28/04/2026
সিংঘম বলতেই কি আমাদের চোখে ভেসে ওঠে রাষ্ট্রীয় মদতপুষ্ট কোনো পেশিবহুল অবয়ব? যার পেছনে আছে প্রশিক্ষিত ঘাতক বাহিনী, হাতে আধুনিক মারণাস্ত্র আর জনতাকে দমানোর সরকারি পরোয়ানা? না, ক্ষমতার দম্ভে মানুষ খুন করা বা ভীতি প্রদর্শন করা বীরত্ব নয়; ওটা স্রেফ পৈশাচিকতা। যদি মানুষ মারার দক্ষতাই মানদণ্ড হতো, তবে ফাঁসুরে নাটা মল্লিক হতেন এ যুগের শ্রেষ্ঠ নায়ক। কিন্তু ইতিহাস তাকে বীরের মর্যাদা দেয়নি।
প্রকৃত ‘সিংঘম’ হলো সেই ১৭ বছরের কিশোর, যে বাংলার মাটি থেকে এক চিলতে সুতলি বোমা নিয়ে কাঁপিয়ে দিয়েছিল দোর্দণ্ডপ্রতাপ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে। ফাঁসির দড়ি যাকে দেখে ভয়ে থরথর করে কেঁপেছিল, কিন্তু যার মুখে ছিল অমলিন হাসি।
প্রকৃত ‘সিংঘম’ সেই বিনয়-বাদল-দীনেশ, যারা পিস্তল হাতে ঢুকে পড়েছিলেন ইংরেজদের সুরক্ষিত দুর্গ রাইটার্স বিল্ডিং-এ। যারা মৃত্যুকে তুড়ি মেরে অত্যাচারীর বুকে বুলেটের জবাব দিয়েছিলেন।
আমরা কি ভুলে যাব সেই রোগা-পাতলা স্কুল মাস্টারকে? মাস্টারদা সূর্যসেন, যার নেতৃত্বে গুটিকয়েক তরুণ জালালাবাদ পাহাড়ের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ব্রিটিশ সিংহকে বুঝিয়ে দিয়েছিল—বাঙালি হারতে জানে না।
কিংবা সেই সত্তর বছরের বৃদ্ধা মাতঙ্গিনী, যাঁর হাতে তেরঙা পতাকা আর অকুতোভয় বুকে ব্রিটিশের বুলেট। দেহ লুটিয়ে পড়ল মাটিতে, কিন্তু কণ্ঠ থেকে শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত উচ্চারিত হলো— 'বন্দে মাতরম'। একেই বলে বীরত্ব, একেই বলে প্রকৃত সিংঘম।
আজকের প্রেক্ষাপটে বীরত্ব মানে কি পঞ্চাশজন মিলে পাঁচজনকে ঘিরে ধরা? না, ওটা কাপুরুষতা। বীরত্ব তো লুকিয়ে আছে সেই একাত্তর বছরের রোগা-পাতলা মহিলার তর্জনীতে, যা আকাশের দিকে তুলে যখন তিনি হুংকার ছাড়েন—"থামো, অনেক অত্যাচার হয়েছে", তখন দীর্ঘদিনের মহীরুহ সমান রাজনৈতিক দলগুলো ধূলিসাৎ হয়ে যায়।
একদিকে পৃথিবীর বৃহত্তম রাজনৈতিক দল, টাকার হিমালয়, ইডি-সিবিআই-এর মতো কেন্দ্রীয় সংস্থাসমূহ, আর একদল স্বার্থান্বেষী মীরজাফর। অন্যদিকে কেবল এক জননেত্রীর অদম্য জেদ। দেশের প্রধানমন্ত্রী থেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, ১৯টি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীরা তাবু খাটিয়ে পড়ে থেকেও যার একটি চুল পর্যন্ত বাঁকা করতে পারছে না। বারবার তারা পর্যুদস্ত হচ্ছে সেই সাধারণ বেশভূষার এক মহিলার একক লড়াইয়ের কাছে।
প্রকৃত সিংঘম তো তিনিই, যিনি সর্বশক্তি প্রয়োগের মুখেও মাথা নত করেন না।
যাদের হাতে আধুনিক মারণাস্ত্র, যারা গ্রামে গ্রামে গিয়ে "মার দেঙ্গে-কাট দেঙ্গে" বলে হুমকি দেয়, বাংলার রাখাল বালকরাও আজ তাদের দেখে উপহাসের হাসি হাসে। তারা জানে, বুলডোজার দিয়ে গরিবের ঘর ভাঙা সহজ, কিন্তু বাঙালির মেরুদণ্ড ভাঙা অসম্ভব।
ইতিহাস সাক্ষী আছে—বাঙালি ভয়কে জয় করতে জানে, ভয়কে ভয় দেখাতে জানে। যারা ক্ষমতার দম্ভে রক্তচক্ষু দেখাচ্ছে, তারা ভুলে গেছে যে এই মাটি বিপ্লবের, এই মাটি প্রতিরোধের। যেখানে পদমর্যাদা বা বন্দুকের নলে সিংঘম জন্মায় না, সিংঘম জন্মায় অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর হিমালয়সম সাহসে।