।
২. স্বাধীনতার দুই আন্দোলন- লেখক- ডি. আর. ওহোল। অনুবাদক- জগদীশচন্দ্র রায়।)

#স্বাধীনতা #আন্দোলন #আম্বেদকর #বাবাসাহেব

হরিলীলামৃত ছাপানোর ইতিহাস বিভ্রান্তিকর কেন?(এটা কি কারো বিশেষ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য করা হয়েছে?)লেখক- জগদীশচন্দ্র রায়     ...
08/08/2026

হরিলীলামৃত ছাপানোর ইতিহাস বিভ্রান্তিকর কেন?
(এটা কি কারো বিশেষ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য করা হয়েছে?)
লেখক- জগদীশচন্দ্র রায়
মতুয়াধর্ম দর্শনের প্রধান আকর গ্রন্থ ‘শ্রীশ্রীহরিলীলামৃত’ কিভাবে ছাপানো হয়েছিল, সেকথার বিস্তারিত উল্লেখ আছে দ্বিতীয় আকর গ্রন্থ, ‘শ্রীশ্রীগুরুচাঁদ চরিত’-এ। কিন্তু তৃতীয় আকর গ্রন্থ ‘সোনার মানুষ গোপাল সাধু’-এর সঙ্গে ২য় আকর গ্রন্থের ‘হরিলীলামৃত ছাপানোর ঘটনার অনেক বৈপরিত্য দেখা যায়। যদিও ২য় ও ৩য় আকর গ্রন্থের কবি একজন। আচার্য মহানন্দ হালদার। যাইহোক আসুন আমরা এই বিষয় সম্পর্কে বিস্তারিত বিচার বিশ্লেষণের চেষ্টা করি।
‘শ্রীশ্রীগুরুচাঁদ চরিত’- কবি মহানন্দ হালদার- ১ম প্রকাশ ১৯৪৩ সাল। আমার কাছে আছে ৫ম সংস্করণ ২০০৯ সাল, এই গ্রন্থের পৃ. ৩৩৭-৩৩৮ অনুসারে আমরা দেখতে পাই।
প্রভু তবে ডাক দিয়া কহে হরিবরে।
“চলে যাও কলিকাতা গ্রন্থ ছাপিবারে।।
সুধন্য, গোপাল আর তুমি একজন।
তিন জনে এক সঙ্গে করহ গমন।।”
প্রভুর আজ্ঞাতে তিনে তখনি ছুটিল!
পরদিনে কলিকাতা উপস্থিত হ’ল।।
পাণ্ডুলিপি প্রেসে দিলে গণ্ডগোল হয়।
প্রেস’য়ালা বলে “ইহা ছাপা নাহি যায়।।”
কারণ জিজ্ঞাসা করে সুধন্য কুমার।
প্রেস বলে “এক স্থানে আপত্তি আমার।।
নমঃশূদ্র ঘরে এল স্বয়ং ভগবান।
এই কথা ছাপিবারে নাহি বলে প্রাণ”।।
বহু তর্কাতর্কি পরে তবে রাজী হ’ল।
ছলে বলে কিছু টাকা বেশী নিয়া নিল।।
ছিদাম মুদির লেনে ছিল এক প্রেস।
এতদিনে তাহা বুঝি হইয়াছে শেষ।।
“শাস্ত্র প্রচার প্রেস” নাম বলি কয়।
দুই মাসে ছাপানর কার্য শেষ হয়।।
তের’শ তেইশ সালে গ্রন্থ ছাপা হ’ল।
প্রতিখণ্ড তিনটাকা মূল্য রেখে দিল।।

আর এই একই কবি অর্থাৎ আচার্য মহানন্দ হালদার রচিত গ্রন্থ “সোনার মানুষ গোপাল সাধু” – ১ম প্রকাশ ১৯৯২, আমার কাছে আছে ২য় সংস্করণ ২০০৮, এই গ্রন্থে (অখণ্ড সংস্করণ) পৃ. ৪৩৭ ও ৪৩৯ তে দেখতে পাই-
“তুমি যাবে হরিবর, আর যাক যজ্ঞেশ্বর,
আরো সাথে লইবে গোপালে।।” পৃ.৩৩৭
“অর্থ শুধু কথা নয়, এ গ্রন্থে যা’ লেখা রয়,
ছাপালে তা’ হ’তে হবে খুন।।”
***********
“মোদের রয়েছে জানা, ধর্মগ্রন্থ এইখানা,
তাতে দোষ ভেবে হারা দিশে।।”
ছাপাখানা ছিল যার, খুলে বলি পরিস্কার,
“কারণ ত’ তোমরা জান না।
লেখা আছে এই গ্রন্থে, কলিযুগ শেষপ্রান্তে,
অবতার করেছে কল্পনা।।
তা’ আবার কোনঘরে, টানিয়াছে সে ঈশ্বরে,
অতি ক্ষুদ্র নমঃশূদ্র ঘরে।
এই কথা যদি ছাপি, এক হ’ব মহাপাপী,
অপরাধী হ’ব তার পরে।।
অন্য অন্য জাতি সব, করে মহা কলরব,
আমাকে ধরিবে সবে বেড়ে।
***************
সাতদিন পরে বুঝে, অর্থ তার পায় খুঁজে,
কিবা করে উপায় এখন?
মুকুন্দ মল্লিক ধন্য, নমঃশূদ্র অগ্রগণ্য,
তাঁর কাছে করিল গমন।।
সব কথা বলে তাঁরে, জিজ্ঞাসিল কি প্রকারে,
ছাপা হবে লীলা গ্রন্থখানা।
*****************
যাহা হোক একখানে, ছিদাম মুদির লেনে,
ছাপাখানা আছে একখান।
নামেতে শাস্ত্র প্রচার, ছাপাখানা হয় যার,
জানি তিনি জাতিতে খ্রীষ্টান।।
সেইখানে গেলে পরে, মনে বলে হতে পারে,
চেষ্টা করে দেখুন সেথায়।
খ্রীষ্টানেরা কেহ আর, ধারে না এসব ধার,
কাজ করে যদি টাকা পায়।।’’
সেইখানে লেখা দিতে, মালিক সন্তুষ্ট চিত্তে,
পাণ্ডুলিপি করিল গ্রহণ।
মুল্যাদি সাব্যস্ত হলে, তিনজনে হরিবলে,
ওড়াকান্দি ফিরিল তখন।।
গ্রন্থ ছাপা হ’ল শেষ, মতুয়ার মনোক্লেশ,
দূর হ’ল প্রভুর কৃপায়। (পৃ. ৪৩৯)
আমরা প্রথমে দেখতে পাচ্ছি-
(১)গুরুচাঁদ ঠাকুর হরিবর সরকার, সুধন্য ও গোপালকে বই ছাপানোর জন্য যেতে বলছেন। কিন্তু পরের বইতে দেখতে পাচ্ছি- হরিবরের সঙ্গে যজ্ঞেশ্বর ও গোপালকে নিয়ে যেতে বলছেন গুরুচাঁদ ঠাকুর। তো সুধন্য ও যজ্ঞেশ্বরকে নিয়ে একটা বিভ্রান্তি ঘটছে। যদিও এটা তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়।
(২) তের’শ তেইশ সালে গ্রন্থ ছাপা হ’ল।
প্রতিখণ্ড তিনটাকা মূল্য রেখে দিল।।
কিন্তু ১৩২৩ সালের ছাপানো গ্রন্থে আমরা দেখতে পাই মূল্য ধার্য করা হয়েছে ২ টাকা।

(৩) বহু তর্কাতর্কি পরে তবে রাজী হ’ল।
ছলে বলে কিছু টাকা বেশী নিয়া নিল।।
প্রথম বইতে, বই ছাপানোর জন্য অনেক তর্কাতর্কির পরে কিছু টাকা বেশি নিয়ে বই ছাপাতে রাজী হওয়ার কথা পাই। কিন্তু দ্বিতীয় বইতে এই ধরণের কোনো সম্ভাবনারও উল্লেখ দেখতে পাইনা। বরং-
খ্রীষ্টানেরা কেহ আর, ধারে না এসব ধার,
কাজ করে যদি টাকা পায়।।’’
সেইখানে লেখা দিতে, মালিক সন্তুষ্ট চিত্তে,
পাণ্ডুলিপি করিল গ্রহণ।
দেখা যাচ্ছে দ্বিতীয় বইতে- মুকুন্দ মল্লিকের নির্দেশ মতো ছিদাম মুদি লেনের ‘শাস্ত্র প্রচার’ ছাপা খানায় গেলেন। যার মালিক হচ্ছেন খ্রিস্টান। তাই, বইতে কি লেখা আছে সেটা নিয়ে তাদের কোনো মাথা ব্যথা নেই। ছাপানোর টাকা পেলেই হলো।
যাহা হোক একখানে, ছিদাম মুদির লেনে,
ছাপাখানা আছে একখান।
নামেতে শাস্ত্র প্রচার, ছাপাখানা হয় যার,
জানি তিনি জাতিতে খ্রীষ্টান।।

প্রথম গ্রন্থ ছাপা হয় ১৯৪৩ সালে। যেটাকে মতুয়া আকর গ্রন্থ হিসাবে মেনে নেওয়া হয়েছে। আর এই গ্রন্থ ছাপানো হয়েছে বিশেষ নিয়ন্ত্রন ও নির্দেশনের মাধ্যমে আর গ্রন্থ সত্ত্বও কবির নিজের নেই। কিন্তু পরের গ্রন্থ কবি মহানন্দ হালদারের একান্ত ব্যক্তিগত। তাই এখানে কিন্তু আমরা এই বিভ্রান্তির জন্য কিছু নির্দেশনের গন্ধ পাচ্ছি ১ম বইতে। যেটা সাধারণ মতুয়া অনুরাগীদের মানসিক একটা প্রেসার দেওয়া হয়েছে। যেটা আমারও মতুয়া দর্শনে অবগাহন করার সময় মনে হয়েছিল। এসব কথা এই জন্য বলছি- কারণ, প্রমাণ্য সূত্রে জানাগেছে- পরবর্তিতে ‘শ্রীশ্রীহরিলীলামৃত’ যেটা ছাপা হয়েছে সেখানে বংশলতা দেওয়া আছে। যেটা প্রথম সংস্করণে নেই। আর ওই বংশলতা হরিচাঁদ ঠাকুরের পূর্বজদের ‘মৈথিলী ব্রাহ্মণ’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু সেটা সম্পূর্ণ সুপরিকল্পিতভাবে করা হয়েছে। যার বাস্তব প্রমাণও পাওয়া গেছে। এবং এটাও করা হয়েছে মতুয়াদের মানসিকভাবে বিভ্রান্ত করার জন্য। সঙ্গে আরোও কিছু উদ্দেশ্যও থাকাটা অসম্ভব নাও হতে পারে।
এবার পাঠকগণকে এই বিভ্রান্তির সম্পর্কে অনুধাবন করতে হবে। এর ফলে সঠিক মতুয়াধর্ম দর্শন প্রচারের ক্ষেত্রে কতটা লাভ বা ক্ষতি হয়েছে। আর এর ফলে কি বিশেষ কারো কারো বিশেষ সুবিধা হয়েছে??
#হরিলীলামৃত
#মতুয়া
#হরিচাঁদ
#গুরুচাঁদ

Address

Puna Link Road
Kalyan
410306

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Jagadish Roy posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Contact The Organization

Send a message to Jagadish Roy:

Shortcuts

Share